পাকিস্তানে তখন উর্দি শাসন। জেনারেল মোশাররফ ক্ষমতায়। রাজনৈতিক দলগুলো মারাত্মক চাপে। নেতারা দেশছাড়া।
পিপিপি নেত্রী বেনজির ভুট্টোও দেশে ঢুকতে পারছেন না। তাঁকে পালাবদল করে কখনো লন্ডনে, কখনো দুবাইয়ে থাকতে হচ্ছে।
এই রকম সময়ে ২০০১ সালের ২৫ নভেম্বর বিকেল বেলায় দিল্লিতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (পরে উপপ্রধানমন্ত্রী হন) লালকৃষ্ণ আদভানির বাসায় বেড়াতে এসেছেন বেনজির ভুট্টো।
চা খেতে খেতে আদভানি বললেন, ‘ভুট্টোজি, ভারত-পাকিস্তানের জন্মসময় আর অতীত তো প্রায় একই। এই সময়ের মধ্যে ভারতে তো গণতন্ত্র মোটামুটি পোক্ত ভিত্তি পেল; কিন্তু পাকিস্তানে পেল না কেন?’
বেনজির ভুট্টো বললেন, ‘দেখুন, এর পেছনে দুটি কারণ। একটি হলো, আপনাদের সেনাবাহিনী রাজনীতিতে নাক গলায় না। আরেকটি হলো, আপনাদের একটি সত্যিকারের শক্তিশালী আর নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন আছে যা জনগণের ভোট পাওয়া দলকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ নিশ্চিত করে। পাকিস্তানে এ দুটো নেই।’
২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনে আদভানির জবানিতে এই স্মৃতিচারণমূলক ঘটনাটির উল্লেখ আছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) সম্পর্কে বেনজির ভুট্টোর এই উচ্চ ধারণার কারণ হলো—ভারতের নির্বাচন কমিশনাররা সরকারের সামনে প্রায় কখনোই মাথা নত করেননি।
আর ইসিআইয়ের মাথা না ঝোকানোর সাহসের ভিত্তি গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন দেশটির প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) গণিতবিদ সুকুমার সেন।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন করতে সুকুমার সেনকে তাড়া দিচ্ছিলেন।
কিন্তু সুকুমার বুঝতে পারছিলেন, ১৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের (যার প্রায় ৮৫ শতাংশ ছিল অশিক্ষিত) তালিকা তৈরি করা, নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ করা, লাখ লাখ ব্যালট বাক্স তৈরি করা ও পাহাড়ি অঞ্চলে রাস্তাঘাট তৈরি করা ছাড়া নির্বাচন দেওয়া অসম্ভব। বিষয়টি নেহরুকে জানানোর পরও তিনি নির্বাচন দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।
এতে বিরক্ত হয়ে সুকুমার সেন স্পষ্টভাবে নেহরুকে জানিয়েছিলেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া নির্বাচন দেওয়া সম্ভব না।
তিনি নেহরুকে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন এবং নেহরুর ‘তাড়াহুড়ো’ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন।
সুকুমার সেনের ইসিআই ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন করেছিল। সে সময় ভোটার তালিকা বানানোর সময় উত্তর ভারতের অনেক নারী ভোটার তালিকায় নিজের নাম না দিয়ে ‘অমুকের স্ত্রী’ বা ‘অমুকের মা’ হিসেবে পরিচয় দিতে চাইছিলেন।
অনেক রাজনৈতিক নেতা তাতে সমর্থনও দিয়েছিলেন। কিন্তু সুকুমার সেন নারীর নিজস্ব নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
স্বাধীনতার পরপরই নাগরিক হিসেবে নারীর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন।
নীতিতে অটল থাকা ও সরকারের সামনে মাথা না নোয়ানোর জন্য ভারতে যিনি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি নামকরা, তিনি হলেন দেশটির দশম সিইসি তিরুনেল্লাই নারায়ণ আইয়ার শেষন। সবাই তাঁকে টিএন শেষন নামে চেনে।
১৯৯১ সালে সেই সময়কার সদ্যনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সরকার টিএন শেষনকে ‘একান্ত বাধ্যগত’ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষনকে তাঁর সার্বভৌম অবস্থান থেকে একচুলও নড়ানো সম্ভব হয়নি।
টিএন শেষন তাঁর আত্মজীবনী থ্রু দ্য ব্রোকেন গ্লাস: অ্যান অটোবায়োগ্রাফিতে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও এবং আমার মধ্যের তিক্ত সম্পর্কের সূচনা সম্ভবত ১৯৯১ সালের অক্টোবরের একটি ঘটনার মাধ্যমে হয়েছিল। সে সময়কার আইনমন্ত্রী বিজয় ভাস্কর রেড্ডির দপ্তর নিয়মিতভাবে নির্বাচন কমিশনকে সংসদীয় প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে দিতে বলত। এতে আমি আপত্তি তুলি। আমি তাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলাম, নির্বাচন কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের কোনো অধীনস্থ শাখা নয়।
আমি আমার দপ্তরকে কোনো উত্তর তৈরি না করার নির্দেশ দেওয়ায় আইনমন্ত্রী রেড্ডি ক্ষুব্ধ হন। আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম, সংসদে আইন মন্ত্রণালয়ের উত্তর দেওয়ার জন্য যেসব তথ্য ও নথি প্রয়োজন, কমিশন শুধুমাত্র সেই প্রাসঙ্গিক তথ্যগুলোই সরবরাহ করবে।
বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রী রেড্ডি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ জানান এবং প্রধানমন্ত্রী আমাকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে পাঠান। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই রেড্ডি আমাকে বলেন, “আপনি মোটেও কো-অপারেটিভ (সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের) নন। ”
আমি জবাব দিই, “দেখুন, আমি কোনো কো-অপারেটিভ সোসাইটি নই; আমি নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিত্ব করি। ”
প্রধানমন্ত্রী আমার উত্তর শুনে হতভম্ব হয়ে যান। এরপর প্রধানমন্ত্রীর দিকে ঘুরে আমি বলি, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার মন্ত্রীর মনোভাব যদি এমন হয়, তবে তাঁর সঙ্গে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। ”’
আত্মজীবনীতে টিএন শেষন লেখেন, ‘এরপর আরও সমস্যা শুরু হয়। সে বছরের জুনে নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে হতো। নিয়ম ছিল, ছয় মাসের মধ্যে সংসদে আসন না পেলে তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদ চলে যাবে।’
টি এন শেষন লিখেছেন, কয়েকটি আসনে উপনির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। সেগুলোর মধ্যে উত্তর প্রদেশের ইটাওয়াও ছিল। সরকার চাচ্ছিল না ইটাওয়াতে নির্বাচন হোক, কারণ সরকার বুঝতে পারছিল, ইটাওয়ার উপনির্বাচনে কংগ্রেস পার্টির প্রার্থীর জয় পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
টি এন শেষন লিখেছেন, ‘আইন প্রতিমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন, একটি নির্দিষ্ট আসনকে (ইটাওয়া) যেন বাদ রাখা হয়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট আসনকে বাদ দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের কারও নেই। আইনগত কোনো বড় সমস্যা না থাকলে এমনকি রাষ্ট্রপতিরও এমন নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। নির্বাচন কমিশন ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট আসনের নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি কখন জারি করা হবে তা ঠিক করার ক্ষমতা আর কারও নেই।’
আমার বলা হুবহু শব্দগুলো ছিল এমন, “আমি এটি মেনে নেব না। আমার কী করা উচিত তা নির্দেশ করার অধিকার সরকারের কারও নেই। যদি আপনার কোনো ভালো যুক্তি থাকে, তবে আমাকে বলুন। আমি যুক্তি শুনব, কিন্তু কোনো হুকুম বা আদেশ শুনব না।ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওকে উদ্দেশ করে দেশটির সাবেক সিইসি টি এন শেষন
শেষন লিখেছেন, ‘এটিই ছিল আমার স্বায়ত্তশাসনের প্রথম আসল পরীক্ষা। আমি রামা দেবীকে (সে সময়কার আইন সচিব ভি. এস. রামাদেবী, যিনি পরবর্তীতে সিইসি হয়েছিলেন) ফোন করে জানিয়ে দিই, প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে এটি আমার কাছে অপমানজনক। কোন আসনের বিজ্ঞপ্তি কখন জারি করা হবে তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক নির্বাচন কমিশন, এখানে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই।
...আমি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করলাম এবং একটি অত্যন্ত কঠিন কথোপকথনকে সংক্ষেপে এনে বললাম, “সরকারের মধ্যে হয়তো একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে আমি একটি ঘোড়া আর সরকার আমার সওয়ার। ”
আমার বলা হুবহু শব্দগুলো ছিল এমন, “আমি এটি মেনে নেব না। আমার কী করা উচিত তা নির্দেশ করার অধিকার সরকারের কারও নেই। যদি আপনার কোনো ভালো যুক্তি থাকে, তবে আমাকে বলুন। আমি যুক্তি শুনব, কিন্তু কোনো হুকুম বা আদেশ শুনব না।
...প্রধানমন্ত্রী আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি রঙ্গরাজনের (তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী) সঙ্গে বিষয়টি মিটিয়ে নিন। ” আমি বললাম, “না, আমি তাঁর সঙ্গে এটি মেটাতে যাচ্ছি না। আমি আপনার সঙ্গেই এর ফয়সালা করব। নির্বাচন কমিশনকে অমান্য করার চেষ্টা করার জন্য আমার শ্রী রঙ্গরাজনের কাছ থেকে একটি ক্ষমা প্রার্থনা বা দুঃখপ্রকাশের চিঠি প্রয়োজন।...শ্রদ্ধার সঙ্গেই বলছি, এমনকি রাষ্ট্রপতিরও নির্বাচন কমিশনকে অমান্য করার ক্ষমতা নেই। এটি একটি অত্যন্ত মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব। ”’
টিএন শেষন লিখেছেন, ‘এরপর আইন প্রতিমন্ত্রী রঙ্গরাজন আমাকে ফোন করলেন এবং তামিল ভাষায় কথা শুরু করে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার সমস্যাটা কোথায়? ” আমি বললাম, “আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি একটি ক্ষমা প্রার্থনা চাই। আমাকে অমান্য করার চেষ্টা করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত দুঃখপ্রকাশ চাই। ”
...আমি আরও বললাম, “দুপুর একটার মধ্যে আমি যদি সেই চিঠি না পাই, তবে আমি পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়াই বাতিল করে দেব। আর এর ফলে যে কজন ব্যক্তি প্রভাবিত হবেন, তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীও একজন। কারণ ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁর নির্বাচন সম্পন্ন হতে হবে, কিন্তু আমি তা হতে দেব না। আমি স্পষ্ট বলে দেব যে এই সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমি নির্বাচন করব না। আর এতে প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কারও কিছুই করার থাকবে না। ”
টিএন শেষন লিখেছেন, ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় আইন মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষমা চেয়ে ইসিআইকে চিঠি দেওয়া হয়।
টিএন শেষনের সময় তাঁর সঙ্গে সরকারের সংঘাত এতটাই বেড়ে যায় যে, তাঁর ক্ষমতার ডানা ছেঁটে ফেলতে ১৯৯৩ সালে নির্বাচন কমিশনকে এক সদস্যের প্রতিষ্ঠান থেকে তিন সদস্যের কমিশনে পরিণত করা হয়।
শেষন নতুন দুই নির্বাচন কমিশনার-এম এস গিল এবং জি ভি জি কৃষ্ণমূর্তির নিয়োগের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যান। কিন্তু আদালত শেষ পর্যন্ত তিন কমিশনারের সমান মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্ট করে।
ভারতের আরেক সিইসির কথা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তিনি ড. এস ওয়াই কুরেইশি। তিনি ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সিইসি ছিলেন। ওই সময় উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল।
সে সময় কুরেইশি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও হেভিওয়েট নেতাদের প্রচারণায় ব্যবহৃত সরকারি গাড়ি, নিরাপত্তাবহর ও ভিআইপি সুবিধার ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন। এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরাও যেন কোনোভাবে প্রভাব খাটাতে না পারেন, সে জন্য তাঁদের বক্তব্য ও চলাচলের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছিলেন।
সরকারি মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের নোটিশ পাঠাতে তিনি দ্বিধা করেননি।
২০১২ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় কেন্দ্রীয় আইন ও বিচারমন্ত্রী সলমান খুরশিদ উত্তর প্রদেশের মুসলিম ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ৯ শতাংশ সংখ্যালঘু উপ-কোটা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
আইনমন্ত্রীর এই ঔদ্ধত্যের পর কুরেইশি সরাসরি রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল এবং প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংকে চিঠি দিয়ে জানান, একজন আইনমন্ত্রী ইসিআইয়ের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অবমাননা করছেন এবং এতে কমিশনের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত সলমান খুরশিদ নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিতভাবে দুঃখপ্রকাশ প্রকাশ করতে বাধ্য হন।
কুরেইশির কমিশন এটিকে নির্বাচনী আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন হিসেবে ঘোষণা করে খুরশিদকে তিরস্কার করে চিঠি দেয়।
আইনমন্ত্রী কুরেইশির এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে এক জনসভায় বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন আমাকে ফাঁসি দিতে পারে, কিন্তু আমি থামব না, আমি আমার কথা বলে যাব।’
আইনমন্ত্রীর এই ঔদ্ধত্যের পর কুরেইশি সরাসরি রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল এবং প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংকে চিঠি দিয়ে জানান, একজন আইনমন্ত্রী ইসিআইয়ের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অবমাননা করছেন এবং এতে কমিশনের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত সলমান খুরশিদ নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিতভাবে দুঃখপ্রকাশ প্রকাশ করতে বাধ্য হন।
তো, মোটা দাগে এই হলো ভারতের সিইসিদের আত্মমর্যাদাবোধের ইতিহাস। তবে আজকের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ইসিআইয়ের সেই মহান ভাবমূর্তি আর নেই। তার ঔজ্জ্বল্য এখন প্রায় মুছে গেছে।
কারণ বর্তমান ইসিআই ভোটার তালিকা সংশোধন করার নামে ভারতের ১৩ কোটির বেশি নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে সরাসরি ‘ডিলিট’ করে দিয়েছে। ভেবে দেখুন ১৩ কোটি! পৃথিবীর বহু দেশের মোট জনসংখ্যাও এত না।
ভোটার তালিকা থেকে গণহারে নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়ার এই কাজটি হয়েছে সরাসরি আইনকে মাড়িয়ে দিয়ে।
এর জন্য দায়ী হিসেবে যে নামটি এখন সয়লাব হয়ে গেছে, সে নামটি হলো জ্ঞানেশ কুমার। আজকের ভারতের সিইসি জ্ঞানেশ কুমার।
জ্ঞানেশ কুমার কেন ‘বিশ্বাসঘাতক’
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘মোদির হাতের পুতুল’ বলেছেন।
একই বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ‘চোর’ বলেছেন।
২৪ সেপ্টেম্বর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে তাঁর পদত্যাগ চেয়েছেন।
সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব একইদিনে নির্বাচন কমিশনকে ‘মোদির হাতের পুতুল’ বলে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়েছেন।
তরুণদের আন্দোলন ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র অভিজিৎ দীপকে তাঁকে ‘জাতীয় বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করে তাঁর অপসারণ চেয়েছেন।
ভারত জুড়ে তাঁর অপসারণের দাবিতে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আন্দোলনের তাপে রাজপথ তেতে উঠেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন করার জন্য ইসিআই যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) চালাচ্ছে, তাতে ধরা পড়া অনিয়ম এবং ১৩ কোটির বেশি ভোটার বাদ পড়া নিয়ে জ্ঞানেশ কুমার বেশ কিছুদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন।
তবে সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা সবাইকে হতবাক করেছে এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির কট্টর সমর্থক সমর্থক ছাড়া বাকি সবার কাছেই জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন কমিশনের পবিত্র মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করা ‘গণবিরোধী ভিলেন’ হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছেন।
ভারতের আইন অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় কার নাম থাকবে আর কার নাম বাদ যাবে, কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখেন স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তা।
কিন্তু কোনো রকম আইন সংশোধন ছাড়াই এখন স্থানীয় অফিসারদের কাছ থেকে সেই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
কে ভোটার হবেন আর কে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বেন, তার চূড়ান্ত ফয়সালা স্থানীয় পর্যায় থেকে আসছে না; আসছে দিল্লি থেকে।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, শুধুমাত্র জনতার ভোট চুরি হয়েছে তা-ই নয়, জ্ঞানেশ কুমারের দুই সতীর্থ নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির ‘ভোট’ও চুরি হয়ে গেছে।
মানে যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে সান্ধু ও যোশির ভোট বা সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে, তাঁদের কিছু না জানিয়েই সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মূলত এই খবর সামনে আসার পর তোলপাড় শুরু হয় এবং সিইসির পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়। তবে গোটা ছবি বুঝতে হলে সবার আগে ইসিআই কীভাবে কাজ করে তা আমাদের বুঝতে হবে।
ইসিআই যেভাবে কাজ করে
১৯৫০ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হওয়া ইসিআই সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে একটি স্থায়ী সাংবিধানিক পর্ষদ।
এর একেবারে ওপরের সারিতে আছেন তিনজন নির্বাচন কমিশনার। এদের একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা সিইসি। আর দুজন হলেন নির্বাচন কমিশনার বা ইসি।
প্রথমে মনে হতে পারে, জ্ঞানেশ কুমার যেহেতু সিইসি, সেহেতু অন্য দুই কমিশনারের চেয়ে তাঁর ক্ষমতা বেশি। আদতে মোটেও তা না। আসলে তিনজনের ক্ষমতা একদম সমান সমান।
গোড়াতেই বলেছি, আগে ইসিআইয়ে কমিশনার ছিলেন একজন। কিন্তু ১৯৯১ সালে সে সময়কার সিইসি টি এন শেষনকে নরসিমা রাওয়ের সরকার বশে আনতে না পেরে তিনজন কমিশনারের পর্ষদ বানিয়েছিল।
নরসিমার পরিকল্পনা ছিল, টিএন শেষন সরকারের অপছন্দনীয় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইলেই বাকি দুই ইসিকে দিয়ে আপত্তি তুলে তা আটকে দেওয়া হবে।
এই পর্ষদ বানানোর সময় নরসিমার সরকার বলেছিল, ইসিআই যাতে কোনো একক ব্যক্তির একক ইচ্ছার অধীনে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য এই বিধান করা হয়েছে।
তখন থেকেই সিইসি কমিশনের প্রধান হলেও অতিরিক্ত কোনো ক্ষমতা তাঁর হাতে নেই। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সিইসিকে ‘ফার্স্ট অ্যামাং ইকুয়ালস’ বলা হয়েছে।
২০০৯ সালে নবীন চাওলা সিইসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় নিজেই বলেছিলেন, ‘সিইসি ইজ দ্য ফার্স্ট অ্যামাং ইকুয়ালস’। তিনি বলেছিলেন, ‘তিনজনই সমান এবং সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেওয়া হবে।’
উল্টোপথে ইসিআই
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর আবাসিক সম্পাদক ঋতিকা চোপড়ার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ইসিআই তার নিজের বিধানের ঠিক উল্টো পথে হেঁটেছে।
দেখা যাচ্ছে, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ইসিআইয়ের কিছু সিদ্ধান্তের কঠোর বিরোধিতা করার পরও তা বাস্তবায়িত হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, ইসিআই এমনসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে ব্যাপারে সান্ধু ও যোশিকে জানানো পর্যন্ত হয়নি।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এর রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত, অর্থাৎ ১০ মাসে জ্ঞানেশ কুমারের ভোট সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সান্ধু ও যোশি একবার-দুবার নয়, ১৪ বার চিঠি দিয়েছেন।
এই সময়ের মধ্যে ইসিআই বেশ কয়েকটি আদেশ জারি করেছে; অথচ সেসব আদেশের বিষয়ে সান্ধু ও যোশিকে কিছুই জানতে দেওয়া হয়নি।
সে কারণে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন কমিশনাররা যদি এসব আদেশ জারি না করে থাকেন, তাহলে সেগুলো জারি হলো কার তরফ থেকে?
সব চাবি দিল্লির হাতে!
১৯৫০ সালের ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্ট’ এবং ১৯৬০ সালের ‘রেজিস্ট্রেশন অব ইলেকটোরস রুলস’ অনুযায়ী ভোটার তালিকা করার দায়িত্ব স্থানীয় ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের (ইআরও)। ইআরও মূলত সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট বা এসডিএম পর্যায়ের কর্মকর্তা।
আইন অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের কাগজপত্র দেখে ভোটার তালিকায় কার নাম থাকবে, কার নাম বাদ যাবে, সেটা ঠিক করবেন ইআরও।
ভোটার তালিকা যাতে কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতের মুঠোয় না যেতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা।
এই কারণে যতবার ভোটার তালিকায় নয়ছয় করার অভিযোগ উঠেছে, তালিকায় কোনো বিশেষ পক্ষের লোকের নাম বেশি অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ উঠেছে, ততবারই সরকারের দিক থেকে বলা হয়েছে, দ্যাখো, কেন্দ্র থেকে ভোটার তালিকা ঠিক করা তো সম্ভবই না; কারণ এই যে ভোটার তালিকা বানানো হয়েছে, তা তো দেশের হাজার হাজার স্থানীয় অফিসারের বানানো; এটা তো কোনো একক ব্যক্তির করা জিনিস না।
আইন অনুযায়ী ইআরওদের হাতে এই অ্যাপের নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার কথা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ দেওয়া তো দূরের কথা, সীমা খান্নার টিম ইআরওদের এই সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকারই বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে কোনো ইআরও ভোটার তালিকায় কোনো ভোটারের নাম যুক্তও করতে পারেন না, কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদও দিতে পারেন না। অথচ আইনে ভোটার তালিকায় নাম ঢোকানো বা নাম বাদ দেওয়ার দায় ইআরওদের ঘাড়ে এখনো চাপিয়ে রাখা হয়েছে।
যুগ যুগ ধরে ভারতে এই ব্যবস্থা সত্যি সত্যি ছিল। কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, জ্ঞানেশ কুমার সেই পুরো সিস্টেমটাকে ভেঙে দিয়েছেন।
তিনি সাব ডিভিশন পর্যায়ের হাজার হাজার ইআরওর কাছ থেকে ভোটার নিবন্ধনের ক্ষমতা দিল্লির মুঠোয় নিয়ে নিয়েছেন। তাঁর এই কাজকে পানির মতো সহজ করে দিয়েছে একটি সফটওয়্যার। সেটির নাম ইসিআইনেট।
২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি ইসিআইনেট চালু করার অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের আইটি ডিভিশনের মহাপরিচালক (ডিজি-আইটি) ড. সীমা খান্না বলেছিলেন, এই অ্যাপের কারণে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা আগের চেয়ে বাড়বে।
ইসিআইনেটে সারা ভারতের সব ভোটারের তথ্য আছে। এর নিয়ন্ত্রণ আছে দিল্লিতে সীমা খান্নার আইটি টিমের হাতে।
আইন অনুযায়ী ইআরওদের হাতে এই অ্যাপের নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার কথা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ দেওয়া তো দূরের কথা, সীমা খান্নার টিম ইআরওদের এই সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকারই বন্ধ করে দিয়েছে।
ফলে কোনো ইআরও ভোটার তালিকায় কোনো ভোটারের নাম যুক্তও করতে পারেন না, কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদও দিতে পারেন না। অথচ আইনে ভোটার তালিকায় নাম ঢোকানো বা নাম বাদ দেওয়ার দায় ইআরওদের ঘাড়ে এখনো চাপিয়ে রাখা হয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এর প্রতিবেদন বলছে, ইসি বিবেক যোশি ২০২৬ সালের ২৯ মে সিইসি জ্ঞানেশ কুমার, ইসি সুখবীর সান্ধু এবং ডেপুটি ইসি সঞ্জয় কুমারকে লিখিতভাবে জানান, ইআরও ছাড়া ভোটার তালিকায় অদলবদল আনার এখতিয়ার আর কারও নেই এবং মাঠপর্যায়ের যেসব কর্মকর্তা ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধনের দায়িত্বে আছেন, আইনমতে তাঁদের সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকার থাকতে হবে।
বিবেক যোশির এই প্রস্তাবকে ১৩ জুলাই অপর ইসি সুখবীর সান্ধু সমর্থন করেন। অর্থাৎ তিন কমিশনারের মধ্যে দুইজনই ভোটার তালিকা কেন্দ্রীয়করণে আপত্তি তোলেন এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভোটার তালিকা বানানো থেকে সরে আসার প্রস্তাব দেন।
আইন অনুযায়ী, তাঁদের এই প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু তাঁদের কোনো কথাই কানে তোলা হয়নি।
সুখবীর সান্ধু লিখিতভাবে জানান, নির্বাচন কমিশনের আইটি ডিভিশন কয়েক মাসে অনেকগুলো নতুন মডিউল এবং পোর্টাল চালু করেছে; অথচ কমিশনকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি; তিনি মিডিয়ার মাধ্যমে এই খবর জেনেছেন।
তিনি গত ১৬ এপ্রিল কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান, কমিশনের নামে অনেক চিঠি ইস্যু করা হচ্ছে এবং অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যে বিষয়ে কমিশনের অনুমোদনই নেই।
এর আট দিন পরে বিবেক যোশিও ঠিক একই কথা বলেন।
গত ২৮ জুলাই ঘটনা চূড়ান্ত অবস্থায় চলে যায়। ওই দিন একটি ‘ওয়ার্ক অ্যালোকেশন অর্ডার’-এর মাধ্যমে ডেপুটি ইলেকশন কমিশনার সঞ্জয় কুমারের কাছ থেকে আইটি বিভাগের ওপর তাঁর আনুষ্ঠানিক তদারকি ও রিপোর্টিংয়ের ক্ষমতা সরিয়ে নেওয়া হয়।
মানে, সঞ্জয় কুমারের কাছে ডিজি-আইটি সীমা খান্নাকে যে দৈনন্দিন আইটি কার্যক্রমের ফিরিস্তি দিতে হতো, সে ক্ষমতা সঞ্জয়ের কাছে থেকে নিয়ে নেওয়া হয়।
সে ক্ষমতা সরাসরি সীমা খান্নার হাতে দেওয়া হয়। সিনিয়র ডেপুটি ইলেকশন কমিশনার মণীশ গর্গ দায়িত্ব বণ্টনের এই আদেশ জারি করেন।
এর পরের দিন ২৯ জুলাই সান্ধু ও যোশি দুজনেই আলাদাভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের কেবিনেট সচিব টি. ভি. সোমনাথনকে চিঠি দিয়ে বলেন, সঞ্জয় কুমারের কাছ থেকে আইটি তদারকির ভার সীমা খান্নার হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে দিল তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না।
তাঁরা কড়া ভাষায় এই দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ নিয়ে আপত্তি জানান এবং পরদিনই, অর্থাৎ ৩০ জুলাই সান্ধু ও যোশি যৌথভাবে মণীশ গর্গের আদেশটি বাতিল করে আগের দায়িত্ব বণ্টন বহাল রাখেন।
নতুন সিদ্ধান্তে কমিশনে ঐকমত্য না হওয়া পর্যন্ত আগের দায়িত্ব বণ্টন চালু রাখতে তাঁরা নির্দেশ দেন। কিন্তু আগের দায়িত্ব বণ্টন মৌখিকভাবে বাতিল হলেও তা নিয়ে নতুন কোনো লিখিত আদেশ জারি হয়নি।
ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন দায়িত্ব বণ্টন কার্যকর আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
কে ভোটার, কে নয়, বাতলাচ্ছে অ্যালগরিদম!
এসআইআর চলাকালীন এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা গেছে শুধু পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে ৬৩.৬৬ লাখ ভোটার বাদ পড়েছেন। পাশাপাশি প্রায় ৬০ লাখ ভোটারের তথ্যকে ‘অসংগতিপূর্ণ’ (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি/নো ম্যাপিং) বা সন্দেহভাজন হিসেবে ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে।
এই ক্যাটাগরির লোকেরা হলেন ‘সাসপেক্টেড’ ভোটার। এদের তথ্য পুনরায় বিচার ট্রাইব্যুনালে শুনানি এবং নথিপত্র যাচাইয়ের অধীনে রাখা হয়।
বলা হয়, যাচাই হওয়ার পর যদি তাঁরা বৈধ ভোটার বলে প্রমাণিত হন, তাহলেই তাঁরা ভোট দিতে পারবেন, তার আগে নয়। তার মানে এই কায়দায় শুধু পশ্চিমবঙ্গে এক কোটি ২০ লাখ লোক ভোট দিতে পারেননি।
এই সিদ্ধান্ত কে দিয়েছে? না, কোনো অফিসার দেননি, কোনো বিচারক দেননি। এই সিদ্ধান্ত দিয়েছে ইসিআইনেট নামের সেই সফটওয়্যার যা চালু করার আগে আগাম পরীক্ষা পর্যন্ত করা হয়নি।
এ সেই সফটওয়্যার যা এক রাতে সারা ভারতের সাত কোটি ভোটারকে ‘সাসপেক্টেড’ বানিয়ে দিয়েছে।
‘সন্দেহজনক ভোটার’দের নাম তালিকা থেকে বাদও দেওয়া হয়নি, অন্তর্ভুক্তও করা হয়নি। এদের ‘ডিলিট’ এবং ‘কনফার্ম’-এর মাঝামাঝি একটা জায়গা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
যে যে কারণে সন্দেহজনক তালিকায় এই ভোটারদের রাখা হয়েছে, তা চোখ ছানাবড়া করার জন্য যথেষ্ট।
কেউ হয়তো MOHAMMAD নামের বানানে ‘O’ এর জায়গায় ‘U’ লাগিয়ে দিয়েছে, অথবা ‘MANDAL’ এর ‘A’ এর জায়গায় ‘O’ বসিয়ে দিয়েছে; তার নাম সোজা ‘সাসপেক্টেড’ তালিকায় চলে গেছে।
কারও লিঙ্গ পরিচয় পরিবর্তিত হয়ে থাকলে; বাবার সঙ্গে সন্তানের বয়সের ফারাক ১৫ বছরের কম ও ৪৫ সালের বেশি হলেও তিনি ‘সাসপেক্টেড’ হয়েছেন।
ভারতে সাধারণ মানুষের কাগজপত্রে নামের বানানের অদলবদল খুবই সাধারণ ঘটনা। বহু মানুষ পড়তেও পারেন না। কোনো অফিসার কী লিখে দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে এখন তাঁর ভোটের অধিকার চলে গেছে।
১৯৫২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৩ বার এসআইআর হয়েছে। এর মধ্যে কখনোই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা ‘আন্ডার অ্যাডজুকেশন’ বা ‘সাসপেক্টেড’-ক্যাটাগরি বলে কিছু ছিল না। এই জিনিস জ্ঞানেশ কুমারের আবিষ্কার।
শুরু থেকেই বিজেপির নেতারা বলে আসছিলেন, বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মতো রাজ্যে বাংলাদেশিদের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একাধিকবার বলেছেন, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা’ ঘুণপোকার মতো ভারতে ঢুকে ভারতকে ভেতর থেকে ঝাঁজরা করে দিচ্ছে।
তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে এক কোটির বেশি লোক ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বেন এবং ওই লোকগুলো মূলত বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া মুসলমান নাগরিক।
কিন্তু এসআইআরয়ের পর দেখা গেল, পুরো পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৪.৩ শতাংশ এমন ভোটার পাওয়া গেছে যাঁদের নাম ২০০২ সালের এসআইআর-এর সঙ্গে মেলেনি।
আরও মজার ব্যাপার হলো মুসলমান সংখ্যাধিক্যের এলাকাগুলোতে সবচেয়ে কম ‘নো ম্যাপিং’ ভোটার (‘নো ম্যাপিং’ অর্থ হলো নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল ডেটাবেইস একজন ভোটারের তথ্যের সঙ্গে তাঁর বাস্তব ঠিকানার সংযোগ/মিল বা সঠিক ‘ম্যাপ’ না থাকা) পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বেশি ‘নো ম্যাপিং’ রেট পাওয়া গেছে মতুয়া সম্প্রদায় অধ্যুষিত আসনগুলোতে।
এরা মূলত ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া শরণার্থী সম্প্রদায়। দেখা গেছে, দৃশ্যত মুসলমান ভোটারদের বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে এসআইআর করা হলেও ফল হয়েছে উল্টো।
সীমান্তবর্তী যে এলাকায় সবচেয়ে বেশি মুসলমান, সে এলাকায় সবচেয়ে কম ‘আন ম্যাপড’ ভোটার; এবং যে এলাকায় সবচেয়ে বেশি মতুয়া ও দলিত হিন্দু, সে এলাকায় সবচেয়ে বেশি ‘আন ম্যাপড’ ভোটার মিলেছে।
আসামেও একই ঘটনা দেখা গেছে। সেখানেও মুখ্যত, মুসলমান ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বাদ দিতে এসআইআর করা হয়েছিল।
কিন্তু সেখানে দেখা গেল বাদ পড়া ১৯ লাখের মধ্যে ৭ লাখ মুসলমান এবং বাকিরা প্রায় সবাই হিন্দু। তার মানে বিজেপি সরকার যে উদ্দেশে এসআইআর করেছিল, সে উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
ইসিআইনেটের কাজ ছিল, ২০ বছর আগেকার পুরোনো ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান ভোটারের তথ্য মিলিয়ে দেখা।
সফটওয়্যারটি যেখানেই একটুখানি অমিল পেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে সে ভোটারকে সন্দেহজনক হিসেবে মার্ক করেছে।
ভারতের অলাভজনক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সংস্থা দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ (টিআরসি) অনুসন্ধান করে জেনেছে, পুরোনো তথ্য এই সফটওয়্যার ঠিকমতো যাচাই করতে পারে কি পারে না, তা আগেভাগে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।
একজন সিনিয়র অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে রিপোর্টার্স কালেকটিভের কাছে স্বীকার করেছেন, এই সফটওয়্যার কতটুকু সঠিক রেজাল্ট দেয়, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণা নেই।
ভেবে দেখুন, যে সফটওয়্যারের মাধ্যমে কোটি কোটি লোকের ভোট বাতিল হয়ে গেছে, সেই সফটওয়্যারের অ্যাকিউরেসির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনো ধারণাই নেই।
এ বছরের ২৪ মার্চ যখন ফল প্রকাশের জন্য এই সফটওয়্যার চালু করা হয়, তখন এক সেকেন্ডের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাত কোটি ভোটারকে ‘সাসপেক্টেড’ ক্যাটাগরিতে ফেলে দেওয়া হয়।
এর দুই ঘণ্টা পর ‘টেকনিক্যাল গ্লিচ’ বা কারিগরি ত্রুটি ঘোষণা দিয়ে তা ‘ঠিক’ করা হয়। এরপর কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই দ্বিতীয়বার তা চালু করা হয়। তখনো বিপত্তি ঘটে।
স্রেফ অ্যালগরিদমের ওপর ভরসা করে লাখ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
কারগিল যুদ্ধে ভারতীয় সেনা হিসেবে অংশ নিয়ে আহত হওয়া মোহাম্মাদ দুয়াল আলি বাদ পড়েছিলেন।
তিনি নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য সেনাবাহিনীর কাগজ দেখিয়েছেন, চাকরির নথি দেখিয়েছেন। কিন্তু ইলেকশন কমিশন তাঁকে ‘সাসপেক্টেড’ হিসেবে ঝুলিয়ে রেখেছে।
কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শহীদুল্লাহ মুনশি, যিনি কলকাতা ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারপারসন, তিনিও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন।
তাঁর ছেলে-মেয়েকে সাসপেক্টেড ক্যাটাগরিতে রাখা হয়। তিনি যখন সংবাদ সম্মেলন করে এর প্রতিবাদ করেন, তখন সমালোচনা এড়াতে রাতারাতি তাঁকে ভোটার লিস্টে তোলা হয়।
কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে সে অধিকার আদায় করা সম্ভব হয়নি।
এই অবস্থা দেখা গেছে গোয়াতেও। সেখানে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে, মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তারা কাগজপত্র যাচাই করে দেখলেন, তাঁদের মধ্যে ৯৭ জন সন্দেহাতীতভাবে প্রকৃত ভোটার।
নির্বাচন কর্মকর্তারা ওই ৯৭ জনের নাম ভোটার তালিকায় তোলার জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু তালিকায় তাঁদের নাম উঠছিল না।
ওদিকে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময় এগিয়ে আসছিল। তালিকায় তাঁদের নাম তোলার জন্য গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি-এই সাত দিনে ৮ বার গোয়ার নির্বাচন কর্মকর্তা দিল্লিতে ইমেইল করেছেন।
কিন্তু দিল্লি থেকে জানানো হয়, তাদের নাম ডিলিট করা হয়েছে এবং আবার নাম ফিরিয়ে আনার কোনো অপশন সফটওয়্যারে নেই। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা চাওয়ার পরও সত্যিকারের ভোটারদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি।
৯৭ সংখ্যাটি শুনতে খুব কম মনে হতে পারে। কিন্তু এটা হলো, খবরে আসা সংখ্যা। পুরো দেশে কোটি কোটি আসল ভোটার এইভাবে বাদ পড়েছেন।
সুখবীর সান্ধু ও বিবেক যোশির আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে যে উদ্যোগের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভোটারকে ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছে, সেটি হলো ফরম-৬ এ অতিরিক্ত ‘ঘোষণাপত্র’ জুড়ে দেওয়া।
ফরম-৬ হলো এমন একটি ফরম যেটি ভারতের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ভোটার হতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে পূরণ করতে হয়।
এখানে ভোটারকে নাম, লিঙ্গ, জন্ম তারিখ ও স্থান, পিতা/মাতা/স্বামী/স্ত্রীর নাম, পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও স্বাক্ষর/টিপসই, জন্ম নিবন্ধনের সনদ, আধার কার্ড, পাসপোর্ট, প্যান কার্ড ইত্যাদি দিতে হয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইসিআইনেট পোর্টালে এই ফরমে একটি নতুন ঘোষণা যুক্ত করা হয়। সেখানে আবেদনকারীকে বলতে হতো—
১. তাঁর নিজের নাম সর্বশেষ এসআইআরের ভোটার তালিকায় আছে কি না;
২. তাঁর বাবা, মা, দাদা বা দাদির নাম সেই তালিকায় আছে কি না; অথবা
৩. তাঁর নিজের বা বাবা-মায়ের কারও নামই সেই তালিকায় নেই।
এই তিনটির মধ্যে যে কোনো একটিতে টিক দিতে বলা হয়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এর প্রতিবেদন বলছে, ১৬ মে বিবেক যোশি এই ঘোষণা যুক্ত করার বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি দিয়েছিলেন।
যোশির যুক্তি ছিল, ফরম-৬ রেজিস্ট্রেশন অব ইলেকটোরস রুলস, ১৯৬০-এর অধীনে নির্ধারিত আইনসিদ্ধ ফরম। এতে পরিবর্তন আনতে হলে ওই ১৯৬০ সালের বিধি সংশোধন করতে হবে।
১৯ মে সুখবীর সিং সান্ধুও যোশির বক্তব্যের সঙ্গে একমত হন। অর্থাৎ তিন সদস্যের কমিশনের মধ্যে দুজন লিখিতভাবে একই আইনি আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আপত্তি শোনা হয়নি। এই ফরম-৬ এর বলি হয়ে লাখ লাখ মানুষ ভোটার হতে পারেননি।
এখন জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কের আবহে এসআইআর হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলোতে ফরম-৬-এর বদল বাতিল করেছে ইসি।
ইসি এখন বলছে, ফরম-৬-এর সঙ্গে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র জমা দিতে হবে না। অর্থাৎ, এসআইআর-পর্বের আগে যে চেহারায় ফরম-৬ মিলত, সেই চেহারাতেই সেটি মিলবে।
ভিআইপিদের বিশেষ সুবিধা, জেন-জিদের বাদ!
ভারতীয় সংবিধানে একটি মৌলিক বিধি আছে। সেটি হলো ‘ইউনিভার্সাল অ্যাডাল্ড ফ্র্যাঞ্চাইজ’।
মানে, সবার ভোটের অধিকার আছে এবং প্রত্যেকের ভোটের মূল্য সমান। সমাজে যত বৈষম্যই থাকুক, ভোটের বেলায় যেন সবাই সমান হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার এই সর্বজনীন ভোটের ধারণাও পাল্টে দিয়েছেন। তাঁর নিয়মে ভোটার হলো দুই প্রকার। এক. সাধারণ ভোটার; দুই. ভিআইপি ভোটার।
দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ–এর চার সাংবাদিক আয়ূষী কর, শুভাঙ্গী দেড়গোবিন্দ, সুমেধা মিত্তাল ও দীক্ষা কৈরালার একটি যৌথ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন দিল্লিতে ঊর্ধ্বতন অফিসার, বিচারক, আইপিএস, সেলিব্রেটিদের মতো লোকদের ‘ভিআইপি’ হিসেবে মার্ক করেছে যাতে তাঁদের নাম কোনোভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।
তাঁদের নাম বাদ পড়লে মিডিয়ায় হইচই হবে এবং তাতে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি খারাপ হবে-এটা ভেবে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এটি নিশ্চিত করতে কমিশন তাদের অ্যাপে একটি বিশেষ মডিউলও যুক্ত করেছে যাতে ভিআইপিদের সহজে শনাক্ত করা যায়।
অর্থাৎ ভিআইপিদের ওপর বিশেষ খেয়াল রাখা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে।
জেনজিদের সঙ্গে আলাদাভাবে প্রতারণা করা হয়েছে। ইকোনমিক টাইমস এর সাংবাদিক অনুভূতি বিষ্ণুইয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমের পর থেকে স্পেশাল সামারি রিভিশন বা এসএসআর হয়নি।
এর ফলে ২০২৪ সালের পর যে তরুণের বয়স ১৮ বছর পূরণ হয়েছে, তিনি ভোটার হতে পারেননি।
ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, এই জেন-জি তরুণেরা ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারকে ভোট দেবে না, এমনটি মনে করেই তাঁদের ভোটার হতে দেওয়া হয়নি।
এখানে দেখার মতো বিষয় হলো, ২০২৪ সালেই দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সান্ধু এবং বিবেক যোশি এসএসআর শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
কিন্তু সিইসি জ্ঞানেশ কুমার ‘শিগগিরই দেখছি’ বলে গত দুই বছরেও এসএসআর করেননি। অনেকের ধারণা, জেন-জি এখনই ভোটার হোক, সেটি তিনি চাননি।
এইসব কারণে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবিতে ভারত উত্তপ্ত হচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টি তাঁকে পদত্যাগ করার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছিল।
সে সময় পার হয়ে গেছে। তাঁরা আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে লাগাতার আন্দোলনে যাচ্ছে। সঙ্গে থাকছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।
প্রশ্ন হলো, জ্ঞানেশ কুমার নিজের মর্জিমতো এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছেন?
নাকি পর্দার ওপাশ থেকে তাঁকে চালিয়েছে অন্য কেউ? বলা হচ্ছে, যে ব্যক্তি জ্ঞানেশ কুমারকে সিইসির চেয়ারে বসিয়েছেন, তাঁর ইশারাতেই জ্ঞানেশ কুমার ভোটার তালিকার ওপর এসআইআর নামের বোমা ফেলে ‘গণহত্যা’ চালিয়েছেন।
নিরপেক্ষ ইসি ভারতের গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হলেও দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, শাসক দল বারবার নিজেদের সুবিধার জন্য এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের পকেটে পুরতে চেয়েছে।
১৯৯০-এর দশকে সিইসি টি এন শেষন যখন কঠোর হাতে নির্বাচনী অপরাধ বন্ধ করতে শুরু করেন, তখন নরসিমা রাও সরকার তাঁকে নানাভাবে চাপ দিয়েও কাবু করতে ব্যর্থ হয়।
শোধ তুলতে ১৯৯৩ সালে অরডিন্যান্স জারি করে একক সদস্যের কমিশনকে তিন সদস্যের পর্ষদে রূপান্তর করা হয়।
সেখানে সমান ভোটিং ক্ষমতা দিয়ে আরও দুজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়, যাতে সেশনের ক্ষমতা ছেঁটে ফেলা যায় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
সেই কৌশলের আরও আধুনিক, আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখা গেছে ২০২৩ সালে মোদি সরকারের পাস করা নতুন আইনে।
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, সিইসি ও কমিশনারদের নিরপেক্ষ নিয়োগের জন্য কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতিকে (সিজেপি) রাখতে হবে।
কিন্তু মোদি সরকার সুপ্রিম কোর্টের সেই প্রস্তাবিত কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে দেয়। তার জায়গায় একজন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করে।
এর ফলে ৩ সদস্যের বাছাই কমিটিতে সরকারের প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়ান ২ জন (প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রী) আর বিরোধী পক্ষে মাত্র ১ জন।
অর্থাৎ, কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে আর কাকে বাদ দেওয়া হবে, সেই চূড়ান্ত চাবিটি পুরোপুরি ক্ষমতাসীন দলের হাতে চলে যায়।
সেই চাবিতেই জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগের তালা খুলে যায়। সেই চাবির জোরেই সিইসির চেয়ারে বসেন জ্ঞানেশ। হয়তো সেই চাবি যেদিকে ঘোরে, তাঁকেও সেদিকে ঘুরতে হয়। সে কারণেই জ্ঞানেশ কুমারকে ‘বিশ্বাসঘাতক’, ‘দেশদ্রোহী’, এমনকি ‘চোর’ গালিও শুনতে হচ্ছে।
এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। সে ঘটনা বিজেপির জন্য বড় আঘাত ছিল।
কিন্তু এবার যদি জ্ঞানেশ কুমারকে একইভাবে সরে যেতে হয়, তাহলে তাতে সবচেয়ে ক্ষতি হবে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার।
কারণ ইতিমধ্যেই এসআইআর বাতিলের দাবি উঠেছে। আন্দোলনের মুখে যদি এসআইআর বাতিল হয়, তাহলে বিভিন্ন রাজ্যে হয়ে যাওয়া বিধান সভার নির্বাচনও বাতিলের দাবি তুঙ্গে উঠবে।
ভোট চুরির সব দায় তখন মোদির ওপর পড়বে। সে কারণে মোদি সরকার ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কত দূর যাবে, তা কেউ জানে না।
২০০১ সালের ২৪ নভেম্বর বিকেল বেলা দিল্লিতে লালকৃষ্ণ আদভানির সরকারি বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন বেনজির ভুট্টো।
সেই ব্যক্তিগত আলাপচারিতার ১৬ বছর পর ২০০৭ সালে বেনজির মারা যান আততায়ীর গুলিতে। তবে আদভানি বেঁচে আছেন। এখন তাঁর বয়স ৯৮ বছর।
জ্ঞানেশ কুমারের এই কীর্তিকলাপ দেখে যে কারও মনে হতে পারে, আজ যদি বেনজির বেঁচে থাকতেন এবং একইভাবে দিল্লিতে আদভানির বাড়িতে যেতেন, তাহলে কি আদভানি সেই আগের প্রশ্নটি আগের মতো করতে পারতেন?
বেনজিরও কি চা খেতে খেতে বলতে পারতেন: ‘দেখুন, ভারতে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হওয়ার পেছনে দুটি কারণ। একটি হলো, আপনাদের সেনাবাহিনী সরাসরি রাজনীতিতে নাক গলায় না। আরেকটি হলো, আপনাদের একটি সত্যিকারের শক্তিশালী আর নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন আছে যা জনগণের ভোট পাওয়া দলকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ নিশ্চিত করেছে।’
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক।
ইমেইল: [email protected]*মতামত লেখকের নিজস্ব।
