ভারতে ব্রিকস সম্মেলন: নিরামিষভোজনের নামে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি

ব্রিকস সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের দলগত ছবি। ভারতের নয়াদিল্লিতেছবি: রয়টার্স

আজকাল হিন্দুত্ববাদের ঔদ্ধত্য যেন সব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ভারতের কূটনীতি যখন সবচেয়ে নিচু অবস্থানে, তখনো তারা সভ্যতার নামে বাঁদরামি করতে দ্বিধা করছে না।

সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে শেষ হওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সদস্যদেশগুলোর সফররত রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মানে জমকালো নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে সব খাবারই ছিল নিরামিষ—খান্ডভি মিলে-ফুই, খুম্ব গালৌটি, পনির লাবাবদার, মিলেট পোলাও ও জিলাপি। ‘শ্রী অন্ন’ বা মিলেটকে ঘিরেই সাজানো হয়েছিল খাবারের তালিকা।

এর উদ্দেশ্য যে ভারতের সভ্যতাগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করা, তা ছিল স্পষ্ট। এটি কেবল হাতে গোনা কয়েকটি ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতের খাদ্যসংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল না। ভারতের খাদ্যসংস্কৃতি হিসেবে মিলেটকে তুলে ধরার পেছনে মোদির ব্যক্তিগত পছন্দও প্রতিফলিত হয়েছে।

মিলেট সত্যিই ভারতের দরিদ্র মানুষের প্রধান খাবার। কিন্তু নয়াদিল্লির সম্মেলনকেন্দ্র ভারত মণ্ডপমে এটি সে অর্থ বহন করেনি। যথারীতি দরিদ্র মানুষকে ভিআইপি চলাচলের পথের পাশে কিলোমিটারের পর কিলোমিটারজুড়ে বসানো বিশেষ পর্দার আড়ালে রাখা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

চীনের সি চিন পিং ছাড়া সফররত অতিথিরা সবাই নৈশভোজে ছিলেন। সি চিন পিং নিজের অপারগতার কথা জানিয়েছিলেন। অন্য অতিথিরা মোদির শারীরিক ঘনিষ্ঠতার প্রকাশকে যেভাবে কূটনীতি হিসেবে মেনে নেন, এ আয়োজনও সেভাবেই সহ্য করেছেন। কিন্তু এ কাজের দুঃসাহস সাধারণ মানুষের নজর এড়ায়নি।

২০১৪ সালে কেন্দ্রে হিন্দুত্ববাদী শক্তি ক্ষমতা দখলের পর থেকে তারা ভারতীয় সভ্যতা সম্পর্কে নিজেদের অজ্ঞতাপ্রসূত ধারণা স্বৈরতান্ত্রিকভাবে মানুষের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নিদর্শন সরিয়ে হিন্দুত্ব ও মোদির ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত নিদর্শন বসানোর মধ্যেও এর প্রকাশ ঘটেছে।

এ কর্মকাণ্ডের চালিকা শক্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস। সংগঠনটি এমনভাবে কথা বলে যেন তারাই বিশ্বের সব জ্ঞানের উৎস। নিরামিষভোজন অবশ্যই তাদের বিশেষ বাতিক। বছরের পর বছর ধরে তারা বহু প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর থেকে আমিষ খাবার সরিয়েছে বা এর অবস্থান দুর্বল করেছে। এমনকি বিদ্যালয়ে শিশুদের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজ থেকে ডিম সরানোর পর্যায়েও তারা গেছে।

ভারতীয় সভ্যতার বিকৃত এ উপস্থাপন বছরের পর বছর ধরে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে। এটি সাংস্কৃতিক সমরূপীকরণের বৃহত্তর একটি প্রকল্পের অংশ। এ ধরনের অনেক রীতির পেছনে জাতপাতের যে স্পষ্ট উৎস রয়েছে, এ প্রকল্প তা আড়াল করে বা ভুলভাবে উপস্থাপন করে।

নিরামিষভোজনের জুজু

হিন্দুত্ববাদের আরও অনেক দাবির মতোই ভারতীয় সংস্কৃতির নির্ধারক বৈশিষ্ট্য হিসেবে নিরামিষভোজনের দাবিটিও বাস্তবতার অত্যন্ত বাছাই করা উপস্থাপনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ভারতের ধর্ম নিয়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২১ সালের জরিপে দেখা গেছে, ভারতের অধিকাংশ মানুষ নিজেদের নিরামিষভোজী বলে পরিচয় দেন না। সরাসরি প্রশ্ন করা হলে ৬১ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাঁরা নিরামিষভোজী নন। বিপরীতে ৩৯ শতাংশ নিজেদের নিরামিষভোজী বলেছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ হিন্দু।

নিজেদের নিরামিষভোজী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার হার অঞ্চলভেদেও ব্যাপকভাবে আলাদা। পশ্চিম, মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ হিন্দু নিজেদের নিরামিষভোজী বলেন। কিন্তু পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে এই হার অনেক কম।

ভারতের নিজস্ব জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য জরিপও (এনএফএইচএস-৫, ২০১৯-২১) একই চিত্র তুলে ধরেছে। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৮৩ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৭০ দশমিক ৬ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিদিন, সপ্তাহে অথবা মাঝেমধ্যে আমিষ খাবার খান। ২০১৫-১৬ সালের জরিপে পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৭৮ দশমিক ৪ শতাংশ।

নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
রয়টার্স

সাপ্তাহিক মাংস খাওয়ার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পুরুষদের ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নারীদের ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত একবার মাছ, মুরগি অথবা অন্য মাংস খেয়েছেন। পাঁচ বছর আগে এ হার ছিল যথাক্রমে ৪৮ দশমিক ৯ এবং ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ।

অঞ্চলভেদে পার্থক্যটি প্রকট। লাক্ষাদ্বীপ, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, গোয়া, কেরালা ও পদুচেরিতে আমিষ খাবার গ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে হরিয়ানা, পাঞ্জাব, গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশে এ হার সবচেয়ে কম।

এমনকি হিন্দুধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও সংখ্যাগরিষ্ঠের খাদ্যাভ্যাস আমিষনির্ভর। হিন্দু পুরুষদের ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নারীদের ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা নিয়মিত মাংস, মাছ অথবা ডিম খান।

বিশুদ্ধতা নিয়ে অতিমাত্রায় সচেতন অনেক প্রচারে ডিমকে মাংসের সমতুল্য বিবেচনা করা হয়। ডিম খাওয়ার হার আরও বেশি। পুরুষদের ৮৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারীদের ৭২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিদিন, সপ্তাহে অথবা মাঝেমধ্যে ডিম খান।

আরও পড়ুন

এ তথ্যের সঙ্গে সরকারি বক্তব্যের ব্যবধান পরীক্ষা করেছেন জনস্বাস্থ্য গবেষকেরা। তাঁরা বলেছেন, নিরামিষভোজনের প্রচার চালানো রাজ্য প্রশাসনগুলো এমন একটি ভাষ্য ব্যবহার করেছে, যেখানে আমিষভোজীদের ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু হিসেবে দেখানো হয়। অথচ তথ্য তার উল্টো চিত্র তুলে ধরে।

এর পেছনের রাজনীতি নিয়ে কারও দৃষ্টিভঙ্গি যা-ই হোক, এ প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানগত দাবিটির পক্ষে সরকারের নিজস্ব জরিপেই জোরালো সমর্থন রয়েছে। দাবিটি হলো, ভারতের বিপুল মানুষ আমিষ খাবার খায় এবং তাদের সংখ্যা কমার পরিবর্তে বাড়ছে।

বিশ্বের মাংস অর্থনীতিতে ভারতের বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে নিরামিষভোজনের রাজনৈতিক প্রচার খুবই বেমানান। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরু ও মহিষ রয়েছে ভারতে। বিশ্বের প্রায় ৫৯ শতাংশ মহিষ এবং প্রায় ১৯ শতাংশ গরু ভারতে রয়েছে। উভয় হিসাবেই দেশটি বিশ্বে প্রথম। একই সময়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারত গবাদিপশুর মাংস রপ্তানিতে বিশ্বের বৃহত্তম দেশগুলোর অন্যতম।

গরুকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক

ভারতীয় সভ্যতার পরিচায়ক হিসেবে নিরামিষভোজনকে তুলে ধরার বিষয়টি হিন্দুত্ববাদের গরুকেন্দ্রিক রাজনীতির পাশাপাশি রাখলে এর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক অর্থটি ধরা পড়ে।

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে গরু জবাই ও গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে এ নীতির সূচনা হয়েছিল। বিধান লঙ্ঘনের জন্য রাখা হয়েছিল কঠোর শাস্তি। এরপর মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিশেষ সুবিধাজনক একটি উপায় হয়ে ওঠে গরুর মাংস খাওয়া।

কেবল মুসলমানরা নন, দলিত, আদিবাসী ও অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও গরুর মাংস খায়। এ বাস্তবতা ওই রাজনৈতিক নির্মাণের জন্য অসুবিধাজনক। কারণ, এসব সম্প্রদায় বৃহত্তর হিন্দু জনগোষ্ঠীর অংশ। তাই গরুর মাংস খাওয়াকে ক্রমে বিশেষভাবে মুসলমানদের রীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে গরুকে উপস্থাপন করা হয় হিন্দু সভ্যতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে।

এভাবে খাবারের একটি প্রশ্নকে পরিচয়ের প্রশ্নে রূপান্তর করা হয়। এরপর পরিচয়ের প্রশ্নকে পরিণত করা হয় বর্জনের রাজনীতিতে।

এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অ–পশ্চিমা বিশ্বের বড় কূটনৈতিক সমাবেশে পরিণত হয়
ছবি: রয়টার্স

এ প্রক্রিয়া গরু রক্ষাতেই শেষ হয় না। গরুর মাংসকে একবার সফলভাবে ‘অপর’ মুসলমানের খাবার হিসেবে চিহ্নিত করার পর এর বিপরীত খাদ্যাভ্যাসকে ধীরে ধীরে সভ্য ও খাঁটি ভারতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে উন্নীত করা যায়।

ঐতিহাসিকভাবে নিরামিষভোজন নির্দিষ্ট ধর্মীয়, জাতপাতভিত্তিক ও আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু এটিকেই সামগ্রিকভাবে ভারতের খাদ্যগত পরিচয় হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এভাবে গরুকেন্দ্রিক রাজনীতি হিন্দুত্ববাদের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সমরূপীকরণ প্রকল্পের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

প্রাতিষ্ঠানিক নিরামিষভোজন

নথিভুক্ত বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক নীতির মাধ্যমে নিরামিষভোজনকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলোর একটি হলো মধ্যাহ্নভোজ প্রকল্প থেকে ডিম সরিয়ে দেওয়া। পরে এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘পিএম পোষণ’। এটি বিনা মূল্যে রান্না করা দুপুরের খাবার দেওয়ার প্রকল্প। সুবিধাভোগী শিশুদের অনেকের জন্য এটিই দৈনিক আমিষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস।

২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমবঙ্গে নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার এ প্রকল্পে খাবার সরবরাহের চুক্তি দেয় হরে কৃষ্ণ সংগঠন ইসকনকে। তাদের কঠোর নিরামিষ খাদ্যতালিকায় ডিমকে মাংসের সমতুল্য মনে করা হয়। ফলে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিক্ষার্থীর খাবার থেকে ডিম সরিয়ে দেওয়া হয়।

শিক্ষক, পুষ্টিবিদ ও অভিভাবকদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত বদলায়। ডিম ফিরিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি নিরামিষভোজী দাতব্য প্রতিষ্ঠানটির খাবার সরবরাহও বহাল রাখা হয়।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ২০২৩ সালে কর্ণাটকে শিক্ষার্থীদের ডিম দেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো এর সমালোচনা করেছিল। বার্ড ফ্লুর কারণ দেখিয়ে বিহার সাময়িকভাবে ডিম সরিয়ে দিয়েছিল।

নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রিত রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য মোদির নৈশভোজের আয়োজন
ছবি: এনডিটিভি থেকে সংগৃহীত

জৈন ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর আবেদনের পর মহারাষ্ট্রও ডিমসংক্রান্ত নীতি সংশোধন করে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, অন্তত ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীর সম্মতি না থাকলে ডিম পরিবেশন করা যাবে না। ইসকনের সঙ্গে যুক্ত দাতব্য প্রতিষ্ঠান যেসব বিদ্যালয়ে খাবার দেয়, সেগুলোকে এ নীতির আওতামুক্ত রাখা হয়।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নিরামিষভোজন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ভারতের প্রধান কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবার খাদ্যগত পৃথক্‌করণের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

আইআইটি বোম্বেতে ২০১৮ সালের একটি হোস্টেল নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের আমিষ খাবারের জন্য আলাদা ‘ট্রে ধরনের’ থালা ব্যবহার করতে বলা হয়েছিল। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির মেস কাউন্সিল ১২৯টি টেবিলের মধ্যে ৬টি শুধু নিরামিষভোজীদের জন্য সংরক্ষণ করে। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সংরক্ষিত একটি টেবিলে বসে আমিষ খাবার খান। পরে তাঁদের জরিমানা করা হয়।

২০১৮ সালে আইআইটি মাদ্রাজে একটি মেসে নিরামিষভোজী ও আমিষভোজী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ, বাসনপত্র ও হাত ধোয়ার বেসিন চালু করা হয়েছিল। এর প্রতিবাদ জানায় আম্বেদকর পেরিয়ার স্টাডি সার্কেল। সংগঠনটি এ ব্যবস্থাকে উচ্চবর্ণের মানুষের সঙ্গে ‘অপবিত্র’ হিসেবে বিবেচিত মানুষদের পৃথক রাখতে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক দুই প্রবেশপথ–ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্মীয় আচার হিসেবে গরু জবাইকে হত্যার ধরন হিসেবেই শ্রেণিবদ্ধ করা হতো না। গুপ্ত যুগের শেষ ভাগ পর্যন্ত গরুর মাংসসহ বিভিন্ন মাংস খাওয়ার প্রচলন ছিল। ধর্মনিরপেক্ষ চিকিৎসা ও সাহিত্যবিষয়ক লেখায় শাকসবজি বা ফলের মতোই মাংসের উল্লেখ এসেছে, কোনো ধরনের বিস্ময় ছাড়াই। এরপরই কেবল নিরামিষভোজন আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এর পেছনে বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের অহিংসার মতবাদের প্রভাব ছিল।

আইআইটি খড়্গপুরে ২০২৪ সালে হল কর্তৃপক্ষের এক নির্দেশনায় বসার জায়গা পৃথক করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, নিরামিষভোজীদের টেবিলে আমিষভোজীরা বসলে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের পরই প্রতিষ্ঠানটি এ নির্দেশনা প্রত্যাহার করে।

ভারতের সবচেয়ে অভিজাত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রায় অভিন্নভাবে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। প্রতিবারই আম্বেদকরপন্থী শিক্ষার্থী গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্বে আন্দোলনের পর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। আন্দোলনকারীরা স্পষ্টভাবে জাতপাতভিত্তিক অস্পৃশ্যতার ভাষা ব্যবহার করেছেন। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন ভুল সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

ভারতীয় রেলওয়ে বিশেষ বিশেষ দিনে শুধু নিরামিষ খাবারের তালিকা চালুর চেষ্টা করেছে। আহমেদাবাদসহ কয়েকটি পৌর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় শহরের রাস্তায় আমিষ খাবার বিক্রি সীমিত করার চেষ্টা করেছে। এতে মুসলমান, দলিত ও নিম্নবর্ণের বিক্রেতা ও ভোক্তারা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

অনেক শহরে নতুন আবাসিক কমপ্লেক্স থেকে প্রকাশ্যে মুসলমানদের বাদ দেওয়া এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একইভাবে আরও প্রচ্ছন্ন উপায়ে দলিত ও আদিবাসীদেরও বাদ দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় মাংস ও ডিম বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এর ফলে শহুরে পরিবেশ ক্রমেই পৃথক জাত ও সম্প্রদায়ের বস্তিতে বিভক্ত হচ্ছে। ঔপনিবেশিক আমল থেকে শহরগুলো বিভিন্ন জাত ও সম্প্রদায়ের মিলনস্থল হয়ে ওঠার যে প্রবণতা দেখিয়েছিল, এখন তা উল্টো দিকে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

ঐতিহাসিক উৎসধারা

নিরামিষভোজন হিন্দু সভ্যতার চিরন্তন ও অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, এ দাবি মূলধারার ঐতিহাসিক গবেষণায় খণ্ডিত হয়েছে।

এর একটি উদাহরণ ডি এন ঝার ‘দ্য মিথ অব দ্য হোলি কাউ’। প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের পাশাপাশি বৈদিক, ব্রাহ্মণ্যবাদী, বৌদ্ধ ও জৈন উৎস ব্যবহার করে লেখা বইটিতে খাদ্য হিসেবে গবাদিপশুর মাংস খাওয়ার বৈদিক উল্লেখ তুলে ধরা হয়েছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্মীয় আচার হিসেবে গরু জবাইকে হত্যার ধরন হিসেবেই শ্রেণিবদ্ধ করা হতো না। গুপ্ত যুগের শেষ ভাগ পর্যন্ত গরুর মাংসসহ বিভিন্ন মাংস খাওয়ার প্রচলন ছিল। ধর্মনিরপেক্ষ চিকিৎসা ও সাহিত্যবিষয়ক লেখায় শাকসবজি বা ফলের মতোই মাংসের উল্লেখ এসেছে, কোনো ধরনের বিস্ময় ছাড়াই।

এরপরই কেবল নিরামিষভোজন আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এর পেছনে বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের অহিংসার মতবাদের প্রভাব ছিল।

অস্পৃশ্যতা ও গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে বাবাসাহেব আম্বেদকরের ১৯৪৮ সালের প্রবন্ধটি ঝার বইয়ের পরিশিষ্ট হিসেবে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। বিভিন্ন লেখ্য উৎসের ভিত্তিতে আম্বেদকর যুক্তি দিয়েছেন, বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় নিয়মিত গরুর মাংস থাকত।

নরেন্দ্র মোদি, যোগী আদিত্যনাথ ও অমিত শাহ
ফাইল ছবি

ঝার মতে, গরুকে পুরোপুরি পবিত্র করে তোলার ঘটনা আরও পরের। তিনি এটিকে উনিশ শতকের গরু রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। দয়ানন্দ সরস্বতীর মতো সংস্কারকেরা এসব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ইতিহাস দেখায়, বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে ব্রাহ্মণরা পবিত্রতার বিধানগুলো নতুনভাবে তৈরি করেছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেগুলো আরও কঠোর হয়ে এমন একটি মতবাদে রূপ নেয়, যেখানে ধর্মীয় পবিত্রতা, জাতপাতের অবস্থান ও নির্দিষ্ট কিছু খাবার না খাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করা হয়।

ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী যুগে এ মতবাদকে একটি একক ও কথিত প্রাচীন হিন্দু পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

আম্বেদকর এ ইতিহাসকে সরাসরি জাতপাতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যেসব সম্প্রদায়কে পরে অস্পৃশ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তারা গরুর মাংস খাওয়ার অভ্যাস বজায় রেখেছিল। এর কারণ, জাতপাত মানা হিন্দুরা গরুর মাংস না খাওয়াকে ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতীক এবং তা খাওয়াকে অপবিত্রতার প্রতীক বানিয়েছিল।

আরও পড়ুন

অর্থনৈতিক স্ববিরোধ

বিশ্বের মাংস অর্থনীতিতে ভারতের বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে নিরামিষভোজনের রাজনৈতিক প্রচার খুবই বেমানান।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরু ও মহিষ রয়েছে ভারতে। বিশ্বের প্রায় ৫৯ শতাংশ মহিষ এবং প্রায় ১৯ শতাংশ গরু ভারতে রয়েছে। উভয় হিসাবেই দেশটি বিশ্বে প্রথম।

একই সময়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারত গবাদিপশুর মাংস রপ্তানিতে বিশ্বের বৃহত্তম দেশগুলোর অন্যতম। বিশেষভাবে এটি মহিষের মাংস বা ‘কারাবিফ’। ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে গরু জবাই সীমিত হলেও মহিষ জবাই সীমিত নয়।

১৯৯৯-২০০১ সালে ভারতে গবাদিপশুর মাংস রপ্তানির বার্ষিক গড় ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার টন। ২০১৩-১৫ সালে তা আনুমানিক ২১ লাখ টনে উন্নীত হয়। ২০১৪ সালে রপ্তানির পরিমাণে ব্রাজিলকে সামান্য পেছনে ফেলে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গরুর মাংস রপ্তানিকারক হয়ে ওঠে।

এ বাণিজ্যের সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে মহিষের মাংস রপ্তানি ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই প্রথম এ বাণিজ্যের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

গরু ও গরুর মাংসকেন্দ্রিক বিজেপির রাজনীতি সমালোচনা তৈরি করেছে
ফাইল ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠিত বাজারের পাশাপাশি মিসর, উজবেকিস্তান ও রাশিয়ায় নতুন বাজার তৈরি হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, বাণিজ্যিক মহিষের মাংস রপ্তানি খাতের মালিকদের মধ্যে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দুসহ অমুসলিমরাও রয়েছেন।

এ কাজে ব্যবহৃত প্রাণীদের বিপুল অংশই অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনক্ষমতা হারানো দুগ্ধপালনের পশু। এর মধ্যে রয়েছে দুধ দেওয়ার উৎপাদনক্ষম বয়স পেরিয়ে যাওয়া মহিষ, বন্ধ্যা প্রাণী এবং পালন করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, এমন পুরুষ বাছুর।

অন্যদিকে গরু রক্ষার রাজনীতির কারণে কৃষকদের আয় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাণীদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে। আরএসএসের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোই শুধু উপকৃত হয়, এমন গোশালা রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি কোষাগারের অর্থ অপচয় হচ্ছে।

এর ফলে ভারতীয়দের পুষ্টিগত অবস্থাও খারাপ হচ্ছে। কারণ, তাদের গবাদিপশুর মাংসের মতো তুলনামূলক সস্তা আমিষের উৎস থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
যে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল বিদ্যালয়ে শিশুদের পাত থেকে ডিম সরিয়ে দেয়, সেই একই পরিমণ্ডল বহু বিলিয়ন ডলারের গবাদিপশুর মাংস রপ্তানি খাত থেকে সুবিধা পায়।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

শেষ কথা

ব্রিকসের নৈশভোজে নিরামিষ খাবারের প্রদর্শনী হিন্দুত্ববাদী প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক অহংকে তৃপ্ত করে থাকতে পারে। কিন্তু এটি আরও বড় একটি সমস্যাকে সামনে আনে—অভ্যন্তরীণ মতাদর্শের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কূটনীতিকে ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।

গত ১২ বছরে পররাষ্ট্রনীতি ক্রমে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। কখনো কখনো এটি লোকদেখানো আচরণেও পরিণত হয়েছে। এ ছলনায় ভারত ও দেশটির প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মোদির অধীনে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্রমে কেন্দ্রীভূত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

কূটনীতি নির্ভর করে বিশ্বাসযোগ্যতা, ধারাবাহিকতা এবং ক্ষমতাসীন সরকারের মতাদর্শগত পছন্দ থেকে জাতীয় স্বার্থকে আলাদা করার সক্ষমতার ওপর।
যখন সভ্যতাগত প্রতীক, সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিচয় ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিসত্তার প্রচার কূটনৈতিক বার্তার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে, তখন সেগুলো দেশের প্রকৃত কৌশলগত স্বার্থকে আড়াল করে।

এর পরিণতিতে ভারত এমনকি নিজের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ট্রাম্পের খামখেয়ালি দাবিগুলো অযৌক্তিকভাবে মেনে নেওয়ার মধ্যে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আরও গুরুতর বিষয় হলো, নেতানিয়াহুর ইসরায়েলের পক্ষে গিয়ে ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সভ্যতাগত সম্পর্ক দৃশ্যত পরিত্যাগ করা।
কীভাবে কূটনীতি পরিচালনা করা উচিত নয়, ইতিহাস হয়তো এসব ঘটনাকে তার শিক্ষা হিসেবে লিপিবদ্ধ করবে।

হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলো ভারতের বিপুল জনসংখ্যা ও বাজারের কারণে পাওয়া দৃশ্যমানতাকে কূটনৈতিক প্রভাব বলে ভুল করছে।

ভারতের সভ্যতাগত গভীরতা বিপুল। কিন্তু সভ্যতা তখনই কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়, যখন সেটিকে সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য মূল্যবোধের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

  • আনন্দ তেলতুম্বড়ে পেট্রোনেটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং আইআইটি খড়্গপুর ও গোয়ার জিআইএমের অধ্যাপক। তিনি একজন লেখক ও নাগরিক অধিকারকর্মীও।

    ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।