বিজেপি ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কেন ‘হতাশ’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন বিজেপি সরকারকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল লাগামছেঁড়া প্রত্যাশা। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ঘটনাপঞ্জি এবং শাসক দলের নেতা–নেত্রীদের কিছু পদক্ষেপ ও পরস্পরবিরোধী মন্তব্যের জেরে সেই ভাবমূর্তি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। লিখেছেন শুভজিৎ বাগচী

সম্প্রতি কলকাতার এক অভিজাত ক্লাবে শহরের এক বিশিষ্ট শিল্পপতির সঙ্গে নিভৃত আলাপচারিতা হচ্ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিল্পপতির স্বগতোক্তি, ‘বিজেপি এ কী করছে! এমন পরিস্থিতির জন্যই কি আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম?’ বস্তুত তাঁর এ হতাশার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে, যা গেরুয়া শিবিরের জনপ্রিয়তায় আঘাত হানার পক্ষে যথেষ্ট।

টানা ১৫ বছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের শাসনের পালা শেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকার। প্রায় পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু এরই মধ্যে একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে গেরুয়া প্রশাসন। একদিকে প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণ এবং অন্যদিকে দলীয় নেতাদের নানা মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে রাজ্য-রাজনীতি প্রতিনিয়ত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচারে নানা ক্ষেত্রে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিজেপি নেতারা, সেসব বাস্তবায়িত হওয়া নিয়েও জনমানসে দেখা দিয়েছে সংশয়ের মেঘ।

আরও পড়ুন

রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও বকেয়া ও জটিলতার কারণে পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্প ও জমি নীতি ঘোষণায় বিলম্ব দেখা দিয়েছে। পূর্বতন তৃণমূল শাসনকালে শিল্পে সরকারি সুবিধা দেওয়ার নীতি কার্যকর না হওয়া এবং প্রায় ২০ হাজার কোটি রুপি বকেয়া মিটিয়ে নতুন কাঠামো তৈরি করা যে অত্যন্ত জটিল, তা ইতিমধ্যে স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। অন্যদিকে টাটা গ্রুপের শীর্ষ নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে রাজ্যে বড় মাপের বিনিয়োগের আশা আপাতত বাস্তবায়িত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

এ ছাড়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শিল্প গড়ার স্বার্থে জমি অধিগ্রহণের প্রতিশ্রুতি এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে বিভিন্ন আইনি জটিলতা। এমন পরিস্থিতি শিল্পে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিরুৎসাহ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছে রাজ্যের শিল্পমহল।

শুধু তা–ই নয়, ক্ষমতায় এসেই বিজেপির একাধিক নেতা-মন্ত্রী এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়ে বসেছেন, যেগুলোর জন্য তীব্র অস্বস্তিতে পড়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রথমত, কলকাতা শহরের ফুটপাত ও রেলের জমি থেকে হকার উচ্ছেদ করার জন্য রাজ্যজুড়ে যে টানা অভিযান চালানো হয়, তা ব্যাপক জনরোষ তৈরি করেছে। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ফুটপাতের কেনাবেচা এক বিশাল জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস।

যাদবপুরসহ বিভিন্ন শিক্ষাক্ষেত্রে আরএসএস ও এবিভিপির তাণ্ডবের প্রতিবাদ এবং বাঁকুড়ার এক তরুণের ওপর হামলা ও তাঁর বাবার খুনের বিচারের দাবিতে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর বিক্ষোভ কলকাতায় মিছিল
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

বিকল্প কোনো বাসস্থানের ব্যবস্থা বা পুনর্বাসনের স্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই রাতারাতি এমন উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে রাজ্যের হকার সংগঠনগুলো। সুযোগ বুঝে প্রশাসনের এমন হঠকারী সিদ্ধান্তের জেরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটিরুজিতে টান পড়ছে বলে তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়েছে বিরোধীরা। বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নতুন নীতি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে আপাতত বহুতলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান যে ব্যবসা, অর্থাৎ ‘রিয়াল এস্টেট’ বা নির্মাণশিল্প, সে শিল্পে মন্দা দেখা দিয়েছে। অর্থ ও কাজ—দুই–ই কমেছে বিভিন্ন স্তরে।

আবার সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের ক্ষেত্রেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি রাজ্য সরকারের। পূর্ববর্তী তৃণমূল নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে জনপ্রিয় ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের অনুসারী নতুন সরকারের ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ চালু করার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য উপভোক্তাদের নাম নথিভুক্ত করা নিয়ে বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। প্রশাসনিক স্তর থেকে এ প্রক্রিয়াকে ‘স্বচ্ছতা আনার প্রয়াস’ বলা হলেও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এসবের ফলে বাজারে হাতে হাতে নিয়মিত ঘোরে যে টাকা, তার পরিমাণও কমে গিয়েছে। প্রধান উৎসব দুর্গাপূজার মুখে তাই দোকান খালি, কেনাবেচা কমে গিয়েছে, জানাচ্ছেন ছোট ব্যবসায়ীরা।

আরও পড়ুন

রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার উন্নতির দোহাই দিয়ে বিধানসভায় পেশ করা নতুন ‘পাবলিক সেফটি বিল’ ঘিরেও তৈরি হয়েছে আইনি ও সামাজিক দ্বন্দ্ব। সংঘটিত অপরাধ ও রাজনৈতিক হিংসা দমনের উদ্দেশ্যে এ আইন তৈরি হলেও তার বিভিন্ন ধারা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতা খর্ব করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে একাধিক মানবাধিকার সংগঠন।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যে কয়টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেই সীমান্ত এলাকা এবং সরকারি জমিসংক্রান্ত বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয় নতুন সরকার। কিন্তু এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে রকমারি নেতিবাচক আশঙ্কা তৈরি হয়।

সীমান্ত সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সুবিধার্থে তড়িঘড়ি জমি হস্তান্তর এবং অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণের নামে যে অভিযান শুরু হয়, তার ফলে রাজ্যের বহু সাধারণ ও বৈধ নাগরিক অযথা হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। সীমান্ত লাগোয়া গ্রামগুলোয় প্রশাসনিক নজরদারি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নথি পরীক্ষার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা সরব হয় এবং একে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত বলে চিহ্নিত করে।

বিজেপি নেতা-নেত্রীদের আচরণে ক্ষুব্ধ মানুষ

বিভিন্ন এলাকায় বিজেপি নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের হুমকি দেওয়া ও চাঁদার নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ সংবাদের শিরোনামে স্থান করে নিয়েছে। এমনকি কিছু প্রভাবশালী বিধায়ক ও দলীয় পদাধিকারীর বিরুদ্ধে তোলা না পেয়ে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া বা সিন্ডিকেট চালিয়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার মতো মারাত্মক অভিযোগও উঠেছে, যা শাসক দলের সততার দাবিকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

এরই মধ্যে কলকাতা শহরের ফুটপাত থেকে দখলদারদের হঠাতে গিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। সহায়-সম্বলহীন ফুটপাতবাসী নারীকে শিশুসন্তানসহ কোনো রকম পুনর্বাসন না করেই উৎখাতের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অমানবিকতার অভিযোগ ওঠে এবং প্রবল ক্ষোভ ছড়ায়। এরই মধ্যে ওই দরিদ্র পরিবারকে পুনর্বাসন করবেন বলে ঘোষণা দেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

চাপের মুখে পরিস্থিতি সামলাতে ফুটপাতবাসী ওই নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান। সম্প্রতি পুনর্বাসনপ্রাপ্ত সেই নারীই অভিযোগ তুলেছেন, সপরিবার তাঁকে ভাড়া বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুললেও এখন বাড়িভাড়ার দায় তাঁর কাঁধেই চাপাচ্ছে প্রশাসন। এখন পর্যন্ত এ নিয়ে সরকারের তরফে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

নির্বাচনী সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে আয়োজিত সমাবেশে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১ জুলাই ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গ
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

নতুন সরকারের নির্দেশে দুর্গাপূজার আগে সরকারি বিজ্ঞাপন ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কেও ক্ষোভ ছড়িয়েছে। পূজার বিজ্ঞাপনে দশের বদলে এগারো হাতযুক্ত দুর্গার ছবিকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে শাস্ত্রীয় প্রথা ও সংস্কৃতিপরিপন্থী অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে।

পাশাপাশি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীসহ রাজ্য বিজেপির একাধিক নেতা-নেত্রী জনপ্রিয় ‘থিম পূজা’–বিরোধী অবস্থান নেওয়ায় এবং ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপ্রতিমা স্থাপনের নিদান দেওয়ায় কমেছে কলকাতার মৃৎশিল্পীদের ব্যবসা। দুর্গাপূজার সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে এবার কমে গিয়েছে বলে জানিয়েছে মৃৎশিল্পী সমিতি।

এরই মধ্যে দুর্গাপূজায় আমিষ খাওয়া প্রসঙ্গে তীব্র সমালোচনা করে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাঙালিকে ‘পাখণ্ডী’, অর্থাৎ পাপী আখ্যা দেওয়ায় উত্তর ভারতীয় এক ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে ক্ষোভ দেখা দেয়।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ক্ষমতায় এসে প্রশাসনিক অগ্রাধিকার নির্ধারণে উপর্যুপরি ভুল, অনভিজ্ঞ হঠকারী সিদ্ধান্ত, নেতা-নেত্রীদের বেপরোয়া মন্তব্য এবং দলের একশ্রেণির সমর্থক-কর্মীর উদ্ধত আচরণ শুধু বিজেপির ভাবমূর্তিতে কালি ছিটাচ্ছে তা–ই নয়, তার জেরে রাজ্যজুড়ে তৈরি হচ্ছে এমন এক অনিশ্চয়তার আবহ, যা পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের পথে জটিল দেয়াল খাড়া করে তুলেছে।

অবস্থা বেগতিক বুঝে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে আমিষের গুরুত্বের সপক্ষে সাফাই দিতে শোনা গেছে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ প্রমুখ নেতাকে। বিরোধীরা বিষয়টিকে রাতারাতি একটা ইস্যু করে ফেলেন। তাঁদের আন্দোলনের অংশ হিসেবে ওই ধর্মগুরুর ছবি পুড়িয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় রাজ্য কংগ্রেসের কিছু নেতা-কর্মীকে।

মাত্র কয়েক মাসেই রাজ্যের শাসক নেতাদের অবিবেচক বক্তব্য বারবার অযাচিত সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য অস্বীকার করে নাম পরিবর্তনের জন্য অহেতুকি প্রস্তাব এবং স্থানীয় বিধায়কের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবাধে ভাঙচুরের ঘটনা। এর ফলে তরুণ সমাজ ও শিক্ষাবিদদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে শাসক দলকে। পরে দলীয় স্তরে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টায় নানা ব্যাখ্যা ও বিবৃতি দেওয়া হলেও অসন্তোষ রয়েই গেছে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

এতেই থেমে না থেকে ৯ সেপ্টেম্বর কলকাতার গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত গেরুয়া সম্মানযাত্রা বা মহামিছিলের নেতৃত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মিছিলে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি শামিল হন বহু গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী এবং নাগা সন্ন্যাসী। বিশ্ববন্দিত শিক্ষাঙ্গনের প্রধান ফটকের সামনে অর্ধ-উলঙ্গ নাগা সাধুদের আস্ফালন দেখে নিন্দায় মুখর হয়েছেন কলকাতাবাসী।

কিন্তু তাতে আমল না দিয়ে যাদবপুরে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু পাল্টা ঘোষণা করেছেন, ‘এখানে পশ্চিমবঙ্গ সনাতন সংস্কৃতি পরিষদের ডাকে বারবার আসব। দেশ ও গেরুয়াকে যাঁরা অপমান করছেন, তাঁদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য একবার বেদ পাঠ করতে আসব। আর একবার হনুমান চালিশা পাঠ করতে আসব।’

মুখ্যমন্ত্রীর এ বিবৃতিতে স্পষ্টতই হতাশ হয়েছেন কট্টর বিজেপি–সমর্থক পেশায় গাড়িচালক অনাথবন্ধু নাথ। তাঁর মতে, নেতাদের হঠকারী আচরণে দলের ভাবমূর্তি ক্রমে নষ্ট হচ্ছে। ক্ষমতায় আসামাত্র এমন ঔদ্ধত্য প্রদর্শন আখেরে অপূরণীয় ক্ষতি করছে। নাথের মত, কট্টর বিজেপি–সমর্থকদের বক্তব্য তৃণমূল কংগ্রেসের বহু নেতা–নেত্রীকে বিজেপিতে নিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা মেনে নেওয়া যায় না। ‘যারা এত দিন আমাদের পেটাল, তারাই এখন আমাদের নেতা। এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়,’ মন্তব্য অনাথবন্ধুর।

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রবেশপথে একটি থাম গেরুয়া রং করে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা
ছবি: সংগৃহীত।

এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে বারবার আগ্রাসী ভাষার ব্যবহারও রাজ্য রাজনীতির সংস্কৃতিকে কালিমালিপ্ত করেছে। প্রকাশ্য জনসভায় বিরোধী কর্মীদের শারীরিকভাবে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি, ‘লাঠি থেরাপি’র নিদান বা প্রশাসনকে ব্যবহার করে ‘চামড়া গুটিয়ে দেওয়া’র মতো নিম্নমানের রাজনৈতিক ভাষা শাসক দলের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়েছে।

পূর্বতন সরকারের শাসনে তিতিবিরক্ত সাধারণ মানুষ যেখানে শান্তি ও উন্নয়নের প্রত্যাশা করেছিল, সেখানে বিজেপি নেতাদের এহেন উসকানিমূলক আচরণ সমাজে মেরুকরণ ও হিংসার বাতাবরণ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

এসবের পাশাপাশি আরও একটি বিষয়ে শাসক দলের নেতা-নেত্রীদের বিশ্বাসযোগ্যতা জনমানসে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, গেরুয়া শিবিরের কোনো নেতা বা দলের ঘনিষ্ঠ কারও বেফাঁস মন্তব্যে বিক্ষোভ দেখা দিলেই তার বিপরীত মতবাদ প্রকাশ করে জনতার রোষানলে জল ঢালার চেষ্টা করছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। যেমন আগেই বলা হয়েছে, উত্তর ভারতীয় ধর্মগুরুর দুর্গাপূজায় বাঙালির আমিষ খাওয়া নিয়ে নিন্দার জেরে তীব্র জনরোষ দেখা দেয়। সেই বিক্ষোভ প্রশমিত করতে কোমর বেঁধে আসরে নামতে দেখা যায় শমীক ভট্টাচার্যকে। অথচ ওই ধর্মগুরুকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠান করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

এটা বারবারই দেখা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি সমাজে যে ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হচ্ছে, তা প্রশমিত করতে মাঠে নামতে হচ্ছে শমীক ভট্টাচার্যকে। এসবের পাশাপাশি মুসলমান সমাজকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। উত্তর কলকাতার মুসলমানপ্রধান একটি কলোনিতে বেশ কয়েক মাস পানি বন্ধ রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও খবর হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ক্ষমতায় এসে প্রশাসনিক অগ্রাধিকার নির্ধারণে উপর্যুপরি ভুল, অনভিজ্ঞ হঠকারী সিদ্ধান্ত, নেতা-নেত্রীদের বেপরোয়া মন্তব্য এবং দলের একশ্রেণির সমর্থক-কর্মীর উদ্ধত আচরণ শুধু বিজেপির ভাবমূর্তিতে কালি ছিটাচ্ছে তা–ই নয়, তার জেরে রাজ্যজুড়ে তৈরি হচ্ছে এমন এক অনিশ্চয়তার আবহ, যা পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের পথে জটিল দেয়াল খাড়া করে তুলেছে। এই দুরূহ সমস্যা আরও ঘনীভূত হবে, নাকি যাবতীয় বিতর্কে জল ঢেলে পাওয়া যাবে মুশকিল আসানের দেখা, তা সময়ই বলবে।

  • শুভজিৎ বাগচী প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা

    *মতামত লেখকের নিজস্ব