গত ২১ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্যানোপি-২ এলাকায় প্রবাসী যাত্রীর স্বজনদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই অস্বস্তিকর ভিডিও। আনসার বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, একজন যাত্রীর স্বজন নিরাপত্তা নির্দেশনা অমান্য করে আগমনী গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে আনসার সদস্যরা তাঁকে বাধা দেন।
পরে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং আনসার সদস্যদের ওপর হামলার চেষ্টা হলে তাঁরা আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেন।
ঘটনাটি সরাসরি প্রবাসী যাত্রীর সঙ্গে না হলেও যাত্রীর স্বজন ও নিরাপত্তাকর্মীদের সংঘাতের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। এর আগে গত ৯ জানুয়ারি নরওয়ে থেকে আসা এক প্রবাসী যাত্রীর সঙ্গেও এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল।
প্রশ্ন তাই শুধু কে প্রথম ধাক্কা দিয়েছেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো, বিমানবন্দরের মতো কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত জায়গায় প্রবেশের নিয়ম প্রয়োগের মতো একটি প্রশাসনিক বিষয় কেন বারবার ব্যক্তিগত সংঘাতে গড়াচ্ছে?
বিমানবন্দর কোনো দেশের শুধু প্রবেশ ও প্রস্থানের স্থান নয়—এটি রাষ্ট্রের প্রথম দৃশ্যমান মুখ। বিদেশ থেকে ফেরা একজন নাগরিক সেখানে রাষ্ট্রকে চেনেন তার আচরণ, সেবা ও ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে।
অথচ শাহজালালে প্রবাসীদের অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ—ট্রলির সংকট, ব্যাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ কাটা বা মালামাল হারানোর অভিযোগ, কাস্টমসে অপ্রয়োজনীয় তল্লাশি ও হয়রানি।
২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রবাসী কর্মীদের অকারণে লাগেজ খোলা ও দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা কেবল কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষীর আচরণে নয়; সমস্যা আমাদের সেবার সংস্কৃতিতে।
একজন প্রবাসী দেশে ফেরার পর কেন তাঁকে বারবার এমন এক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে সহায়তার আগে সন্দেহ, সেবার আগে কর্তৃত্ব এবং স্বাগত জানানোর আগে জবাবদিহি চাওয়া হয়?
বিমানবন্দরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের কঠোর নিয়ম থাকবেই। নিরাপত্তার সামান্য শৈথিল্যও সেখানে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে মর্যাদা দেওয়া পরস্পরের বিপরীত নয়।
আমাদের সমস্যা অনেক সময় এখানেই—নিয়ম প্রয়োগকে আমরা ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রদর্শনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি।
‘আমি বলেছি, তাই মানতে হবে’—এ মনোভাবের মুখোমুখি হয়ে একজন নাগরিকেরও মনে হতে পারে, ‘আমাকে এভাবে অপমান করা হবে কেন?’ তখন একটি প্রশাসনিক নির্দেশ দ্রুত ব্যক্তিগত মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়।
একজন নিরাপত্তাকর্মীর প্রকৃত দক্ষতা শুধু কাউকে থামাতে পারায় নয়; এমনভাবে থামাতে পারায়, যাতে নিয়মও অটুট থাকে, পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় এবং নাগরিকের মর্যাদাও অক্ষুণ্ন থাকে।
শাহজালাল বিমানবন্দরের সমস্যা শুধু আচরণগত নয়, অবকাঠামোগতও। টার্মিনাল ১ ও ২ বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী সামলানোর জন্য নির্মিত হলেও এখন সেখানে ১ কোটি ২৬ লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করছেন।
সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি মানুষকে প্রতিদিন একই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পার করতে হচ্ছে। ভিড়, সীমিত জায়গা ও অস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে থাকলে সামান্য ভুল–বোঝাবুঝিও দ্রুত উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।
ব্যাগেজ পেতে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমানো বা লাইভ মনিটর স্থাপনের মতো সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয় হলেও মূল সেবা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় না থাকলে মাঠপর্যায়ে কর্মী ও যাত্রীর মুখোমুখি সংঘাত থেকেই যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু প্রবাসীর সম্মানের ভিত্তি কেবল তাঁর পাঠানো রেমিট্যান্স নয়, তাঁর নাগরিকত্ব।
আবার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের অজুহাতে কোনো অন্যায় বা অপেশাদার আচরণকে মেনে নেওয়া যায় না। যাত্রী বা স্বজনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য—নিরাপত্তা নির্দেশনা অমান্য করা, গালাগালি বা ধাক্কাধাক্কি করা গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।
প্রবাসীদের জন্য আলাদা লাউঞ্জ বা দ্রুত ইমিগ্রেশনের সুবিধা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। তবে প্রকৃত প্রবাসীবান্ধব বিমানবন্দর তৈরি করতে হলে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
প্রথমত, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণকে মানবিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
শাহজালালের মতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা অবশ্যই কঠোর হতে হবে, তবে তা যেন রূঢ়তায় রূপ না নেয়। নিরাপত্তাকর্মীকে বুঝতে হবে, তিনি ক্ষমতার মালিক নন, দায়িত্বের ধারক। আর নাগরিককেও বুঝতে হবে, নিয়ম মানা তাঁর দায়িত্ব।
স্বজনেরা কোথায় অপেক্ষা করবেন, তা স্পষ্ট ও বহুভাষিক সাইনবোর্ডে জানাতে হবে। অস্পষ্টতা যত কমবে, ব্যক্তিগত নির্দেশের প্রয়োজন এবং সংঘাতের সম্ভাবনা তত কমবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শারীরিক সংঘাতের নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত হতে হবে। দোষ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, নিরাপত্তাকর্মীদের প্রশিক্ষণে তল্লাশির পাশাপাশি উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাঁদের মূল্যায়নে শুধু নিরাপত্তা নয়, সৌজন্যমূলক আচরণকেও মাপকাঠি করা জরুরি।
শাহজালালের মতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা অবশ্যই কঠোর হতে হবে, তবে তা যেন রূঢ়তায় রূপ না নেয়। নিরাপত্তাকর্মীকে বুঝতে হবে, তিনি ক্ষমতার মালিক নন, দায়িত্বের ধারক। আর নাগরিককেও বুঝতে হবে, নিয়ম মানা তাঁর দায়িত্ব।
ক্যানোপি-২-এর ঘটনাটি কেবল এক সাময়িক হাতাহাতি নয়, বরং এটি আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির এক বড় পরীক্ষা। সবাইকে বুঝতে হবে, সত্যিকারের আধুনিক বিমানবন্দরের পরিচয় নতুন ভবনে নয়, মানুষের ইতিবাচক আচরণে।
ড. সেলিম রেজা সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।
* মতামত লেখকের নিজস্ব।
