ইরান নিয়ে নিজের পাতা ফাঁদেই এখন আটকা পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি এমন একটি চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে আছেন, যার মাধ্যমে অন্তত লোকদেখানো কোনো ‘বিজয়’ ঘোষণা করা যায়। অন্যদিকে বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তির মতো কিছু একটা করে ফেলার ভয়ও তাঁর কাটছে না।
কারণ, তিনি জানেন, তেমন কিছু করলে অবধারিতভাবেই তাঁকে তীব্র ও যৌক্তিক সমালোচনার মুখে পড়তে হবে। এই দোলাচলের মধ্যে ভালো কোনো সমাধানও এখন তাঁর হাতে নেই, যা কেবল তাঁর হতাশা ও ক্ষোভই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ট্রাম্পের পোস্টে তাঁর এই অস্বস্তি ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া রূপরেখার বিপরীতে ইরানের দেওয়া প্রতিক্রিয়াকে তিনি ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে এর কড়া নিন্দা জানিয়েছেন।
বর্তমানে তাঁর মানসিক অবস্থা সম্ভবত নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের মতো। বুশ একসময় হোয়াইট হাউসে তাঁর একাকিত্বের কথা তুলে ধরতে গিয়ে নিজেকে ‘এক নিঃসঙ্গ ক্ষুদ্র মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেনের ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল কৌশলের ব্যর্থতা নিয়ে উইনস্টন চার্চিলের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রাসঙ্গিক। চার্চিল বলেছিলেন, ‘এই কাজ শুরু করার সাহস আমার হতো কি না জানি না, কিন্তু একবার শুরু করলে আমি কখনো থামার দুঃসাহস দেখাতাম না।’
ট্রাম্পের বর্তমান এই ‘ইরান ট্র্যাপ’ বা ফাঁদ মূলত তাঁর নিজেরই অদূরদর্শিতার ফল। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা চালানোর আগে ট্রাম্প কখনোই নিজ দেশের নাগরিকদের সামনে এর যৌক্তিকতা স্পষ্ট করেননি। তেহরানের শাসনব্যবস্থায় বদল আনা, পারমাণবিক ও সন্ত্রাসী হুমকি নির্মূল করা কিংবা তাদের সামরিক সামর্থ্য ধ্বংস করার জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ কেন প্রয়োজন ছিল, সেই ব্যাখ্যা দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
এমনকি তিনি কংগ্রেসকেও এ বিষয়ে আগে থেকে পর্যাপ্ত তথ্য জানাননি। ন্যাটোর সদস্যদেশ, পারস্য উপসাগরের মিত্রদেশ কিংবা ইন্দো প্যাসিফিকের যেসব বন্ধুরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের কারও সঙ্গেই কোনো পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। অথচ ১৯৯১ সালে ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ শুরু করার আগে প্রবীণ বুশ এই প্রতিটি পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছিলেন।
যদি ইরানের শাসনক্ষমতা পরিবর্তনই ট্রাম্পের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে দেশটির ভেতরকার সরকারবিরোধীদের সঙ্গেও তাঁর কোনো সমন্বয় দেখা যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ সেখানে এখন তুঙ্গে। যার প্রকাশ ঘটেছিল গত জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে হওয়া তীব্র জনবিক্ষোভে। যদিও সে বিক্ষোভ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছে তেহরান।
ইরানের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ৩০ বছরের কম বয়সী এবং এই তরুণ প্রজন্ম বর্তমান শাসকদের মৌলবাদী আদর্শ প্রত্যাখ্যান করেছে। ২০২২ সালে নীতি পুলিশের হেফাজতে মাসা আমিনি হত্যার ঘটনার পর থেকে ইরানের নারীরা বর্তমান শাসনের বৈধতাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে আসছেন। এমনকি কুর্দি ও বালুচদের মতো নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও বাড়ছে অসন্তোষ।
ট্রাম্প কোনো বিশেষ প্রস্তুতি ছাড়াই ইরানের ওপর আক্রমণ শুরু করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে এই সামরিক অভিযান সফলও ছিল। বিশেষ করে আরবের তেল রপ্তানি সচল রাখতে নেওয়া ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো তিনি শুরু করা কাজ শেষ করতে পারেননি।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেনের ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল কৌশলের ব্যর্থতা নিয়ে উইনস্টন চার্চিলের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রাসঙ্গিক। চার্চিল বলেছিলেন, ‘এই কাজ শুরু করার সাহস আমার হতো কি না জানি না, কিন্তু একবার শুরু করলে আমি কখনো থামার দুঃসাহস দেখাতাম না।’
ট্রাম্প থেমে গিয়েছিলেন এবং বর্তমানে তাঁকে দিগ্ভ্রান্ত মনে হচ্ছে। তিনি এখন আশায় আছেন ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হয়তো তাঁকে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি কূটনৈতিক পথ দেখাবে। কিন্তু তেহরান এখনো সেই পথে হাঁটেনি। উল্টো বর্তমান ইরান শাসকেরা নিজেদের ঘর গুছিয়ে নেওয়ার সময় খুঁজছেন। তাঁরা চাচ্ছেন এই ফাঁকে সামরিক সামর্থ্য এবং পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠিত করতে। তেহরান সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে বহুদূরের ইরান সংকটের চেয়ে ট্রাম্প তাঁর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঝামেলা নিয়েই এখন বেশি বিপর্যস্ত।
এই বাস্তবতায় তেহরান যদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে মৌখিকভাবে রাজিও হয়, তবু মাঠপর্যায়ে কাজের কাজ কিছুই করবে না। এমনকি তারা হরমুজ প্রণালি সহজে উন্মুক্ত করার দিকেও যাবে না। বর্তমানে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা আছে।
প্রথমত, ইরানের হামলাগুলোতে যে যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে সেটি সরকারিভাবে বাতিল করে আবার দেশটির সামরিক শক্তি পুরোপুরি ধ্বংসের কাজে ফিরে যাওয়া। গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএসহ ট্রাম্পের অনেক সমালোচকই মনে করেন, ইরানি সামরিক সামর্থ্য ধ্বংস করার জন্য এখনো বড় ধরনের অভিযান বাকি আছে। এ অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন থাকা অবস্থাতেই এই অসমাপ্ত কাজ শেষ করা প্রয়োজন।
আর ট্রাম্প যদি সেই পথে যেতে সাহস না পান, তবে তাঁর সামনে বিকল্প হলো হরমুজ প্রণালিকে পেশিশক্তির জোরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং একই সঙ্গে ইরানের ওপর অবরোধ কঠোর রাখা। প্রায় আড়াই শ বছর ধরে ‘সমুদ্রে অবাধ চলাচল’ বা ফ্রিডম অব নেভিগেশন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক অংশ। আজ এটি সংকটে পড়লে দক্ষিণ চীন সাগরের মতো বিরোধপূর্ণ অঞ্চলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তা ছাড়া হরমুজ প্রণালি মুক্ত হয়ে তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হলে চলমান বিশ্ব অর্থনীতিও খানিকটা প্রাণ ফিরে পাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তেহরানের মনে আবার মার্কিন সামরিক শক্তির ভয় তৈরি করা। তাদের এটি শিখিয়ে দিতে হবে যে যখন-তখন হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টা করলে এর চরম মাশুল গুনতে হবে। যদি বর্তমান সংকট কোনো দুর্বল কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শেষ হয়, তবে তেহরান ভবিষ্যতে আরও সাহসী হয়ে উঠবে। তারা মনে করবে, প্রণালি বন্ধ করলে হয়তো সামান্য কূটনৈতিক নিন্দার ঝড় বয়ে যাবে; কিন্তু কোনো বড় সামরিক আঘাত আসবে না। ফলে তারা ইচ্ছেমতো তেলের বাজারের এই চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করার সাহস দেখাবে।
একসময় প্রজেক্ট ফ্রিডম ইরানের দম্ভ ভেঙে দিয়ে আশা জাগিয়েছিল। এখন দরকার তার পূর্ণ বাস্তবায়ন। কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। তাদের অস্ত্রসজ্জিত দ্রুতগতির নৌযান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি অকেজো করার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেই হবে। যদি তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়, তবেই প্রমাণিত হবে তারা কখনোই শান্তিপূর্ণ পথে থাকতে চায়নি।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের একক আধিপত্য যেমন উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর কাছে অসহ্য, তেমনি এটি ওয়াশিংটনের জন্যও অগ্রহণযোগ্য। নিজের পাতা ফাঁদ থেকে বেরোনোর পথ ট্রাম্পের সামনে স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের অ্যান্থনি ইডেন হিসেবে চিহ্নিত হতে চান কি না, সেই সিদ্ধান্ত একান্তই তাঁর।
জন আর বোল্টন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত