বাংলাদেশি গবেষকদের প্রকাশিত গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনা নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নাল থেকে বাংলাদেশের গবেষকদের অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রকাশনাও এর মধ্যে রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট গবেষকের জন্য নয়, তাঁর প্রতিষ্ঠান এবং দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ভাবমূর্তির জন্যও উদ্বেগের।
তবে গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার শুরুতেই একটি পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। কোনো গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হলেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে গবেষক জালিয়াতি করেছেন। গবেষণায় অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে। আবার ইচ্ছাকৃতভাবে গবেষণার তথ্য বিকৃত বা জাল করাও হতে পারে। দুটি বিষয়কে এক করে দেখলে ন্যায়বিচার হবে না।
গবেষণার সময় গণনায় ভুল, তথ্য বিশ্লেষণে অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি কিংবা কোনো পদ্ধতিগত ভুল পরে ধরা পড়তে পারে। এমন ক্ষেত্রে গবেষক নিজেই জার্নাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে সংশোধন বা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারেন। এটি গবেষণার সততারই অংশ। এ ধরনের ভুলের জন্য গবেষককে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু ইচ্ছাকৃত অসদাচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। গবেষণা না করেই তথ্য তৈরি করা, প্রকৃত তথ্য পরিবর্তন করা, অন্যের লেখা বা ধারণা নিজের নামে ব্যবহার করা, ভুয়া পিয়ার-রিভিউয়ের মাধ্যমে গবেষণাপত্র প্রকাশ করা কিংবা অর্থের বিনিময়ে পেপার মিলের কাছ থেকে তৈরি গবেষণাপত্র কিনে নিজের নামে প্রকাশ করা গুরুতর অনৈতিকতা। মানুষ বা প্রাণীর ওপর গবেষণার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নৈতিক অনুমোদন না নেওয়াও গুরুতর অনিয়ম।
এসব ঘটনা শুধু একজন গবেষকের ব্যক্তিগত অসদাচরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, গবেষণার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, গবেষণা তহবিল এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা যুক্ত থাকে। কোনো প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম ঘটলে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা তদারকি ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
গবেষণার সততা শুধু একজন গবেষকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব। বাংলাদেশের গবেষণা আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এই সময়ে গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়েই গবেষণার সততা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণে রিট্র্যাকশন ওয়াচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার, গবেষণা জালিয়াতি, প্লেজিয়ারিজম এবং ভুয়া পিয়ার-রিভিউসহ বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য অনুসরণ করে। ২০২৩ সালে ক্রসরেফ রিট্র্যাকশন ওয়াচের তথ্যভান্ডার অধিগ্রহণ করে সবার জন্য উন্মুক্ত করে। ফলে গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের তথ্য শনাক্ত ও অনুসরণ করা আরও সহজ হয়েছে।
গবেষণা প্রকাশনার নৈতিকতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে কমিটি অন পাবলিকেশন এথিকস বা কোপ এবং ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব মেডিকেল জার্নাল এডিটরস বা আইসিএমজেই বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশিকা দিয়েছে। এসব নির্দেশনায় গবেষণার সততা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং প্রকাশনার স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশও গবেষণা জালিয়াতি ঠেকাতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। চীন গবেষণায় অনিয়মের ক্ষেত্রে গবেষকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেও জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতও গবেষণাপত্র প্রত্যাহার ও প্লেজিয়ারিজম মোকাবিলায় শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নীতিমালা তৈরি করেছে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সব বিষয়ে ঝুঁকি এক নয়। চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞান গবেষণায় ভুল তথ্যের প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবনের ওপর পড়তে পারে। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি গবেষণাতেও ভুল তথ্যের বড় প্রভাব রয়েছে। একই সঙ্গে সমাজবিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও গবেষণার সততা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কাঠামো। কোনো গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হলে কীভাবে বিষয়টি তদন্ত হবে, অনিচ্ছাকৃত ভুল ও ইচ্ছাকৃত জালিয়াতি কীভাবে আলাদা করা হবে, গবেষক কখন দায়ী হবেন এবং কখন প্রতিষ্ঠানকে দায় নিতে হবে—এসব বিষয়ে অভিন্ন নীতিমালা থাকা দরকার।
এই দায়িত্বে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইউজিসির দায়িত্ব রয়েছে। গবেষণা তহবিল ও অনুদানের ক্ষেত্রেও ইউজিসির ভূমিকা আছে। তাই গবেষণার সততা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ ইউজিসির পক্ষ থেকেই আসা প্রয়োজন।
এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বহুবিষয়ক কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নীতিমালা তৈরি করতে পারে।
নীতিমালায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি। গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের পর তদন্তের পদ্ধতি কী হবে, তদন্তকারী কমিটি কীভাবে গঠিত হবে, গবেষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কীভাবে দেওয়া হবে এবং প্রমাণিত অসদাচরণের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব নির্দিষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে অনিচ্ছাকৃত ভুলের ক্ষেত্রে গবেষককে অযথা শাস্তির হাত থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।
প্রয়োজনে গবেষক ও প্রতিষ্ঠানের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোনো গবেষক ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য জাল করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান গবেষণার অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত না করলে বা অনিয়ম আড়াল করলে সেই প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ালেই গবেষণার মান বাড়ে না। গবেষণার মূল ভিত্তি হলো সততা, নির্ভরযোগ্যতা ও জবাবদিহি। প্রকাশনার সংখ্যাকে পদোন্নতি, মর্যাদা বা আর্থিক সুবিধার প্রধান মাপকাঠি বানানো হলে গবেষকের ওপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হতে পারে। সেখান থেকেই অনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তাই আমাদের ‘প্রকাশ করো, নইলে পিছিয়ে পড়ো’ সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। একই সঙ্গে সৎ গবেষকদের অনিচ্ছাকৃত ভুল স্বীকার করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ভুল ধরা পড়লে তা সংশোধন করা গবেষণার দুর্বলতা নয়। বরং ভুল স্বীকার করা গবেষণার সততার পরিচয়।
অন্যদিকে পরিকল্পিত গবেষণা জালিয়াতি, তথ্য বিকৃতি, প্লেজিয়ারিজম, ভুয়া পিয়ার-রিভিউ এবং পেপার মিলের মতো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। গবেষণার মান রক্ষার স্বার্থেই এই দুই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করা জরুরি।
গবেষণার সততা শুধু একজন গবেষকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব। বাংলাদেশের গবেষণা আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এই সময়ে গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
তাই গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনাকে শুধু বিতর্ক হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে গবেষণার মান ও সততা নিশ্চিত করার সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। ইউজিসির নেতৃত্বে একটি জাতীয় গবেষণা-সততা নীতিমালা এবং গবেষণাপত্র প্রত্যাহার–সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এতে যেমন ইচ্ছাকৃত জালিয়াতির বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, তেমনি অনিচ্ছাকৃত ভুল করা সৎ গবেষকেরাও ন্যায্য সুরক্ষা পাবেন।
কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ (এলপিআর), ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
মতামত লেখকের নিজস্ব