চলতি মাসে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর কোনো নির্দিষ্ট ও তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে রিয়াদের প্রতিক্রিয়া ছিল না। অনেকেই এমনটা মনে করলেও চুক্তির পেছনের বাস্তবতা আরও গভীর।
সৌদি প্রভাব
চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ ধারণাটি বড় সামরিক জোটগুলোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির কাছাকাছি। তবে তিন দেশই জোর দিয়ে বলেছে, এই চুক্তির চরিত্র প্রতিরক্ষামূলক। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়।
এই চুক্তির আসল গুরুত্ব এখানেই। তিন দেশ কাকে প্রতিরোধ করতে চায়, সেটি প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ইতিহাসের এই নির্দিষ্ট মুহূর্তে কেন প্রতিটি দেশের অন্য দুটি দেশকে প্রয়োজন হলো?
সৌদি আরব স্বাভাবিকভাবেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে শুধু একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভুল হবে।
সৌদি আরব এমন একটি অঞ্চলের কেন্দ্রে অবস্থিত, যেখানে অসংখ্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রকল্প, শক্তি ও স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ফলে দেশটির কৌশলগত পরিবেশ অত্যন্ত জটিল।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা তাই শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়। এর সঙ্গে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি এবং জ্বালানি পরিবহনপথের নিরাপত্তা জড়িত। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, আকাশসীমা, সাইবার নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা এবং বড় বড় অর্থনৈতিক প্রকল্পও রয়েছে। এর বাইরেও অনেক বিষয় সৌদি নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা সৌদি আরবের জন্য বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। তুরস্কের রয়েছে অত্যন্ত উন্নত সামরিক, শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। অন্যদিকে পাকিস্তান দিতে পারে সামরিক গভীরতা, বাস্তব অভিযানের অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সুবিধা।
সৌদি আরবের রয়েছে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব, বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ এবং প্রতিরক্ষা শিল্প, বাজার, জ্বালানি ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সক্ষমতা। তিন দেশের এই ভিন্ন ভিন্ন শক্তি একে অপরের পরিপূরক। আর এই পরিপূরকতাই মক্কা চুক্তি বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।
সৌদি আরবের ওপর হামলার সম্ভাব্য মূল্য বা ক্ষতি এখন আর শুধু সৌদি আরবের নিজস্ব শক্তি বিবেচনা করে হিসাব করা যাবে না। হামলাকারীকে আরও বিস্তৃত সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার একটি নেটওয়ার্ক এবং জোটের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এটাই প্রতিরোধের মূল কথা। এর অর্থ এই নয় যে কোনো রাষ্ট্র যুদ্ধ করতে চায়। বরং উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের সম্ভাব্য মূল্য ও খরচ এতটাই বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে প্রতিপক্ষ হামলা চালানোর আগে বহুবার ভেবে দেখে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি
প্রশ্ন উঠতে পারে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োজন তুরস্কের কেন হলো? তুরস্ক তো ন্যাটোর সদস্য। এই জোটের সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনীগুলোর একটি তাদের। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে।
তুরস্ক এখন তার আশপাশের বিস্তৃত অঞ্চলকে নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থের সরাসরি অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই কৌশলগত পরিসরের মধ্যে রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, লিবিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, রাশিয়া, ইরান এবং ইউরোপ। একই সময়ে সিরিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা এবং ইসরায়েলের নীতির প্রতি আঙ্কারার সমালোচনা ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছে তুরস্ক।
এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো, তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন আর শুধু ফিলিস্তিন প্রশ্নে রাজনৈতিক মতবিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খুব দ্রুত তাদের মধ্যে কৌশলগত সংঘাতের একাধিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সিরিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিরোধ বেড়েছে।
তুরস্কের দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাস এমন একটি অঞ্চলে সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যেখানে তাদের স্বার্থের সঙ্গে তুরস্কের স্বার্থের সরাসরি সংঘাত রয়েছে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করা আঙ্কারার পক্ষে সম্ভব নয়। এ থেকেই বোঝা যায়, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে অংশীদারত্ব তুরস্কের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরায়েল গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে নিরাপত্তা ও সামরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছে। গত ডিসেম্বরে এই তিন দেশ তাদের দশম ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন করেছে। গ্রিস, ইসরায়েল ও সাইপ্রাস যৌথ সামরিক মহড়াসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সহযোগিতা কর্মসূচিও গড়ে তুলেছে।
তুরস্কের দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাস এমন একটি অঞ্চলে সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যেখানে তাদের স্বার্থের সঙ্গে তুরস্কের স্বার্থের সরাসরি সংঘাত রয়েছে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করা আঙ্কারার পক্ষে সম্ভব নয়।
এ থেকেই বোঝা যায়, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে অংশীদারত্ব তুরস্কের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক চায় না যে তার কৌশলগত সক্ষমতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্কের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। বরং দেশটি আরও বিস্তৃত একটি অংশীদারত্বের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চায়। এর মাধ্যমে কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের চাপের মুখে তুরস্কের দুর্বলতা কমবে।
পাকিস্তানের হিসাব-নিকাশ
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা বড় ভুল হবে।
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশটির নিরাপত্তা ভারতের সঙ্গে তার বিরোধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিপজ্জনক মাত্রায় উত্তেজনা দেখা যায়। পরিস্থিতি সামরিক প্রস্তুতি ও সরাসরি সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তাই ইসলামাবাদ আঙ্কারা ও রিয়াদের সঙ্গে এই চুক্তিকে শুধু পারস্য উপসাগরকেন্দ্রিক দৃষ্টিতে দেখছে না। তাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন রয়েছে। তা হলো, বহুমুখী নিরাপত্তা হুমকির পরিবেশে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পাকিস্তান কীভাবে কৌশলগত অংশীদারত্বের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে?
এই দৃষ্টিকোণ থেকে রিয়াদ পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সৌদি আরব শুধু একটি উপসাগরীয় বা আরব রাষ্ট্র নয়। এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে অর্থনীতি, জ্বালানি, ধর্ম ও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
অন্যদিকে তুরস্কের রয়েছে উল্লেখযোগ্য সামরিক ও শিল্প সক্ষমতা। মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের ব্যাপক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সম্পর্ক পাকিস্তানের জন্য আরও বিস্তৃত কৌশলগত ক্ষেত্র তৈরি করে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব আসলে কোনো ‘বিদেশি সেনাবাহিনী’ খুঁজছে না। বরং তারা তাদের হাতে থাকা শক্তির উৎসগুলোকে বহুমুখী করতে চায়। নিজেদের রক্ষার অক্ষমতার কারণে সৌদি আরব এই চুক্তি করেছে, এমন ব্যাখ্যা গুরুতর ভুল হবে।
সাম্প্রতিক কয়েক দশকে সৌদি আরব নিজেদের সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে। বিমান ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
তবে আধুনিক সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্র কেনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ, বাস্তব সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা জড়িত। উপগ্রহ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, অস্ত্র উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণও আধুনিক সামরিক শক্তির অংশ। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সময় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে অংশীদারত্ব শুধু কোনো হামলার সময় সৌদি আরবের জন্য কাজে লাগবে না। দীর্ঘ মেয়াদে এটি দেশটির নিজস্ব ও আরও স্বাধীন প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতেও সহায়তা করবে।
বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
ভৌগোলিক অবস্থান মক্কা চুক্তিকে এমন একধরনের গুরুত্ব দিয়েছে, যা প্রচলিত সামরিক জোটগুলোর সব সময় থাকে না। তুরস্ক এই অঞ্চলের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। দেশটি ইউরোপ, কৃষ্ণসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় রয়েছে। সৌদি আরব এই অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে। দেশটির অবস্থান পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের মাঝামাঝি। অন্যদিকে পাকিস্তান ইরানের পূর্বে অবস্থিত। এর সীমান্ত ভারতের ও মধ্য এশিয়ার কাছাকাছি। দেশটির দক্ষিণে রয়েছে আরব সাগর।
এই তিন দেশ মিলে একটি বিশাল ভৌগোলিক ত্রিভুজ তৈরি করেছে। এর বিস্তৃতি আনাতোলিয়া থেকে আরব উপদ্বীপ হয়ে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত। এই ভৌগোলিক বিস্তার মক্কা চুক্তির গুরুত্বকে শুধু জাতীয় সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এর মাধ্যমে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল যুক্ত হয়েছে। এগুলো হলো পূর্ব ভূমধ্যসাগর, পারস্য উপসাগর এবং ভারত মহাসাগর।
এই অঞ্চলগুলো জ্বালানি, বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের মাধ্যমে আগে থেকেই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তুরস্কের নিরাপত্তাকে পুরোপুরি সৌদি আরবের নিরাপত্তা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। একইভাবে সৌদি আরবের নিরাপত্তাও পাকিস্তানের নিরাপত্তা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। এখানে স্বার্থের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে।
এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তিন দেশের শুধু সামরিক শক্তিই বাড়বে না। একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গড়ে উঠতে পারে। সেই শিল্পভিত্তি অস্ত্রের বাজারে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের প্রতিরক্ষা বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বৈশ্বিক পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, তিনটি দেশেরই কৌশলগত সমুদ্রাঞ্চলে প্রবেশাধিকার রয়েছে। তুরস্ক কৃষ্ণসাগর ও ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করা প্রণালিগুলোর নিয়ন্ত্রণ করে। সৌদি আরবের অবস্থান লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের তীরে। পাকিস্তানের রয়েছে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী অবস্থান।
এ কারণে সমুদ্রভিত্তিক নজরদারি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং নৌ চলাচলের নিরাপত্তা রক্ষা এই তিন দেশের স্বাভাবিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বাব আল-মানদেব প্রণালি ও হরমুজ প্রণালিতে যে ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে, তার প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের পথ সুরক্ষিত করা কৌশলগত সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রতিরক্ষা সমন্বয়
ভবিষ্যতে মক্কা চুক্তির আওতায় সমুদ্র নজরদারি, ড্রোন প্রতিরোধ, জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং বন্দরের সাইবার নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়তে পারে। নৌ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সমুদ্রের মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করা, উপকূলীয় অবকাঠামো রক্ষা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানেও সহযোগিতা গড়ে উঠতে পারে। যুদ্ধের সময় শুধু সেনা মোতায়েনের চেয়ে এসব ক্ষেত্র শেষ পর্যন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিরক্ষা শিল্প। তুরস্ক ড্রোন, চালকবিহীন বিভিন্ন ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান ও সামরিক ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানেরও সামরিক শিল্পে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাস্তব সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও দেশটির ব্যাপক অভিজ্ঞতা আছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। দেশটির হাতে বিনিয়োগের জন্য বিপুল অর্থ রয়েছে। রয়েছে বড় বাজার। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা উৎপাদনের একটি বড় অংশ নিজেদের দেশে নিয়ে আসার প্রয়োজনও রয়েছে।
এখানেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্ভাবনা তৈরি হয়। মক্কা চুক্তি ভবিষ্যতে শুধু একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সমন্বয়ের কাঠামোয় পরিণত হতে পারে।
এটি বাস্তবায়িত হলে তিন দেশের শুধু সামরিক শক্তিই বাড়বে না। একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গড়ে উঠতে পারে। সেই শিল্পভিত্তি অস্ত্রের বাজারে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের প্রতিরক্ষা বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বৈশ্বিক পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে।
এই চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হলো পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা। তবে এর অর্থ এই নয় যে মক্কা চুক্তির ফলে সৌদি আরব বা তুরস্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাকিস্তানের পারমাণবিক সুরক্ষার আওতায় চলে যাবে। এর অর্থ এটিও নয় যে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির অংশ। তারপরও কোনো প্রতিরক্ষা জোটে পারমাণবিক অস্ত্রধারী একটি রাষ্ট্রের উপস্থিতি প্রতিরোধের হিসাব বদলে দেয়।
আসল পরীক্ষা
সৌদি আরব এখনো উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ, আরব লিগ এবং ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে দেশটির ব্যাপক সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্ক ন্যাটো এবং ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্য। পাকিস্তানও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা বিশ্ব ও চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের এবং জটিল সম্পর্ক রয়েছে। তাই এই চুক্তিকে বিদ্যমান সম্পর্ক ও জোট পরিত্যাগ হিসেবে না দেখে বিকল্পের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিসংগত।
তবে আসল পরীক্ষা শুরু হবে যখন চুক্তিটি বাস্তবে প্রয়োগ করা হবে। প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের দিন সব জোটকেই শক্তিশালী মনে হয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, শুধু কাগজে লেখা চুক্তি শক্তি তৈরি করে না।
এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে পরিণত না হলেও এটি ইতিমধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা শুধু বড় শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে—এই ধারণাকে এটি বদলে দিয়েছে। এখন আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেরাই নিরাপত্তাব্যবস্থার রূপ নির্ধারণ করতে পারে—এই ধারণা সামনে এসেছে।
এটি সামরিক পরিবর্তনের আগেই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন। কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থার মানচিত্র মূলত অঞ্চলের বাইরের শক্তিগুলো এঁকেছে। এখন আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেরাই উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে ক্রমেই বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।
মক্কা চুক্তি একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে। গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণায় বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস প্রথম পাতায় একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। এর শিরোনাম ছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মধ্যপ্রাচ্যব্যবস্থার সমাপ্তি: মক্কা চুক্তিই তার প্রমাণ।’ বিশ্লেষণে বলা হয়, এই চুক্তি দেখিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কতটা কমেছে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিজেরাই গড়ে তুলছে।
জেরুজালেম ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ইসরায়েলকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলার পশ্চিমা বড় পরিকল্পনাগুলোর জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সৌদি আরবের জন্য মক্কা চুক্তির মূল বার্তা হলো, রিয়াদ যুদ্ধ চায় না। কিন্তু দেশের নিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তার হাতে জিম্মিও করে রাখতে চায় না। এই অবস্থান সৌদি আরবের বৃহত্তর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই নীতির ভিত্তি হলো কূটনীতি, উত্তেজনা কমানো এবং বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
চুক্তি স্বাক্ষরের স্থান হিসেবে মক্কা বেছে নেওয়ার মধ্যেও গভীর রাজনৈতিক ও প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। মক্কা শুধু সৌদি আরবের একটি শহর নয়। এটি মুসলমানদের কিবলা। সারা বিশ্বের মুসলমানদের হৃদয়ের কেন্দ্র এবং তাদের ঐক্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে এই চুক্তিতে অন্য আরব ও মুসলিম দেশও যুক্ত হতে পারে। এই উদ্যোগ সফল হলে কয়েক বছর পর হয়তো প্রশ্নটি আর থাকবে না, কেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি জোট গঠন করেছিল। তখন হয়তো প্রশ্ন হবে, ভিন্ন ভিন্ন হুমকি এবং পরস্পর থেকে আলাদা স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও এই তিন দেশ কীভাবে এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে পারল, যার নিয়ম শুধু বাইরের শক্তিগুলো নির্ধারণ করবে না?
আমার মতে, কৌশল ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেন, এমন ব্যক্তিদের সামনে এটাই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আহমেদ আলতুয়াইজরি মিডল ইস্ট আইয়ের নিয়মিত কলাম লেখক।
মিডল ইস্ট থেকে নেওয়া। সংক্ষেপিত অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।