আওয়ামী লীগ আমলের গত তিনটি নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জনমনে কৌতূহলের কোনো সুযোগ ছিল না। এমনকি ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল কী হতে পারে, তা আগেই ধারণা করা গেছে। সেদিক থেকে এবার এক ব্যতিক্রমী নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
বিভিন্ন জরিপে ফলাফলের কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু এবারের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন পক্ষ থেকে যে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, তা ১৮০ ডিগ্রি এদিক-সেদিক। সেই বিবেচনায় ১২ ফেব্রুয়ারি আমরা একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশা করতে পারি।
কেমন হবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বা সম্ভাব্য ফলাফল কী ? নির্বাচনের দিন চারেক আগে খুব স্বাভাবিকভাবে এটাই আলোচনার বিষয়। এবারের নির্বাচনের আরও একটি ব্যতিক্রমী দিক হচ্ছে নির্বাচন নিয়ে এই শেষ সময়েও কিছু মানুষের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে।
১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে চারটায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত কেউ কেউ এই সংশয় মনে পুষে যাবেন বলে মনে হয়। তবে এটাও ঠিক যে নির্বাচনের একদম আগে আগে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে বা ঘটানোর চেষ্টা হচ্ছে, যা এমন সন্দেহকে উসকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
২.
বিএনপি (সঙ্গে কিছু নির্বাচনী সহযোগী দল) ও জামায়াতের নেতৃত্বে ১১–দলীয় জোট—নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই পক্ষই নির্বাচনে জেতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী অথবা জনগণকে এমন ধারণা দিচ্ছে যে তারাই জিতে যাচ্ছে বা সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। দুই পক্ষই যে এমন দাবি করছে, তার পেছনে কাজ করছে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের হিসাব-নিকাশ। তবে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, সেই বিষয়টি তাদের দাবির পক্ষে শর্ত হিসেবে হাজির আছে।
নির্বাচনে ভোটারদের মনস্তত্ত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। মার্কিন অর্থনীতিবিদ অ্যান্টনি ডাউনসের মতে, ভোটারদের কাছে অনেক সময় নীতি বা আদর্শগত বিষয়ের চেয়ে ‘জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা’ বেশি গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা অনেক ক্ষেত্রে শেষ সময়ে সম্ভাব্য বিজয়ী দলের প্রতি সমর্থন জানান। (অ্যান ইকোনমিক থিওরি অব ডেমোক্রেসি)
বিএনপি নব্বইয়ের পর দুই দফায় নির্বাচিত দল হিসেবে দেশ শাসন করেছে। তাদের জনসমর্থন ও শক্তি-সামর্থ্যের বিষয়টি প্রমাণিত, যদিও মাঝে দীর্ঘ সময় চলে গেছে। অন্যদিকে ভোটের হিসাবে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের অবস্থান ছিল চতুর্থ। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জামায়াতের বড় উল্লম্ফন ঘটেছে। এই বাস্তবতায় তারাই বিজয়ী হচ্ছে, এমন একটি ধারণা জনমনে গেঁথে দিতে জামায়াত তাই বেশি সক্রিয় থেকেছে। অবস্থাটি এ রকম যে জয় প্রায় নিশ্চিত—এমন ধারণা তৈরি করে জামায়াত ভোটারদের মানসিকভাবে তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারে জনগণের সামনে দেওয়া বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌশলী কর্মকাণ্ড এবং প্রচার এবং প্রকাশ্য বা ছদ্মবেশে লোক নামিয়ে জনগণকে প্রভাবিত করা—এ ধরনের নানা উপায়ে এমন একটি প্রতীকী বাস্তবতা নির্মাণ সম্ভব, যাতে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যায় যে তারাই নির্বাচনে জয়লাভ করবে। বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনী প্রচারে এই বিষয়গুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি।
রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের গুরুত্ব বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীর বক্তব্যে আমরা পাই। আত্মবিশ্বাসী ভাষ্য কর্মী ও সমর্থকদের চাঙা করে। ভোটের মাঠে ‘আমরা জিতে যাচ্ছি’ বা ‘জয়ের কাছাকাছি’ এমন ধারণা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে উৎসাহিত করে। ন্যারেটিভ বা ভাষ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণও ভোট বা রাজনীতির মাঠে খুবই কার্যকর কৌশল।
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারি এডেলম্যান তাঁর দ্য সিম্বলিক ইউজেস অব পলিটিকস বইয়ে বলেছেন, যে রাজনৈতিক কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে, তা সাধারণত সিম্বলিক বা প্রতীকী। জনগণকে প্রকৃত সুফল দেওয়া এর লক্ষ্য নয়। বরং এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি, চাপ সৃষ্টি বা আবেগ জাগানোর কাজটি করা হয়। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতির চেয়েও প্রতীক বা ভাষ্যের মাধ্যমে রাজনীতি বেশি কাজ করে।
জনগণ আমাদের ভোট দেবে বা নির্বাচিত করবে—এ ধরনের দাবি ঢালাও বা পরিসংখ্যাননির্ভর না হলেও রাজনৈতিকভাবে কার্যকর। জনগণের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরির ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রচার কাজে দেয়।
নির্বাচনী প্রচারে জনগণের সামনে দেওয়া বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌশলী কর্মকাণ্ড এবং প্রচার এবং প্রকাশ্য বা ছদ্মবেশে লোক নামিয়ে জনগণকে প্রভাবিত করা—এ ধরনের নানা উপায়ে এমন একটি প্রতীকী বাস্তবতা নির্মাণ সম্ভব, যাতে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যায় যে তারাই নির্বাচনে জয়লাভ করবে। বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনী প্রচারে বিশেষ করে জামায়াতকে এই কৌশল নিতে দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আত্মবিশ্বাসী অবস্থানের মাধ্যমে যে শুধু ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে তা নয়, বরং সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, সহযোগী রাজনৈতিক দল ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক শক্তি ও পর্যবেক্ষকদের বার্তা দেওয়াও এর লক্ষ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের সূত্রে আমরা জানি যে ক্ষমতায় যেতে চায়, এমন দলগুলো অনেক সময় নিজেদের একটি ‘শক্তির ধারণা’ তৈরি করে। কারণ, শক্তির ধারণা অনেক সময় বাস্তব শক্তিতে রূপ নেয়।
৩.
বিএনপি ও জামায়াতের ১১–দলীয় জোট নিজ নিজ কৌশল অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃত। খালেদা জিয়ার বিপুল জনপ্রিয়তা, তাঁর মৃত্যুর পর জানাজায় ঐতিহাসিক জমায়েত, ১৭ বছর পর ব্যাপক সংবর্ধনার মধ্যে তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং এ পর্যন্ত তাঁর সংযত অবস্থান ও ভাবমূর্তি ভোটের প্রচারের শুরুতে বিএনপিকে এগিয়ে দেয়। এসব কারণে বিএনপি ও এর নেতা-কর্মীরা নির্বাচনে বিপুল জয়ের ব্যাপারে বলা যায় শতভাগ আত্মবিশ্বাসী।
কিন্তু নির্বাচনের মাঠের যেসব কৌশল বা জনগণের মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রচার–প্রচারণার যে বিষয়গুলো আগে আলোচনা করেছি, সেখানে বিএনপি আসলে কতটা কী করেছে বা করতে পেরেছে? নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে দল হিসেবে বিএনপি বা এর নেতা-কর্মীরা যতই আত্মবিশ্বাসী হোন, ‘বিএনপি বিজয়ী হবেই’ এমন ধারণা তাঁরা জনগণের মধ্যে কতটা গেঁথে দিতে পেরেছেন, সেটা এক বড় প্রশ্ন। অবশ্য এমনও হতে পারে যে বিএনপি সচেতনভাবেই এ ধরনের কৌশল নেয়নি।
কিন্তু এটা মাথায় রাখা জরুরি যে ২০০১ সালের পর এই প্রথম বিএনপি সেই অর্থে একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে লড়াই করছে। এই সময়ের মধ্যে এক–এগারো হয়েছে, রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে। কয়েক কোটি নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে। বড় দলের পুরোনো হিসাব-নিকাশ বা আত্মবিশ্বাস নতুন ভোটারদের কাছে এসে হোঁচট খায় কিনা সেই প্রশ্নও অনেকে তুলেছেন।
অন্যদিকে ন্যারেটিভ তৈরির ক্ষেত্রে জামায়াতকে সফল বলতেই হবে। বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে একসময় চতুর্থ দল হিসেবে বিবেচিত জামায়াতও সেই আগের জায়গায় নেই। দলটি ১১–দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হবে বা হতে পারে—এমন ধারণা দলটি জনমনে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। কার্যকর নির্বাচনী কৌশল ও প্রচার ছাড়া এটা সম্ভব হতো না। এর সুফল জামায়াত কতটা পাবে, তা বোঝার জন্য আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া পথ নেই।
তবে জামায়াত জিতে যাবে—এমন ধারণা বিএনপিকে কিছু সুবিধাও দিতে পারে। গণ-অভ্যুত্থানের পর দল হিসেবে জামায়াত শক্তিশালী হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে কলঙ্কিত অবস্থানের কারণে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতার সংকট কোনো দিনই কাটবার নয়। তা ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে নারী ইস্যুতে জামায়াতের যে অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে, তা সমাজের একটি অংশকে ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত করেছে। নানা বিবেচনায় এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহী ছিলেন না, এমন অনেক ভোটার জামায়াত জিতে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন। যে ভোট কখনো বিএনপির বাক্সে যাওয়ার কথা নয়, এমন ভোটও এবার বিএনপি পেতে পারে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ফলে এই নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক’ বলা যাবে কি না, সেই প্রশ্ন থাকবে। তবে এই নির্বাচনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত যা–ই হোক, নির্বাচনটি অন্তত একতরফা হবে না।
নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষের যে কেউই জিততে পারে—এমন ধারণা যেহেতু তৈরি হয়েছে, তাই নির্বাচনটি উল্লেখযোগ্য জনগণের অংশগ্রহণে ‘অংশগ্রহণমূলক’ ও স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে। তবে এটা নির্ভর করছে জনগণের নিরাপত্তার বোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখা এবং নির্বাচনকে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার পরীক্ষায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে পাস করতেই হবে।
এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক
মতামত লেখকের নিজস্ব
[৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ লেখা প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা—শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে]
