ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের চার বছর পেরিয়ে গেছে। ক্রেমলিন ড্রোন, পদাতিক বাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাঁজোয়া যান দিয়ে যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তার সমান্তরালে তারা অর্থনৈতিক ধ্বংসও চালিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, যুদ্ধ যদি আজ শেষ হয়, তাহলেও দেশটি পুনর্গঠনে খরচ হবে ৫৮৮ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ ইউক্রেনের জিডিপির প্রায় তিন গুণ।
মাঠের যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়া ও পশ্চিমাদের মধ্যে অর্থনৈতিক যুদ্ধও চলছে। তবে গত এক বছরে দক্ষিণ ও পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে অর্থনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র অনেক বেশি বদলেছে। স্থলযুদ্ধ এখন শক্তিক্ষয়-যুদ্ধের পর্যায়ে। শেষ পর্যন্ত এই সংঘাত কীভাবে মীমাংসা হবে, তা নির্ধারণে অর্থনৈতিক লড়াই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু দুই পক্ষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা যুদ্ধের ‘কুয়াশা’য় ঢাকা পড়ে আছে। তার ওপরে এই অর্থনৈতিক সংঘাতে জড়িত অনেক পক্ষই বাস্তব পরিস্থিতি আড়াল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে আত্মপ্রচার ও রাজনৈতিক বক্তব্য বাস্তবতার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এ অবস্থায় যুদ্ধ কোন দিকে যাচ্ছে, তা বুঝতে হলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা ও পশ্চিমাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত তিনটি ভ্রান্ত ধারণা ভাঙা দরকার।
প্রথম ভ্রান্ত ধারণা হলো, রাশিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দেওয়া সম্ভব। অনেকে মনে করেন, ক্রেমলিন যেকোনো মূল্যে যুদ্ধ চালাতে প্রস্তুত, তাই অর্থনৈতিক ক্ষতিও তারা মানিয়ে নিতে পারবে। বাস্তবতা হলো এই যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
২০২২ সালের আগ্রাসনের পর রাশিয়া তার সবচেয়ে বড় গ্যাস রপ্তানি বাজার (ইউরোপ) হারিয়েছে। যুদ্ধের আগে রাশিয়া বছরে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিক্রি করত। এখন তা নেমে এসেছে ৩৮ বিলিয়ন ঘনমিটারে। ইউরোপীয় গ্যাস ফিউচার বাজারের (ইউরোপে গ্যাস কেনাবেচা শুধু সরাসরি আজকের দামে হয় না; ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ে সরবরাহের জন্যও আগে থেকে চুক্তি করা হয়। একে বলে ফিউচার বাজার।) সাম্প্রতিক দামে প্রতি বিলিয়ন ঘনমিটারের মূল্য ৩০০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি (প্রায় ৩৫৩ মিলিয়ন ডলার)। অর্থাৎ রাশিয়া বছরে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার) হারাচ্ছে। আগামী বছর ইইউ দেশগুলো পুরোপুরি রুশ গ্যাস আমদানি বন্ধ করলে এই ক্ষতি আরও বাড়বে।
রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন কূটনৈতিক আলোচনায় এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। উভয় পক্ষই পঞ্চম বছরে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক
যুদ্ধও চলবে।
এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৩৫ বিলিয়ন ডলারের রুশ রাষ্ট্রীয় সম্পদ এখনো জব্দ অবস্থায় আছে। ক্রেমলিন বারবার আইনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এসব সম্পদ ইউক্রেনের পক্ষে ব্যবহার ঠেকানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনায় রাশিয়ার প্রস্তাবগুলোর ভেতর থেকে বোঝা যায়—তারা নিজেরাই স্বীকার করছে, এসব সম্পদের বড় অংশ আর ফেরত পাওয়া যাবে না। বর্তমানে যে খাতটি ভালো করছে, তা হলো সামরিক ও প্রতিরক্ষা উৎপাদন। কিন্তু উচ্চ সুদের হার এবং যুদ্ধক্ষয় ও নিয়োগের কারণে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় রুশ অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে চাপে রয়েছে।
দ্বিতীয় ভ্রান্ত ধারণাটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক লড়াইয়ে আগ্রহী নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যদি যুদ্ধ বন্ধ হয় বা সমঝোতা হয়, তাহলে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু এখনো তিনি রাশিয়ার ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নেননি।
বরং তাঁর সরকারের নেওয়া কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য তেল বিক্রি করাকে আরও কঠিন করে তুলছে। অর্থাৎ কথায় সহযোগিতার ইঙ্গিত থাকলেও বাস্তবে অর্থনৈতিক চাপ এখনো চলছে।
ওয়াশিংটন গত অক্টোবরে রাশিয়ার দুটি বৃহত্তম তেল কোম্পানির (রসনেফ ও লুকঅয়েল) ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। প্রাথমিক লক্ষণ বলছে, এসব পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাজারে রুশ তেল বিক্রির সক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
এই নিষেধাজ্ঞায় রুশ অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কালোতালিকাভুক্ত হয়েছে। ফলে বিশেষ করে এশিয়ায় ব্যাংক, ব্যবসায়ী ও পরিশোধনাগারগুলো তাদের সঙ্গে লেনদেনে অংশ নিতে ভয় পাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর ওপর ইউরোপের তুলনায় ধীরগতিতে নিষেধাজ্ঞা দিলেও ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে বাজারে এখন আগের চেয়ে বেশি ‘কালো’ তেল রয়েছে।
এর ফল হিসেবে অনেক তেল ক্রেতাহীন অবস্থায় পড়ে আছে। কোটি কোটি ব্যারেল তেল গুদাম বা ট্যাংকারে আটকে আছে। কারণ, পরিশোধনাগারগুলো নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিতে চায় না। নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি রপ্তানি বন্ধ করেনি, কিন্তু বেচাকেনা ধীর ও অনিশ্চিত করেছে। রুশ তেল এখন ক্রেতা খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং বড় অঙ্কের ছাড় দিতে বাধ্য হচ্ছে।
ট্রাম্পের ইরানে হামলার হুমকির কারণে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বেড়ে ব্রেন্ট তেলের দাম ৭০ ডলারের বেশি হলেও রাশিয়াকে প্রতি ব্যারেলে ৩০ ডলার পর্যন্ত ছাড় দিতে হয়েছে।
তৃতীয় ভ্রান্ত ধারণা হলো ইউক্রেনকে সহায়তা দিতে ইউরোপকে নিজেদের কোষাগার থেকেই অর্থ দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইইউর হাতে একটি বিকল্প আছে। সেটি হলো জব্দ করা রুশ সম্পদ।
আসলে ৯০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ পরিকল্পনাটিও গত ডিসেম্বরে শেষ মুহূর্তে তৈরি করা হয়। কারণ, রাশিয়ার জব্দ সম্পদ ব্যবহারে ঐক্য গড়া সম্ভব হয়নি। এসব সম্পদের বড় অংশই ইইউর এখতিয়ারে রয়েছে। গত বছর আলোচনা ব্যর্থ হলেও তা আবার শুরু করা যেতে পারে।
রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন কূটনৈতিক আলোচনায় এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। উভয় পক্ষই পঞ্চম বছরে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক
যুদ্ধও চলবে।
রুশ অর্থনীতিকে সত্যিকারের ভেঙে ফেলতে এবং মস্কোকে যুদ্ধ শেষের বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করতে হলে পশ্চিমাদের এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যা তারা এখনো নিতে পারেনি। নয়তো আরও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ম্যাক্সিমিলিয়ান হেস লন্ডনভিত্তিক রাজনৈতিক ঝুঁকি পরামর্শক এবং ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ