ভোট–বসন্তে রাঙানো উৎসব

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলায় বোতলার পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের সারিছবি: লেখকের সৌজন্যে

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলায় চারটি ভোটকেন্দ্র ঘুরলাম। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি। তরুণ এবং নারীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল মাঘ মাসের ২৯ তারিখ। এক দিন পরে প্রকৃতিতে বসন্ত নামবে। কয়েকটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে মনে হলো ভোটের বসন্ত নেমেছে আজ।

সকাল ১০টার দিকে রাজারহাট ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে একটি অটোরিকশায় করে গেলাম। রিকশা থেকে নামার আগে একজন মহিলার কথা শোনা গেল। নাম তাঁর আসমা। ছেলের নাম আসমান। তিনি যে চিরকুট নিয়ে ভোট দিতে গেছেন, সেই চিরকুটে নাম লেখা ছিল আসমান। নাম না মেলার কারণ প্রথমে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। আসমান তাঁর ছেলের নাম, সেটি যাচাই করার পর তাঁর ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম কেমন লাগছে? তাঁর মুখে হাসির ঝলক। তিনি বললেন, ‘পোত্যেকবার ভোট দেই। এবারও দিছি। ভালো লাগতেছে।’

রিকশার পাশে দাঁড়ানো কয়েকজন তরুণ। তাঁরা প্রত্যেকে প্রথমবার ভোট দিতে এসেছেন। তাঁদের কেউ এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছেন, কেউ উচ্চমাধমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন, কেউœস্নাতক শ্রেণিতে পড়েন। উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া লিমন বলছেন, ‘জীবনে প্রথমবার ভোট দেব, এটা ভেবে গত রাতে ঘুমই হয়নি।’

দেখলাম মোবাইলে অ্যাপ ব্যবহার করে তিনি অনেকের ভোটার নম্বর বলে দিচ্ছেন। আমাকে পরিবহন করা রিকশাওয়ালা মকবুল হোসেন তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিজের ভোটার নম্বর জেনে নিলেন। লিমন আমার মোবাইলে অ্যাপটি ডাউনলোড করে দিয়েছেন।

পুনকর সৌদাময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়েছিলাম প্রায় বেলা ১১টার দিকে। সেখানে নারী-পুরুষ সব ধরনের ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি। পুনিল চন্দ্র নামে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং তাপস নামের আরেক স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানালেন ভোট ভীষণ শান্তিপূর্ণ। কোনো রকম ভীতি কিংবা শঙ্কা ছাড়াই সবাই ভোট দিতে আসছেন। এখানে কয়েকজন তরুণের সঙ্গেও কথা হয়। ঢাকা থেকে একজন কেবল ভোট দিতেই এসেছেন।

ভোটে জয়–পরাজয় একপক্ষের হবে, সেটাই স্বাভাবিক। মানুষ যেভাবে উৎসবের আমেজে ভোট দিয়েছেন তাতে গণতন্ত্র রক্ষায় তারা যে সজাগ ও সচেতন সেই বার্তায় পাওয়া গেল।  ২০২৬–এর ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের যে নতুন যাত্রা শুরু হলো, তা অব্যাহত থাকুক।

দুপুর ১২টার দিকে হরিশ্বর তালুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখলাম মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভোট প্রয়োগ করছেন। এই কেন্দ্রে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। জানলাম নারীরা বাড়িতে সকালে ভাত রান্না করে বাড়ির সব সদস্যদের খাওয়ানোর পর ভোট দিতে এসেছেন।

গত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন কার্যত ছিল একপেশে। ২০১৪ সালে ভোটের আগেই বিনা ভোটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এর পরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ সালে দিনের ভোট আগের রাতে এবং ভোটের দিন গায়ের জোরে ভোট করেছে আওয়ামী লীগ জোট সরকার। ২০২৪ সালের নির্বাচনও ছিল সাজানো। ফলে এই নির্বাচনগুলো কোনোটিই উৎসবমুখর হয়নি।

আরও পড়ুন

২০১৮ সালে রাজারহাট উপজেলার বোতালারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে আমি দেখেছি, একদল মানুষ ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে। তারা অধিকাংশ এই কেন্দ্রের ভোটার নয়। ঘণ্টাখানেক তারা কেন্দ্রের ভেতরে ছিল। বাইরে থেকে অনেকের মতো আমিও দেখেছি। পরে জেনেছি, তারা আওয়ামী জোট প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে ইচ্ছেমতো সিল মেরেছিল। বিকেলে যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা অনেকে আর ভোট দিতে পারেননি। এই কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষ হলে দেখা যায়, মোট ভোটারের চেয়ে ব্যালটের সংখ্যা অনেক বেশি। পরে অতিরিক্ত ব্যালট বাতিল করে এই কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

আজ এই কেন্দ্রে যখন গিয়েছি, তখন বেলা একটা বাজে। দেখলাম, মহিলাদের দুটি বড় বড় লাইন। ভোটকেন্দ্র থেকে সামান্য দূরে দেখলাম অনেক লোকসমাগম। নিজ নিজ মার্কার পক্ষে অনেক বুথ বাইরেও বসেছে। এগুলো মূলত ভোটারদের সহায়তা করার জন্য। অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা প্রত্যেকে ভোটের পরিবেশ নিয়ে খুব খুশি।

জীবনে প্রথম ভোট দেওয়ার পর চার তরুণ। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের পাশে
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

কোন প্রার্থীর সম্ভাবনা বেশি—এমন কথা হয় অনেকের সঙ্গে। দেখে মনে হলো এসব কেন্দ্রে ধানের শীষ এবং শাপলা কলি মার্কার দিকে মানুষের ঝোঁক বেশি। তবে জয়–পরাজয়ের বাস্তবতা জানা যাবে আরও কয়েক ঘণ্টা পরে। ভোটকেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা ভালো রাখার ক্ষেত্রে দলীয় ব্যক্তিরাও ভূমিকা রাখছেন। বিভিন্ন দলীয় প্রতিনিধিরাও চাইছেন ভোট সুষ্ঠু হোক। এই লেখা চলমান থাকা পর্যন্ত ভোট অবাধ-সুষ্ঠু হচ্ছে। আশা করা যায় দেশজুড়ে সুষ্ঠু ভোট সম্পন্ন হবে।

ভোটকেন্দ্রগুলোতে এক দিনের জন্য চায়ের দোকান বসেছে। সেখানে পাউরুটি, বিস্কুট, বিড়ি-সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। অনেকে চা খাচ্ছেন। যাঁরা লেখাপড়া কিংবা কাজের সুবাদে বাইরে থাকেন, ভোট উপলক্ষে এসেছেন, তাঁরা ছোট ছোট জটলার মতো করে আড্ডাও দিচ্ছেন। ভোটকেন্দ্রগুলোতে আমার সঙ্গেও অনেক পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা হলো। তাঁদের সঙ্গে যে মতবিনিময় হলো তা প্রাণবন্ত। ঈদ, পূজা কিংবা অন্য কোনো বড় ছুটিতে যেমন অনেকে বাড়িতে আসেন। এবারে ভোটের ছুটিতে সেই বাস্তবতা। ভোটকেন্দ্রগুলো উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন

উৎসবপ্রিয় বাঙালির কাছে ভোট প্রদান উৎসবে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণমানুষের মধ্যে দেশ নিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, এবারের ভোটে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে দেশ আর পথ হারাবে না। আন্দোলনও মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে ইতিহাসে টিকে থাকবে। ভোটে জয়–পরাজয় একপক্ষের হবে, সেটাই স্বাভাবিক। মানুষ যেভাবে উৎসবের আমেজে ভোট দিয়েছেন তাতে গণতন্ত্র রক্ষায় তারা যে সজাগ ও সচেতন সেই বার্তায় পাওয়া গেল।  ২০২৬–এর ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের যে নতুন যাত্রা শুরু হলো, তা অব্যাহত থাকুক।

  • তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
    *মতামত লেখকের নিজস্ব