ভাবুন, ঢাকার যেকোনো গলিতে পাশাপাশি তিনটি বাসা। একটিতে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী, একটিতে পোশাকশ্রমিক, আরেকটিতে বেসরকারি অফিসের হিসাবরক্ষক বা প্রকৌশলী। কিছুদিন আগেও প্রথম দুজন প্রায় একই টাকায় সংসার চালাতেন। আগের স্কেলে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ছিল ৮,২৫০ টাকা, সব ভাতা মিলিয়ে ঢাকার বাইরে প্রায় ১৫,৭০০ টাকা।
পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মোট মজুরি ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ১২,৫০০ টাকা; মিরপুরের এক শ্রমিক জানালেন, ওভারটাইম মিলিয়ে মাসে আসে ১৮ থেকে ২০ হাজার। শ্রমিকের মজুরি না বাড়লে নতুন পে স্কেল পুরো বাস্তবায়নের পর এই দুই প্রতিবেশীর বার্ষিক আয়ের ব্যবধান দাঁড়াবে প্রায় তিন গুণ।
সরকারি কর্মচারীর ন্যায্য বেতন নিয়ে আপত্তি নেই। প্রশ্নটা অন্য জায়গায়: বাকি দুই বাসার বেতন বাড়বে কোথা থেকে, যখন যে ব্যবসা তাঁদের বেতন দেয়, সে নিজেই মন্দা, ঘুষ আর চাঁদার চাপে দম ফেলতে পারছে না?
প্রথম বাসা: নিশ্চিত, ধাপে ধাপে
১০ থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতনের বর্ধিত অংশ মিলছে ধাপে: ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০ শতাংশ, ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, জুলাই থেকে পুরোটা। ফলে ২০তম গ্রেডে নতুন যোগ দেওয়া একজনের মূল বেতন এখনই ১৪,১২৫ টাকা, যা ভাতা ছাড়াই একজন পোশাকশ্রমিকের পুরো মোট মজুরির চেয়ে বেশি।
নতুন হারের ভাতা চালু হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি। তখন ঢাকায় এই গ্রেডে মূল বেতন ২০,০০০ টাকা, বাড়িভাড়া তার ৬০ শতাংশ, চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার আর টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা; শুধু এই চারটি মিলিয়েই মাসে ৩৫,৫০০ টাকা। যোগদানের মাস থেকেই মূল বেতনের সমান দুটি উৎসব ভাতা আর নববর্ষ ভাতা ধরলে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
কোনো ইনক্রিমেন্ট না ধরেও ৩০ বছরের চাকরিতে তা ১ কোটি ৪০ লাখ ছাড়ায়, পেনশন আর আনুতোষিক যোগ হলে দেড় কোটিও। বর্তমান পেনশনভোগীদের পেনশন বেড়েছে ধাপভেদে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ। এই স্কেলে সরকারের বছরে বাড়তি ব্যয় ১,০৫,৫৮০ কোটি টাকা, উপকৃত ২৪ লাখ কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগী।
এর মধ্যে ব্যবসা নিজে বেতন বাড়ালে মুনাফা রাখাই প্রায় অসম্ভব, না বাড়ালে রাস্তা গরম হয়। সরকার ঢুকেছে এক চক্রব্যূহে; অভিমন্যুর মতো ঢোকার পথ জানা ছিল, বেরোনোর পথ কেউ জানে না। আর ঢোকার সময় সঙ্গে টেনে এনেছে পুরো দেশকে। সরকার যদি এটা সামলাতে না পারে, অন্য পক্ষ সুযোগ নেবেই।
দ্বিতীয় বাসা: পুরোনো বাজারদরে আটকে
নতুন শ্রমিকের মূল মজুরি ৬,৭০০ টাকা। উৎসব ভাতা মেলে এক বছর চাকরির পর, তা-ও মূল মজুরির বেশি নয়। ওভারটাইম ছাড়া বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, ৩০ বছরে ৪৯ লাখ, যদি কারখানা টিকে থাকে। রাষ্ট্র-নিশ্চিত পেনশন নেই, আর ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪০০-এর বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে।
শতাংশে দুই পক্ষের বৃদ্ধি প্রায় সমান। সরকারি মূল বেতন ১৪২ শতাংশ, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ২০১৩ সালের ৫,৩০০ টাকা থেকে ১৩৬ শতাংশ। তফাত সময়ে। সরকারি বেতন ঠিক হলো আজকের বাজারদরে, শ্রমিকেরটা ২০২৩ সালের দরে।
এর মধ্যে দাম বেড়েছে মোটামুটি এক-চতুর্থাংশ; আজকের ১২,৫০০ টাকায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের ১০ হাজার টাকার মতো জিনিস মেলে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে মূল্যস্ফীতি টানা মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে; সেপ্টেম্বরেও মজুরি বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, দাম ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
জানুয়ারি থেকে আগস্টে ইইউতে আমাদের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে ইইউর মোট আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, প্রতি কেজির দাম ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ; ভিয়েতনামের আয় উল্টো বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
গাজীপুরের এক সুইং অপারেটর জানালেন, আগে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ হতো, এখন অনেক দিন বিকেল ৫টায় ছুটি। ওভারটাইম গেলে হাতে থাকে ১২,৫০০ টাকা, অথচ মিরপুরের ওই শ্রমিকের শুধু ঘরভাড়াই ৮ হাজার। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে টানা আন্দোলনের মধ্যে ১ নভেম্বর সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
তৃতীয় বাসা: যার কথা কেউ বলে না
বিবিএসের হিসাবে দেশের কর্মজীবীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বেসরকারি খাতে। অথচ বেশির ভাগ বেসরকারি অফিসে বেতন ঠিক করার কমিশন বা বোর্ড নেই, দাবি তোলার সংগঠনও কার্যত নেই; তাঁদের বেতন কতটা ক্ষয়ে গেল, তার নিয়মিত সরকারি হিসাবও নেই।
২০২৫ সালের সংশোধনীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শ্রমিকের সংজ্ঞায় আনা হয়েছিল; এপ্রিলে পাস হওয়া সংশোধিত শ্রম আইনে সেই বিধান বাদ গেছে, ফলে অনেকে গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ড হারানোর ঝুঁকিতে। অথচ বেসরকারি সার্ভিস রুলস তৈরিতে সরকারের গড়া কমিটির প্রধানই বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সুবিধামতো ছাঁটাই করছে, অনেকে সার্ভিস বেনিফিট পাচ্ছেন না।
চাকরির বাজারের এই চাপ সবচেয়ে স্পষ্ট শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে। আইএমএফের হিসাবে দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেকার। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ২০২৪ সালের জরিপে ৫৫ শতাংশ তরুণ পড়াশোনা বা কাজের জন্য বিদেশে যেতে আগ্রহী, আর বেকারত্বের প্রধান কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি, ৩৭ শতাংশ, বলেছেন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। ব্যবসা খারাপ হলে প্রথমে আটকায় তাঁদের ইনক্রিমেন্ট, কখনো চাকরিও। শ্রমিক অন্তত রাস্তায় দাঁড়াতে পারেন; তাঁরা সেটুকুও পারেন না, কারণ মুখ খুললে চাকরি যায়।
কিন্তু সব বাসারই বেতন দেয় বেসরকারি খাত। তাই আসল প্রশ্ন, সেই খাতের অবস্থা কী।
যে খাত বেতন দেবে, তারই দম নেই
মার্চে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নামে, জুনে ঠেকে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। আগস্টেও তা ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ; বিশ্বব্যাংক বলছে, ৩৩ বছরে সর্বনিম্ন। অথচ একই আগস্টে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ, প্রায় সাত গুণ গতিতে।
ব্যবসার জন্য সুদও চড়া: একটি ব্যাংকের ৩০ জুন থেকে কার্যকর হারেই বড় শিল্পের মেয়াদি ঋণ আর কর্মসূচির বাইরের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণের সুদ ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। অথচ এসএমই ফাউন্ডেশনের হিসাবে শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান এই ছোট উদ্যোগগুলোতেই।
তার ওপর গ্যাস নেই, যদিও দাম ঠিকই বেড়েছে: ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্পে ১৫০ থেকে ১৭৮ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা, ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন সংযোগে ৪০ টাকা। জুলাই-আগস্টের সংকটে শুধু হবিগঞ্জেই ছোট-বড় ১৭১টি কারখানা বন্ধ হয়।
মুন্সিগঞ্জের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে সিটি গ্রুপের পাঁচটি ইউনিট গ্যাসের অভাবে চালু হচ্ছে না; প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস, অথচ দিনে সুদ গুনতে হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। বিজিএমইএ সভাপতির হিসাবে বর্তমান সরকারের আমলে ৩১টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে চাকরি গেছে প্রায় ১৪ হাজার জনের; আট থেকে দশটি ইস্পাত কলও বন্ধ।
ফল দেখা যাচ্ছে হিসাবের খাতায়। জুলাই-মার্চে স্কয়ার টেক্সটাইলসের মুনাফা কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ, শাশা ডেনিমসের ৭২ শতাংশ। বহু ব্যবসার নিট মার্জিন এখন ৩ থেকে ৪ শতাংশ।
দুই চাঁদাবাজি: রাস্তায় আর টেবিলে
এই সরু মার্জিন থেকেই দুই পক্ষকে খুশি রাখতে হয়। প্রথম পক্ষ রাস্তার। পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকায় সারা দেশে চাঁদাবাজ ৩,৮৪৯ জন; ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকায় শুধু রাজধানীতেই ১,২৮০ জন, তাঁদের ১৪৮ জন সশস্ত্র, আর আশ্রয়দাতা ৩১৪ জন।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ৭৫ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় একটি পোশাক কারখানার প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ, উৎপাদন বন্ধ। ৩০ অক্টোবর রাজধানীর দিয়াবাড়ি ফলের আড়তের নিয়ন্ত্রণ আর চাঁদা নিয়ে পুলিশের সামনেই ক্ষমতাসীন দল-সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের সংঘর্ষ। ক্ষমতা বদলায়, কালেক্টরের নাম বদলায়, চাঁদা বদলায় না।
দ্বিতীয় পক্ষ টেবিলের, যাকে আমরা চাঁদা বলি না, বলি ‘স্পিড মানি’। টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫ বলছে, এক বছরে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেন হয়েছে ১২,৬৩৩ কোটি টাকা, ২০২৩ সালের চেয়ে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের হার ৫০ দশমিক ৮ থেকে বেড়ে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ; অর্থাৎ ঘুষ শুধু বেশি টাকা নিচ্ছে না, বেশি মানুষকে ধরছে।
অথচ এটা শুধু পরিবারের হিসাব। কাস্টমস, ভ্যাট, আয়কর, লাইসেন্স, ছাড়পত্র আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগে ব্যবসাকে কত গুনতে হয়, তার কোনো জাতীয় হিসাব নেই। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ এন্টারপ্রাইজ জরিপ (২০২২) শুধু বলে, প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব কাজে অন্তত একবার ঘুষ চাওয়া হয়েছে।
আগস্টে চালু হওয়া নাগরিক উদ্যোগ ‘ঘুষ.সাইট’-এ প্রথম তিন দিনেই ১,৮২৬টি অভিযোগ জমা পড়ে, চাওয়া ঘুষের অঙ্ক ২১ কোটি টাকা। অভিযোগগুলো যাচাই করা নয়, সাইট নিজেই তা বলে; তবু আভাসটা স্পষ্ট। ঠিকমতো মাপলে টেবিলের চাঁদা রাস্তার চাঁদাকে বহু গুণে ছাড়িয়ে যাবে।
৩ শতাংশ মার্জিনের অঙ্ক
ধরা যাক, বছরে ১০ কোটি টাকা বিক্রির একটি মাঝারি প্রতিষ্ঠান, নিট মার্জিন ৩ শতাংশ, অর্থাৎ লাভ ৩০ লাখ টাকা। ৫০ জন কর্মীর বেতন মাসে গড়ে মাত্র ২ হাজার টাকা বাড়াতে লাগবে বছরে ১২ লাখ, লাভের ৪০ শতাংশ। এবার এই ৩০ লাখ থেকে বাদ দিন এলাকার মাসোহারা, মাল আনার পথে ঘাটে–ঘাটে টোল আর ফাইল নড়াতে টেবিলে–টেবিলে খরচ। অঙ্ক মেলে না।
মালিকের সামনে তখন তিন পথ: ইনক্রিমেন্ট আটকানো, ছাঁটাই, নয়তো বন্ধ। ঘুষ আর চাঁদা তাই শুধু নৈতিক সমস্যা নয়; এটা বেসরকারি কর্মীর বেতন থেকে সরাসরি কেটে নেওয়া টাকা।
প্রতিশ্রুতির বাকি অর্ধেক
১২ জুন বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে দুর্নীতি কমবে। ব্যবসায়ীরা একই কথা বলে আসছেন উল্টো দিক থেকে, আর অনেক আগে থেকে।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঠিক তিন বছর আগে, ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর, মজুরি আন্দোলনের মধ্যেই বিজিএমইএর জরুরি সভায় মালিকেরা বলেছিলেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা ঘুষ নেওয়া বন্ধ করলে তাঁরা শ্রমিকের বেতন বাড়াতে আগ্রহী। সেপ্টেম্বরে এনবিআর চেয়ারম্যান নিজেই ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছেন, কোনো কর্মকর্তাকে এক টাকাও ঘুষ দেবেন না। অনুরোধটা যে করতে হচ্ছে, সেটাই প্রমাণ।
প্রথম অর্ধেক পূরণ হয়েছে; অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে আগের তিন মাসের বর্ধিত অংশও যাচ্ছে। বাকি অর্ধেক, অর্থাৎ ঘুষ কতটা কমবে, কবে কমবে, তার কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই, মাপার ব্যবস্থাও নেই। বেতন বাড়ানোর আছে সময়সূচি, ধাপ আর বাজেট; ঘুষ কমানোর নেই কিছুই। এই ব্যয় মেটে জনগণের করে।
গত অর্থবছরে এনবিআরের আদায়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ এসেছে ভ্যাট আর শুল্ক থেকে, যা নিম্ন আয়ের শ্রমিকও নিত্যপণ্য কিনতে দেন। আয়করের ভিত আরও সরু: মার্চের শুরু পর্যন্ত জমা পড়া ৪০ লাখ রিটার্নের ২২ লাখই করযোগ্য সীমার নিচে; ১৭ কোটির দেশে করযোগ্য আয় দেখিয়েছেন ১৮ লাখের মতো মানুষ। আর ব্যবসা দেয় দুবার: একবার কর হিসেবে, আরেকবার ঘুষ হিসেবে।
রাষ্ট্রের কর্মচারীর ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সরকার সেই বেতন দিচ্ছে ধার করে, কারণ নিজের আয়েই কুলাচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ২৩ শতাংশ, লক্ষ্যের চেয়ে কম প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা; আগস্ট শেষে ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ এক বছরে বেড়েছে ৩৬ শতাংশ।
এই ধারের দায় শেষ পর্যন্ত বইতে হবে বেসরকারি খাতকেই: এ বছরের রাজস্ব লক্ষ্য গত বছরের আদায়ের চেয়ে ৪৫ শতাংশের বেশি, ঋণের বাজারে সরকারের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা, আর সরকারি বেতনের সঙ্গে তাল মেলানোর চাপ।
এর মধ্যে ব্যবসা নিজে বেতন বাড়ালে মুনাফা রাখাই প্রায় অসম্ভব, না বাড়ালে রাস্তা গরম হয়। সরকার ঢুকেছে এক চক্রব্যূহে; অভিমন্যুর মতো ঢোকার পথ জানা ছিল, বেরোনোর পথ কেউ জানে না। আর ঢোকার সময় সঙ্গে টেনে এনেছে পুরো দেশকে। সরকার যদি এটা সামলাতে না পারে, অন্য পক্ষ সুযোগ নেবেই।
একই গলির বাসাগুলোর মাঝের দেয়াল যত উঁচু হবে, রাস্তার উত্তাপ তত বাড়বে।
সুবাইল বিন আলম, প্রকৌশলী-অর্থনীতিবিদ, টেকসই উন্নয়নবিষয়ক কলামিস্ট।
ই–মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব