একবার চিন্তা করে দেখেন তো আপনার বাবাকে হত্যা, আপনার মাকে জেলে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা, আপনি এবং আপনার ভাই নির্বাসনে, আপনাকে পঙ্গু করে ফেলার চেষ্টা—সবকিছুতেই সহায়তাকারী হিসেবে সন্দেহভাজন, তার সঙ্গে সম্পর্ক আপনি কীভাবে দেখবেন? তবে হ্যাঁ! কেউ রাষ্ট্রের শপথ নেওয়ার পর অবশ্যই সব ব্যক্তিগত আবেগের বাইরে থাকতে হবে। তখন অবশ্যই রাষ্ট্রের নীতিতে কাজ করতে হবে। না হলে তা শপথ ভাঙার মতো অপরাধ হবে। বিস্তারিত বলার আগে ইতিহাসে যাই।
২০১০ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার ভারত সফর ঢাকায় বিশাল আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণাপত্রে এমন কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা সেই হাইপ বা উত্তেজনাকে যৌক্তিকতা দিত। ছিটমহল বিনিময় কার্যকর এবং তিস্তা চুক্তি না হওয়া ছিল উল্লেখযোগ্য। আমাদের বন্ধু জাফর সোবহান তখন বলেছিলেন, সবকিছুই যে সরকারি বিবৃতি থেকে বোঝা যায় না। দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যে ‘মনোভাবের পরিবর্তন’ ঘটেছে, কোনো লেখা তা ধারণ করতে পারবে না।
এর পরের দেড় দশকে ভারতের যে বাংলাদেশ-নীতি দেখা গেছে, প্রথমে হাসিনা সরকারের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদকে নিঃশর্ত সমর্থন, আর এখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি অনাস্থা। তা প্রমাণ করে জাফর ঠিকই বলেছিলেন। কোনো সরকারি বিবৃতিতে এই ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত ছিল না। কিন্তু স্পষ্টতই ভারত তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের সব ডিম হাসিনার ঝুড়িতেই রাখবে।
২০১০ থেকে ২০২৪— এই ১৪ বছরে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি বেড়েছে প্রায় চার গুণ। অর্থাৎ সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও লাভের পাল্লা এক পাশে ভারী। ২০১০ সালের দিল্লি সফর আসলে সরকারি নথিতে যা দেখা যায়, তার চেয়ে অনেক বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছিল।
কিন্তু ভারতীয় সেই নীতি ভয়াবহভাবে বুমেরাং হয়েছে। হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে; ভারতেই তাঁর উপস্থিতি এখন নয়াদিল্লির জন্য বড় পররাষ্ট্রনীতির বোঝা। আর বাংলাদেশে ভারত আজ পুরোপুরি নিঃসঙ্গ। যাদের একসময় বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে উচ্চাশা ছিল, তাঁদের অনেকেও নিয়মিতভাবে এবং যথার্থভাবে ভারতের সমালোচনা করেন হাসিনা শাসনকে সমর্থন দেওয়ার জন্য।
বাস্তবে, আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ঢাকার অভিজাত মহলে ভারতের বিরুদ্ধে এ রকম সর্বসম্মত মনোভাব আগে দেখা যায়নি। পিউ রিসার্চ এবং ওআরএফের সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতি সবচেয়ে নেতিবাচক মনোভাব বর্তমানে বাংলাদেশেই। আজ সর্বত্রই একটি ধারণা স্পষ্ট: নয়াদিল্লি বাংলাদেশের বন্ধু নয়।
এই ধারণাকে উপজীব্য করে বাংলাদেশের একটি পক্ষ বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলকে ভারতপন্থী তকমা দিয়ে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মতো অপাঙ্ক্তেয় করে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। বাস্তবতা কী?
এই দেশে কোনো রাজনৈতিক দল যারা বাস্তবমুখী রাজনীতি করতে চায়, কখনোই সরাসরি অন্য দেশকে নিয়ে বলতে পারবে না। যেমন জামায়াতে ইসলামীও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য বৈঠকে বসে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অক্টোবরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কী বলেছেন? তিনি বলেছেন: ‘সবার আগে বাংলাদেশ। আমি আগে আমার দেশের মানুষের স্বার্থ দেখব, আমার দেশের স্বার্থ দেখব।’ ভারতসহ যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা চাওয়ার কথা বলেন এবং সীমান্তে হত্যা (যেমন ফেলানী হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ করে) মেনে নেবেন না।
তাঁর বক্তব্য, ‘ভারত যদি স্বৈরাচারকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিরাগভাজন হয়, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের সঙ্গে শীতল থাকবে, আমাকে মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে একে বলা হয় ‘শীতল শান্তি’, যেখানে যুদ্ধ নেই, কূটনৈতিক ও ওয়ার্কিং সম্পর্ক থাকবে; কিন্তু পারস্পরিক আস্থা নেই। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন ঠিক সেই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে।
বাংলাদেশ খুব স্পষ্টভাবে ভারতকে জানিয়ে দেবে যে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় থাকবে (শান্তি), কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারণী মহলের মৌলিক পরিবর্তন না ঘটা পর্যন্ত গভীর কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক অগ্রগতি হবে না (শীতল)। বাস্তবে এর মানে হচ্ছে যে যৌথ কমিটি, ওয়ার্কিং গ্রুপ, আমলাতান্ত্রিক বৈঠক এসব চলবে; কিন্তু কোনো বড় সম্মেলন, ‘হাইপ-ওয়ালা’ চুক্তি বা নতুন উদ্যোগ নয়।
এখন শীতল শান্তির বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করার আগে দুটি বইয়ের প্রসঙ্গ আসছে।
রামচন্দ্র গুহ ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাস লেখক। তাঁর ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী আধুনিক ভারতের সেরা গ্রন্থগুলোর একটি। বইটি ভারতীয় অভিজাত মহলের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে একটি অদ্ভুত সত্যও উদ্ঘাটন করে, তারা কোন প্রতিবেশীকে কতটা গুরুত্ব দেয়। প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার বইয়ে বাংলাদেশ আছে ১৫টি পৃষ্ঠায়, যার চারটি ১৯৭১ নিয়ে। বিপরীতে পাকিস্তান নিয়ে এন্ট্রি আছে ২০০টির মতো। এ বইয়ের সূচিতে ভুট্টো আছে ৮ পৃষ্ঠায়, জিয়াউল হক ১টিতে, মুজিব ৪টিতে, কিন্তু তার উত্তরসূরিদের একবারও উল্লেখ নেই।
পদ্মা (গঙ্গা) পানিচুক্তির মেয়াদ শেষের দিকে, এদিকে খুব সময় নাই। বিএনপি পরিষ্কারভাবে পানি নিয়ে নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করেছে। তারা ভারতের বাধার জন্য যে দুটি প্রজেক্ট বিগত সময়ে বাস্তবায়ন করতে পারা যায়নি, তা করার ঘোষণা দিয়েছে—তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা বা গঙ্গা ব্যারাজ। যা এখনো কোনো দলই বলতে পারে নাই।
ডেভিড মালোনের ডাজ দ্য এলিফ্যান্ট ড্যান্স ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার বই, যেখানে বাংলাদেশ মাত্র ২০টির মতো পৃষ্ঠা পেয়েছে—আফগানিস্তানের চেয়ে সামান্য বেশি।
এসবই দেখায়—বাংলাদেশ ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে কোনো দিনই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এবং তাই ব্যাখ্যা পাওয়া যায়—কেন জুলাই বিপ্লব তাদের জন্য ছিল বিস্ময়কর। ভারত বাংলাদেশকে মূলত নিরাপত্তার চশমায় দেখে।
২০০০-এর দশকে ভারতের নিরাপত্তা মহলে বিশ্বাস জন্মে যে বাংলাদেশ হয় ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তাবিরোধী শক্তিগুলোর মদদদাতা, নয়তো তাদের নীরব আশ্রয়দাতা। ২০০৯-এর পর হাসিনা সরকার এলে তারা তাই আশ্বস্ত হয়।
তাই বলা যায়, আমাদের সম্পর্ক মোটাদাগে পাঁচটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে।
নিরাপত্তা
সত্তরের দশকে ভারত দুটি সশস্ত্র বিদ্রোহকে প্রশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। পাহাড়ে শান্তিবাহিনীর বিষয়টি ছিল প্রকৃত অভিযোগ ও বৈষম্য থেকে উৎসারিত, তবে ১৯৭৫-পরবর্তী কাদের সিদ্দিকীর ‘প্রতিরোধ’ ব্যর্থ হয়ে যায়। ভারত নতুন করে এমন ভুল না করলে ‘কাউকে’ আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের কোনো লাভ নেই বরং অতীতে এসবই আমাদের জন্য অভিশাপ ছিল।
অতএব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শীতল শান্তির নীতি হবে এই বার্তা দেওয়া:
ভারত যদি বাংলাদেশবিরোধী সশস্ত্র খেলায় না নামে, বাংলাদেশও ভারতবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতা উঠতে দেবে না। ভারত আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও যেন হস্তক্ষেপ না করে।
আজকের সবচেয়ে বড় বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের নায়ক অবশ্য শেখ হাসিনা নিজেই। তিনি হয়তো ভারতের কোনো নির্জন বাংলোয় জীবনের বাকি সময় কাটাবেন। আর বিভিন্নভাবে বাংলাদেশকে উসকিয়ে নেতা-কর্মীদের জীবন হুমকির মধ্যে ফেলবেন। কিন্তু হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী যারা ভারতে পালিয়ে আছে, তাদের কী হবে?
শহীদ ওসমান বিন হাদি হত্যার ঘটনায় সম্ভাব্য খুনির অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন বুঝিয়ে দেয়, তারা এখনো দেশের অস্থিরতা তৈরিতে সক্রিয়। ভারত যদি আমাদের মধ্যকার অপরাধী বিনিময় চুক্তি পালন না করে এই ব্যাপারে আমাদের আন্তর্জাতিক সাহায্য চাওয়া লাগতে পারে। এ ব্যাপারে কিন্তু বিএনপিও পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে।
পানির অধিকার
ভারত যেহেতু উজানে, তারা বছরের পর বছর ধরে একতরফা পানি প্রত্যাহার করছে। আমাদের প্রয়োজন বহুমাত্রিক কৌশল। বাংলাদেশে ৫৪টি অভিন্ন নদী। কার্যকর চুক্তি মাত্র ১টি (গঙ্গা, ১৯৯৬)। এদিকে তিস্তার জন্য দরকার ৫,০০০ কিউসেক পানি; কিন্তু পায় ১,০০০ কিউসেকেরও কম।
প্রথম কাজ আমাদের জাতিসংঘের আন্তদেশীয় পানি কনভেনশন ১৯৯৭ বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ এ কনভেনশনের পক্ষে ভোট দিলেও এতে স্বাক্ষর করেনি। এটি করতে পারলে আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানির দাবি পেশ করতে পারব। অভিন্ন পানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরেকটি কনভেনশন ইউএন পানি কনভেনশন ১৯৯২-এ বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। যদিও ভারত কোনো কনভেনশনেই স্বাক্ষর করেনি। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাবি তোলার পাশাপাশি যৌথ নদী কমিশন উপযুক্ত মানুষ দিয়ে গঠন করে আলোচনা শুরু করতে হবে।
পদ্মা (গঙ্গা) পানিচুক্তির মেয়াদ শেষের দিকে, এদিকে খুব সময় নাই। বিএনপি পরিষ্কারভাবে পানি নিয়ে নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করেছে। তারা ভারতের বাধার জন্য যে দুটি প্রজেক্ট বিগত সময়ে বাস্তবায়ন করতে পারা যায়নি, তা করার ঘোষণা দিয়েছে—তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা বা গঙ্গা ব্যারাজ। যা এখনো কোনো দলই বলতে পারে নাই।
সীমান্ত হত্যা
ভারত এই সীমান্তে হত্যার মাধ্যমে জেনেভা কনভেনশন ভঙ্গ করেই চলেছে। ২০০১-২০২৩ সালে সীমান্তে বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন ১২০০ এর বেশি। এটা বিশ্বের একমাত্র সীমান্ত, যেখানে ‘শুট টু কিল’ নিয়ম কার্যত প্রয়োগ হয়।
বিএনপি এই ব্যাপারেও অবস্থান নিয়েছে। তাদের জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে সীমান্তে নন-লিথাল অস্ত্র বহনের দিকে চাপ প্রয়োগ করা। যদি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান না হয়, আন্তর্জাতিক চুক্তি যে ভঙ্গ হচ্ছে, সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সমস্যা তোলা লাগতে পারে।
অর্থনীতি
বাংলাদেশের রপ্তানিতে ভারতের অংশ মাত্র ২-৩ শতাংশ। কিন্তু ভিয়েতনাম-ভারত বাণিজ্যে ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশ থেকে প্রায় দ্বিগুণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যঘাটতি ৯ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সমস্যা ভূগোল নয়, নীতির। দুই দশক আগে উদারপন্থী অর্থনীতিবিদেরা ভারত-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংহতির স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু বাস্তবে সংখ্যা কখনোই খুব শক্তিশালী ছিল না। গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বলে ভারতের সঙ্গে বড় কোনো অর্থনৈতিক অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
গত দেড় দশকে ভারতকে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেওয়া হলেও, বিনিময়ে বাংলাদেশ নেপাল বা ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য যে ‘মোবিলিটি’ বা করিডর চেয়েছিল, তা ভারত কার্যকরভাবে দেয়নি। এই বৈষম্যটি ‘শীতল শান্তি’র যৌক্তিকতা আরও বাড়িয়ে দেয় ।
বাংলাদেশের প্রধান ভারতীয় আমদানি:
• তুলা
• খাদ্যপণ্য
• চিকিৎসা ও শিক্ষা-পর্যটন
এসবের উৎস বৈচিত্র্য করা প্রয়োজন। নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবা উন্নতি করা, শিক্ষা-পর্যটনের বিকল্প তৈরি করা। এগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব নীতিগত লক্ষ্যই হওয়া উচিত।
আমরা এই জিনিস ভুলে গিয়ে একে আর একজনকে ভারতপন্থী বলে ট্যাগের মাধ্যমে বিভাজনের রাজনীতিই করে যাচ্ছি। কিন্তু যারা বলছে তারা এখনো কোনো পলিসি দেখাতে পারছে না, উপরন্তু ভাঙচুর এবং মবের মাধ্যমে সারা দেশ অস্থিতিশীল করছে। তাদের এই বিভাজনের রাজনীতি ফ্যাসিস্ট লীগের অনুরূপ এবং তা ভারত এবং লীগকেই শক্তিশালী করবে। ভারত এই দেশে পতিত লীগ ছাড়া আর কাউকেই বিশ্বাস করবে না, এই জিনিস যত আগে মেনে নিতে পারেন ততই ভালো।
বিএনপির ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমি এবং ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের ওয়াদা যদি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়, সেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতই। কারণ, নিজেরা যত আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হব, ততই নিজেদের চাহিদা নিজেরা মেটাতে পারব এবং ফলে বাণিজ্যঘাটতি কমতে থাকবে। আর এক কোটি মানুষের চাকরি নিশ্চিত করতে হলে এমন অনেক খাত আছে, যেখানে বিদেশি লাগে না (প্রোডাকশন ম্যানেজার পোস্টেও ভারতীয় আছে) সেগুলাতে দেশি নিয়োগ হবে।
ভারত বাংলাদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাওয়ার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি (প্রায়ই চতুর্থ বা পঞ্চম অবস্থানে থাকে)। অথচ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য ভারতীয় ভিসা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এই রেমিট্যান্স বহির্গমন কমানো এবং দেশীয় জনশক্তিকে উচ্চপদস্থ স্তরে দক্ষ করে তোলা বিএনপির ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ ইকোনমি ভিশনের বড় অংশ হতে পারে।
অন্যান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়
অবশ্যই হাসিনা আমলের সব চুক্তি পুনঃআলোচনা করা উচিত। কারণ, সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল একতরফা এবং বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। ভারতীয় কোম্পানি আদানির কাছ থেকে চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি এবং সম্প্রতি পাওনা বকেয়া নিয়ে তাদের যে চাপ, তা বাংলাদেশের জ্বালানিনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এটি প্রমাণ করে যে কৌশলগত অনেক চুক্তিই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।
সাফটা চুক্তি অনুসারে ভারতের চ্যানেল বাংলাদেশে চললেও ভারতে বাংলাদেশের চ্যানেল চলে না। যারা ভারতীয় আধিপত্য নিয়ে চিন্তিত, তারা কখনোই এভাবে যে সাংস্কৃতিক বিস্তার ঘটছে, কখনোই তোলে না। এদিকে ভারতেও আমাদের চ্যানেল না চলাতে, তারা আমাদের সামাজিক অবস্থা বুঝতেও পারে না। ফলে অনেক জিনিসের তারা বাস্তবতা না বুঝে বা গুজব শুনে প্রতিক্রিয়ামূলক আচরণ করে।
এখানে উল্লেখ্য যে আমাদের দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে তারা সব সময় উদ্বেগ দেখালেও, ভারতের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে আমরা চুপ থাকি—এটা আসলে তাদের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
এখানে আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ্য যে পশ্চিম বাংলার পত্রিকাগুলো, বিএনপি নিয়ে বিভিন্ন অজানা সূত্রের দোহাই দিয়ে লেখা লিখছে, যা দেশে বিপক্ষ শক্তিকে উসকে বাংলাদেশকে উগ্রবাদী হিসেবে দেখানোর একটা প্রচেষ্টা। এই ব্যাপারে শেরেবাংলার একটা বিখ্যাত যুক্তি মনে করা যেতে পারে। বিএনপি তাদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে ভারতের রেড ফ্ল্যাগ থাকা বেশ কয়েকজনকে নিয়োগ দিয়েছে। তারেক রহমান দেশে এসে তাঁর প্রথম ভাষণ, ওসমান হাদি এবং পিলখানার শহীদদের কবর জিয়ারতও অনেক ইঙ্গিতবাহী।
জার্মান চ্যান্সেলর বিসমার্কের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে—বিশ্বে কোনো দেশই একটা দেশের চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র না, তারা একে ওপরের সঙ্গে পরস্পর স্বার্থ নিয়ে সংযুক্ত থাকে।
আমরা এই জিনিস ভুলে গিয়ে একে আর একজনকে ভারতপন্থী বলে ট্যাগের মাধ্যমে বিভাজনের রাজনীতিই করে যাচ্ছি। কিন্তু যারা বলছে তারা এখনো কোনো পলিসি দেখাতে পারছে না, উপরন্তু ভাঙচুর এবং মবের মাধ্যমে সারা দেশ অস্থিতিশীল করছে। তাদের এই বিভাজনের রাজনীতি ফ্যাসিস্ট লীগের অনুরূপ এবং তা ভারত এবং লীগকেই শক্তিশালী করবে। ভারত এই দেশে পতিত লীগ ছাড়া আর কাউকেই বিশ্বাস করবে না, এই জিনিস যত আগে মেনে নিতে পারেন ততই ভালো।
ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দোহাই দিয়ে সার্ককে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে। বিএনপি যদি ‘লুক ইস্ট’ বা পূর্বমুখী নীতির পাশাপাশি সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলে, এবং পশ্চিমের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে, তা একক আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করতে পারে। সীমান্তে অশান্তি থাকা কোনো দেশের জন্যই ভালো হবে না।
জ্যোতি রহমান অর্থনীতিবিদ, সদস্য বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক
সুবাইল বিন আলম সদস্য, সেন্টার ফর সায়েন্স টেক পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি
*মতামত লেখকদ্বয়ের নিজস্ব