নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: কেমন হতে পারে তাঁর প্রেসিডেন্সি

সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শ্রদ্ধা নিবেদন। গতকাল শনিবার সকালেছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল

যেমন আশা করা হয়েছিল, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বিস্ময়ের কিছু ছিল না, কেউ আশ্চর্যও হননি। নির্বাচনের পর থেকেই বারবার তাঁর নাম উঠে আসছিল বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি হিসেবে।

আমাদের দেশে যেহেতু দলের বাইরে বিশিষ্ট কাউকে রাষ্ট্রপতি করার প্রচলন প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাই বিএনপি দলেরই কেউ রাষ্ট্রপতি হবেন, সেটা ছিল সবার জানা।

বিএনপির বাইরেও বিপুল জনগণের কাছে মির্জা ফখরুল ইসলামকে একজন সজ্জন ও সম্মানীত ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট পদের সব কাজই খুব আনুষ্ঠানিক ও রুটিনমাফিক চলে, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ও সংকটকালে রাষ্ট্রপতিকে অনেক বড় দায়িত্ব নিতে হয় এবং দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে সংকট সামাল দিতে হয়।

বাংলাদেশে আমরা অনেকবার এ পরিস্থিতি দেখেছি। আমরা আশা করব, মির্জা ফখরুল ইসলামকে তাঁর দায়িত্বকালীন অবস্থায় তেমন কোনো সংকট মোকাবিলা করতে হবে না, দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে এবং তিনি নির্বিঘ্নে রুটিনমাফিক কাজের মাধ্যমে তাঁর কার্যকাল সম্পন্ন করতে পারবেন।

আরও পড়ুন

প্রশ্ন আসতে পারে, রাষ্ট্রপতির রুটিন দায়িত্ব কী? আমরা বিগত দিনে যা দেখেছি, তার ভিত্তিতে কিছুটা অনুমান করতে পারি। প্রতিবছর অন্তত একবার এবং নতুন সংসদ নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেবেন। অবশ্য এই ভাষণ তাঁকে সরকারের দপ্তর থেকে লিখে দেওয়া হবে, তিনি শুধু কষ্ট করে পড়বেন।

কোনো নতুন বিদেশি রাষ্ট্রদূত নিয়োগ পেলে, তাঁকে প্রেসিডেন্টের কাছে তাঁর পরিচয়পত্র পেশ করতে হয়। রাষ্ট্রপতিকে বাধ্যতামূলকভাবে এই পরিচয় গ্রহণ করতে হয়, নাকচ করার কোনো উপায় নেই।

বিভিন্ন জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব বেড়ে যায়, তাঁকে শহীদ মিনার বা জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে ফুলের তোড়া দিতে হয়। তা ছাড়া জাতীয় দিবসগুলোতে রাষ্ট্রপতিকে বাণী প্রচার করতে হয়। রাষ্ট্রপতি মাঝেমধ্যে বিদেশভ্রমণেরও সুযোগ পান, বিশেষত যখন কোনো বিদেশি সরকারপ্রধান মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য।

তা ছাড়া বাংলাদেশে একটা নিয়ম হয়ে গেছে, রাষ্ট্রপতি প্রতি ছয় মাস বা এক বছর পর পর চিকিৎসা করতে বিদেশে যাবেন। আওয়ামী লীগ আমলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বিরাটসংখ্যক লোকের লটবহর নিয়ে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। মির্জা ফখরুলের বিদেশসঙ্গী কতজন হবেন, তা পর্যবেক্ষকেরা নিশ্চয় লক্ষ রাখবেন।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম বড় প্রটোকলের মানুষ নন। অহংবোধ বা ইগো দেখানোর লোকও তিনি নন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি সরকার ও দলের নেতাদের সঙ্গে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখবেন, সেটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিএনপিতে তাঁর শুভার্থীর সংখ্যাও কম নয়। তিনি নিশ্চয়ই রাষ্ট্রপতি পদের গুরুত্ব মেনে এ পদের প্রটোকলও বজায় রাখবেন।

প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান যখন বিদেশ সফর করে আসেন, তখন তাঁকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিদেশ সফরের ফলাফল জানাতে হয়। তবে জুলাই–পরবর্তীকালে নানা কারণে এ প্রটোকলের বিঘ্ন ঘটেছে। আশা করা যায়, সেই সৌজন্য আবার ফিরে আসবে।

তবে রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো, সংসদ যেসব বিল পাস করবে, রাষ্ট্রপতিকে সেগুলোতে সম্মতি দিয়ে স্বাক্ষর দিতে হয়। অবশ্য বাংলাদেশের সংবিধানের ৮০ ধারা মতে সংসদে গৃহীত একটা বিল রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর না করে সংসদে পুনর্বিবেচনার জন্যও পাঠাতে পারেন। তবে বাংলাদেশে সাধারণত কোনো রাষ্ট্রপতিই সেই ঝুঁকি নেন না। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম কি সে ধরনের কোনো ঝুঁকি নেবেন, কোনো বিল তাঁর অপছন্দ হলে তিনি কি তাতে অসম্মতি জানিয়ে ফেরত পাঠাবেন? এমন সম্ভাবনা খুব কম, তবে একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে
ছবি: রয়টার্স

নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম বিএনপির মহাসচিব হিসেবে অনেক গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। সুতরাং রাষ্ট্রপতির রুটিন কাজগুলো সামলানো তাঁর জন্য কঠিন কিছু হবে না। আল্লাহ না করুক, দেশের কোনো রকম দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় কোনো সংকট সামাল দিতে হলে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে তা দক্ষতার সঙ্গে পারবেন, জাতি তাঁর ওপর সে আস্থা রাখতেই পারে।

তবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন যত নিষ্কণ্টক মনে করা হয়, তত নিষ্কণ্টক নয়।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সাধারণত সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁর আস্তে আস্তে দূরত্ব তৈরি হয়। রাষ্ট্রপতি প্রকৃতপক্ষে বঙ্গভবনে বন্দী থাকেন। রাজনীতির গতিপ্রকৃতি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ তাঁর থাকে না। রাষ্ট্রপতিকে কতগুলো প্রটোকল মেনে চলতে হয়। তাই তিনি কোনো দলীয় বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। তিনি দল থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। সরকারপ্রধানের সঙ্গেও তাঁর যোগযোগ সীমিত ও আনুষ্ঠানিক হয়ে পড়ে। এসব থেকে অনেক সময় ভুল–বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

বিএনপির আরেকজন মহাসচিব রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপতি পদে পূর্ণ মেয়াদ থাকতে পারেননি, তার আগেই তাঁকে বিদায় নিতে হয়েছিল। বদরুদ্দোজা চৌধুরীর রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অসহায়ভাবে অপসারণের উদাহরণ থেকে ধারণা করা যেতে পারে, বঙ্গভবনে গিয়ে একজন রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিকভাবে কতটা অসহায় হয়ে পড়েন।

বিএনপির আরেকজন রাষ্ট্রপতিকে যথেষ্ট বিড়ম্বনা সইতে হয়েছিল। ওয়ান–ইলেভেনের সময় দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ। জেনারেল মঈন ক্ষমতা দখলের পর তাঁকে সেনাবাহিনীর কথা অনুসারে চলতে হয়েছিল। এ জন্য তিনি দারুণভাবে বিএনপির বিরাগভাজন হয়েছিলেন। ২০০৯ সালে পদত্যাগ করার পর তাঁকে নিভৃতেই অবসরজীবন কাটাতে হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম বড় প্রটোকলের মানুষ নন। অহংবোধ বা ইগো দেখানোর লোকও তিনি নন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি সরকার ও দলের নেতাদের সঙ্গে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখবেন, সেটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিএনপিতে তাঁর শুভার্থীর সংখ্যাও কম নয়। তিনি নিশ্চয়ই রাষ্ট্রপতি পদের গুরুত্ব মেনে এ পদের প্রটোকলও বজায় রাখবেন।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পরামর্শ ও তথ্য পাওয়ার এবং তাঁকে সতর্ক করার সাংবিধানিক অধিকার রাষ্ট্রপতির রয়েছে। তবে তা হতে হবে একান্ত ব্যক্তিগতভাবে। মির্জা ফখরুল রাজনীতির লোক। তিনি কি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাজনৈতিক বিষয়ে পরামর্শ দেবেন? সেটা একান্তই তাঁদের দুজনের ব্যাপার। সাধারণ জনগণের কৌতূহল থাকলেও এসব আলোচনা সম্ভবত কখনো উন্মুক্ত করা হবে না।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির কার্যবিধি ও ক্ষমতা খুবই সীমিত এবং দারুণভাবে আনুষ্ঠানিক পরিসরে আবদ্ধ। তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম বঙ্গভবনে যাওয়াতে আমরা দেশের নীতিনির্ধারণ বা শাসনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন দেখব না।

তবে জুলাই–পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে যে একটা জটলা ও অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়েছিল, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে তার অবসান হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

আমরা নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাফল্য কামনা করছি।

  • সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মতামত লেখকের নিজস্ব