২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। এ নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নয়। প্রশ্নটি হলো, একজন সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে তাঁর আসন কি শূন্য হবে?
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে। তিনি আরও বলেছেন, দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সদস্যপদ বাতিল হবে। তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তবে এটি কি সাংবিধানিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত? নির্বাচন কমিশনও তাঁর বক্তব্য সমর্থন করে কোনো আইনি সিদ্ধান্ত দেয়নি। বরং ইসি সচিব আখতার আহমেদ বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক প্রশ্ন’ বলেছেন। তিনি এ নিয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গেছেন। (‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বাইরে ভোট দিলে কী হবে?’, ঢাকা ট্রিবিউন, ১১ আগস্ট ২০২৬)।
তাই শুরুতেই দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে। চিফ হুইপের ব্যাখ্যা এক বিষয়। সংবিধানের নিশ্চিত অর্থ আরেক বিষয়।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ভাষা সংক্ষিপ্ত। এতে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের কথা বলা হয়েছে। তাঁর আসন দুটি ক্ষেত্রে শূন্য হবে। প্রথমটি হলো দল থেকে পদত্যাগ। দ্বিতীয়টি হলো ‘সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান’।
এখানে বহুল প্রচারিত একটি ভুল সংশোধন জরুরি। এই অনুচ্ছেদে ‘সংসদে আনীত কোনো প্রস্তাবের ওপর’ কথাটি নেই। তাই শুধু একটি যুক্তি দিয়ে ৭০ অনুচ্ছেদকে অপ্রযোজ্য বলা যাবে কিনা সেই প্রশ্ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তিটি হলো, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কোনো বিল বা প্রস্তাব নয়।
আসল প্রশ্নটি আরও সূক্ষ্ম। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের একটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে দেওয়া ভোট কি ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে ‘সংসদে’ভোটদান?
অনুচ্ছেদ ৪৮ (১) বলছে, রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। সেই আইন হলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১। আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচন সংসদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। তবে কক্ষটি ব্যবহৃত হলেই বৈঠকটি সংসদের নিয়মিত অধিবেশন হয়ে যায় না।
সংসদ অধিবেশনে না থাকলেও এই নির্বাচন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করতে পারে। সেখানে স্পিকার সভাপতিত্ব করেন না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তা হিসেবে সভাপতিত্ব করেন।
২০ আগস্টের ভোটও সংসদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যবর্তী সময়ে হবে। এটি হবে একটি পৃথক বৈঠক। এই কাঠামোই ৭০ অনুচ্ছেদ অপ্রযোজ্য হওয়ার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি। এটি সংসদের আইন প্রণয়ন বা সাধারণ কার্যধারা নয়। এটি নির্বাচন কমিশন পরিচালিত একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক নির্বাচন।
সাংবিধানিক ইতিহাসেও এই যুক্তির সমর্থন পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ ছিল। আবার দ্বিতীয় তফসিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালটের ব্যবস্থাও ছিল। ভোটারকে শনাক্ত করা যায়, এমন চিহ্ন থাকলে ব্যালট বাতিল হওয়ার বিধানও ছিল। অর্থাৎ সংবিধানপ্রণেতারা একই সঙ্গে দুটি বিষয় গ্রহণ করেছিলেন। একটি ছিল দলত্যাগবিরোধী বিধান। অন্যটি ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের গোপন পছন্দ। এ থেকে অন্তত একটি বিষয় বোঝা যায়। ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রতিটি ভোট নিয়ন্ত্রণ করে, এমন ব্যাখ্যা অনিবার্য নয়।
১৯৯১ সালের আইনে গোপন ব্যালটের বদলে প্রকাশ্য ভোট চালু করা হয়। ব্যালটের কাউন্টারফয়েলে সদস্যের নাম থাকে। সেখানে তাঁর বিভক্তি নম্বর ও স্বাক্ষরও থাকে। প্রার্থীর নামের বিপরীতেও ভোটারকে পূর্ণ নামে স্বাক্ষর করতে হয়। প্রকাশ্য ভোট রাজনৈতিক নজরদারি সম্ভব করে। তবে এটি নিজে ৭০ অনুচ্ছেদের পরিধি বাড়ায় না। সাধারণ আইন দিয়ে সংবিধানের শাস্তির ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা যায় না।
তবে বিপরীত ব্যাখ্যাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। ৭০ অনুচ্ছেদে ‘সংসদের কোনো অধিবেশনে’ বলা হয়নি। ‘কোনো বিলের ওপর’ কথাটিও বলা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সংসদে’ দলের বিপক্ষে ভোট। রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করেন সংসদ সদস্যরা। ভোট হয় সংসদ কক্ষে। ভোটটিও প্রকাশ্য। এই ভাষার সঙ্গে ৭০ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য মিলিয়ে একটি যুক্তি দেওয়া যায়। উদ্দেশ্যটি হলো, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা। এই ভিত্তিতে কেউ বলতে পারেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও বিধানটি প্রযোজ্য হবে। কয়েকজন সংবিধান বিশেষজ্ঞও এমন মত দিয়েছেন।
তাই সৎ আইনি উত্তরটি ‘অবশ্যই প্রযোজ্য’ নয়। আবার ‘কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়’ বলাও ঠিক হবে না। এ বিষয়ে সরাসরি ও বাধ্যতামূলক বিচারিক নজির নেই। ফলে একটি বাস্তব সাংবিধানিক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
আরও একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সদস্য দলীয় প্রার্থীর বাইরে ভোট দিলে তাঁর ভোট বাতিল হবে—এমন কোনো বিধান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে নেই। বৈধভাবে দেওয়া ব্যালট নির্বাচন কমিশন গণনা করবে। ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি ওই সদস্যের সংসদীয় আসনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ এ বিষয়ে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে। এই অনুচ্ছেদ সদস্যপদের অযোগ্যতা ও আসন শূন্য হওয়ার প্রক্রিয়া ঠিক করে। ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে কোনো আসন শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে বিরোধ দেখা দিতে পারে। সে বিরোধ নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হয়। তাই চিফ হুইপের ঘোষণামাত্রই কোনো আসন শূন্য হয়ে যায় না। আগে সাংবিধানিক প্রশ্নটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করতে হবে।
এই প্রক্রিয়ায় আরও দুটি প্রশ্ন উঠবে। প্রথম প্রশ্নটি দলীয় নির্দেশ নিয়ে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল কি নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ দিয়েছিল? দ্বিতীয় প্রশ্নটি ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা নিয়ে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের স্বতন্ত্র বৈঠকে সেই নির্দেশ অমান্য করা হলে, সেটি কি ‘সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট’ হিসেবে গণ্য হবে?
প্রকাশ্য ও স্বাক্ষরযুক্ত ব্যালট প্রথম প্রশ্নের প্রমাণ সহজ করতে পারে। কিন্তু এটি দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয় না। দ্বিতীয় প্রশ্নটি খাঁটি সাংবিধানিক ব্যাখ্যার বিষয়। তাই প্রকাশ্য ব্যালটকে সদস্যপদ হারানোর স্বয়ংসম্পূর্ণ আইনি ভিত্তি ভাবা ঠিক হবে না। ব্যালট ভোটদাতাকে শনাক্ত করে। কিন্তু ব্যালট তাঁর ভোটের সাংবিধানিক পরিণতি নির্ধারণ করে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য—এ দাবি বিতর্কমুক্ত নয়। নির্বাচনটি সংসদ কক্ষে হয় ঠিকই তবে এটি নির্বাচন কমিশন পরিচালিত একটি পৃথক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। তাই ৭০ অনুচ্ছেদ অপ্রযোজ্য হওয়ার পক্ষে শক্তিশালী ব্যাখ্যা রয়েছে। একই সঙ্গে বিপরীত ব্যাখ্যাও সম্ভব। এর কারণ অনুচ্ছেদটির ভাষা। চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দরকার। প্রয়োজন হলে উচ্চতর বিচারিক ব্যাখ্যাও দরকার।
এই বিতর্কে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দিকটিও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বিএনপির ৩১ দফার ৬ নম্বর প্রস্তাবে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত দেওয়ার সুযোগ তৈরির কথা ছিল। তবে চারটি বিষয় এর বাইরে রাখা হয়েছিল। সেগুলো হলো আস্থাভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিষয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার আরও স্পষ্ট। সংবিধান সংস্কার অংশের ১১ নম্বর দফায় ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ওই চার ক্ষেত্র ছাড়া সব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত ও ভোট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিএনপির ইশতেহারবিষয়ক প্রকাশিত বিবরণেও একই কথা আছে।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব ছিল আরও সংকীর্ণ। সেখানে শুধু অর্থবিল ও আস্থাভোটে দলীয় আনুগত্যের কথা বলা হয়েছিল। অন্য বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। বিএনপি সেখানে ভিন্নমত দিয়েছিল। দলটি সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তাকেও ব্যতিক্রমের তালিকায় রাখতে চেয়েছিল। তবে উভয় অবস্থানেই একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার স্পষ্ট। সেটি হলো, বর্তমান ৭০ অনুচ্ছেদের পরিধি সংকুচিত করা।
এখানেই সরকারের রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন আসে। সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু বিগত দুটি অধিবেশনে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব আনা হয়নি। এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে। এই সময়ে বর্তমান বিস্তৃত বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগের কথা বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিধানটি সংকুচিত করার অঙ্গীকারও করা হচ্ছে। এখানে একটি স্পষ্ট নীতিগত অসংগতি লক্ষণীয়। আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সংবিধানই চলবে। এ কথা সত্য। তবে সংবিধানের বিতর্কিত পরিধিকে রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়ে চূড়ান্ত করার সুযোগ আছে কি?
সংস্কারের ক্ষেত্রেও অর্ধেক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। শুধু ৭০ অনুচ্ছেদে ব্যতিক্রম যুক্ত করলেই হবে না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনেও দুটি বিষয় স্পষ্ট করতে হবে। প্রথমটি হলো দলীয় নির্দেশ। রাজনৈতিক দল কি তার সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিতে পারবে? দ্বিতীয়টি হলো ভোটের গোপনীয়তা। কোন সংসদ সদস্য কাকে ভোট দিয়েছেন, সেই তথ্য কি গোপন রাখা হবে? এসব বিষয় স্পষ্ট না হলে সাংবিধানিক স্বাধীনতা কাগজে-কলমে থাকবে। কিন্তু স্বাক্ষরযুক্ত প্রকাশ্য ব্যালটের কারণে রাজনৈতিক চাপ ও প্রতিশোধের আশঙ্কা বহাল থাকবে। রাষ্ট্রপতি পুরো রাষ্ট্রের প্রতীক। তিনি যেহেতু শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রতিনিধি নন, তাই তাঁর নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের বিবেকভিত্তিক ও গোপন ভোটের ব্যবস্থা থাকা অধিক যুক্তিসংগত।
দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য—এ দাবি বিতর্কমুক্ত নয়। নির্বাচনটি সংসদ কক্ষে হয় ঠিকই তবে এটি নির্বাচন কমিশন পরিচালিত একটি পৃথক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। তাই ৭০ অনুচ্ছেদ অপ্রযোজ্য হওয়ার পক্ষে শক্তিশালী ব্যাখ্যা রয়েছে। একই সঙ্গে বিপরীত ব্যাখ্যাও সম্ভব। এর কারণ অনুচ্ছেদটির ভাষা। চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দরকার। প্রয়োজন হলে উচ্চতর বিচারিক ব্যাখ্যাও দরকার।
এই অনিশ্চয়তা দূর করার ক্ষেত্রে দুটি পথ অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রথমটি হলো ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন। দ্বিতীয়টি হলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সত্যিকারের স্বাধীন ও গোপন ভোটে ফিরিয়ে আনা। আমি মনে করি এটাই গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিকভাবে সংগত সমাধান।
মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
*মতামত লেখকের নিজস্ব
