ভেনেজুয়েলার দুই ‘সাবেক’ নেতা প্রয়াত হুগো চাভেজ এবং তাঁর উত্তরসূরি নিকোলা মাদুরোকে অনেক দিক থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের কিছু পরিচিত চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তুলনা করা যায় সাদ্দাম হোসেন, আয়াতুল্লাহ খোমেনি কিংবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সঙ্গে। তাঁরা সবাই ছিলেন বক্তৃতা, জনতুষ্টির স্লোগান ও অর্জনহীন শাসনের জন্য পরিচিত।
জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে নিয়ে চাভেজের সেই বিখ্যাত মন্তব্য কেই–বা ভুলতে পারে! তিনি বলেছিলেন, গতকাল এখানে শয়তান এসেছিল এবং আজও গন্ধটা সালফারের মতো রয়ে গেছে। অন্যদের মতো তিনিও অবাস্তব লড়াইয়ে নেমেছিলেন। বাস্তবে তাঁর শাসনকাল কেটেছে অবরুদ্ধ অবস্থায় এবং শেষ পর্যন্ত পরাজয়ই ছিল তাঁর পরিণতি।
বাক্পটু চাভেজের পর এলেন মাদুরো। একজন সাধারণ মানুষ। পেশায় ছিলেন বাসচালক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। তিনি পূর্বসূরির পথেই হাঁটলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিদ্রূপ করাই তাঁর প্রিয় বিষয় হয়ে উঠল।
কিন্তু হোয়াইট হাউসে বসা নতুন শাসকের চরিত্র মাদুরো বুঝতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ধরতে পারবেন না। আলোচনার পথে না গিয়ে তিনি নিজেকে প্রাসাদে বন্দী করলেন এবং প্রেসিডেন্ট ভবনকে ভারী অস্ত্রসজ্জিত দুর্গে পরিণত করলেন। এরপর মাদুরোর পরিণতি হয়েছে অনেকটা ২০০৩ সালের সাদ্দামের মতো।
ইরাকের নেতা সাদ্দাম বিস্ময়ে দেখেছিলেন, মার্কিন সেনাদের বহর দজলা নদীর পাড় ধরে বাগদাদের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসছে। তখন সাদ্দাম তড়িঘড়ি পালিয়ে যান। তবে খুব শিগগির নিজের লোকের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ধরা পড়েন এবং মার্কিন সেনাদের হাতে বন্দী হন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকেও একইভাবে পায়জামা পরা অবস্থায় নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট বললেন, মাদুরোর পরিণতি অন্য নেতাদের জন্য শিক্ষা। কিউবা, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টদের জন্য এটি মাদক পাচারকে প্রশ্রয় না দেওয়ার সতর্কবার্তা।
লাতিন আমেরিকার সমাজ আরব সমাজের মতোই। সেখানে দেশগুলোকেও আত্মমগ্ন ও জনতুষ্টিবাদী নেতাদের বোঝা বইতে হয়। আমি ২০০৭ সালে কারাকাস গিয়েছিলাম। তখন শহরটিকে সুন্দর ও পরিষ্কার মনে হয়েছিল। শহরটিকে ঘিরে বেশ কিছু বস্তি ছিল। আমাদের গাইড আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বস্তিবাসীরা সবাই অভিবাসী। উন্নত জীবনের আশায় লাখ লাখ মানুষ এই তথাকথিত ধনী দেশে এসে জড়ো হয়েছে।
বিপ্লবী সরকারের নীতির ফলে জীবনযাত্রার মান দ্রুত খারাপ হতে থাকে। শহরে সশস্ত্র লোকজন দেখা যেত প্রায়ই। তারা পুলিশ ছিল না। ছিল নির্দিষ্ট ভবন পাহারা দেওয়ার জন্য ভাড়া করা বেসামরিক লোক। আমাদের হোটেলের পার্কিংয়ের প্রবেশপথেও তারা ছিল। তখন এক ডলার সমান ছিল দুই বলিভার। চাভেজ এবং পরে মাদুরোর শাসনে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যায়। মুদ্রার মান নেমে আসে ১ ডলারে বা প্রায় ৫০০ বলিভারে। দারিদ্র্যের চাপে ৫০ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।
তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ কেন মহাদেশজুড়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে! কেন একজন প্রেসিডেন্ট শীতল যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যাওয়া বিপ্লবী ভঙিমা আঁকড়ে থাকবেন! দৃশ্যটা ছিল লিবিয়ার মতোই। সম্পদে ভরপুর কিন্তু বাস্তবে দরিদ্র একটি দেশ। মাদুরো এখন আটক। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি চাভেজের ছায়ায় ছিলেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি চাভেজকে অনুকরণ করে শাসন করেছেন; কিন্তু মাদুরো যেখানে একজন সাধারণ মানুষ, সেখানে চাভেজ ছিলেন গভীর ও আদর্শ দ্বারা চালিত একজন নেতা। তিনি তেলসমৃদ্ধ দেশে বিপ্লবী বাগ্মিতাকে বৈধতা দেন। মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বের করে দেন। বড় বিনিয়োগ জাতীয়করণ করেন।
চাভেজ নিজেকে একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে তুলে ধরতেন। কবি ও লেখকদের দ্বারা নিজেকে ঘিরে রাখতেন। লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসও ছিলেন তাঁর বন্ধুদের একজন। চাভেজ নিজেকে ভেনেজুয়েলার ঐতিহাসিক নেতা সিমন বলিভারের উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করতেন। প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি সাপ্তাহিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান করতেন। একবার টানা আট ঘণ্টা কথা বলেছিলেন।
অবশ্য তাঁর কথার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান ছিল বিশাল। দারিদ্র্য বাড়ছিল। বেকারত্ব বাড়ছিল। গ্রেপ্তারও বাড়ছিল। চাভেজ ৫৮ বছর বয়সে কিউবার একটি ক্লিনিকে ক্যানসারে মারা যান। যদিও কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, তাঁর শরীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। তাঁর জায়গায় আসেন মাদুরো। তিনি রাজনীতিতে চাভেজকে অনুকরণ করলেও চাভেজের বাগ্মিতা মাদুরোর ছিল না।
আমরা জানি, ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরিদের মতো নেতা নন। তাঁর আগের প্রেসিডেন্টরা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক একঘরে করার নীতিতে ভরসা করেছিলেন। ট্রাম্প ভিন্ন পথ নেন। তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ে এক আঘাতেই সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। তিনি সরকার পরিবর্তন চাননি। বরং মাদুরোকেই লক্ষ্য করেন এবং ভেনেজুয়েলার উপপ্রধানের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হন। যে নেতারা ট্রাম্পের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, তাঁদের জন্য কারাকাসের ঘটনা একটি স্পষ্ট বার্তা। সতর্ক থাকুন, ট্রাম্প জেতার জন্য সবই করতে পারেন।
আব্দুলরহমান আল রাশেদ, মধ্যপ্রচ্যের সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ।
আরব নিউজ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত