ট্রাম্প নয়, ইরান যুদ্ধের চাবিকাঠি রয়েছে যার হাতে

(বাঁ থেকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় মাসে পৌঁছেছে করেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে মার্কিন-ইসরায়েল জোটের বড় ধরনের সামরিক সাফল্য এলেও ইরানের সেনাবাহিনী এবং সরকারের টিকে থাকার সক্ষমতা বর্তমান সমীকরণকে বদলে দিচ্ছে।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল এই মুহূর্তে যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করার চেয়ে পরিস্থিতির বিপরীতে প্রতিক্রিয়া দেখাতেই বেশি ব্যস্ত। এই কৌশলগত স্থবিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের লক্ষ্যমাত্রার পারস্পরিক বিরোধিতা। ইরান আক্রমণের কোনো সঠিক যৌক্তিকতা তুলে ধরতেও বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ তাদের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘকালীন নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই নীতির ভিত্তি ছিল ১৯৮০ সালের কার্টার ডকট্রিন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঘোষণা করেছিলেন যে পারস্য উপসাগর এলাকায় অন্য কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের ওপর আঘাত এবং সামরিক শক্তি দিয়ে তা মোকাবিলা করা হবে।

আরও পড়ুন

পরবর্তী দশকগুলোতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সৈন্য এবং পঞ্চম নৌবহর এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে। বিগত মার্কিন সরকারগুলোও ইরানের হুমকি সামাল দিয়ে ওই স্থিতাবস্থা বজায় রেখেছিল। কারণ তারা জানত, সরাসরি সংঘাত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে, যা সারা বিশ্বের জন্য বিপর্যয়কর হবে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের লক্ষ্যমাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের নেতৃত্বাধীন হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুতি জোট, যা রেজিস্ট্যান্স এক্সিস নামে পরিচিত, তাদের পুরোপুরি নির্মূল করতে চায় ইসরায়েল।

২০২৩ সালের অক্টোবর পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ায় ইসরায়েল এখন তার পুরোনো ‘ঘাস কাটা’ নামক কৌশলে ইরান এবং হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাচ্ছে। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রতিপক্ষের নেতৃত্ব নির্মূল করা এবং তাদের অবকাঠামো ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া। দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মাধ্যমে তারা এক বিশাল বাফার জোন তৈরি করতে চাইছে, যাতে হিজবুল্লাহ তাদের অবস্থান হারিয়ে ফেলে।

আরও পড়ুন

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, দেশটির পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ জয়ের সাফল্যকে পুঁজি করে নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন।

২০২৩ সালে হামাসের হামলার কারণে নেতানিয়াহুর ‘ত্রাতা’ হিসেবে যে খ্যাতি ছিল, তা ধসে পড়ে। এখন ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তিনি পুনরায় ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। এর জন্য নির্বাচনে জয়ী হওয়া অপরিহার্য। কারণ, ক্ষমতায় টিকে থাকলেই তিনি তাঁর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলার বিচারের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে পারেন এবং প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে ক্ষমা নিশ্চিত করতে পারেন।

ইরানের সামরিক ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শুধু টিকে থাকাকেই তেহরান তাদের জয় হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের এই বিধ্বংসী আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এখন এক নতুন এবং অপেক্ষাকৃত কট্টরপন্থী নেতৃত্বের জন্ম হচ্ছে, যারা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য আরও বড় বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে।

তবে এই যুদ্ধ নেতানিয়াহুর জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। জনমত জরিপ বলছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকলে লিকুদ পার্টির জনপ্রিয়তা বেড়েছে ঠিকই, তবে ইরানের প্রস্তাবিত কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র সায় দিলে সেই জনপ্রিয়তা আবার কমেও যেতে পারে। তা ছাড়া ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমেরিকায় চালানো বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপের অবস্থা আরও করুণ।

ইসরায়েল প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের যে সাহায্য পায়, তা না থাকলে দেশটির অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তি স্থবির হয়ে পড়বে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনিশ্চিত স্বভাবের কারণে এই সমর্থন চিরস্থায়ী না–ও হতে পারে।

আরও পড়ুন

একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি ফিলিস্তিনে চালানো যুদ্ধের জন্য ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছেন। এতে বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েল আরও একঘরে হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ইরানের সামরিক ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শুধু টিকে থাকাকেই তেহরান তাদের জয় হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের এই বিধ্বংসী আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এখন এক নতুন এবং অপেক্ষাকৃত কট্টরপন্থী নেতৃত্বের জন্ম হচ্ছে, যারা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য আরও বড় বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে ইরানকে দমানোর এই প্রচেষ্টা ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকে এক জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিয়েছে।

  • মার্টিন কিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত