গত কয়েক সপ্তাহে ১৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করতে ‘বাধ্য’ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী।
এসব শুধু সংখ্যা নয়। এগুলো একেকটি বিষাদসিন্ধু, একটি করে স্বপ্ন, একটি করে পরিবার ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস। এসব খবর দেখে একজন মা লিখেছেন—শিক্ষার্থীরা কেন করছে আত্মহত্যা? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা প্রশাসন এই আত্মহত্যা সম্পর্কে কী বলেন? অত্যন্ত নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
পিতামাতার অনেক সাধনা ছিল, ইচ্ছা ছিল তাঁরা সবাই একেকটা পরিবারের দায়িত্ব বুঝে নেবেন, পরিবারগুলো শান্তি ও নিরাপত্তা পাবে; কিন্তু কী হলো? এটা কি সমগ্র জাতির দুশ্চিন্তার বিষয় নয়? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আপনারা বলুন, উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীদের এই আত্মহত্যা কেন?
একজন মন্তব্য করেছেন ‘মেডিক্যালে ডিপ্রেশন অনেক বেশি’। আরেকজন বলেছেন, ছবিতে শাড়ি পরা মেয়ে মেডিক্যালের ছাত্রী ছিল। শুনেছি কুমিল্লার বেসরকারি কলেজের শিক্ষকের লালসার শিকার হতে চাননি। তাই একই বিষয়ে পাঁচবার ফেল করিয়েছে। তা–ও আবার ডিক্লারেশন দিয়ে। জীবনের প্রতি অসহায়তা, সমাজের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে চলে গেল। কইরে জুলাই যোদ্ধা?
যখনই কোনো শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর দেখি, তখনই আমার মেডিক্যাল শিক্ষার্থী মধুসূদনের কথা মনে পড়ে। প্রাথমিক স্কুলশিক্ষক বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। প্রথম থেকেই সব ক্লাসের ফার্স্টবয় মধু সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে যান অনায়াসে। মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তিনি নানাভাবে নিগৃহীত হতে থাকেন।
শিক্ষকদের দিয়েই শুরু। মধু অন্য পাঁচজনের মতো কথা বলতে পারতেন না, তাঁর কথা আটকে যেত। ইংরেজিতে এই অবস্থাকে বলে ‘ইস্টামারিং’, বাংলায় তোতলামি। ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জ থেকে শুরু করে মেরিলিন মনরো, হালের জো বাইডেন, টাইগার উডসহ অনেক নামকরা মানুষের কথা বলতে আটকে যেত। কিন্তু তাতে তাঁদের সফলতা আটকে থাকেনি। মেডিক্যালের শিক্ষকেরা নিশ্চয় সেটা জানতেন। কিন্তু বেপরোয়াদের হুঁশ থাকে কম। যেমন থাকে না স্বৈরাচারদের।
মধুকে নিয়ে শিক্ষকদের রংবাজির অন্ত ছিল না। অনেকেই যেন ক্লাসে আসতেন মধুকে নাড়ার জন্য। তাঁকে মনোরঞ্জনের বস্তুতে পরিণত করতেন ক্লাসের মধ্যেই। মোদ্দাকথা, এখানে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বৈরাচারদের মতো যা খুশি তা–ই করতে পারেন।
সমাজ হিসেবে আমরা প্রায়ই শোক প্রকাশে থেমে যাই। কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই জমে ওঠে আরেকটি মধুসূদন, আরেকটি নওশিন, আরেকটি অদৃশ্য যন্ত্রণা।
‘তোতলার তোতলামি’ নিয়ে হাসিঠাট্টা আমাদের সমাজে একটা প্রচলিত জনপ্রিয় বিনোদনের বিষয়। সিনেমা–থিয়েটারেও তাদের নিয়ে হাসিঠাট্টা চলে। অনেকেই মনে করেন, এটা একটা নির্দোষ বিনোদন।
কিন্তু শিক্ষকদের এই বিনোদন মধুর জীবনকে তিতা করে তোলে। তিনি ফিরে যেতে চান বাড়িতে। চিঠি লেখেন বাবাকে। বাবা ছুটে আসেন, ছেলেকে বোঝান; কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করেন। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়; বাবাকে জানানোটা তাঁর অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। গণটার্গেটে পরিণত হন মধু।
ছুটির দিনে তিনি শহরের একটা হোটেলে নিভৃতে থাকতেন। সেখানেই তিনি একদিন আত্মহত্যা করেন। ‘হাসির বস্তু’ মধুর চিতা জ্বলে তাঁর গ্রামের বাড়ির শ্মশানে। কেউ অভিযোগ করেনি, কোনো তদন্ত হয়নি। সংখ্যালঘু গরিব প্রতিবন্ধী এই শিক্ষার্থীর পাশে কেউ দাঁড়ায়নি।
স্বৈরাচারের সংজ্ঞা
আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় প্রথম শব্দটি কানে গেঁথে যায়। ক্লাস নাইনে বাংলা আর সমাজবিজ্ঞান পড়াতেন মোস্তফা স্যার। তাঁকে একদিন সাহস করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, স্বৈরাচার মানে কী?
স্যার খুব সুন্দর করে বোঝাতে পারতেন নানা উদাহরণ দিয়ে, তিনি বিষয়টি খোলসা করতে চাইতেন। স্বৈরাচার হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তিই সব। জবাবদিহি থাকে না। বিষয়টিকে আরও খোলাসা করতে তিনি সেদিন আমাদের ক্লাস মনিটরের উদাহরণ টেনেছিলেন। সোহরাব সেই ক্লাস সিক্স থেকেই আমাদের মনিটর এবং প্রতিবছরই সে স্কুলের বেস্ট মনিটরের প্রাইজ পায়।
স্যার বললেন, ‘ধর তোদের ক্লাস মনিটর ভালো, নিরহংকারী, ফি বছর বেস্ট মনিটরের প্রাইজ পায়। ফাইভ–সিক্স থেকে মনিটর নির্বাচিত হয়, কেউ তাকে চ্যালেঞ্জ করে না। ওর একটা আত্মবিশ্বাস আছে, ভালো করার চেষ্টা আছে। অনেক সময় আত্মবিশ্বাস অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা অহংকারে পরিণত হয়। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার প্রবল ইচ্ছা এসে ভর করে। অহংকারের বশে যদি সে ক্লাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নামে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ম বানাতে শুরু করে, কেউ প্রতিবাদ করলে দমন করতে চায়, খাতায় নাম লিখে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে, বেঁচে যাওয়া টিফিন যদি নিজেই হাপিশ করে দেয়। তখনই বুঝতে হবে সে স্বৈরাচারী হয়ে উঠছে। এই পর্যায়ে স্বৈরাচার ক্ষমতা হারানোর ভয় বা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে। তখন সে দল পাকায়, একসময় সহচরেরা বা দল তাকে বন্দী করে ফেলে।’
মেডিক্যালের শিক্ষকেরা কি এমন? খুলনার যে মেয়েটি কুমিল্লায় এসে হারিয়ে গেল, তাঁর ছবি দেখে একজন মন্তব্য করেছেন—‘ছবিতে শাড়ি পরা মেয়ে মেডিক্যালের ছাত্রী ছিল। একই বিষয়ে পাঁচবার ফেল করিয়েছে। তাও আবার ডিক্লারেশন দিয়ে। জীবনের প্রতি অসহায়তা, সমাজের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে চলে গেল।’
অন্যেরা লিখেছেন প্রথম বর্ষ থেকেই কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের ওই শিক্ষকের রোষানলে পড়েন নওশিন। প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় অন্য সব বিষয়ে পাস করলেও অ্যানাটমিতে ফেল করেন তিনি। এরপর গত তিন বছরে আরও চারবার একই বিষয়ে পরীক্ষা দিলেও প্রতিবারই অকৃতকার্য হন। প্রথম বর্ষে থাকতেই প্রকাশ্যে তাঁকে ফেল করানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে ঠিক কী কারণে ওই শিক্ষক এমন আচরণ করেছিলেন, তা স্পষ্ট নয়।
ফেল করানোর হুমকি–ধমকি
ফেল করানোর হুমকি–ধমকি মেডিক্যালে নতুন কিছু নয়। শিক্ষার্থী এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ অভিভাবকেরা এ বিষয়ে কমবেশি ওয়াকিবহাল। এটা পড়ায় মন বসানোর জন্য কপট কোনো হুমকি নয়। এই লেখকের বোনের ছেলে এ রকম পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন এক সরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী থাকার সময়। তাঁর লিখিত পরীক্ষার একটা খাতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এক বছর অপেক্ষা করতে হয় তাঁকে।
আরও কয়েকটি ঘটনা
এক. ভারতের রাজস্থান থেকে আসা মেডিক্যাল শিক্ষার্থী নিদা খান গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী হোস্টেলে আত্মহত্যা করেন। তিনি এমবিবিএস ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেই সময় পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছিল—একটি পরীক্ষায় নিদা খান নকল করার অভিযোগে বহিষ্কার হন। এটি নিয়ে সারা দিন হতাশায় ছিলেন। যার কারণে তিনি রাতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুই. একই বছরের ২২ মে (২০২৫) মাসে বরিশাল মেডিক্যালের ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। সুইসাইড নোটে তিনি ‘অতিরিক্ত একাডেমিক চাপকে’ তাঁর সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সজীব বাড়ৈ আসলে কোনো এক অজানা কারণে তৃতীয় বর্ষে আটকে গিয়েছিলেন, যেখানে তাঁর সব সহপাঠীরা তত দিনে ইন্টার্নশিপ শুরু করে ফেলেছেন। সজীব বাড়ৈয়ের রুমমেট ছিলেন সুমন হালদার। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘সজীব প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন, কারণ তিনি তাঁর পড়াশোনার চাপ সামলাতে পারতেন না। ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়ে গভীর ভয় ছিল।’
তিন. ‘একাডেমিক চাপ’ নিতে না পেরে যশোর মেডিক্যালের দশম ব্যাচের শিক্ষার্থী আজমাইন সাকিব গত ২৬ জুন ২০২৪ আত্মহত্যা করেন।
বলা বাহুল্য, কোনো আত্মহত্যার সুস্থ নিরপেক্ষ তদন্ত হয় না। তবে কুমিল্লার ঘটনার তদন্তের ঘোষণা এসেছে। আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ‘একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন’ করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়দায়িত্ব নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমিনকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জোবায়দা সুলতানা এবং সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (শৃঙ্খলা) ডা. মুহাম্মদ আবদুল কাদের। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটির কার্যপরিধিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অর্পিতা নওশিনের অকালমৃত্যুর প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনার ওপর। এ ছাড়া শিক্ষার্থীর প্রতি কোনো ধরনের মানসিক চাপ, হয়রানি বা বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে কি না এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কমিটিকে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, পরীক্ষার ফলাফল ও উপস্থিতি রেকর্ড সংগ্রহ করে কলেজ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা মূল্যায়ন করবে এই কমিটি।
এ সবই খুব আশার কথা, ঘর পোড়া গরু আমরা তাই সন্দেহ যায় না; কমিটির সবাই চিকিৎসক, ক্লাস ইন্টারেস্ট থেকে তাঁরা বেরিয়ে এসে নিরপেক্ষতার সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করতে পারলে ভালো। তদন্ত কমিটিতে অভিভাবকদের একাধিক প্রতিনিধি থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। স্বৈরাচারের কাঠামোতে সেটা প্রত্যাশা করা একটু বেশিই হয়ে যায়, তবু মানুষ সাত দিন নয় সাত মাস অপেক্ষা করতে রাজি যদি মেডিক্যাল শিক্ষকদের অসীম ক্ষমতার লাগামটা যুক্তিসংগত করা যায়।
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক। মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর অভিভাবক [email protected]
