ফুটবলে রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব ও একক শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান

ফুটবলের মুখোশ পরে হাজির এক সমর্থকছবি: এএফপি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও সদিচ্ছা বাড়াতে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল। ম্যাচটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত ক্লাব ডায়নামো মস্কো এবং ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আর্সেনালের মধ্যে।

একদিকে ডায়নামো মস্কো চেয়েছিল তৎকালীন ফুটবল-বিশ্বের পরাশক্তি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নিজেদের দক্ষতা যাচাই করতে, অন্যদিকে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ব্রিটেন ও সোভিয়েতের বৈরী সম্পর্কের বরফ গলাতে চেয়েছিল দুই দেশের সরকার। ফুটবল কূটনীতির ইতিহাসে একে একদম প্রাথমিক উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

কিন্তু মাঠের ও মাঠের বাইরের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। খেলার মূল উদ্দেশ্য তো পূরণ হলোই না, উল্টো তৎকালীন ভূরাজনীতিতে এটি হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়াল।

ঘটনাটি গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল সেকালের বিখ্যাত দূরদর্শী সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলকে। লন্ডনের ট্রিবিউন পত্রিকায় তিনি ‘দ্য স্পোর্টিং স্পিরিট’ শীর্ষক একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ লিখলেন। অরওয়েল লক্ষ করলেন, সোভিয়েত দলটিকে নিয়ে পুরো ইংল্যান্ডের পথেঘাটে সাধারণ মানুষ যে ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা আলোচনা করছিল, তা আর ব্যক্তিগত থাকল না, তা রূপ নিল গণমাধ্যমের উগ্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনায়।

পত্রিকাগুলো একেক মুখরোচক শিরোনামে খবর প্রকাশ করতে শুরু করল। আর্সেনাল দলে সোভিয়েতের ‘গুপ্ত খেলোয়াড়’ খেলানোর অভিযোগ উঠল। ওদিকে ছড়াতে লাগল তপ্ত সব ষড়যন্ত্রতত্ত্ব—সোভিয়েত দল নাকি খেলোয়াড়ের ছদ্মবেশে একগাদা গোয়েন্দা ইংল্যান্ডে পুশ করেছে!

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে আয়োজিত একটি ম্যাচ কীভাবে শত্রুতার নতুন বারুদ তৈরি করছে, তা অরওয়েল স্বচক্ষে দেখলেন। কিছুটা ঝাঁজালো ভাষা আর চিরাচরিত বিদ্রূপাত্মক সুরে তিনি পেশ করলেন তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। প্রশ্ন তুললেন খোদ ফুটবলের অন্তর্গত দর্শন এবং এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ঠুনকো ভিত্তি নিয়ে।

ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল
ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

অরওয়েল লিখলেন, মানুষ এক পক্ষকে বিজয়ী এবং অন্য পক্ষকে অপমানিত হতে দেখতে চায়। তারা ভুলে যায় যে প্রতারণা কিংবা দর্শকদের হস্তক্ষেপে অর্জিত জয়ের কোনো মূল্য নেই। এমনকি দর্শকেরা যখন সরাসরি শারীরিক হস্তক্ষেপ করে না, তখনো তারা নিজেদের দলের জন্য জয়ধ্বনি দিয়ে এবং প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের টিটকারি ও অপমানের মাধ্যমে বিচলিত করে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

অরওয়েলের মতে, প্রকৃত খেলাধুলার সঙ্গে ন্যায়পরায়ণতার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি ঘৃণা, ঈর্ষা, দম্ভ, নিয়মনীতির প্রতি অবজ্ঞা এবং সহিংসতা দেখে একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পাওয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অন্য কথায়, এটি হলো গুলি ছোড়া বা রক্তপাতহীন যুদ্ধ।

প্রবন্ধটির শেষের দিকে অরওয়েল ফুটবল আর বক্সিংয়ের মতো সংঘাতপূর্ণ খেলার বিস্তার নিয়ে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, এই পুরো বিষয়টিই জাতীয়তাবাদের উত্থানের সঙ্গে যুক্ত, অর্থাৎ নিজেকে কোনো বৃহৎ শক্তির আধারের (যেমন দেশ বা জাতি) সঙ্গে একীভূত করা এবং সবকিছুকে একধরনের প্রতিযোগিতামূলক মর্যাদার মাপকাঠিতে বিচার করার যে আধুনিক উন্মত্ত অভ্যাস, এটি তারই ফল।

ফুটবল আসলে একটি বহুত্ববাদী প্রপঞ্চ। এর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্পৃহা কোনো একক সত্তার নয়; বরং বহুর। ফলে বহুজনের খেলায় বহুজনের ইতিহাসই প্রাপ্য হওয়া উচিত ছিল। অরওয়েল আজ বেঁচে থাকলে হয়তো হাসতে হাসতে বলতেন, ‘বহুত্বের আলাপ কেবল কাগজেই সুন্দর। যেখানে উগ্র জনতা থাকে, সেখানে দাবি ওঠে একত্ববাদী ত্রাতার। এই ত্রাতাবাদ থেকে মানুষের মুক্তি নেই।’
আরও পড়ুন

অরওয়েল আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, মধ্যযুগেও খেলাধুলা হতো এবং সম্ভবত তখন শারীরিক নিষ্ঠুরতা আরও বেশি ছিল; কিন্তু সেগুলো কোনোভাবেই রাজনীতির সঙ্গে মিশে যেত না কিংবা গোষ্ঠীগত বিদ্বেষের কারণ হয়ে দাঁড়াত না।

অরওয়েল যখন এ কথাগুলো বলছেন, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মাত্র শেষ হয়েছে। ফিন্যান্স ক্যাপিটালিজম বা আর্থিক পুঁজিবাদের এমন দানবীয় বিকাশ তখনো ঘটেনি। গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের অধিকাংশ দেশ তখনো উপনিবেশের শৃঙ্খলে বন্দী। সর্বত্র জাতীয়তাবাদের জয়ঢাক বাজছে। খেলাধুলা তখনো মূলত ইউরোপীয়দের অভ্যন্তরীণ এক ‘মামলা’। কাগজে-কলমে লাতিনদের ছাড়া বিশ্বকাপ না হলেও, আফ্রিকান ফুটবল তখনো আঞ্চলিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ।

আজকের ফুটবল কিন্তু সেই স্তরে নেই। এর অবকাঠামো থেকে শুরু করে প্রাযুক্তিক কাঠামো—সবই বদলে গেছে। তবে অরওয়েলের উদ্বেগের জায়গাটি ছিল ফুটবলের নামে উগ্র ও হিংস্র জাতীয়তাবাদের সামষ্টিক চর্চা, যা মানুষের ঐক্য বা সুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে আসে না; বরং আসে মানুষের অন্তর্গত পাশবিকতা ও ধর্ষকামী মানসিকতা থেকে।

আরও পড়ুন

অরওয়েলের মতে, যতই ‘নিয়মের’ বেড়াজাল দিয়ে এই সামষ্টিক আগ্রাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হোক না কেন, একটা পর্যায়ে নিয়ম আর অনিয়মের মাঝের সাদা দাগটা মুছে যায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়ন তো বহুদূরের কথা, খেলা নিজেই এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

ফুটবল তথা খেলাধুলাতে শৈল্পিক রূপক কিংবা আধ্যাত্মিক বিশেষণ আরোপের ঘোর বিরোধী ছিলেন অরওয়েল। কারণ, তাঁর মতে, এই কৃত্রিম মহিমান্বিতকরণ আদতে খেলার ভেতর দিয়ে একটি মোহমুগ্ধ কাল্পনিক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করে, যেখানে একই সঙ্গে একজন ‘মেসিয়াহ’ বা ত্রাতা এবং একটি ‘বলির পাঁঠা’র প্রয়োজন পড়ে। গণতান্ত্রিক খেলার ছদ্মবেশে এখানে আসলে ‘ক্রাউড মবিলিটি’ বা জনতার উগ্র সমাবেশ ঘটে। আর এই আগ্রাসী জনতাকে শান্ত করার জন্য প্রয়োজন হয় ঈশ্বরপ্রদত্ত কোনো ফেরেশতা অথবা সব দোষ চাপানোর জন্য কোনো ‘এস্কেপ-গোট’।

ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক কাল্পনিক ধর্মতত্ত্ব। তাই তো ফুটবলের এত বিশাল ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও বারবার অবান্তর প্রশ্ন ওঠে—সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার কে? সর্বকালের সেরা দল কোনটি? অর্থাৎ এখানেও সেই ‘একক সার্বভৌমত্বের’ গুণকীর্তন!

উরুগুয়ের মন্টিভিডিওতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে উরুগুয়ের প্রথম গোল, ৩০ জুলাই ১৯৩০। ছবি: সংগৃহীত

খোদ ফুটবল যেখানে একটি সামষ্টিক খেলা এবং এর ইতিহাস যেখানে বহু যুগের বহু মানুষের আখ্যান, সেখানে একক শ্রেষ্ঠত্বের এই বয়ান আমাদের অরওয়েলের সেই বিখ্যাত ‘গোলাগুলিবিহীন যুদ্ধ’র কথাই মনে করিয়ে দেয়।

অবশ্য এখন আর অরওয়েলের সেই আদিম যুগ নেই। এখন ঘোর প্রযুক্তির কাল। অরওয়েলের যুগে জনতার রাক্ষসী আগ্রাসনকে সামাল দিতে রাষ্ট্র বা সমাজকে অনেক কসরত করতে হতো। এখন জন-আক্রোশ ঠিকই আছে, তবে তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এক অদৃশ্য করপোরেট হাত দ্বারা। অরওয়েল চিত্রিত আদর্শের ভণ্ডামি কিংবা নৈতিকতার অভিনয়ের প্রেক্ষাপট আজ সেকেলে। দুনিয়া আজ অন্য করপোরেট বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে।

তবু ফুটবল নিয়ে অরওয়েলের কিছু কথা আজ শতভাগ প্রাসঙ্গিক। এর প্রমাণ আমরা প্রতি ম্যাচেই পাই। যখন একটি দল হারার উপক্রম হয়, তখন সমর্থকদের মানসিক অস্থিরতা, ‘ইজ্জত’ খোয়ানোর ভয়, আত্মকালিমাবোধ কিংবা যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মতো গ্লানি তীব্রভাবে ফুটে ওঠে। আবার জয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা সমর্থকদের মাঝে জেগে ওঠে এক অহংবোধ, দম্ভ, প্রতিপক্ষকে হেয় করার পৈশাচিক আকাঙ্ক্ষা। প্রশ্ন ওঠে, এই উন্মাদনা কিসের ইঙ্গিত দেয়? অরওয়েলের ভাষায়, এই মরীচিকার পেছনে রয়েছে ‘জাতীয়তাবাদ’ নামক এক কাল্পনিক-মিথিক্যাল প্রপঞ্চ, যা শ্রেষ্ঠত্বের মোহে মানুষকে অন্ধ করে।

আরও পড়ুন

অরওয়েলের সময়ে ফুটবলভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটেনি। ফুটবল তখনো পূর্ণদমে পুঁজিবাদের বলয়ে ঢোকেনি; কিন্তু আজকের ফুটবল বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম মুখ্য নির্দেশক। ফুটবলের ওপর আজ যে ‘আরাধ্য পবিত্রতা’ আরোপ করা হয়েছে, তা আসলে বৈশ্বিক পুঁজির সর্বোচ্চ সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।

কিন্তু এত করপোরেট আগ্রাসন, এত উগ্রতার মাঝেও আমরা ফুটবল দেখি। সব জেনেবুঝেও আমরা ফুটবল উদ্‌যাপন করি, বিশ্বকাপকে উপলক্ষ করে মেতে উঠি এক অনন্য বৈশ্বিক উৎসবে। কিন্তু এই আনন্দ, আবেগ ও শ্রদ্ধার স্থায়ী অবস্থান আজ আর নেই। অথচ ঘৃণা, রেষারেষি আর অসম্মানের স্থায়িত্ব যেন চিরকালীন। দান্তে বা সেন্ট অগাস্টিনের ভাষায় বলতে গেলে, এই পৃথিবী যেন নরকেরই এক প্রতিচ্ছবি আর এখানে যদি স্বর্গের কোনো আভাস পাওয়া যায়, তা কেবল মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধে।

তাত্ত্বিকভাবে, ফুটবলের আদি উদ্দেশ্য ছিল পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সৌহার্দ্য রক্ষা করা। অরওয়েল এ কথা শুনলে হয়তো আজ মৃদু হাসতেন। তাঁর চোখে ফুটবল ছিল সামষ্টিক জাতিগত বিদ্বেষ প্রকাশের একটি নিয়মমাফিক সুযোগমাত্র। জাতীয়তাবাদের ঘাড়ের ওপর ভর করে এই ফুটবল আজ জন্ম দিয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের—এক অনন্ত যুদ্ধের।

‘বহুজনের খেলা আজ রূপ নিয়েছে একক শ্রেষ্ঠত্বের কৃত্রিম আচারে।’ লিওনেল মেসি ও রোনালদো
প্রথম আলো কোলাজ

ফুটবল আসলে একটি বহুত্ববাদী প্রপঞ্চ। এর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্পৃহা কোনো একক সত্তার নয়; বরং বহুর। ফলে বহুজনের খেলায় বহুজনের ইতিহাসই প্রাপ্য হওয়া উচিত ছিল। অরওয়েল আজ বেঁচে থাকলে হয়তো হাসতে হাসতে বলতেন, ‘বহুত্বের আলাপ কেবল কাগজেই সুন্দর। যেখানে উগ্র জনতা থাকে, সেখানে দাবি ওঠে একত্ববাদী ত্রাতার। এই ত্রাতাবাদ থেকে মানুষের মুক্তি নেই।’

এই বৈষম্যের দুনিয়ায় মানুষ স্বভাবজাতভাবেই একজন ত্রাতার সন্ধান করে। কিন্তু ফুটবল কোনো যুদ্ধ নয় যে এখানে একজন মেসিয়াহর দরকার পড়বে। অথচ মানুষের আদিম পাশবিকতা ও নির্মমতা ফুটবলের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ‘ভ্রাতৃত্ববোধ’কে নির্বাসনে পাঠিয়ে একে পরিণত করেছে এক ত্রাতাবাদী যুদ্ধে। আর পর্দার পেছনের অদৃশ্য খেলোয়াড়েরা মানুষের এই অবদমিত আবেগ ও ত্রাতার আকাঙ্ক্ষাকেই পুঁজি করে নিজেদের মুনাফার পাহাড় গড়ছে।

বহুজনের খেলা আজ রূপ নিয়েছে একক শ্রেষ্ঠত্বের কৃত্রিম আচারে। মমত্ববোধ হয়ে গেছে এক দুরূহ কল্পনা। বৈষম্যের যন্ত্রণা লাঘব করতে যে বহু মানুষের ক্রীড়ার জন্ম হয়েছিল, তা আজ নীরস ও যান্ত্রিক। ফুটবল আজ একক মস্তক-মুকুটের শৃঙ্খলে এক অসহায় কয়েদি। ফুটবল আজ বড্ড নিঃসঙ্গ।

  • মিনহাজুল ইসলাম লেখক ও গবেষক

মতামত লেখকের নিজস্ব