সামনে নির্বাচন, পুতিন কেন ভয় পাচ্ছেন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনরয়টার্স

ডুমা (রুশ পার্লামেন্ট) নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। ঠিক এই সময়ে ক্রেমলিন ব্যালট পেপারকে পুরোপুরি প্রতিদ্বন্দ্বীহীন করার প্রক্রিয়া আরও তীব্র করে তুলেছে। জন–অসন্তোষের সামান্যতম প্রকাশ ঘটতে পারে—এমন সব ঝুঁকির জায়গাগুলোকেই ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

এমনকি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা তথাকথিত ‘বিরোধী’ দলগুলোও ছাড় পাচ্ছে না। যেমন কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্য রাশিয়ান ফেডারেশন (সিপিআরএফ)। তাদের একাধিক প্রার্থীকে হয় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, না হয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

উদ্দেশ্য একটাই—ক্ষমতাসীন ‘ইউনাইটেড রাশিয়া’ পার্টির বিরুদ্ধে যেন কোনোভাবেই প্রতিবাদী ভোট এককাট্টা হতে না পারে।

আরও পড়ুন

আর গত মাসে রাশিয়ার একমাত্র উন্মুক্ত যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দল ‘ইয়াবলোকো’কে প্রার্থী তালিকাভুক্ত করতেই দেওয়া হয়নি।

অতীতে যেসব বিরোধী নেতাকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হতো না, যেমন প্রয়াত অ্যালেক্সি নাভালনি, তারা এই দলগুলোকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়ার এবং শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাত।

তবে এবার ক্রেমলিন কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে নারাজ। জনগণের অসন্তোষ এখন এতটাই ব্যাপক যে ভোটের বাক্সে তার সামান্য প্রতিফলন ঘটানোও ক্রেমলিনের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রিত বিরোধীদেরও আর কোনোভাবেই স্বাধীনভাবে মাঠ চষে বেড়াতে দেওয়া হচ্ছে না।

নির্বাচনের ফলাফল এমন হতেই হবে, যা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং তাঁর দল ইউনাইটেড রাশিয়ার প্রতি দেশের জনগণের এককাট্টা সমর্থন ও অখণ্ড জাতীয় ঐক্যের ‘প্রমাণ’ দেবে।

রাশিয়ার মস্কোতে সংসদীয় নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রে ভোটাররা ইলেকট্রনিক ভোটিং টার্মিনাল ব্যবহার করছেন
রয়টার্স

নিয়ন্ত্রিত বিরোধীদের ‘হুমকি’

‘ইয়াবলোকো’ হচ্ছে রাশিয়ার একমাত্র টিকে থাকা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে আসছে। বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক নিপীড়নের একের পর এক ঢেউ কাটিয়ে দলটি এখনো টিকে রয়েছে; যেখানে বাকি সব বিরোধীকে হয় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে, না হয় নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

গত জুলাই মাসে ইয়াবলোকোকে ডুমা নির্বাচনের জন্য নিবন্ধন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ক্রেমলিন নিজেদের আত্মবিশ্বাস দেখাতে চেয়েছিল—তারা বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিল যে ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও রাশিয়ার নির্বাচন এতটাই স্বাধীন ও অবাধ যে সেখানে একটি যুদ্ধবিরোধী দলও অংশ নিতে পারছে।

নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার ঠিক আগে ইয়াবলোকোর পক্ষে জনসমর্থন ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছিল, আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবারও তারা ১ থেকে ২ শতাংশের বেশি ভোট পাবে না—যা পার্লামেন্টে আসন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৫ শতাংশের থ্রেশহোল্ডের অনেক নিচে।

এবারের নির্বাচন এমন এক সময়ে হতে যাচ্ছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ আঁচ রাশিয়ার সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। জ্বালানিসংকট আর আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি প্রতিটা রুশ পরিবারকে চাপে ফেলছে—বিশেষ করে যাঁরা যুদ্ধের ময়দানে প্রতিনিধি পাঠাননি বা কোনো অস্ত্র কারখানার সঙ্গে যুক্ত নন।

তাহলে হঠাৎ কী এমন বদলে গেল?

ইয়াবলোকোর নিবন্ধনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাশিয়াজুড়ে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব অনিয়ন্ত্রিত আগ্রহ। যুদ্ধবিরোধী স্লোগানের টানে মানুষ তাদের প্রতি ঝুঁকতে শুরু করে। রাশিয়ার প্রধান সার্চ ইঞ্জিন ‘ইয়ানডেক্স’-এ দলের নাম এবং ‘নির্বাচন’ শব্দ দুটি লিখে খোঁজার হার একলাফে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়, যা ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়াকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল।

জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ইয়াবলোকোর প্রতি এই অভূতপূর্ব সমর্থন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপরই যুক্ত হন নির্বাসিত বিরোধী নেতারা। নাভালনির বিধবা স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনাইয়াসহ অনেকে দলটির পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

ফলাফল হতে সময় লাগেনি। আগস্ট মাসেই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দেওয়ার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ইয়াবলোকোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়।

কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআরএফ) গল্পটা অবশ্য একটু আলাদা। ডুমায় তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এবং বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ বিলে তারা ইউনাইটেড রাশিয়ার নির্দেশমতোই ভোট দিয়ে থাকে। তারা সরাসরি যুদ্ধবিরোধী না হলেও, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীনদের কড়া সমালোচনা করার মতো শক্তিশালী কিছু আঞ্চলিক শাখা তাদের রয়েছে।

তা ছাড়া দলের ভেতরে এমন কিছু প্রভাবশালী নেতা আছেন, যাঁরা যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বেশ সোচ্চার।

আরও পড়ুন

মূলত সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সরকারের সমালোচনাকে সামনে এনেই প্রচারণা চালায় সিপিআরএফ। আর এতেই তারা প্রতিবাদী ভোটারদের জন্য এক আকর্ষণীয় বিকল্পে পরিণত হয়।

দল হিসেবে সিপিআরএফকে বাতিল করা না হলেও, নানা অজুহাতে তাদের বেশ কয়েকজন দাপুটে প্রার্থীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রচারণা সীমিত করতে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নানা বিধিনিষেধ।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জনপ্রিয় কমিউনিস্ট নেতা নিকোলাই বোন্দারেঙ্কোর কথা। ইউটিউবে যাঁর সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ২০ লাখের বেশি। ‘উগ্রপন্থী প্রতীক’ ব্যবহারের অভিযোগে তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তাঁর একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যালেক্সি নাভালনির ছবিসহ একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার পর, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে আয়োজিত একটি যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি
রয়টার্স

নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের কলকাঠি

ক্রেমলিনের এই দমন-পীড়ন না থাকলেও হয়তো ইয়াবলোকো বা সিপিআরএফ—কারোর পক্ষেই ডুমায় ইউনাইটেড রাশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে হুমকি দেওয়া সম্ভব হতো না।

প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের পুরোনো অভিজ্ঞতা, ই-ভোটিংয়ের ব্যবহার, তিন দিন ধরে ভোট গ্রহণের নিয়ম চালু এবং স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের পুরো ব্যবস্থা থেকে ছেঁটে ফেলার মাধ্যমে ক্রেমলিন এখন নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো নির্বাচনী ফলাফল তৈরি করতে সিদ্ধহস্ত।

নির্বাচনের আগেই ক্রেমলিনের রাজনৈতিক নীলনকশাকারীরা ফলাফলের একটা লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেন। এবারের লক্ষ্য—৫০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি এবং তার মধ্যে ৫০ শতাংশ ভোট ইউনাইটেড রাশিয়ার ঝুলিতে তোলা। উল্লেখ্য, জন–অসন্তোষ বাড়ায় লক্ষ্যমাত্রা আগের ৫৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশে আনা হয়েছে।

তাহলে এই অনুগত বিরোধীদের ওপরও কেন এত চড়াও হওয়া?

এবারের নির্বাচন এমন এক সময়ে হতে যাচ্ছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ আঁচ রাশিয়ার সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। জ্বালানিসংকট আর আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি প্রতিটা রুশ পরিবারকে চাপে ফেলছে—বিশেষ করে যাঁরা যুদ্ধের ময়দানে প্রতিনিধি পাঠাননি বা কোনো অস্ত্র কারখানার সঙ্গে যুক্ত নন।

আরও পড়ুন

দেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে মানুষ দিন দিন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিচ্ছে ঘোর অনিশ্চয়তা। স্বাধীন গবেষণা সংস্থা লেভাদা সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে যখন প্রথম দফায় গণ-একত্রীকরণ (ম্যাসেস মোবিলাইজেশন) ঘোষণা করা হয়েছিল, রাশিয়ার মানুষের মধ্যে এখনকার উদ্বেগ ঠিক সেই পর্যায়ের।ক্রেমলিন খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে যে এই জমে থাকা ক্ষোভ ভোটের বাক্সে আছড়ে পড়তে পারে। আর তা ঠেকিয়ে নিজেদের মনের মতো ফলাফল বের করে আনতে হলে জালিয়াতির মাত্রা দ্বিগুণ বাড়াতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক—ইয়াবলোকো যদি দুই অঙ্কের (১০% বা তার বেশি) ভোট পেয়ে বসে, তবে তা ক্রেমলিনের নির্বাচনী কারিগরদের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, হাতে থাকা সব কারচুপির কলকাঠি দিয়েও ১০ শতাংশ ভোটকে রাতারাতি ১ শতাংশে নামিয়ে আনা কঠিন, আর আনলেও সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না।

ফলে একদিকে যেমন রাজপথে প্রতিবাদের ঝুঁকি তৈরি হবে, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পুতিনের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে—যিনি এবার নিজেই ব্যক্তিগতভাবে ইউনাইটেড রাশিয়ার হয়ে প্রচারণায় নেমেছেন।

আরও পড়ুন

ক্রেমলিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এমন এক ফলাফল প্রদর্শন করা প্রয়োজন, যা পুরো দেশের অখণ্ড ঐক্য আর সর্বাত্মক সমর্থন প্রমাণ করবে এবং সাধারণ জনগণকেও তা মেনে নিতে বাধ্য করবে।

তাই তাদের নিয়ন্ত্রিত বিরোধী স্বরটুকু দমন করার অর্থ হলো, ক্রেমলিন এখন অতি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং নির্বাচনের প্রতিটি খুঁটিনাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে।

ভোট শেষ হওয়া পর্যন্তই যা একটু জনগণের মেজাজ-মর্জি নিয়ে ক্রেমলিন চিন্তিত। নির্বাচনটি একবার তাদের মনের মতো শেষ হয়ে গেলে, রাষ্ট্রীয় যন্ত্র পুরো মুক্ত হয়ে যাবে। তখন ইন্টারনেটব্যবস্থার ওপর শতভাগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কিংবা নতুন অর্থনৈতিক কঠোর নীতি আরোপের মতো অপ্রিয় সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়ন আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিতে তাদের সামনে আর কোনো বাধাই থাকবে না।

এখন ক্রেমলিনের রাজনৈতিক কৌশলী থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থা—সবার মূল লক্ষ্য একটাই: যেকোনো মূল্যে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হাতে রাখা, যাতে ইউক্রেনে নিজের ইচ্ছেমতো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পুতিনের পথে কোনো কাঁটা না থাকে।

  • অ্যান্টন বারবাশিন রিডল রাশিয়ার সম্পাদকীয় পরিচালক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

    আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।