যুক্তরাষ্ট্রে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের রাষ্ট্রীয় সফরে দৃশ্যমান জাঁকজমকের কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দৃষ্টিতে এসব আনুষ্ঠানিকতা ছিল গৌণ। তাদের কাছে আসল বিষয় ছিল ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ রক্ষার প্রচেষ্টা। এই শীর্ষ সম্মেলন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে চলতি দশকের বাকিটা সময় তারা দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে বজায় রাখবে।
এই সম্মেলন থেকে বেইজিং এমন এক কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে বেরিয়ে এসেছে, যেখানে কোনো সামরিক ঝামেলায় না জড়িয়েই নিজেদের প্রভাব বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন বৈঠকে বসেছিল এমন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে তারা প্রায় সাত মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িয়ে আছে।
এর ওপর মিত্রদের বাণিজ্যনীতি নিয়ে চাপ দেওয়া, লাতিন আমেরিকায় প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা এবং চীনকে ঠেকানোর অভিযানে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে যেকোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া—সবই তারা করে চলেছে।
অথচ অন্যদিকে ট্রাম্প নিজেই চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং বৈঠককে ‘সফল’ বলে প্রশংসা করছেন। ওয়াশিংটনের হয়ে বেইজিং থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ যেসব দেশ পাচ্ছে, তাদের কাছে এই দ্বিমুখী বৈপরীত্য এড়াবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বাড়তি সুবিধা
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই বাস্তবতার চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট। ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধের সূত্রপাত হওয়ার পর থেকেই অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন যাতে এই প্রণালি খুলে দিতে সহায়তা করে, তা-ই চাইছেন ট্রাম্প।
সি চিন পিং যুদ্ধবিরতিতে ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত শান্তি আলোচনার বিষয়টি সমর্থন করলেও চীনের প্রকাশিত বিবরণীতে প্রণালি খুলে দেওয়া কিংবা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।
রিয়াদ, আবুধাবি বা দোহার মতো দেশগুলোর জন্য চীনের এ অবস্থানের একটি স্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। চীন চাইলেই এক সেনা মোতায়েন না করে বা সামরিক ঘাঁটি না বানিয়েও তেহরানকে ফোন করতে পারে, জাতিসংঘে বিবৃতি দিতে পারে কিংবা মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিতে পারে।
অনেকের কাছে এটি পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প; আবার অন্যদের কাছে এক নির্ভরতা ছেড়ে অন্য নির্ভরতা বেছে নেওয়া। আসল প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো কি নিজেদের স্বার্থে নিয়ম প্রণয়নের জন্য যথেষ্ট ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে?
অপরদিকে ওয়াশিংটন এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অংশীদার, আর তাদের তৈরি করা সংকটের কারণেই আজ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী হিসেবে যে ভাবমূর্তি, তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ইতিমধ্যেই হিসাব মেলাতে শুরু করেছে—তারা সামরিক সরঞ্জামের জন্য মার্কিন ছত্রচ্ছায়ায় থাকলেও কূটনৈতিক সংকট নিরসন ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য চীনের ওপর বাজি ধরছে।
এককথায়, চীনের উপযোগিতা ঠিক এখানেই যে তারা ওয়াশিংটনের মতো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে না।
এই হিসাব-নিকাশ বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম আর নৌবাণিজ্য পথ অচল হয়ে পড়ার দৃশ্য দেখা ইরাক, মিসর বা আলজেরিয়ার কাছে চীনের এই সংযম বেশ আকর্ষণীয়।
ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা সামলানোর উপায়
বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য এ পরিস্থিতি এক কঠিন সিদ্ধান্তের সৃষ্টি করেছে। যেখানে ট্রাম্প নিজেই চীনের সঙ্গে আবার সম্পর্ক জোরদার করছেন, সেখানে এই দেশগুলোকে চীনের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এমন এক অনুভূতি তীব্র হচ্ছে যে দুই পরাশক্তি নিজেদের স্বার্থে বোঝাপড়া বজায় রাখলেও সম্পর্কের টানাটানির মাশুল দিতে হচ্ছে অন্যদের।
এর প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ভারত বহুমুখী ভারসাম্য বজায় রাখছে—রাশিয়ান তেল কেনার পাশাপাশি তারা মার্কিন প্রযুক্তি ও চীনা বিনিয়োগকেও স্বাগত জানাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া তাদের ‘মুক্ত ও সক্রিয়’ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের সঙ্গেই প্রতিরক্ষা চুক্তি করছে।
আবার দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিল ব্রিকসকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত করছে; এটি কোনো পশ্চিমাবিরোধী পদক্ষেপ নয়, বরং অন্যদের তৈরি করা নিয়মকানুনের খাঁচা থেকে নিজেদের রক্ষা করার একধরনের বিমা। ট্রাম্প-সি সম্মেলন যে এই ভারসাম্য রক্ষার কৌশল তৈরি করেছে, তা নয়, তবে নিশ্চিতভাবেই এটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এআই ও নিয়মনীতি নির্ধারণের লড়াই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিকাশ বৈশ্বিক দক্ষিণের সামনে আরেক নতুন সংকট তৈরি করেছে: এই সংক্রান্ত নিয়মকানুন আদতে ঠিক করবে কে? এআইয়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সি চিন পিংয়ের জোর দেওয়া কিংবা ট্রাম্পের নতুন কোনো নীতিমালার বিরোধিতা করা—এই দুটিই দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে, যার কোনোটির কেন্দ্রেই বৈশ্বিক দক্ষিণের স্বার্থ নেই।
দুই পক্ষই এআই সংলাপে রাজি হয়েছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে অবহিতকরণ ব্যবস্থা চালু নিয়ে আলোচনা করছে ঠিকই, তবে কোনো বাধ্যতামূলক নীতি এখনো গড়ে ওঠেনি। অনেক দেশকেই অন্যের তৈরি এআই সিস্টেম, পরিকাঠামো ও মানের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে, যেখানে ওই নীতিমালা প্রণয়নে তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না।
চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মডেলকে আমেরিকার করপোরেট-চালিত ব্যবস্থার চেয়ে কিছুটা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, তবে শেষ বিচারে তা একধরনের নির্ভরতাই।
তবে বৈশ্বিক দক্ষিণও একদম হাত গুটিয়ে বসে নেই। ভারত নিজস্ব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরি করছে এবং নিজস্ব ডিজিটাল অবকাঠামো রপ্তানি করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেকে প্রধান এআই হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আর আফ্রিকান ইউনিয়ন তথ্য-সার্বভৌমত্ব কাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে আফ্রিকান দেশগুলো নিজেদের ডেটা ও ডিজিটাল পরিকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে।
এই উদ্যোগগুলো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, এগুলো থেকে স্পষ্ট যে মার্কিন বা চীনা মডেলের যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা এড়ানোর একটি প্রবল ইচ্ছা রয়েছে। বেইজিংও নিজস্ব চিন্তাধারাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এর অংশ হিসেবে তারা ‘গ্লোবাল এআই গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ’ চালু করেছে এবং ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ গঠনে সহায়তা করেছে। গত জুলাইয়ে সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে ২৯টি দেশ ওই সংস্থার প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
অনেকের কাছে এটি পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প; আবার অন্যদের কাছে এক নির্ভরতা ছেড়ে অন্য নির্ভরতা বেছে নেওয়া। আসল প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো কি নিজেদের স্বার্থে নিয়ম প্রণয়নের জন্য যথেষ্ট ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে?
আড়ম্বরপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার বাইরে, এই সম্মেলনের স্পষ্ট বার্তা ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে। ওয়াশিংটন ছবি তোলার সুযোগ এবং সাময়িক শুল্কছাড় হাসিল করতে পেরেছে। তবে বেইজিং পেয়েছে আরও বড় কৌশলগত সুবিধা—যে শর্তে তারা সম্পর্ক পরিচালনা করতে চেয়েছিল, তার স্বীকৃতি।
বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য এই বৈঠক তাদের অনুসৃত নীতিকেই আবারও নিশ্চিত করেছে। নীতিটি হলো, সম্ভব হলে কোনো পক্ষের বলয়ে না ভিড়ে দুই পরাশক্তির সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখা এবং এই প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা।
ওয়েনরান জিয়াং ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার চায়না ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং ম্যাকট্যাগার্ট রিসার্চ চেয়ারের ইমেরিটাস অধ্যাপক।
আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।