যুক্তরাষ্ট্র-চীনের এআই যুদ্ধ কতটা ভয়ংকর হতে যাচ্ছে

মার্কিন-চীনের মধ্যে এআই নিয়ে দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠেছেরয়টার্স

সময়টি যেন কোনোভাবেই উপযোগী নয়। এআই প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে যখন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হি লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে ‘গুজব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম চায়না ডেইলির এক সম্পাদকীয়তে অভিযোগ করা হয়েছে, চীনের এআই অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতেই যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এ প্রযুক্তির গতি কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বা চীন—কোনো দেশই এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে রাজি নয়। আবার একটি দেশ আরেকটিকে বিশ্বাসও করে না। এদিকে দ্রুত বিকাশমান এআই প্রযুক্তি কূটনীতির চূড়ান্ত অগ্রগতির জন্য অপেক্ষা করবে না।

তবে এই কঠিন সত্যগুলোর মানে এই নয় যে ট্রাম্প ও সি চিন পিং এআই নিয়ে আলোচনার আহ্বানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করবেন।

আরও পড়ুন

মার্কিন-চীন কূটনীতির দুটি চিরাচরিত ফাঁদ এড়িয়েই যেকোনো আলোচনা পরিচালনা করতে হবে: এত কম লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেন সেই আলোচনা অর্থহীন হয়ে পড়ে; অথবা এত বেশি প্রত্যাশা রাখা, যা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।

লক্ষ্য যদি খুব ছোট হয়, তবে সংলাপটি স্রেফ কিছু ছবির সুযোগ এবং উদ্ভাবন বৃদ্ধি ও ঝুঁকি কমানোর কিছু সাধারণ বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আবার বিপরীত দিকে লক্ষ্য যদি অনেক বড় হয়—যেমন এমন কিছু কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, যা কোনো দেশের রাজনৈতিক আস্থা বা তদারক করার সক্ষমতার মধ্যে পড়ে না—তবে সেই বৈঠক ব্যর্থ হতে বাধ্য।

প্রথম পথটি বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হয়, আর দ্বিতীয়টি বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে পারে না।

প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যান্য বিষয় বা শর্ত ছাড়াই এআই–সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হওয়া উচিত
রয়টার্স

এআই নিরাপত্তার টেকসই পথ

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য হতে পারে একই সঙ্গে এআই নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া এবং ব্যবহারে নিজেদের অগ্রগতি প্রমাণ করা। উভয় দেশের তৈরি এআই ব্যবস্থাগুলোকে নিজ নিজ জায়গায় আরও নিরাপদ করার জন্য প্রযুক্তিগত বিনিময়ের মাধ্যমে এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়া উচিত।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেওয়ার আগেই এআই–সংক্রান্ত উদীয়মান দুর্ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণে একটি যোগাযোগ প্রটোকল তৈরি করা প্রয়োজন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী বক্তব্য বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতির চেয়ে এই পদক্ষেপগুলো অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত এমন প্রযুক্তিগত বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া, যা মডেলগুলোর বিপজ্জনক আচরণ বা সক্ষমতা পরীক্ষা করতে সাহায্য করবে, যেসব ঝুঁকি দুই দেশের কেউই দেখতে চায় না; যেমন অপেশাদার কাউকে জৈব অস্ত্র তৈরিতে সাহায্য করা বা মানুষের নজরদারি এড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করা।

মার্কিন এআই কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর ধরে এসব ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করছে এবং চীনও তাদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় নীতিতে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেছে। কীভাবে এসব ঝুঁকি পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও সেরা কৌশলগুলো বিনিময় করলে উভয় দেশেরই নির্মিত এআই–ব্যবস্থাগুলো অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন

এই প্রযুক্তিগত বিনিময়ের জন্য পরাশক্তি দুটির মধ্যে গভীর ‘বিশ্বাস’, ‘প্রতিদান’ বা এআই–সংক্রান্ত ঝুঁকিতে একমত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি চালিত হবে সম্পূর্ণ নিজস্ব স্বার্থের কারণে। সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলগুলো যত শক্তিশালী হয়ে উঠবে, দুটি দেশের জন্যই সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা তত জরুরি হয়ে পড়বে, তা সেগুলো যেখানেই তৈরি বা ব্যবহার করা হোক না কেন।

এর জন্য উভয় দেশকে তাদের মডেল টেস্টিং, নজরদারি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি এমন তথ্য শেয়ার করতে হবে, যা প্রতিযোগিতা বা জাতীয় নিরাপত্তা ব্যাহত না করেও নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করে।

এই কূটনীতি কোনো ঢালাও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মতো নয়; বরং এটি এমন একটি প্রযুক্তির জন্য নিরাপত্তাবিধি ও কার্যপ্রণালি তৈরি করা, যা কোনো সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই। এখানে বিষয়টিকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না, বরং মূল কথা হলো, যেকোনো এক পক্ষ এআই–ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে তা কোনো দেশের জন্যই শুভ হবে না।

একটি সুদূরপ্রসারী চুক্তিতে পৌঁছানোর মতো রাজনৈতিক পরিবেশ এখন তৈরি হয়নি। ট্রাম্প যেমন যুক্তরাষ্ট্রের এআই উদ্ভাবনের গতি কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, তেমনি বেইজিং মার্কিন নীতিগুলোকে তাদের প্রযুক্তি বিকাশে বাধা দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছে। কোনো পক্ষই প্রযুক্তির চূড়ান্ত উন্নয়নে কোনো নিষেধাজ্ঞা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি সফল করতে হলে অবশ্যই দুই দেশের সরকারের মধ্যে সরাসরি একটি ‘সংকট-যোগাযোগ প্রটোকল’ থাকতে হবে। ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো এআই মডেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কোনো চীনা কোম্পানি বা সরকারের নেটওয়ার্কে সাইবার হামলা চালাল; অথবা চীনের একটি এআই–চালিত ড্রোন কোনো মার্কিন নৌযানে আঘাত করল এবং ঘটনাটি দুর্ঘটনা নাকি ইচ্ছাকৃত, তা সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল না।

আবার ধরা যাক, ওয়াশিংটন জানতে পারল যে চীনা একটি মডেল বিপজ্জনক সাইবার হামলা চালাচ্ছে, কিন্তু তা বেইজিংয়ের নির্দেশে হচ্ছে নাকি কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, তা জানা যাচ্ছে না।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ধরনের ঝুঁকিগুলোকে উড়িয়ে দিয়েছেন, এগুলো ঠিক তেমন নয়; তবে বাস্তবে ঘটে চলা নানা ঘটনার সঙ্গে এর বেশ মিল রয়েছে। দুই দেশেরই এখন থেকে এসব পরিস্থিতি সামলানোর প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করা দরকার।

এই যোগাযোগমাধ্যম কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে এর বাস্তবিক কাঠামোর ওপর।

কোন ধরনের ঘটনাকে জানানোর মতো দুর্ঘটনা বলে গণ্য করা হবে? নির্ধারিত যোগাযোগকারী ব্যক্তি কারা হবেন? এবং তথ্যফাঁদ না ফেলে কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে যে এটি কোনো অননুমোদিত ঘটনা ছিল? এসব প্রশ্নের প্রাথমিক উত্তর খুঁজে পেতে হলেও গভীর ও তথ্যভিত্তিক কূটনীতির প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

এ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হওয়া উচিত যেকোনো ঘটনার তথ্য প্রথম দিকে মৌখিকভাবে না জানিয়ে লিখিতভাবে পাঠানো। চীনে যেখানে নানা কমিটি ও নথির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেখানে তাৎক্ষণিক ভুল–বোঝাবুঝি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

লিখিত বার্তা পাঠানোর ফলে চীনের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো সেটি বিশ্লেষণ করে একটি সুচিন্তিত জবাব দেওয়ার সময় পাবে, যা হয়তো কোনো একক কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারতেন না। এতে বার্তার ভুল ব্যাখ্যা বা বিকৃতির আশঙ্কাও কমে আসবে।

অবশ্য এ পদ্ধতিও বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কারণ, উত্তেজনা চূড়ান্ত রূপ নিলে চীন প্রায়ই সংকটকালে যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দেয় বা ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানায়। তবে অন্তত এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ফোন না তোলার জটিলতা দূর করা সম্ভব হবে।

ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের বৈঠকে এআই নিয়ে আলোচনা হতে পারে
ফাইল ছবি

বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনার কৌশল

প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যান্য বিষয় বা শর্ত ছাড়াই এ–সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হওয়া উচিত। বেইজিং যদি উন্নত চিপ এবং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের এআই নিরাপত্তার বিষয়টি শর্তযুক্ত করতে চায়, তবে ওয়াশিংটনকে স্পষ্টভাবেই বিষয় দুটি আলাদা রাখতে হবে।

এআই নিরাপত্তা কূটনীতির মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে পরম বন্ধুতে পরিণত করা নয়; বরং তাদের প্রতিযোগিতার পরিণতি যেন এমন কিছু না হয়, যা কোনো পক্ষই চায় না।

একটি সুদূরপ্রসারী চুক্তিতে পৌঁছানোর মতো রাজনৈতিক পরিবেশ এখন তৈরি হয়নি। ট্রাম্প যেমন যুক্তরাষ্ট্রের এআই উদ্ভাবনের গতি কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, তেমনি বেইজিং মার্কিন নীতিগুলোকে তাদের প্রযুক্তি বিকাশে বাধা দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছে। কোনো পক্ষই প্রযুক্তির চূড়ান্ত উন্নয়নে কোনো নিষেধাজ্ঞা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখনো তার ঘরোয়া এআই খাতকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, যা কূটনৈতিক আলোচনার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক এ কারণেই দুটি দেশের একটি ছোট পরিসর থেকে কাজ শুরু করা দরকার।

আরও পড়ুন

ছোট দিয়ে শুরু করার অর্থ কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এআইয়ের রাজনীতি অনেকটাই বদলে গেছে এবং প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়ন উভয় দেশের সমীকরণ বদলাতে থাকবে।

আসন্ন মার্কিন-চীন বৈঠকই শেষ কথা নয়। ছোট একটি উদ্যোগ থেকেও টেকসই ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে, যা প্রযুক্তিগত ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।

আজ হয়তো বিষয়টি অসম্ভব মনে হতে পারে, তবে ভবিষ্যতে কোনো একদিন উভয় দেশই হয়তো বুঝতে পারবে, এআইয়ের দৌড়ে কে জিতবে, তা নিয়ে একমত না হলেও এটি যেন হাতছাড়া না হয়ে যায়, সে বিষয়ে তাদের একমত হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

  • জুলিয়ান গেউয়ার্টজ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের গবেষক। ম্যাট শিহান চায়না এআই ইনিশিয়েটিভের সহপরিচালক।

    টাইম থেকে সংক্ষেপে অনূদিত