এত আন্দোলন–সংগ্রামের পরও পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের আমেরিকা বা ইউরোপীয় ধনী দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ হ্রাস বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিরোধে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা পর্যাপ্ত নয়। অথচ এই সব দেশই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

মিসরের শার্ম আল-শেখ শহরে ৭ নভেম্বর ২৭ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের প্রাক্কালে ‘শেষ প্রজন্ম’ নামে একটি পরিবেশবাদী সংগঠন তাদের আন্দোলনকে চরমপন্থায় নিয়ে গেছে। এই পরিবেশবাদীরা আমস্টারডাম সিফোল বিমানবন্দরের রানওয়েতে প্রবেশ করে বিমান উড্ডয়নে বাধা দেয়। লন্ডন, মাদ্রিদ ও বার্লিনের মিউজিয়ামে বিখ্যাত চিত্রকরদের ছবিগুলোয় আলুর স্যুপ নিক্ষেপ করে বা আঠাজাতীয় কিছু লাগিয়ে দেয়।
৫ নভেম্বর গ্রিনপিস ও শেষ প্রজন্ম সংগঠন দুটির ৫০০ বিক্ষোভকারী আমস্টারডাম সিফোল বিমানবন্দরের রানওয়েতে ঢুকে পড়েন। অনেকে সাইকেল নিয়েও প্রবেশ করতে সমর্থ হন। এসব বিক্ষোভকারী প্রাইভেট জেট বিমানকে উড্ডয়ন করতে বাধা দেন।

গ্রিনপিসের ঘোষণা অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা প্রাইভেট জেট বিমান উড্ডয়ন করতে বাধা দিয়েছেন। সিফোল বিমানবন্দর থেকে কম ফ্লাইটের জন্য এবং বিশেষ করে ব্যক্তিগত জেটের বিরুদ্ধে তাঁরা বিক্ষোভ দেখান। নেদারল্যান্ডসের গ্রিনপিসের ডিউই জলোচ জানান, ‘আমরা কম ফ্লাইট, আরও ট্রেন এবং অপ্রয়োজনীয় স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইট এবং ব্যক্তিগত জেটের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি করছি।’ হল্যান্ডের পুলিশ আমস্টারডাম সিফোল বিমানবন্দরে বিক্ষোভকারীদের মধ্য থেকে বেশ কিছু লোককে গ্রেপ্তার করে।

৫ নভেম্বর স্পেনের মাদ্রিদে বিখ্যাত প্রাডো মিউজিয়ামে স্পেনের বিখ্যাত শিল্পী ফ্রান্সেসকো ডি গোয়ার দুটি বিখ্যাত চিত্রকর্মের ফ্রেম দুটির দেয়ালে দুই তরুণ–তরুণী +১,৫ সেন্টিগ্রেড লিখে দেয়। উল্লেখ্য ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছর +১,৫ সেন্টিগ্রেড বৈশ্বিক উষ্ণতা বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রাডো মিউজিয়ামের নিরাপত্তাকর্মীরা আসার আগপর্যন্ত তাঁরা ছবি দুটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘জলবায়ুর প্রতি অবহেলা  আমাদের খাদ্যনিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে।’ এই পরিবেশবাদী গোষ্ঠী কেবল উদ্ভিদভিত্তিক পণ্য ব্যবহার করে—এমন কৃষিকে সমর্থন করে জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করছে বলে দাবি করে। পরে পুলিশ এই দুই পরিবেশবাদীকে গ্রেপ্তার করে।

মাদ্রিদের এই ঘটনার পরদিন ৬ নভেম্বর বার্লিনের সন্নিকটে পটসডামের বারবেরিনি মিউজিয়ামে রক্ষিত ক্লদ মনের একটি চিত্রকর্ম জলবায়ুকর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। পরিবেশবাদীরা ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট ক্লদ মনের ১৮৯০ সালে আঁকা পেইন্টিং ‘গ্রেনস্ট্যাকস’ ছবিটির ওপর আলুর স্যুপ নিক্ষেপ করেন। তবে পেইন্টিংটি কাচ দিয়ে ফ্রেমে সুরক্ষিত ছিল বলে ততটা ক্ষতি হয়নি। তবে আরও হামলার ভয়ে পটসডামের বারবেরিনি মিউজিয়াম ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মাদ্রিদ ও পটসডামের মিউজিয়াম দুটিতে এ ধরনের ঘটনার আগে পরিবেশবাদীরা লন্ডনের ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারিতে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের একটি সূর্যমুখী চিত্রকর্মে টমেটোর স্যুপ নিক্ষেপ করেন। ‘লাস্ট জেনারেশন’ বা ‘শেষ প্রজন্ম’–এর সদস্য দুই তরুণী চিত্রকর্মগুলোয় হামলার দায় স্বীকার করে বলেছেন, রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি পৌঁছাতেই জাদুঘরে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইউরোপজুড়ে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের কারণে যথেষ্ট অর্জন থাকলেও কিছু পরিবেশবাদীর চরমপন্থী আন্দোলনের কারণে পরিবেশবাদীদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। জার্মানির সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্লডিয়া রথ এক বিবৃতিতে বলছেন, ‘আমার দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু সুরক্ষার জন্য শিল্পের ওপর আক্রমণ, অবশ্যই একটি ভুল পদ্ধতি।’

জলবায়ু রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে শিল্পকর্মের ওপর হামলা নিয়ে ইউরোপে এখন নানা আলোচনা–সমালোচনা হচ্ছে। হঠাৎ করে জাদুঘরগুলোর অমূল্য শিল্পকর্ম কেন জলবায়ুকর্মীদের বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হলো, তা অনেকের কাছে বোধগম্য নয়।

এসব ঘটনা ছাড়া বার্লিন শহরের রাজপথে পরিবেশবাদী গোষ্ঠী শেষ প্রজন্মের অধিকারকর্মীরা হঠাৎ রাজপথ দখল করে রাস্তার ট্র্যাক সিগন্যালে নিজেদের শেকল অথবা শক্ত টেপ দিয়ে বেঁধে রাস্তা বন্ধ রাখার কৌশল নেন। এই কর্মসূচির কারণে দুই সপ্তাহ আগে বার্লিনে সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত আহত এক সাইকেলচালকের মৃত্যু হয়। বার্লিনের পুলিশ জানিয়েছে, জরুরি সেবা অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো না পৌঁছানোর কারণেই ৪৪ বছর বয়সী ওই নারী সাইকেল আরোহী মারা যান। এই ঘটনার পরও এই সংগঠনের সদস্যরা বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখে রাস্তা দখল কর্মসূচি পালন করেছেন।

ইউরোপজুড়ে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের কারণে যথেষ্ট অর্জন থাকলেও কিছু পরিবেশবাদীর চরমপন্থী আন্দোলনের কারণে পরিবেশবাদীদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। জার্মানির সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্লডিয়া রথ এক বিবৃতিতে বলছেন, ‘আমার দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু সুরক্ষার জন্য শিল্পের ওপর আক্রমণ, অবশ্যই একটি ভুল পদ্ধতি।’
জার্মানির প্রুশিয়ান কালচারাল হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট হারমান পারজিঞ্জার বলেছেন, ‘চিত্রকর্মের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে তাঁরা জলবায়ুর জন্য কিছু করছেন, তা আমি বিশ্বাস করি না। কেবল জলবায়ু রক্ষার নামে বিশ্বজুড়ে দ্রুত পরিচিত হওয়ার জন্য তাদের এই পথ সন্ধান করা সঠিক নয়।’

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা পরিবেশের জন্য ইউরোপীয় পরিবেশবাদীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন সর্বজনবিদিত, তবে তা যেন কোনো চরমপন্থার কারণে মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়।

  • সরাফ আহমেদ প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি
    [email protected]