সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় গত ১২ ডিসেম্বর। ওই দিন থেকে নির্বাচনপূর্ব সময় শুরু হয়েছে। কেননা, সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮–এর বিধি ২ (৬) অনুসারে ‘নির্বাচনপূর্ব সময়’ বলতে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার দিন থেকে নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়সীমাকে বোঝায়।
নানা কারণেই এবারের নির্বাচন বিশেষ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে। একদিকে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, অন্যদিকে ২০০৮ সালের পর নিজস্ব দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে আগের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর জামায়াতে ইসলামী কি তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারল? নাকি নির্বাচনপূর্ব সময়ে কিছু ভুল কৌশল অবলম্বনের মাশুল তাদের দিতে হতে পারে সংসদ নির্বাচনে? এ প্রসঙ্গে গত প্রায় দুই মাসে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন প্রচারণাসংক্রান্ত কয়েকটি পদক্ষেপ বা ঘটনা বিশ্লেষণ করা যাক।
বাংলাদেশে যতগুলো দল ইসলামপন্থী রাজনীতি করে, জামায়াতে ইসলামী তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির চর্চা করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটি ৩৮টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিলেও প্রার্থীরা দুটি আসনে জয়লাভ করেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পর তারাই সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী জোটসঙ্গী হওয়ার পর এককভাবে এই প্রথম এমন বৃহৎ পরিসরে জামায়াতে ইসলামী ভোটের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে।
নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশের অনেক আগে থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সমাবেশগুলোয় নানা পরিকল্পনা ও কর্মসূচির মাধ্যমে জনসংযোগ শুরু করে। তবে এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় যে দুটি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, তা হচ্ছে ধর্ম ও নারী।
যেহেতু জামায়াতে ইসলামীর দর্শন ও আদর্শ ইসলাম ধর্মকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়, ধর্মীয় সেই প্রভাব স্পষ্টভাবে নেতা-কর্মীদের বক্তব্য-বিবৃতিতেও পরিলক্ষিত হয়, বিশেষ করে নারীকেন্দ্রিক বিষয়গুলোয়।
যেমন নির্বাচনপূর্ব এই সময়ে জামায়াতের আমির বারবার বিভিন্ন জনসভায় নারীদের কর্মঘণ্টা ও নারী নেতৃত্ব নিয়ে তাদের দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তাঁর মতে, নারীদের কর্মঘণ্টা ৮ থেকে ৫ ঘণ্টায় কমিয়ে আনা যেতে পারে এবং ইসলাম অনুযায়ী নারীদের কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আসারও সুযোগ নেই।
এই বক্তব্যগুলোর সঙ্গে সঙ্গে আরও সমালোচনার ঝড় ওঠে, যখন জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা পূর্ববর্তী ডাকসুকে ‘বেশ্যাখানা’ বলে অভিহিত করেন এবং পরে দলটির আমিরের এক্স হ্যান্ডেলের একটি পোস্টে কর্মজীবী নারীদের কাজকে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়। যদিও ওই নেতা তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চান এবং জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টটি হ্যাকড হওয়ার দাবি করা হয়। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে আগে নারীদের নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য অনেকটাই ভোটের হিসেবে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের নির্বাচনী প্রচারণায় বলতে শোনা গিয়েছে, জামায়াত ইসলামীকে ভোট দিলে জান্নাতের টিকিট পাওয়া যাবে বা জামায়াতে ইসলামীকে ভোট না দিলে হাশরের দিনে সৃষ্টিকর্তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এটা সত্যি যে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের সমর্থন নিশ্চিত করতে নানামুখী কৌশল অবলম্বন করে।
ধর্ম ও ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিজেদের সুবিধামতো না দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর উচিত ছিল নির্বাচনপূর্ব সময়ে এ বিষয়গুলোয় আরও সৎ ও স্পষ্ট দলীয় অবস্থান নেওয়ার; বিশেষ করে একজন দলপ্রধানের বক্তব্য নির্বাচনপূর্ব সময়ে ভীষণ গুরুত্ব বহন করে। কেননা, এর দ্বারা বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে আমরা যেমন দলটির অবস্থান সম্পর্কে বুঝতে পারি, ঠিক তেমনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করে দলের সেই অবস্থানের প্রতি আমাদের আস্থা বা অনাস্থারও প্রতিফলন ঘটাতে পারি।
কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রত্যন্ত একটি গ্রামের স্থানীয় ভোটাররা যে কথায় সহজেই বিশ্বাস রাখবেন, শহরের উচ্চশিক্ষিত একজন নাগরিক হয়তো আস্থা রাখবেন তাঁর জীবনের মান উন্নয়নসংক্রান্ত কোনো প্রতিশ্রুতিতে।
কিন্তু গণমাধ্যমের এই যুগে মুহূর্তের মধ্যেই কুড়িগ্রাম কিংবা নীলফামারীর নির্বাচনী প্রচারণার ভিডিও দেখতে পাওয়া যায় দেশে–বিদেশ যেকোনো জায়গা থেকে। এবং ঠিক এই জায়গাটিতে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী বক্তব্য নিয়ে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে বলেই মনে হয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর আপামর জনসমর্থনের যে স্বাদ তারা পেয়েছে, সেই জনপ্রিয়তার সঙ্গে একইভাবে তাদের বক্তব্যও চলে এসেছে নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এর আগে দেশের দুই বৃহত্তম দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনী জোট ও যুগপৎ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ায় সেভাবে ভোটের রাজনীতির লাইমলাইটে আসতে পারেনি এই দল। কিন্তু এবারের ভিন্ন পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ সব নেতার বক্তব্য ও বিবৃতি নিয়ে প্রতিনিয়ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার–বিশ্লেষণ চলছে, যা দলটির জন্য একেবারেই নতুন একটি অভিজ্ঞতা।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনপূর্ব সময়ে জামায়াতের আমিরের কিছু বক্তব্য ভোটারদের কিছুটা হলেও দ্বিধাবিভক্ত করেছে বলে মনে হয়।
যেমন কিছুদিন আগেই আল–জাজিরার সঙ্গে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির তাঁদের দলের নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনা ও ১৯৭১ সালের গণহত্যায় তাঁদের ভূমিকা নিয়ে যা বলেছেন, তা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি অনেকেই।
প্রথমত, দলটিতে নারী নেতৃত্ব না আসার কারণ হিসেবে তিনি ইসলাম ধর্মের নিয়মের কথা বলেছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অনেক ধর্মীয় বিশেষজ্ঞই এ বিষয়ে একমত নন। আমরা যদি অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের দিকে তাকাই, দেখব যে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্কের মতো দেশে নারীরা দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ইসলামে নারী নেতৃত্ব নিয়ে বিধিনিষেধ থাকলে এসব রাষ্ট্র কি নারী নেতৃত্বকে অনুমোদন করত? তা ছাড়া জামায়াতে ইসলামী নিজেও ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত চার-দলীয় জোটের শরিক হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাদের চার–দলীয় জোটটি বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং জামায়াত সরকারের অংশীদারও হয়। তাই জামায়াতে ইসলামীর নারী নেতৃত্ব নিয়ে তাত্ত্বিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়াকে জোটের নেতা মেনে নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হওয়াটা তাদের রাজনৈতিক কৌশল, নাকি আদর্শিক অবস্থান নিয়ে দ্বিচারিতা?
সবচেয়ে বড় কথা জামায়াতে ইসলামীর এই দলগত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সংবিধানের মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ২৮–এর পরিপন্থী। কেননা, এই অনুচ্ছেদে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী–পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করতে নিষেধ করা হয়েছে (২৮.১) এবং রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভের কথা বলা হয়েছে (২৮.২)।
কাজেই একজন নারীর কোনো একটি দল বা দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম বা সংবিধানে কোনো নিষেধ আছে—এমনটি বলা যায় না।
দ্বিতীয়ত, আল–জাজিরাকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা প্রসঙ্গে আমির বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয় সেই সময়ে। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে এ–ও বলেন, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।
তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, জামায়াতে ইসলামীর কেউ যদি ১৯৭১ সালে কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকত, তাহলে কেন ৭১–পরবর্তী শেখ মুজিব সরকার দলটির কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করেনি?
অথচ আমরা জানি, ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি দালালদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের আদেশ জারি করা হলে জামায়াতে ইসলামী নেতা এ কে এম ইউসুফ—যিনি ১৯৭১ সালে গঠিত তথাকথিত মালেক মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন—তাঁকে দালাল আইনের অধীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া শহীদ বুদ্ধিজীবী লেখক শহীদুল্লা কায়সারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে তৎকালীন আলবদরের সদস্য খালেক মজুমদারকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু এসব রায় পরবর্তী সময়ে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তৎকালীন সরকার কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার পর ১৯৭৩ সালে অভিযুক্ত অনেকেই কারাগার থেকে মুক্তি পান। (মহিউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামী, পৃ: ৯৯, ১২৯ ও ১৪২)।
এর বাইরেও দালাল আদেশ মোতাবেক তদন্তের জন্য হাজিরা না দিয়ে পলাতক থাকার কারণে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক প্রধান নেতা গোলাম আযমের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় ১৯৭২ সালে এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর নাগরিকত্বও বাতিল করা হয়। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন সময়ে তিনি নিজেই সাক্ষ্য দেন, ‘ওই সময়ে দালাল (সহযোগী) হিসেবে তালিকায় আমার নাম ছিল’ (দ্য ডেইলি স্টার, ১৩ মে, ২০১২ )।
এ ছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার কারণে ১৯৭২ সালে দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এভাবে দেশি–বিদেশি অসংখ্য দলিল ও পত্রপত্রিকায় ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণহত্যায় জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। এ কারণে জামায়াতে ইসলামী যতবার ইতিহাসের এই দায়কে অস্বীকার করবে, তত বেশি দেশপ্রেমী প্রতিটি মানুষের কাছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
পরিশেষে বলতে চাই, ধর্ম ও ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিজেদের সুবিধামতো না দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর উচিত ছিল নির্বাচনপূর্ব সময়ে এ বিষয়গুলোয় আরও সৎ ও স্পষ্ট দলীয় অবস্থান নেওয়ার; বিশেষ করে একজন দলপ্রধানের বক্তব্য নির্বাচনপূর্ব সময়ে ভীষণ গুরুত্ব বহন করে। কেননা, এর দ্বারা বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে আমরা যেমন দলটির অবস্থান সম্পর্কে বুঝতে পারি, ঠিক তেমনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করে দলের সেই অবস্থানের প্রতি আমাদের আস্থা বা অনাস্থারও প্রতিফলন ঘটাতে পারি।
তাই শুধু এবারের নির্বাচন নয়, ভবিষ্যতের যেকোনো নির্বাচনের ক্ষেত্রেই জামায়াতে ইসলামীকে নারী নেতৃত্বসহ একাত্তরে তাদের ভূমিকা নিয়ে দলগতভাবে দায় স্বীকারের একটি স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নিয়ে এ দেশে ভোটের রাজনীতি করতে হবে বলে মনে করি।
উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব
