আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে সেই পুরোনো প্রলোভনের কথা নিশ্চয়ই জানেন। যে ধারণা বলে, আপনি যদি যথেষ্ট শক্তিশালী হন, তাহলে বাস্তবতাকেও নিজের ইচ্ছেমতো বাঁকাতে পারবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীন এই বিশ্বাসই মূলনীতিতে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে।
এটি খুব বুদ্ধিদীপ্ত কোনো কৌশল নয়; বরং এটি অনেকটা একটি উচ্চঝুঁকির জুয়া, যা দাঁড়িয়ে আছে একটি দুর্বল ধারণার ওপর—সামরিক শক্তিই ঠিক বা ভুল নির্ধারণ করে; আর আপনি যদি যথেষ্ট চাপ দেন, তাহলে যেকোনো প্রতিপক্ষ শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করবে।
এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তথাকথিত ‘সর্বোচ্চ চাপের’ অভিযান—কঠোর নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিকভাবে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা এবং সব সময় সামরিক পদক্ষেপের হুমকি পেছনে রেখে দেওয়া। লক্ষ্য হলো তেহরানকে প্রায় সব বিষয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা—তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের ভূমিকা। সমস্যা হলো এই পদ্ধতি পুরোপুরি ভুলভাবে বোঝে—ইরান আসলে কেমন ধরনের দেশ এবং এ ধরনের অসম সংঘাতগুলো সাধারণত কীভাবে এগোয়।
ইরান এমন কোনো দুর্বল শাসনব্যবস্থা নয়, যা ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক দশক ধরে দেশটি চাপের মধ্যে টিকে থাকতে শিখেছে—জোট গড়ে তুলে, প্রক্সি নেটওয়ার্ক তৈরি করে এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও এগিয়ে চলার মতো স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করে।
ইতিহাস বারবার এই সত্য প্রমাণ করেছে। কিউবা বা উত্তর কোরিয়ার দিকে তাকান—কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি খুব কম ক্ষেত্রেই এ ধরনের মতাদর্শিক রাষ্ট্রগুলোকে ভাঙতে পারে; বরং এগুলো সাধারণত তাদের আরও একগুঁয়ে করে তোলে। ইরানকে ভাঙা আরও কঠিন—কারণ, এর বৃহত্তর জনসংখ্যা, নিজ অঞ্চলে গভীরভাবে প্রোথিত এবং আরও পরিশীলিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো। শুধু চাপ প্রয়োগ করে ওয়াশিংটনের কিছু নীতিনির্ধারক যে পরিষ্কার বিজয়ের আশা করেন, তা প্রায় কখনোই অর্জিত হয় না।
এখানে আরেকটি বিপজ্জনক স্ববিরোধিতাও আছে। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে তারা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চায় না, অথচ তারা যা করছে, তার সবই যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। আপনি যখন কোনো দেশের বিরুদ্ধে এই মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ চাপিয়ে দেন, তখন তারা এটিকে আলোচনা হিসেবে দেখে না, তারা এটিকে নিজেদের ধ্বংসের চেষ্টা হিসেবে দেখে। এমন পরিবেশে পাল্টা প্রতিরোধ করাই যৌক্তিক মনে হতে শুরু করে।
ইরানের ক্ষেত্রে প্রতিটি নতুন চাপের ধাপই শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে প্রিয় বয়ানটিকে আরও শক্তিশালী করে—তারা বিদেশি ‘দাদাগিরি’র বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে ব্যবস্থাটিকে দুর্বল করার বদলে, এই কৌশল উল্টো সেই শক্তিগুলোকেই আরও মজবুত করছে, যেগুলোকে এটি ভাঙতে চায়।
উপসাগরীয় অঞ্চলের ঘটনাগুলো, প্রক্সিদের ব্যবহার এবং পারমাণবিক সীমাবদ্ধতা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা—সবই ইঙ্গিত দেয় যে ইরান আত্মসমর্পণের বদলে প্রতিপক্ষের জন্য খরচ বাড়াতে প্রস্তুত।
এখানেই শক্তির বিভ্রম সত্যিকার অর্থে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই; কিন্তু তার মানে এই নয় যে এরপর কী ঘটবে তা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। আর সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হলেও পরবর্তী প্রশ্নটি হবে নির্মম—তারপর কী?
শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ধারণা কারও কাছে আকর্ষণীয় শোনাতে পারে; কিন্তু এর পরবর্তী বিশৃঙ্খলা একে দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে প্রয়োজন হবে সেই ধৈর্যশীল কূটনীতি, যেটিকে এই নীতিই ইতিমধ্যে ধ্বংস করে দিয়েছে। যেভাবেই হোক, আমেরিকার ঝুঁকি হলো এমন এক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল চক্রে আটকে যাওয়া, যার কোনো স্পষ্ট বের হওয়ার পথ নেই।
কূটনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল। পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসা এবং এত কঠোর অবস্থান নেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররাও বিরক্ত হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো কিছু সংলাপ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, যখন ওয়াশিংটন আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। এই বিভক্তি নিষেধাজ্ঞাকে দুর্বল করে এবং ইরানকে কৌশলগতভাবে চলার সুযোগ দেয়।
দিনের শেষে এই পদ্ধতি একটি বাস্তবসম্মত আলোচনাভিত্তিক চুক্তিকে প্রায় অসম্ভব করে তুলছে। তাহলে সফলতা আসলে দেখতে কেমন? যদি লক্ষ্য হয় ইরানের আচরণ পুরোপুরি বদলে দেওয়া, তাহলে এই কৌশল সম্ভবত সেখানে পৌঁছাতে পারবে না। আর যদি লক্ষ্য শুধু তাদের আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা হয়, তাহলে শর্তগুলোকে বাস্তবসম্মত হতে হবে। এই মুহূর্তে ওয়াশিংটন যেন সবচেয়ে খারাপ দুই পরিস্থিতির দিকেই এগোচ্ছে—একদিকে দুর্বল হলেও অটুট একটি প্রতিরোধী ইরান, অন্যদিকে ভাঙনধরা জোট এবং বৃহত্তর সংঘাতের দিকে ধাবিত একটি অঞ্চল।
আসল সমস্যা আরও গভীরে। সেটি হলো সেই পুরোনো মানসিকতা, যা মনে করে শক্তিই সবকিছুর বৈধতা দেয়। বাস্তবে এই চিন্তাভাবনা প্রায়ই উল্টো ফল দেয়। এটি উপেক্ষা করে কীভাবে বৈধতা, স্থানীয় বাস্তবতা এবং জাতীয় গর্ব আসলে ফলাফল নির্ধারণ করে।
ইরানের ক্ষেত্রে প্রতিটি নতুন চাপের ধাপই শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে প্রিয় বয়ানটিকে আরও শক্তিশালী করে—তারা বিদেশি ‘দাদাগিরি’র বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে ব্যবস্থাটিকে দুর্বল করার বদলে, এই কৌশল উল্টো সেই শক্তিগুলোকেই আরও মজবুত করছে, যেগুলোকে এটি ভাঙতে চায়।
একটি ভালো পথ হতে পারে শক্তিপ্রয়োগের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা, মিত্রদের সঙ্গে আবার একই অবস্থানে ফিরে আসা এবং এমন একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলা, যা উভয় পক্ষের বাস্তব উদ্বেগগুলো মোকাবিলা করবে—সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ দাবি না করেই। এর অর্থ এই নয় যে কোনো চাপ থাকবে না; বরং আরও বুদ্ধিদীপ্ত চাপ থাকবে, যা উত্তেজনা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।
ঝুঁকি অত্যন্ত বড়। জেতার অযোগ্য একটি যুদ্ধ শুধু নীতিগত ভুলই হবে না, এটি হবে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। শক্তির বিভ্রম হয়তো মুহূর্তের জন্য শক্তিশালী মনে হতে পারে; কিন্তু তার পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি হবে যন্ত্রণাদায়ক এবং তা বহু বছর ধরে স্থায়ী হবে।
গ্রেগ পেন্স আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিষয়ক লেখক
মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।