গঙ্গা ব্যারাজ সম্পর্কে উত্থাপিত ১০ প্রশ্নের উত্তর কোথায়

ভারতের ফারাক্কার অভিজ্ঞতা দেখায়, এই ব্যারাজ সেখানে উজান ও ভাটির জন্য এমন কঠিন সমস্যার সৃষ্টি করেছে যে তা এখন একটি ফাঁসে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তেমনটা হতে পারে কি না, তা নিয়ে লিখেছেন নজরুল ইসলাম ও মো. খালেকুজ্জামান

কৃ্ত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহযোগিতায় তৈরি প্রতীকী ছবি

গঙ্গা ব্যারাজ নিয়ে ১০ প্রশ্ন

গত ২২ আগস্ট রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।

সেখানে আমরা ব্যারাজ সম্পর্কে ১০টি প্রশ্ন তুলে ধরি। ১. এই ব্যারাজ নিয়ে এত গোপনীয়তা কেন? ২. ব্যারাজ কি শুধু বর্ষাকালের পানি শীতকালে ব্যবহার করবে? ৩. ভাটি এলাকার ওপর ব্যারাজের অভিঘাতের আলোচনা কোথায়? ৪. গঙ্গার বর্ষাকালীন প্রবাহ এখন শাখাগুলোয় প্রবাহিত হয় না কেন? ৫. দক্ষিণ-পশ্চিমের জলাবদ্ধতার সমস্যার সমাধান কোথায়? ৬. ব্যারাজের উজানে পলি পতন, বন্যা এবং পাড়ভাঙনের বিষয়ে কতটা আশ্বস্ত হওয়া যায়? ৭. পাংশার উজানে ব্যারাজের বিভিন্ন উপকারিতার অনুমান কতখানি নির্ভরযোগ্য? ৮. এই ব্যারাজ কি গঙ্গার পানি ভাগাভাগির ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল করবে না? ৯. এত পুরোনো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিকল্পনা কেন? ১০. বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বিশাল বাজেটের প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্প গ্রহণ সমীচীন কি?

আরও পড়ুন

পানিসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো থেকে সদুত্তরের অভাব

সরকারের পক্ষে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং যেসব সংস্থা এই ব্যারাজ প্রকল্প প্রণয়নে মূল ভূমিকা পালন করেছে, তাদেরই এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়া উচিত ছিল। তবে পাউবো প্রায় কখনোই জনসমক্ষে এসে তাদের প্রকল্পগুলো সম্পর্কে আলোচনা করতে আগ্রহী হয় না।

বাপা ও বেন দেশের পানিসম্পদ নিয়ে এ পর্যন্ত বহু সম্মেলনের আয়োজন করেছে। কিন্তু আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও পাউবোর প্রতিনিধিরা এসব সম্মেলনে যোগ দিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা এবং তার সঠিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেননি। ২২ আগস্টের মতবিনিময় সভায়ও দৃশ্যত তাদের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না।

সম্ভবত পাউবোর এখন আর অভ্যন্তরীণ কারিগরি সক্ষমতা তেমন নেই। এসব কাজের জন্য তারা পুরোপুরিভাবেই বাইরের গবেষণা-পরামর্শক সংস্থার ওপর নির্ভর করে। প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং এর ডিজাইন ইত্যাদিও পাউবোর জন্য করেছে ডিসিসি নামক একটি সংস্থা, যার সহযোগী হয়েছে আইডব্লিউএম (ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং), সিইজিআইএস (সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল এবং জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস) এবং ডেটা এক্স নামের একটি সংস্থা।

পাউবোর দায়িত্ব ছিল এটা নিশ্চিত করা, যাতে এসব সংস্থা থেকে প্রতিনিধিরা বাপা-বেনের মতবিনিময় সভায় এসে প্রকল্পবিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। বাপা ও বেনের পক্ষ থেকেও এসব সংস্থাকে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

পাউবোর দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে, নাকি বাপা-বেনের সরাসরি আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে, তা বলা কঠিন। তবে এসব সংস্থা থেকে দুজন এই মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁদের একজন একসময় সিইজিআইএসের প্রধান ছিলেন এবং এখন অবসরপ্রাপ্ত। সম্ভবত যখন এই ব্যারাজ প্রকল্প প্রণীত হয়েছিল (২০১৬ সালের আগে) তখন তিনি কর্মরত ছিলেন এবং এ প্রকল্প প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন। অন্যজন এসেছিলেন আইডব্লিউএম থেকে, যেখানে তিনি এ প্রকল্প প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং এখনো কর্মরত।

সিইজিআইএসের সাবেক প্রধান জানান, ভাটি এলাকার ওপর ব্যারাজের অভিঘাত নিয়ে বাস্তবায়ন-সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের পরিশিষ্টের একটি খণ্ডে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সভাস্থলের প্রায় সবাই তাঁকে অনুরোধ করেন পরিশিষ্টের এই খণ্ড সবার সঙ্গে শেয়ার করার জন্য। পরে তাঁর সঙ্গে এই খণ্ডের জন্য যোগাযোগও করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দেননি।

প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, বাপার পক্ষ থেকে অনেক আগেই প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজের বাস্তবায়ন-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং তার সব পরিশিষ্ট শেয়ার করার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু জনগুরুত্বসম্পন্ন তথ্যের ওপর জনগণের অধিকার–সংক্রান্ত (আরটিআই) আইন থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ এই আবেদনে সাড়া দেয়নি।

আইডব্লিউএমের প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, প্রবন্ধ লেখকেরা; অর্থাৎ আমরা, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের কার্যনির্বাহী সারাংশও ভালো করে পড়িনি। এটা অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নেই। তবে যাঁরা তাঁদের প্রতিবেদন গোপন রেখেছেন এবং আনুষ্ঠানিক আবেদন সত্ত্বেও শেয়ার করেননি, তাঁদের একজন প্রতিনিধির পক্ষে অন্যদের বিরুদ্ধে সে প্রতিবেদন না পড়ার অভিযোগ আনা কতটা সংগতিপূর্ণ, সেটা একটা চিত্তাকর্ষক বিষয়।

বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কতখানি কার্যকর

তাঁদের প্রণীত ব্যারাজ প্রকল্প কত উন্নত মানের, সেটা বোঝানোর জন্য আইডব্লিউএমের এই প্রতিনিধি একাধিকবার উল্লেখ করেন যে অনেক বিদেশি বিশেষজ্ঞ এই প্রকল্প প্রণয়নের কাজে সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন। বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন প্রয়াসের ইতিহাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকলে হয়তো তিনি বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এত উৎসাহ প্রদর্শন করতেন না। ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: পাস্ট, প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার শীর্ষক ৮২২ পৃষ্ঠার বইয়ে নজরুল ইসলাম এই ইতিহাস বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে বাংলাদেশে পানি উন্নয়নের যে ট্র্যাজেডি, তার মুখ্য কারিগর এসব বিদেশি বিশেষজ্ঞ। যেসব বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা বিনা বাক্যে তাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদের দায়িত্বও কম নয়।

কাজেই বহু বিদেশি বিশেষজ্ঞ জড়িত ছিলেন বলেই একটি প্রকল্প ভালো, এই ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মনে হচ্ছে আমাদের অনেক প্রকৌশলী এখনো বেরিয়ে আসতে পারেননি। আরও চমকপ্রদ যে আইডব্লিউএমের প্রকৌশলী যে তালিকা নিয়ে গর্ব করলেন, তার মধ্যে পাকিস্তানও ছিল। হঠাৎ করে এই পাকিস্তান-অনুরাগ কেন, সেটাও কৌতূহলোদ্দীপক।

আরও পড়ুন
প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য গোপন রেখে সরকার বরং নানা সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। আইডব্লিউএমের প্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, আমরা নাকি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের কার্যনির্বাহী সারাংশ ভালো করে পড়িনি। বাস্তবতা সম্ভবত উল্টো। তাঁরা হয়তো আশা করেননি যে এই সারাংশ আমরা এত খুঁটিয়ে পড়ব যে এই ব্যারাজের নামে জনগণকে যে একটা বড় ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, সেটা উদ্‌ঘাটিত হয়ে যাবে।

বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পক্ষে যে বাংলাদেশের নদ–নদীর সমস্যা সঠিকভাবে অনুধাবন এবং তার সমাধান প্রস্তাব করা কঠিন তার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ আমরা দেখলাম তিস্তা প্রকল্প নিয়ে। কিছুকাল আগপর্যন্তও পাউবো ও সংশ্লিষ্ট পরামর্শক সংস্থাগুলো প্রায় সবাই চীনা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রণীত তথাকথিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নিয়ে মহা উৎসাহী ছিল।

আমরা যখন এ প্রকল্পের সমালোচনা করেছি, তখন তারা আমাদের ওপর রুষ্ট হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের যৌক্তিক অবস্থানের মুখে চীনারা তাদের প্রথম বাস্তবায়ন-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রত্যাহার করে প্রকল্পের জন্য একটি সংশোধিত ডিজাইন হাজির করে।কিন্তু আমরা দেখাই, সেটাও গোঁজামিলে পূর্ণ। (এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে উৎসাহীরা দেখুন আমাদের পুস্তিকা সংকটে তিস্তা নদী—সমাধান কোন পথে?)

আমাদের এই যৌক্তিক সমালোচনার মুখে চীনাদের মহাপরিকল্পনা, বলা যেতে পারে পরিত্যক্ত হয়েছে এবং সরকার এখন বহুলাংশে দেশীয় পারদর্শিতার ভিত্তিতে এবং বস্তুত আমাদের প্রস্তাবিত ধারায় তিস্তা নদীর সমস্যার সমাধান খোঁজায় ব্যাপৃত হয়েছে। এই পটভূমিতে আইডব্লিউএমের প্রকৌশলী কর্তৃক তাদের ব্যারাজ প্রকল্পের সঠিকতার দাবির সপক্ষে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের বরাত দেওয়া একই সঙ্গে বিসদৃশ ও দুঃখজনক।

২২ আগস্টের মতবিনিময় সভার পর প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সভায় উত্থাপিত ১০টি প্রশ্নের একটিরও কোনো উত্তর সরকার কিংবা পাউবো ও সংশ্লিষ্ট পরামর্শক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাদের পক্ষে সবচেয়ে সহজ ছিল প্রথম প্রশ্নটির (এত গোপনীয়তা কেন?) প্রতি সাড়া দিয়ে ব্যারাজ–সংক্রান্ত তথ্য, যেমন বাস্তবায়ন-সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন এবং এর পরিশিষ্টগুলো জনগণের কাছে উন্মুক্ত করা। যদি সেখানে এমন কিছু থাকে, যা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে গোপন রাখা দরকার, সে অংশটুকু কালো কালি দিয়ে আড়াল করে দেওয়া যেতে পারে। তবে এ ধরনের অংশ কী হতে পারে, সেটা ভেবে পাওয়া কঠিন।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারেজ কি দ্বিতীয় ফারাক্কা হবে

প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য গোপন রেখে সরকার বরং নানা সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। আইডব্লিউএমের প্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, আমরা নাকি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের কার্যনির্বাহী সারাংশ ভালো করে পড়িনি। বাস্তবতা সম্ভবত উল্টো। তাঁরা হয়তো আশা করেননি যে এই সারাংশ আমরা এত খুঁটিয়ে পড়ব যে এই ব্যারাজের নামে জনগণকে যে একটা বড় ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, সেটা উদ্‌ঘাটিত হয়ে যাবে।

প্রথম থেকেই এই ব্যারাজের প্রবক্তারা দেশবাসীকে বোঝাচ্ছিলেন যে এর মূল উদ্দেশ্য হলো বর্ষাকালে পানি ধরে রেখে শীতকালে ব্যবহার করা। কিন্তু আমরা কার্যনির্বাহী সারাংশতে প্রদত্ত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই দেখিয়েছি যে ব্যারাজ দিয়ে গঙ্গার বর্ষাকালের মোট প্রবাহের মাত্র ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে।

আমরা আরও দেখিয়েছি, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে গঙ্গার পাঁচটি শাখা নদ–নদী (বড়াল, ইছামতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী এবং চন্দনা-বারসিয়া) এবং গোদাগাড়ী ও ভেড়ামারা পাম্পস্টেশনে যে মোট ৬৯৮ কিউমেক পানি প্রবাহিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার মাত্র ২০৯ কিউমেক (৩০ শতাংশ) বর্ষাকালের সঞ্চিত পানি থেকে আসতে পারে এবং বাকি ৪৮৯ কিউমেক (৭০ শতাংশ) আসতে হবে গঙ্গার চলতি প্রবাহ থেকে, যার পরিমাণ ১ হাজার ২৯৫ কিউমেক।

আমরা আশা করি, বাংলাদেশের জনগণ বিষয়টির প্রতি সচেতন হবেন; প্রস্তাবিত ব্যারাজ শুধু বর্ষাকালের পানি শীতকালে ব্যবহার করবে—এই মিথ্যা আশ্বাসে বিভ্রান্ত হবেন না এবং ভারতের ফারাক্কা যে করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে, প্রস্তাবিত ব্যারাজের নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ফারাক্কা দ্বারা সেই একই পরিণতির দ্বিগুণ মাত্রায় পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেবেন না।

ফলে ব্যারাজের কারণে পাংশায় গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ প্রায় ৬০: ৪০ অনুপাতে ভাগাভাগি হবে; অর্থাৎ গোয়ালন্দের দিকে গঙ্গার প্রবাহ এখনকার তুলনায় আরও প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পাবে।

প্রস্তাবিত ব্যারাজ হবে আরেকটি ফারাক্কা। কারণ, এখন ফারাক্কায়ও গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মোটামুটি আধা–আধি ভাগ হয়। প্রস্তাবিত ব্যারাজের কারণে পাংশার ভাটিতে গঙ্গার প্রবাহ এত বিরাট পরিমাণে হ্রাস পাবে, সে বিষয়টি আড়াল করার জন্যই সম্ভবত ভাটি এলাকার ওপর এর অভিঘাত সম্পর্কে সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের কার্যনির্বাহী সারাংশ এত নীরব। সে জন্যই সম্ভবত ব্যারাজের প্রবক্তারা এত অসন্তুষ্ট। কারণ, যে বিষয়টি তাঁরা হয়তো আড়াল করতে চেয়েছিলেন, সে বিষয়টি আমরা প্রকাশ করে দিয়েছি।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

বল এখন সরকারের কোর্টে

বল এখন সরকারের কোর্টে। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা জেনেশুনে দেশের ভেতরে আরেকটি ফারাক্কা বানাবে, নাকি তারা বিষয়টি নিয়ে আবার ভাববে। ভারতের ফারাক্কার কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য ২২ আগস্টের মতবিনিময় সভায় আমরা যে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছি, তা বাস্তবায়নের ধারায় অগ্রসর হবে।

সংক্ষেপে এগুলো হচ্ছে: ১. গঙ্গার শাখা-প্রশাখায় সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে বর্ষাকালীন প্রবাহ বৃদ্ধি; ২. টিআরএম কর্মসূচির সম্প্রসারণের মাধ্যমে পোল্ডারগুলোর সঙ্গে নদী খাতের সংযোগ ক্রমান্বয়ে পুনঃস্থাপন; ৩. উপকূলের বাঁধগুলোকে ক্রমান্বয়ে অষ্টমাসি বাঁধে রূপান্তর; ৪. বাংলাদেশজুড়ে জলাধার বিচ্ছুরিত করা এবং ৫. ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা।

ভারতের ফারাক্কার অভিজ্ঞতা দেখায়, এই ব্যারাজ সেখানে উজান ও ভাটির জন্য এমন কঠিন সমস্যার সৃষ্টি করেছে যে তা এখন একটি ফাঁসে পরিণত হয়েছে। এ ফাঁসের বিরুদ্ধে ভারতে জনমত ক্রমেই প্রবল হচ্ছে। এ অভিজ্ঞতা থাকার পরও যদি সরকার বাংলাদেশে দ্বিতীয় ফারাক্কা নির্মাণে অগ্রসর হতে চায়, তাহলে সেটা হবে নিতান্তই পরিতাপের।

তবে আমরা আশা করি, বাংলাদেশের জনগণ বিষয়টির প্রতি সচেতন হবেন; প্রস্তাবিত ব্যারাজ শুধু বর্ষাকালের পানি শীতকালে ব্যবহার করবে—এই মিথ্যা আশ্বাসে বিভ্রান্ত হবেন না এবং ভারতের ফারাক্কা যে করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে, প্রস্তাবিত ব্যারাজের নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ফারাক্কা দ্বারা সেই একই পরিণতির দ্বিগুণ মাত্রায় পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেবেন না।

  • নজরুল ইসলাম অধ্যাপক, এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান

  • মো. খালেকুজ্জামান অধ্যাপক, কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়, লক হেভেন, যুক্তরাষ্ট্র

    মতামত লেখকদের নিজস্ব