পদ্মা না গঙ্গা ব্যারাজ? যেসব সমালোচনার সমাধান আমাদের হাতেই আছে

প্রতীকী ছবি

গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে অনলাইন ও গণমাধ্যমে যে সমালোচনা চলছে তার বেশির ভাগই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিটি সমস্যারই প্রকৌশলগত ও বৈজ্ঞানিক সমাধান আছে। দরকার শুধু সৎ সাহস ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বের অভিজ্ঞতা প্রকল্পের নকশায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

গঙ্গা থেকে পদ্মা ব্যারাজ: সমস্যার শুরু এখান থেকেই

১৯৬৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এটি গঙ্গা ব্যারাজ নামেই পরিচিত ছিল। এখন বলা হচ্ছে পদ্মা ব্যারাজ। দেশের মানুষ পদ্মা বলেই চেনে, তাই নামটা স্বাভাবিক লাগে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতিতে নদীর নাম শুধু ভূগোল নয়, সার্বভৌমত্বের ভাষা। চীন মেকংকে সর্বদা ‘লানকাং’ বলে ডাকে, কারণ সেই নামে সে ভাটির দেশগুলোর ওপর উজানের নিয়ন্ত্রণকে কূটনৈতিকভাবে বৈধ করে নেয়। একইভাবে চীন ব্রহ্মপুত্রকে ‘ইয়ারলুং সাংপো’ বলে, মানে তিব্বতের নদী, চীনের নদী।

বাংলাদেশ যদি শুধু ‘পদ্মা’ বলে, তাহলে কূটনৈতিক বার্তা দাঁড়ায়: এটি আমাদের মাটিতে আসার পরের নদী, উজানের বিষয়ে আমাদের দাবি নেই। অথচ আমরা চাই গঙ্গা চুক্তির নবায়নে শুধু ফারাক্কার প্রবাহ নয়, উজানে উত্তর প্রদেশ-বিহার থেকে পুরো অববাহিকার পানি প্রত্যাহারের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত হোক।

১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্দেশীয় পানি সনদের ৫ ও ৬ অনুচ্ছেদ ন্যায়সংগত ও যুক্তিসংগত ব্যবহারের অধিকার দেয়। এই অধিকার দাবি করতে হলে নদীকে আন্তর্জাতিক নামেই ডাকতে হবে। গঙ্গা নামটি সরাসরি আন্তর্জাতিক নদীর ওপর ভাটির দেশের হস্তক্ষেপের দাবি প্রতিষ্ঠা করে এবং ২০২৬ সালের চুক্তি নবায়নের আলোচনার টেবিলে এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান মজবুত করবে।

সমস্যা এক: উজানে পলি জমবে, বন্যা বাড়বে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাংশায় ব্যারাজ হলে উজানে পলি জমে নদীতল উঁচু হবে এবং পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার এলাকায় বন্যা ও পাড়ভাঙন তীব্র হবে। ফারাক্কার তথ্য বলছে, ব্যারাজের গেটগুলো উচ্চ প্রবাহের সময় আসা পলির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আটকে দেয় এবং ফারাক্কার উজানের কিছু অংশে নদীতল ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে গেছে। পাংশা পয়েন্টে গঙ্গা বছরে আনুমানিক ৪৫০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে। এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনার চরাঞ্চলের কোটি মানুষ কোথায় যাবেন?

এই আশঙ্কা সত্যিকারের। কিন্তু সমাধানও বিশ্বে প্রমাণিত। জাপানের তেনরু নদীর শাখা মিবু নদীতে মিওয়া বাঁধে ২০০৬ সাল থেকে চালু একটি পলি বাইপাস টানেল বার্ষিক মোট পলির ৭৬ শতাংশ সরাসরি ভাটিতে পাঠিয়ে দেয়। ১২ বছরের পরিচালনায় মোট ১৪টি অভিযানে ১৭ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পলি জলাধারে জমতে না দিয়ে ভাটিতে পাঠানো সম্ভব হয়েছে এবং পরিবেশের ওপর কোনো বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। এর পাশাপাশি ‘স্লুইসিং’ বা ‘ড্রডাউন ফ্লাশিং’ পদ্ধতিতে উচ্চ প্রবাহের সময় জলাধারের পানির স্তর নামিয়ে দেওয়া হয়, ফলে পলি জমার আগেই সেটা দ্রুতগতিতে ভাটিতে বের হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো খনন, স্লুইসিং ও ফ্লাশিংয়ের মিশ্র পদ্ধতি। ব্যারাজের নকশায় ১৮টি আন্ডারস্লুইস রাখার কথা আছে। বর্ষার শুরুতে পলিভরা পানির প্রথম ঢেউ আসার সময় এই স্লুইসগুলো খুলে পলি বের করে দেওয়া এবং পলির স্তর কমে আসার পরে পানি মজুত শুরু করার একটি বৈজ্ঞানিক পরিচালনা নির্দেশিকাই হবে এই সমস্যার আসল সমাধান।

সমস্যা দুই: ইলিশের মাইগ্রেশন বন্ধ হবে

ফারাক্কার কারণে উজানে ইলিশের উৎপাদন ৯২ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল। এলাহাবাদ, বাক্সার, ভাগলপুরে একসময় প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত, ফারাক্কা তৈরির পরে সেসব এলাকায় ইলিশ ধরা পড়ার হার এখন নগণ্য। বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন দুই বছরে ৭১ হাজার টনের বেশি কমে গেছে, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে ব্যারাজের মাছ চলাচলের পথের কাঠামো যথেষ্ট কি না, সেই কারিগরি বিশ্লেষণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

তবে ফারাক্কায় গেট ও ফিশ লক পরিবর্তন করার পরে তিন দশকের বিরতিতে উত্তর প্রদেশ, বিহার ও ঝাড়খন্ডে ইলিশ আবার ধরা পড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ সঠিকভাবে নকশা করা ফিশ লক কাজ করে। ইলিশ তীব্র স্রোতের বিপরীতে লাফিয়ে চলতে পছন্দ করে না, তাই প্রথাগত ফিশ ল্যাডার কাজ করে না। দরকার ইলিশের শরীরের দৈর্ঘ্য, সাঁতারের গতি ও মাইগ্রেশন ঋতু বিশ্লেষণ করে প্রস্থ, গভীরতা ও প্রবাহের বেগ নির্ধারণ করা। পদ্মা ব্যারাজের নকশায় দুটি মাছ চলাচলের পথের উল্লেখ আছে, কিন্তু এর কারিগরি বিশেষত্ব জনসমক্ষে আসেনি। ফারাক্কার ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ফিশ পাস চালু রাখার প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার অভাব। পদ্মায় সেই একই ভুল না করাটাই সমাধান।

আরও পড়ুন

সমস্যা তিন: ভারতের সঙ্গে চুক্তি ছাড়া পানি মিলবে না

ব্যারাজ পানি নিয়ন্ত্রণ করে, তৈরি করে না। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় পাংশায় একটি নির্দিষ্ট মাত্রার শুষ্ক মৌসুমি প্রবাহ ধরে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এই অনুমানের পেছনে কোনো নতুন চুক্তি নেই, স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা নেই, বাধ্যবাধকতামূলক পানি ছাড়ার সময়সূচি নেই। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ এ বছরই শেষ হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করছেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে ভারতের সঙ্গে নতুন গঙ্গা চুক্তির আলোচনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ভারত বলতে পারবে: তোমরা তো ব্যারাজ দিয়ে ম্যানেজ করছ, আর বেশি পানি চাইছ কেন?

সমাধান হলো একটি দ্বিস্তরীয় কৌশল। প্রথমত, গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলোচনার সঙ্গে ব্যারাজের নির্মাণ পরিকল্পনাকে সরাসরি যুক্ত করা। দুটি স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয়, সম্পূরক। দ্বিতীয়ত, চুক্তি না হলেও বর্ষার নিজের পানি ধরে রাখার ওপর বেশি জোর দেওয়া। বাংলাদেশ প্রতি বর্ষায় প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার পানি পায়, যার বিশাল অংশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাগরে নেমে যায়। মূল নকশা অনুযায়ী জলাধারের ধারণক্ষমতা প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনমিটার। এর সঙ্গে উজানে বিল ও খাল সংস্কার করে বর্ষার অতিরিক্ত ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধরে রাখলে শুষ্ক মৌসুমে অন্তত দুই মাস ফারাক্কানির্ভরতা কমানো সম্ভব। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের শীতলীকরণ পানির বিকল্প উৎস হিসেবেও এই জলাধার কাজ করবে। ২০২৬-এর চুক্তি নবায়নের টেবিলে গঙ্গা ব্যারাজকে আমাদের ‘কূটনৈতিক লিভারেজ’ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে

আরও পড়ুন

সমস্যা চার: সমীক্ষা পুরোনো, নকশা ১৩ বছর আগের

পানিসম্পদমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, ২০০৪ সালে শুরু হওয়া বিস্তারিত সমীক্ষাটি ২০১৩ সালে সম্পন্ন হয় এবং সেই ভিত্তিতেই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে পাংশা পয়েন্টের সেই নকশা বাতিল করা হয়েছিল নকশায় ত্রুটি এবং উজানে পলি, জলাবদ্ধতা ও পাড়ভাঙনের আশঙ্কার কারণে। সেই একই পাংশা পয়েন্টে এখন নতুনভাবে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, কিন্তু ২০১৭ সালের সমস্যাগুলোর কারিগরি সমাধান জনসমক্ষে স্পষ্ট করা হয়নি। এ ছাড়া আইপিসিসির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ২০৫০ সাল নাগাদ বর্ষার সর্বোচ্চ প্রবাহ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে। ২০১৩ সালের নকশায় ১০০ বছরের বন্যা ধরা হয়েছিল ৯০ হাজার কিউমেক। নতুন জলবায়ু বাস্তবতায় স্পিলওয়ে ধারণক্ষমতা আবার মডেলিং করা জরুরি।

গত এক দশকে হিমালয় অঞ্চলে বৃষ্টির ধরন, গ্লেসিয়ার গলা এবং বর্ষার সময় দ্রুত বদলেছে। ফলে ২০১৩ সালের সমীক্ষা দিয়ে ২০৫০ সালের পদ্মা বোঝা সম্ভব নয়। অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেছেন, উন্নত প্রযুক্তি ও সতর্ক নকশার মাধ্যমে এই ঝুঁকিগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু ‘সতর্ক নকশা’ মানে পুরোনো নকশা নয়, নতুন তথ্যের ভিত্তিতে নতুন মূল্যায়ন।

বিশ্বে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন পর্যালোচনা একটি মানদণ্ড। নেদারল্যান্ডসের ডেলফ্ট হাইড্রোলিকস, যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস আর্মি কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স বা বিশ্বব্যাংকের টেকনিক্যাল প্যানেল এমন মূল্যায়নে সক্ষম।

এই মূল্যায়নে যা থাকতে হবে: ২০২৬ সালের নদীপ্রবাহ ডেটার ভিত্তিতে আপডেটেড লোকেশন সিলেকশন, হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং, পলি বাজেট বিশ্লেষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ২০১৭ সালে যে নকশা ত্রুটি ধরা পড়েছিল সেটা সংশোধন হয়েছে কি না তার স্বচ্ছ যাচাই এবং নতুন টেকনোলজি সংযুক্তকরণ। মাত্র তিন থেকে ছয় মাসের কাজ। ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের আগে এটুকু সময় ব্যয় অপচয় নয়, বিনিয়োগ সুরক্ষা।

আরও পড়ুন

সমস্যা পাঁচ: ভাটির মানুষেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন

পাংশার ভাটিতে গোয়ালন্দ পর্যন্ত আরও ২০ থেকে ২৩ কিলোমিটার নদী। পাংশায় সব পানি আটকে রাখা হলে এই অংশটি ‘ডাবল ফারাক্কা’ পরিস্থিতিতে পড়বে: উজানে ফারাক্কা আটকায়, ভাটিতে পাংশা আটকায়, মাঝখানে নদী নিঃশেষ। পাংশা থেকে দক্ষিণে প্রবাহ কমলে আড়িয়াল খাঁ, কুমার, গড়াই অঞ্চলে লবণাক্ততা আরও বাড়বে। গড়াইতে শুষ্ক মৌসুমে ১৯৮৮ সাল থেকে কার্যত কোনো প্রাকৃতিক প্রবাহ নেই। এর ফলে খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা দ্বিগুণ এবং বরদিয়া পয়েন্টে সর্বোচ্চ লবণাক্ততা আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

সমাধান হলো ব্যারাজের পরিচালনা নীতিতে বাধ্যতামূলক পরিবেশগত প্রবাহ নিশ্চিত করা। পাংশায় মার্চ মাসে গড় শুষ্ক মৌসুমি প্রবাহ প্রায় ১,২০০ কিউমেক। দক্ষিণ আফ্রিকার ডেস্কটপ রিজার্ভ মডেল অনুযায়ী এর ২০ শতাংশ, অর্থাৎ ২৪০ কিউমেক ছাড়ার বাধ্যবাধকতা পরিচালনা নির্দেশিকায় রাখতে হবে। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এই নীতিমালা আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালনা নির্দেশিকায় এটি সংযুক্ত করা সম্ভব।

কিছু না করারও একটি বিশাল মূল্য আছে

৫০ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প অভ্যন্তরীণ বাজেট, বিদেশি ঋণ না পিপিপিতে হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। অর্থায়নের শর্ত ও ব্যয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ বিষয়ে সমালোচনারও বৈজ্ঞানিক উত্তর থাকা দরকার। নিজেদের টাকায় এত বিশাল খরচের ভার বহন উচিত হবে না। তবে কিছু না করারও একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্য আছে।

ফারাক্কার কারণে হিসনা-মাথাভাঙা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়াসহ একাধিক নদীব্যবস্থা শুকিয়ে গেছে এবং কৃষি, মৎস্য, বনায়ন, নৌ–চলাচল ও বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, গড়াই নদী শুকিয়ে যাওয়ায় খুলনা-সাতক্ষীরায় প্রতি বছর ৩ হাজার কোটি টাকার ফসলহানি হচ্ছে। নৌপরিবহন বন্ধ থাকায় বছরে ক্ষতি আরও ৮০০ কোটি টাকা। ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ায় ৭১ হাজার টন মাছ কম ধরা পড়ছে, যার বাজারমূল্য ৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যারাজ না করলেও বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা হারাচ্ছে। গড়াই শুকিয়ে গেলে খুলনার লবণাক্ততা বাড়বে, কৃষি কমবে, সুন্দরবনের মিঠাপানির ভারসাম্য নষ্ট হবে।

সমালোচকদের একটি অংশ বলেন, শুধু খনন ও বিল-খাল সংস্কার করলেই হয়। কিন্তু গবেষণা বলছে, শুধু খনন দিয়ে গড়াইয়ে তিন মাসের বেশি পানি ধরে রাখা যায় না। আবার শুধু ব্যারাজ করলেও উজানে পলি জমবে। তাই সমাধান একক নয়: ব্যারাজের সঙ্গে পলি বাইপাস, অফ-টেক খাল ও বিল সংরক্ষণের সমন্বিত পদ্ধতিতেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বাঁচবে। এটাই আসলে ২১০০ ডেল্টা প্ল্যান, যা আমাদের জন্য বানিয়ে দিয়েছিল নেদারল্যান্ডস এবং যার কথা এখন কেউই বলে না।

বলা হয়ে থাকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে মিঠাপানির জন্য। আমাদের যেভাবে পানি হারাচ্ছে, শুধু গঙ্গা ব্যারাজ দিয়ে হবে না। আমাদের লাগবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নদী–খাল খনন, পানির স্তর ফিরিয়ে আনার জন্য বৃষ্টিকে ব্যবহার, কৃষিতে এডব্লিউডি প্রয়োগ, আন্তনদী সংযোগসহ অনেক কিছু। কিন্তু সবচেয়ে বড় দরকার হচ্ছে ১৯৯৭–এর জাতিসংঘের আন্তর্দেশীয় পানি সনদ রেটিফাই করা।

তাই বাংলাদেশের সামনে এখন আসল প্রশ্ন ব্যারাজ হবে কি হবে না নয়, আসল প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোকে কীভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করা হবে। সমালোচকেরা যে প্রশ্নগুলো তুলছেন সেগুলো উড়িয়ে দেওয়ার নয়, বরং সেগুলোর উত্তর প্রকল্পের নকশায় ও পরিচালনা নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার। প্রশ্ন শুধু একটি: বাংলাদেশ কি পানি ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যতের রাষ্ট্র হবে, নাকি কেবল উজানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা একটি ভাটির দেশ হয়েই থাকবে?

  • সুবাইল বিন আলম প্রকৌশলী, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সেন্টার ফর সায়েন্স টেক এবং পলিসি ডিপ্লোমেসি এবং বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক। [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব