এম সাখাওয়াত হোসেনের কলাম
তেহরান থেকে ফিরে: ‘যুদ্ধরত’ ইরানকে যেমন দেখলাম
সম্প্রতি ইরানের রাজধানী তেহরানে গিয়েছিলেন এম সাখাওয়াত হোসেন। এই লেখায় তিনি তাঁর সেই সফরের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তিন দিনের জন্য ইরানের রাজধানী তেহরানে গিয়েছিলাম। ইরান পাবলিক প্রাইভেট হসপিটালের (আইপিএইচ) সঙ্গে যুক্ত মেডিক্যাল ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠান টেব মেডিক্যাল ট্যুরিজমের আমন্ত্রণে এই সফর। আমাদের দলটি ছোট ছিল—মাত্র তিনজনের। এর আগে ২০১৯ সালে আমরা কয়েকজন প্রায় ১৭ দিনের জন্য ইরান সফর করেছিলাম। সে সময় ইরানের বহু দর্শনীয় জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
বাংলাদেশিদের জন্য ইরানে চিকিৎসার সুযোগ ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে একজন ইরানি চিকিৎসক ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। আলোচনায় তাঁরা বাংলাদেশে ক্যানসার ও ফার্টিলিটি সেন্টার স্থাপনের কথা বলেন। এবারের তেহরান সফরেও ইরানের মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট একই প্রস্তাব রেখেছিলেন।
পরে তেহরানে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়। তাঁরা বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে তাঁদের আগ্রহের কথা জানান। বাংলাদেশের অনুমোদন পাওয়া গেলে ঢাকা–তেহরান সরাসরি যোগাযোগ শুরু করতে ইরানের আগ্রহের কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
ইরান বা এককালের পারস্য সম্পর্কে যাঁরা অল্পবিস্তর জানেন, তাঁরা মানবসভ্যতার বিকাশে এই অঞ্চলের অবদান সম্পর্কেও অবগত। সাহিত্য, স্থাপত্যসহ সভ্যতার নানা ক্ষেত্রে তৎকালীন পারস্য তথা আজকের ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক শতাব্দী ধরে ফারসি এই উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদালত ও প্রশাসনের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারস্যের সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট ব্যাবিলন জয় করেন। সেই বিজয়ের পর তাঁর নামে একটি ঘোষণা পোড়ামাটির সিলিন্ডারে খোদাই করা হয়, যা আজ ‘সাইরাস সিলিন্ডার’ নামে পরিচিত। মূল সিলিন্ডারটি এখন লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা আছে। ২০১৯ সালের সফরে পারসেপোলিস ও সাইরাস সিলিন্ডারের একটি প্রতিলিপি দেখার সুযোগ হয়েছিল।
২.
প্রায় সাত বছর পর ইরানের রাজধানীতে দ্বিতীয়বার গেলাম। এবার এলাম এক ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা নিহত হন। এরপর ইরানের পাল্টাহামলা ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাকে যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি ইরান তার প্রতিবেশীদের ওপর যেন হামলা চালাতে না পারে এবং ইরানিরা নিজেদের নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটাতে পারেন—এমন পরিস্থিতি তৈরি করার কথাও বলেছেন তিনি।
আমার মনে হয়েছে, যুদ্ধের ফলে ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা বাস্তবে ফল দেয়নি; বরং আমার সফরকালে যাঁদের দেখেছি, তাঁদের অনেকের মধ্যেই বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষে সমর্থনের মনোভাব লক্ষ করেছি। তবে তিন দিনের সফরে একটি দেশের সব মানুষের মনোভাব বোঝা সম্ভব নয়।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানের পাল্টাহামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্থাপনাও আক্রান্ত হয়েছে। জুনে যুদ্ধবিরতির একটি প্রাথমিক সমঝোতা হলেও পরে তা ভেঙে যায় এবং হামলা-পাল্টা হামলা আবার শুরু হয়। আমাদের সফরের সময়ও কূটনৈতিক উদ্যোগ চলছিল; একই সঙ্গে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত ছিল।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। এ পরিমাণ তখনকার বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম তরল জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশের সমান।
ইরান নিজেও জ্বালানিসমৃদ্ধ দেশ। মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রমাণিত তেলের মজুতের দিক থেকে ইরান ছিল বিশ্বের তৃতীয় এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের দিক থেকে দ্বিতীয়। দেশটির প্রমাণিত তেলের মজুত প্রায় ২০৯ বিলিয়ন ব্যারেল এবং গ্যাসের মজুত প্রায় ৩৪ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতি ও জ্বালানি রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তারপরও দেশটি বিভিন্ন উপায়ে তেল রপ্তানি করছে। চীন ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা।
ইরানের জ্বালানি খাতের সঙ্গে দেশটির আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসও নিবিড়ভাবে জড়িত। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগের সময় ১৯৫১ সালে দেশটির তেলশিল্প জাতীয়করণ হয়। তখন ব্রিটিশ স্বার্থসংশ্লিষ্ট অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি ইরানের তেলশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিল।১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সমর্থনপুষ্ট অভ্যুত্থানে মোসাদ্দেগ ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ক্ষমতা আরও সুসংহত হয়।
এবারের যুদ্ধে উভয় পক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে এবং ইরানের সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানও আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানে সরাসরি স্থল অভিযান কতটা কঠিন হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ইতিহাসে বহিঃশক্তির হাতে পারস্য ও ইরানের বিভিন্ন অঞ্চল একাধিকবার আক্রান্ত ও অধিকৃত হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে আলেকজান্ডার তৎকালীন পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসকে পরাজিত করেন। পরে আরব বাহিনীও পারস্য জয় করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী ইরানে প্রবেশ করে। সে সময় রেজা শাহকে সিংহাসন ছাড়তে হয় এবং তাঁর ছেলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভি শাহ হন।
ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, জাতীয়তাবাদ, ঐতিহ্য এবং ভূমির বিন্যাস ইরানের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইরানের আয়তন প্রায় ১৬ লাখ ৪৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। আয়তনের হিসাবে, এটি বিশ্বের বৃহৎ দেশগুলোর একটি এবং এর সম্পূর্ণ ভূখণ্ড এশিয়ায় অবস্থিত।
ইরান অনেকটাই পর্বতঘেরা দেশ। প্রধান দুটি পর্বতমালা জাগ্রোস ও আলবোর্জ। জাগ্রোস উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বিস্তৃত হয়ে দেশের পশ্চিম অংশ ঘিরে রেখেছে। অন্যদিকে আলবোর্জ পর্বতমালা উত্তরে কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। দেশের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলেও পর্বত এবং শুষ্ক ও মরুময় এলাকা রয়েছে।
এই ভূমিবিন্যাস ইরানকে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার সুবিধা দিয়েছে। দেশটি পর্বতময় ভূখণ্ড ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনা অস্ত্র সংরক্ষণ এবং সামরিক প্রয়োজনে কাজে লাগিয়েছে। ফলে এসব স্থাপনার অবস্থান শনাক্ত করা ও ধ্বংস করা বাইরের আক্রমণকারীদের জন্য কঠিন হতে পারে।
একদিকে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে বিশ্ব ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, অন্যদিকে দেশটির সামরিক শক্তির বিন্যাসেও এই ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগানো হয়েছে। ইরানের সামরিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে এ বাহিনীর সাংগঠনিক উপস্থিতি রয়েছে।
১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত প্রায় আট বছরের ইরান–ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেশটির প্রতিরক্ষা চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। বহিঃশক্তির হামলা প্রতিরোধে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আইআরজিসি এই ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের কারণে আমাদের মতো যেসব দেশের সঙ্গে যুদ্ধের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই, তারাও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। আমরা তাই এই সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা করি।
৩.
আমরা তিনজন ঢাকা–ব্যাংকক–ইসলামাবাদ হয়ে ইরানের যাত্রীবাহী বিমান সংস্থা মাহান এয়ারে তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালাম। তখন দুপুর গড়িয়ে অপরাহ্ণ।
প্রায় সাত বছর পর তেহরান বিমানবন্দরে এসে বড় কোনো পরিবর্তন কিংবা যুদ্ধের ছায়া তেমন চোখে পড়ল না। ভেবেছিলাম, অন্তত বিমানবন্দরের রানওয়ে কিংবা হ্যাঙ্গারগুলোর আশপাশে যুদ্ধের ছাপ থাকবে। কিন্তু তেমন কিছু দেখিনি। খুব সহজেই বিমানবন্দর থেকে বের হলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আমাদের অভ্যর্থনাকারীর সঙ্গে গাড়িতে উঠে নির্ধারিত হোটেলের পথে রওনা হলাম। প্রায় দুই ঘণ্টার পথ।
বিমানবন্দরে নেমেই যে পরিবর্তন চোখে পড়ল তা হলো, নারীদের, বিশেষ করে তরুণীদের পোশাকের পরিবর্তন। ২০১৯ সালে এমনটি দেখিনি। সে সময় দেখেছিলাম, অবগুণ্ঠন বা হিজাব এবং চুল ঢেকে রাখার কড়াকড়ি। এবার দেখলাম, অনেক তরুণী পশ্চিমা ধাঁচের জিনস ও টপ পরছেন, চুল হাইলাইট করছেন।
আগেরবার এসে চলাফেরায় অনেক কড়াকড়ি দেখেছিলাম। কিন্তু এবার তেহরানে যত দিন ছিলাম, একই ধরনের দৃশ্য দেখেছি। নারীদের বন্ধু বা আত্মীয়ের সঙ্গে মোটরসাইকেলের পেছনে বসে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। গভীর রাত পর্যন্ত রেস্তোরাঁগুলোও ভর্তি থাকতে দেখেছি। ইরানের নারীদের ওপর দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধের কথা বিবেচনায় নিলে আমার কাছে এটি একটি বড় সামাজিক পরিবর্তন বলে মনে হয়েছে।
এমন পরিবর্তনের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। ২০২২ সালে হিজাবসংক্রান্ত বিধি নিয়ে আটক মাসা আমিনির পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। সেই প্রতিবাদ ও পরবর্তী সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে আলোচনায় আসে। যুদ্ধের সময় জনসমর্থন ধরে রাখার প্রশ্নটিও অনেকে আলোচনায় আনেন। তবে এই পরিবর্তনের পেছনে কোন কারণ কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা গভীরভাবে বোঝার জন্য আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।
তেহরানের রাস্তায় বের হয়ে আমার মনে হয়নি যে একটি যুদ্ধরত দেশে রয়েছি। অথচ যুদ্ধের শুরুতে তেহরানেও হামলা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার সফরের সময় নগরজীবনে তার প্রকাশ্য ছাপ খুব বেশি চোখে পড়েনি। রাস্তায় প্রচুর গাড়ির ভিড় দেখেছি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অনেক গাড়ি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা সংযোজিত। গণপরিবহনও চলছিল।
আমার কাছে ইরানের এই অভিজ্ঞতা থেকে যে শিক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তা হলো, জাতীয়তাবাদ, জাতীয় সংহতি ও দুঃসময়ে ঐক্য একটি দেশকে বড় শক্তির বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার সাহস জোগাতে পারে। ইরান রুখে দাঁড়িয়েছে। দেশটির আরও ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু সফরের সময় যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের মধ্যে প্রতিরোধের স্পৃহা লক্ষ করেছি।
যুদ্ধ ও দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে সফরকালে আমি বাজারে নিত্যপণ্যের বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ করিনি। ইরানে জ্বালানির দাম কম রাখতে সরকার ভর্তুকি দেয়। অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এসব সুবিধার পরিমাণ ও আওতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
তিন দিন যে হোটেলে ছিলাম, সেখানেই দুটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলোয় উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি এবং মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের অনেকে ছিলেন। যে দুটি সরকারি কার্যালয়ে গিয়েছি, সেখানেও যুদ্ধের পরিবেশ বা উৎকণ্ঠার প্রকাশ্য চিহ্ন পাইনি।
আমার পর্যবেক্ষণে, যুদ্ধ ইরানিদের আরও সংঘবদ্ধ করেছে। তেহরানের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের ছবি দেখেছি। বিভিন্ন মোড় ও চত্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এবং ইরানের ইসলামি সরকারের পক্ষে সমাবেশ হতেও দেখেছি। সমাবেশে আসা ব্যক্তিদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও ছিল।
আমার কাছে ইরানের এই অভিজ্ঞতা থেকে যে শিক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তা হলো, জাতীয়তাবাদ, জাতীয় সংহতি ও দুঃসময়ে ঐক্য একটি দেশকে বড় শক্তির বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার সাহস জোগাতে পারে। ইরান রুখে দাঁড়িয়েছে। দেশটির আরও ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু সফরের সময় যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের মধ্যে প্রতিরোধের স্পৃহা লক্ষ করেছি।
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের কারণে আমাদের মতো যেসব দেশের সঙ্গে যুদ্ধের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই, তারাও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। আমরা তাই এই সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা করি।
● এম সাখাওয়াত হোসেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা
* মতামত লেখকের নিজস্ব