১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ছয়টি দল, যারা একটি আসন পেয়েছিল, তারা ভোট পেয়েছিল শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ এবং বাকি ৭৪টি দল সমষ্টিগতভাবে ভোট পেয়েছিল শূন্য ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং বেশির ভাগই শূন্য শতাংশ ভোট পেয়েছিল। ২০০১ সালেই নিবন্ধন ঐচ্ছিক হওয়ার কারণে মোট ৫৩টি দল অংশ নেয়, যার মধ্যে ৮টি দল ছাড়া অন্য দলগুলো একটি আসনও পায়নি। এসব দলের মধ্যেও তিনটি ১ শতাংশের নিচে ভোট পেয়েছিল। অন্যদিকে বাকি ৪৫টি দল মিলে শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল এবং এর মধ্যে ৩৩টি দল শূন্য শতাংশ ভোট পেয়েছিল।

নিবন্ধন বাধ্যতামূলক না হওয়ায় নামসর্বস্ব বিপুলসংখ্যক দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ২০০৭ সালে নির্বাচন কমিশন এ নিয়ে খোঁজখবর শুরু করলে দেখা গেছে, এসব নির্বাচনে এমন উদাহরণও ছিল, কোনো কোনো কেন্দ্রে এজেন্টদের বসতে দেওয়া যায়নি। একটি বুথে ৩২ জন এজেন্ট ছিলেন। অভিযোগ ছিল, এসব এজেন্ট বড় দলগুলোর মাসলম্যান হিসেবে কাজ করেছেন।

তাঁদের ব্যবহার করা হয়েছিল বুথ দখলের মতো অবৈধ কার্যকলাপে। এমন অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে, নামসর্বস্ব এসব দলের এজেন্টরা অর্থের বিনিময়ে বড় দলের পক্ষে কাজ করেছেন। এ ধরনের অনিয়ম ও অরাজকতার প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালে সর্বসম্মতিক্রমে দল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে জবাবদিহির পরিস্থিতি তৈরি করতে নিবন্ধন আইনে বেশ কিছু ধারা সংযোজন করতে হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নিবন্ধন কোনো নতুন বিষয় নয়। এই উপমহাদেশে তো বটেই, পৃথিবীর সিংহভাগ গণতান্ত্রিক দেশে এ ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতে কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন না থাকলে জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে হলে অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়।

আশা করা যায়, এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে শুধু অধিকতর প্রতিযোগিতাই নয়, জাতীয় পর্যায়ে আরও মত–পথ বিকশিত হবে; যেমনটা উদার গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য। স্থানীয় সরকার শুধু বড় দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন যেভাবে চলছে, তেমন থাকলে ছোট ও নতুন দলের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

দলগুলোকে আঞ্চলিক ভিত্তিতে নিবন্ধন করতে হয়, পরে জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে হলে কমিশনের নির্ধারিত নিয়মে উতরাতে হয়। উল্লেখ্য, ভারতে আঞ্চলিকভাবে ২০০১ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৮৫৮টি দল ছিল। এর মধ্যে ৫৪টি আঞ্চলিক দল এবং মাত্র ৮টি দল জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত। অন্যান্য দেশে বিষয়টি আরও কঠিন।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া এবং পরিচালনার জন্য জাতীয় পর্যায়ে কোনো আইন নেই; যে কারণে নামসর্বস্ব অনেক দল তৈরি হয়। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যার বেশির ভাগেরই কখনো দেশে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি। প্রায় সব জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পলিটিক্যাল পার্টি অ্যাক্ট বলে কিছু আইন না থাকার সুযোগে দল গঠন করা হয় এবং নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য ভিড় জমায়। এবারও যে ৯৮টি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে, এর মধ্যে কিছু কিছু নাম শুনে মনে হয় সম্পূর্ণ বিষয়কে একটি হাস্যাস্পদ বিষয়ে পরিণত করার চেষ্টায় রয়েছে।

এসব দলের কাগজপত্র এবং মাঠপর্যায়ে নিরীক্ষণ করতেই নির্বাচন কমিশনের প্রচুর সময় লাগবে। এদের মধ্যে দু-তিনটি দল রয়েছে, যেগুলো কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান। কিছু দলে তরুণ উদীয়মান নেতৃত্বের বিকাশ দেখা যায়। দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে তারা ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা হয়তো তরুণ প্রজন্মকে নতুন ধারার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডর সঙ্গে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারবে। তবে অভিযোগ আছে, সব শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও গত নির্বাচনের আগে থেকে এখন পর্যন্ত এদের বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। আমার জানামতে, একটি দল এ নিয়ে আইনি লড়াই করছে। যদিও আমি মনে করি, এ নিয়ে কমিশনেই আপিল করতে হয়। সব শর্ত পূরণ করলে কমিশনের আপত্তি ধোপে টেকার কথা নয়। আমি আশা করছি, নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে নির্মোহভাবে খতিয়ে দেখে নিবন্ধন দেবে।

এ প্রবন্ধ শেষ করার আগে নিবন্ধন আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক তুলে ধরতে চাই। নিবন্ধন আইনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনার পর নিবন্ধন আইনের ৯০ বি–এর উপধারা ৯০বি (১) ও (২) এখন প্রযোজ্য নয়। ওই সময়ে প্রথমবারের মতো নিবন্ধনের জন্য ন্যূনতম দল নির্ধারণের জন্যএ দুটি ধারা রাখা হয়েছিল, যার কার্যকারিতা এখন রয়েছে বলে মনে হয় না; বরং ধারা ৯০ বি (৩) একমাত্র শর্ত, যা এখন নতুন দলের জন্য প্রযোজ্য হবে।

দ্বিতীয় সুপারিশটি অত্যন্ত জরুরি। দেশে কথিত ছোট বা নতুন দলকে বিকশিত করতে দেওয়া উচিত। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় সংসদ বা গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের নিবন্ধনের বদলে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য আলাদা নিবন্ধনের ধারা প্রণয়ন করা উচিত বলে মনে করি।

এর মাধ্যমেই কিছু শর্ত সাপেক্ষে কোনো কোনো দলকে জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধনের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচনে যেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে, তেমনি বিনা ভোটে নির্বাচনের অপসংস্কৃতি থেকে হয়তো রেহাই পাওয়া যেতে পারে। স্মরণযোগ্য, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রযোজ্য।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য থাকলেও আলাদা আইন ও বিধি দ্বারা পরিচালিত। কাজেই আমি মনে করি, আরপিও অধ্যায় ৬-এ স্থানীয় সরকার আইনে সংযোজিত না হলে প্রযোজ্য করা উচিত নয়। আমার সুপারিশ হচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনে যেন আলাদাভাবে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে সহজ শর্তে কথিত নতুন ও ছোট দল আঞ্চলিক পর্যায়ের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত করা যায়।

আশা করা যায়, এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে শুধু অধিকতর প্রতিযোগিতাই নয়, জাতীয় পর্যায়ে আরও মত–পথ বিকশিত হবে; যেমনটা উদার গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য। স্থানীয় সরকার শুধু বড় দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন যেভাবে চলছে, তেমন থাকলে ছোট ও নতুন দলের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

[email protected]