গতকাল রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হামলা চালান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালাতে দেখা যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এ ঘটনায় চারজন সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও কথা জানিয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ। আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি। কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে।’ একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে মামলা করা হবে।
অন্যদিকে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। উক্ত কমিটিকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানত তিনটি কারণে এই ঘটনা আমাদের জন্য উদ্বেগের। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও মারধরের স্মৃতি আজও আমাদের মনে তরতাজা। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান শুরুর প্রাক্কালে প্রতিটি ক্যাম্পাসে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের নানা নির্যাতনের বিরুদ্ধেই। কেবল চব্বিশের জুলাইয়েই নয়, পুরো আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে বারবার ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
ফলে, এই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষাই ছিল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেন এই সহিংস পরিবেশ আর ফিরে না আসে। যদিও এই আকাঙ্ক্ষা চব্বিশের পর বারবার হোঁচট খেয়েছে, এখন ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের এই আগ্রাসী ভূমিকা সরাসরি আমাদের মনে সেই নিপীড়নের স্মৃতিকে উসকে দিচ্ছে।
এটাও উল্লেখ করা দরকার, কেবল রাজশাহীতেই নয়, চব্বিশের পর অন্যান্য ক্যাম্পাসেও রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোকে সহিংস ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। এর মধ্যে গত এপ্রিল মাসে রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রদলের হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছিলেন অন্তত ১০ জন সাংবাদিক।
গত মার্চেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয় দখলচেষ্টার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে; সে সময় হামলায় ১০ জন সাংবাদিক আহত হন। এই প্রবণতা আশঙ্কাজনক।
দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের একটা প্রবণতা খেয়াল করা যাচ্ছে। রাজশাহীর ঘটনায় যেমন সাংবাদিকেরা বিশেষ লক্ষ্যবস্তু ছিলেন, তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হামলাতে লক্ষ্যবস্তু ছিলেন সাংবাদিক।
অন্যদিকে গত ২৯ আগস্ট আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের একটি অনুষ্ঠানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঝিনাইদহে একজন সাংবাদিক ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছিল। একইভাবে, শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গত ২৫ আগস্ট বিএনপির একটি কর্মসূচিতে তিন সাংবাদিক মারধরের শিকার হয়েছিলেন।
আবার, গত ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জামায়াতের একটি মিছিল শেষে সমাবেশের সময় একজন সাংবাদিক মারধরের শিকার হন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর হামলা ও অসহনশীলতার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকেরা। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি।
দলগতভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে হয়তো সর্বোচ্চ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে সাময়িক বরখাস্তের নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু অস্ত্র নিয়ে হামলা করার মতো ঘটনা যে আইনের চোখে একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ, সেই মূল বিষয়টি আলোচনার টেবিল থেকে প্রায়ই হারিয়ে যায়।
তৃতীয়ত, রাজশাহীর ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এপ্রিল মাসের ঘটনার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি এবং দলের পক্ষ থেকেও তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এর কোনো ফলাফল দেখা যায়নি।
ওই ঘটনায় শাহবাগ থানা তখন কোনো মামলাও নেয়নি। বাংলাদেশে ঘটা যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর গঠিত ‘তদন্ত কমিটি’গুলোর যে পরিণতি দেখা যায়, এগুলোর বেলাতেও ঠিক একই চিত্র ফুটে উঠছে: কোনো তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় জড়িতদের নাম, পদবি ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও উঠে এসেছিল। তবু ঘটনার এত দিন পরও কেন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ পাচ্ছে না—সে প্রশ্ন আমাদের তুলতেই হচ্ছে। একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাতেও সবার নাম পরিচয় মূলধারার গণমাধ্যমেই উঠে এসেছে।
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এবারও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে ঠিকই, তবে এই কমিটিও শেষ পর্যন্ত কোনো ফল বয়ে আনবে কি না, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাস আমলে নিলে আমাদের আবারও হতাশ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। তবু সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা ধরে রাখতে চাই।
তবে তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের আলোচনায় সেভাবে উঠে আসছে না, তা হলো—বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এভাবে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো খোদ একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ এসব সহিংসতাকে ‘পৃথক’ বিবেচনা করা হচ্ছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে শুধু ‘সাময়িক বহিষ্কার’কেই মেনে নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর মামলা না নেওয়ার নজিরই এর প্রমাণ। কেবল বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলে এসব সহিংসতার দায়ে জড়িত ব্যক্তিদের কখনোই আদালতের মুখোমুখি বা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় না।
দলগতভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে হয়তো সর্বোচ্চ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে সাময়িক বরখাস্তের নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু অস্ত্র নিয়ে হামলা করার মতো ঘটনা যে আইনের চোখে একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ, সেই মূল বিষয়টি আলোচনার টেবিল থেকে প্রায়ই হারিয়ে যায়।
তবে আমাদের মনে রাখা জরুরি, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের পেছনে থাকে শক্তিশালী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন প্রায়ই অসহায় বোধ করে। ইতিমধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কথায় সেই অসহায়ত্ববোধই ফুটে উঠেছে।
রাজশাহীর ঘটনায় যে ধরনের আগ্রাসী মনোভাব দেখতে পাওয়া গিয়েছে, সেটাকে যদি যথাযথ আইনের আশ্রয়ে না আনা যায়, তাহলে শক্তিশালী রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ধীরে ধীরে আরও বড় সহিংস ঘটনা ঘটানোর উৎসাহ পাবে।
যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংঘর্ষ ও সহিংসতার সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকে। এ ধরনের সহিংস পরিবেশ সামগ্রিকভাবে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে, আর সাংবাদিকদের ওপর হামলা তো খোদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপরও আঘাত করে।
আমরা এক দীর্ঘ সহিংস অভিজ্ঞতা পার হয়ে এসেছি। অতীতের সেই তিক্ত স্মৃতির অন্যতম বড় ভুক্তভোগী ছিল খোদ আজকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত এই ছাত্রসংগঠনটি। ফলে সেই ইতিহাস থেকে তাদের শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এই ধরনের সহিংস রাজনৈতিক আচরণের অন্তিম পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ইতিমধ্যেই আমাদের সবার সামনে রয়েছে।
ফলে, রাজশাহীর ঘটনায় কেবল ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা থেকে পদক্ষেপ নিলেই হবে না, এখানে যে ফৌজদারি অপরাধ সংগঠিত হয়েছে, তার বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
