ঠিক যেমন হওয়া উচিত ছিল, তেমনই হয়েছে নির্বাচন। কিছু উত্তেজনা, কিছু গন্ডগোল এবং কিছুটা একে অপরের প্রতি দোষারোপ ছিল।
তবে সব মিলিয়ে সুন্দর নির্বাচন হয়েছে। কারণ, যেসব দেশ অনেক বছর ধরে ভালো পার্লামেন্টারি নির্বাচন করে আসছে, তাদের অনেকের নির্বাচনও এর চেয়ে ভালো হয়নি।
এখন বিএনপিকে শক্ত হাতে সরকারের দায়িত্ব নিতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলেরও বিশাল ভূমিকা আছে।
নতুন সরকার যদি কাউকে তোষামোদি করে, তাদেরও শেষ হবে ওই তোষামোদির কারণে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত ১৮ মাসের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সরকার চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে কাজের স্বাধীনতা হারায়।
বিএনপির নিজস্ব মেনিফেস্টো বা ইশতেহার আছে। তাদের পূর্ণ অধিকার আছে তাদের প্ল্যাটফর্ম অনুযায়ী সরকার চালানোর। তারা যদি খারাপ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়, তাতে যে বিপর্যয় হতে পারে, তার দায়িত্বও তাদের নিতে হবে।
বিএনপি সরকার গঠন করেই যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে পারিবারিক কার্ড বিতরণ শুরু করে এবং ট্রেজারির টাকাপয়সা বিলিয়ে দেওয়া শুরু করে, তাহলে দেশে বিশাল মুদ্রাস্ফীতি হবে এবং জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে।
নতুন সরকারকে আগে দেশের বড় স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করতে হবে। নিজেদের ইশতেহার নিয়ে কাজ করার আগে নতুন সরকারকে কিছু নির্দলীয় জরুরি কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আমাদের দেশে অনেক বছর ধরে নিয়মতান্ত্রিক সরকার ছিল না। এত বছরের রাজনৈতিক দুর্বিচারে অনেক জঞ্জাল জমে গেছে। সরকারের প্রথম কাজ হবে এসব জঞ্জাল পরিষ্কার করে জনগণের আস্থা বাড়ানো।
সরকারকে কিছু জাতীয় অগ্রাধিকার নিয়ে ভাবতে হবে। এই অগ্রাধিকারগুলো, যেটিকে আমি বলছি পঞ্চশীলা বা পাঁচটি অগ্রাধিকারের কাজ; এগুলো বিএনপির প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ নয়; বরং আমি বলব পরিপূরক।
এ পাঁচটি বিষয়ে কাজ করে তারা যদি কিছুটা সফল হতে পারে, তাহলে আমি বলব নতুন সরকার খুব তাড়াতাড়ি জনগণের আস্থাভাজন হবে এবং তা তাদের নিজস্ব ইশতেহারগুলো এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।
১. পরবর্তী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা
নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে পঞ্জিকা দেখে পরবর্তী নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা।
কাজটি খুব ছোট; কিন্তু এর অঙ্গীকার ও প্রভাব বিশাল ও সুদূরপ্রসারী। একটি সরকার প্রথমেই জানান দিল তাদের মেয়াদ পাঁচ বছর এবং এ নিয়ে কোনো টালবাহানা হবে না, এটা আমাদের মতো দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বিরাট অঙ্গীকার।
পৃথিবীর অনেক দেশ এখন থেকেই জানে ৫০ বছর পর তাদের জাতীয় নির্বাচন কোন দিন হবে। আমাদের দেশে রোজার কারণে তারিখ পূর্বনির্ধারণ করা সম্ভব নয়; কিন্তু এটি একটি রীতি বা কনভেনশন হতে পারে, নতুন সরকার এসেই পরবর্তী নির্বাচনের দিন ঘোষণা করবে।
২. আইনশৃঙ্খলা ও মব
যেই সরকার আইনশৃঙ্খলা রাখতে পারবে না, তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব হারাবে। এই জিনিসটা আমরা বারবার দেখেছি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়।
দেশের অনেক বড় বড় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সময় আমরা সরকারকে অসহায় অবস্থায় অকেজো দেখেছি। এর প্রতিকার খুঁজতে হবে।
প্রথম কাজ হবে একটা কর্মক্ষম পুলিশ বাহিনী তৈরি করা, যাদের সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে না। আর ‘মব’ নিয়ে সরকারের লিখিত নীতি থাকতে হবে।
চুরি, ডাকাতি, ধর্মীয় আবেগ, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনধারা এবং রাজনৈতিক বিরুদ্ধাচরণ কোনো ব্যাপারেই মব করা যাবে না।
অন্য একজন নাগরিকের ওপর আঘাত করার অধিকার কারও থাকবে না, ব্যতিক্রম হবে শুধু আত্মরক্ষা।
প্রথম থেকে মব দমন না করলে পরে মহিরুহ হয়ে হানা দেবে। আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে। আমাদের জাতীয় প্রচারেরও দরকার আছে, যাতে জনগণ অন্যদের ব্যাপারে সংবেদনশীল ও সহনশীল হতে উদ্বুদ্ধ হয়।
৩. সরকারি চাকরিজীবী ও পেশাজীবীদের বিরাজনৈতিকীকরণ
আমাদের ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী, হকার, শিল্পী—সবাইকে বিগত দিনগুলোতে রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে।
আপনি যেদিকেই তাকাবেন, শুনবেন—তিনি বিএনপির লোক, তিনি আওয়ামী লীগের বা জামায়াতের। শিক্ষক, আমলা, চিকিৎসক কেউই বাদ নেই এই শ্রেণিবিভাগ থেকে।
এই শ্রেণিবিভাগ তৈরি হয় প্রথমে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থে। যে দল ক্ষমতায় আসে, তাদের লোকেরাই সবকিছুতে প্রমোশন ও প্রশ্রয় পেয়ে থাকেন এবং এই ট্যাগে অনেক অযোগ্য লোক উচ্চাসনে গিয়ে বসেন। এতে ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের।
একটি উদাহরণ দিই। ধরুন, একটি ফুটবল দলে ১১ জন খেলোয়াড়। তাঁদের ছয়জন সবুজ পার্টির ও পাঁচজন হলুদ পার্টির সমর্থক।
সবুজ পার্টি ক্ষমতায় এসে হলুদ পার্টির পাঁচজনকে ওএসডি করে বেঞ্চে বসিয়ে রাখল। সেখানে তাদের সমর্থক নতুন খেলোয়াড়কে স্থান দেওয়া হলো। আপনি আশ্চর্য হবেন?
যদি আমাদের ক্রীড়ামন্ত্রীদের ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ আগে দেখে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই আশ্চর্য হবেন না। অথবা আপনাকে পুরোনো পত্রিকা ঘেঁটে জেনে নিতে হবে।
এখন যে ফুটবল দল হলো, তারা কেমন খেলবে? হয়তো দুজন চৌকস স্ট্রাইকার ও ডিফেন্ডার এখন ওএসডি। নতুন দল বিদেশে গিয়ে এক ডজন গোল হজম করে এলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই!
আশা করি বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রশাসন ও পেশাজীবীদের বিরাজনৈতিকীকরণের কাজ শুরু করবে। তারেক রহমানকে অনুরোধ করব, যাঁরা বিজয়ের মালা দিতে আসবেন, তাঁদের দয়া করে ফিরিয়ে দিন, তাঁদের নির্দলীয়ভাবে দেশের জন্য কাজ করতে বলুন।
এতে প্রশাসনে গতি আসবে এবং পেশাজীবীদের কর্মদক্ষতা ও কাজে মনোযোগ বাড়বে।
৪. শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা
শিক্ষাঙ্গন শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদদের জন্য। আমাদের দেশে প্রাইভেট ও পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিক্ষার পরিবেশে পার্থক্য দিন দিন বাড়ছে।
সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অশান্তি ও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে বড় ঘাটতি নেতৃত্বের অভাব।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেতারা প্রায় সবাই আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থক।
এখন সময় এসেছে নির্দলীয় শিক্ষাবিদদের হাতে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত করার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব চাবি থাকবে তাঁদের হাতে। কোনো ছাত্র যেন সাহস না করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তালা দেওয়ার। জ্ঞান-অর্জনে তালা থাকবে কেন?
আসলে এই দেশে এত বেশি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দুর্বিচার হয়েছে যে শুদ্ধতা তৈরির শেষ নেই। নতুন সরকার এ পাঁচটি কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে শুরু করতে পারে। এই অগ্রাধিকারগুলো হলো সবই জঞ্জাল পরিষ্কার করার কাজ, বলা যায় রাষ্ট্রীয় শুদ্ধতা। পাশাপাশি সরকারের রুটিন কাজগুলো— যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এগুলোতে অবশ্যই থাকবে।
৫. যেসব সংস্কার প্রয়োজন
গণভোটে ‘হাঁ’ জয় পেয়েছে, এখন সংসদ গণপরিষদ হয়ে কী করতে হবে, তা সনদেই লেখা আছে। আমি শুধু বলব, ডিসেন্ট বা পিআর নিয়ে বিভেদ না করে যত তাড়াতাড়ি পরিবর্তনগুলো করা যাবে, ততই দেশের মঙ্গল হবে।
তবে সব একসঙ্গে লিখে ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে অর্থই যে সব ধারা–উপধারা জনগণ পছন্দ করেছে, তা ভাবলে ভুল হবে। গণপরিষদ অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বাদ দিতে পারে।
উচ্চ পরিষদের কেন দরকার, তা কেউই কখনো ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেননি। ১০০ জন নতুন সদস্যের মাথাভারী উচ্চ পরিষদ দেশে শুধু শুধু নতুন মোড়ল সৃষ্টি করবে। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, আমি আগেও লিখেছি। আবারও বলব, এই অপ্রয়োজনীয় জিনিসটা সম্ভব হলে বাদ দেওয়া হোক।
আরেকটি বিষয় হলো নির্দলীয় সরকারের অধীন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আইন প্রণয়ন। নতুন আইন প্রণয়নের কোনো প্রয়োজন আছে কি না, ভেবে দেখতে হবে।
ত্রয়োদশ সংশোধনী শাসনতন্ত্রে আবার ফিরে এসেছে হাইকোর্টের রায়ে। ত্রয়োদশ সংশোধনীর সরকারে তিনটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে, ওগুলোই ছিল এ দেশের সর্বোত্তম নির্বাচন।
রাজনীতিবিদদের তৈরি ‘নিরপেক্ষ’ সরকারের চেয়েও ত্রয়োদশ সংশোধনী হবে দলনিরপেক্ষ নির্বাচনের আরও উত্তম উপায়।
অন্য সংশোধনীগুলো, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অত্যন্ত জরুরি।
আসলে এই দেশে এত বেশি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দুর্বিচার হয়েছে যে শুদ্ধতা তৈরির শেষ নেই। নতুন সরকার এ পাঁচটি কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে শুরু করতে পারে।
এই অগ্রাধিকারগুলো হলো সবই জঞ্জাল পরিষ্কার করার কাজ, বলা যায় রাষ্ট্রীয় শুদ্ধতা। পাশাপাশি সরকারের রুটিন কাজগুলো— যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এগুলোতে অবশ্যই থাকবে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব
