হাম: সাড়ে সাত শ শিশুর মৃত্যু, না ‘সামাজিক হত্যা’

কোনো রোগে যে কারও মৃত্যু হতেই পারে। কিন্তু সে রোগটি যদি প্রতিরোধযোগ্য হয়, আর যদি সেই প্রতিরোধের ন্যূনতম চেষ্টা না করা হয়, তবে তাকে নিছক ‘রোগে মৃত্যু’ বলা যায় না; এটি ‘সামাজিক হত্যা’।

রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত এক শিশুকে নেবুলাইজ করা হচ্ছেছবি : মীর হোসেন

আমেনা বেগম পাঁচ মাসের সন্তান মো. তাকরিমকে বুকে জড়িয়ে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন। ফিরেছিলেনও; তবে জীবিত নয়, মৃত তাকরিমকে নিয়ে। মায়ের সেই আর্তচিৎকার আমরা শুনেছিলাম, ‘বাবারে কিন্তু আমি বুকে নিয়া বাসায় যামু।’ মায়ের আক্ষেপ চলতে থাকে, ‘আমি তো বাবারে এমনে আনি নাই, এখন এমনে কেমনে নিয়া যামু’, ‘বাবা তো আমার কাছে আর আসব না’, ‘আল্লাহ কেন দয়া করল না’, ‘বাবা আমার আগে কেন চইল্যা গেল’, ‘বাবারে কত কষ্ট দিছি, বাবা মাফ কইরা দিয়ে।’

হাম আর কিছু জটিলতায় শিশু তাকরিমের প্রাণ যায় গত ৬ মে, রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। এর আগে অন্তত এক মাসের লড়াই চলে শিশুটিকে বাঁচাতে।

হামে শিশুর মৃত্যুতে স্বজনহারাদের কান্না থামছে না
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

শিশুটির বাড়ি ভোলায়। অসুস্থ হওয়ার পর ভোলা সদর হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিকে ছোটাছুটি করেন শিশুটির বাবা–মা। সেখান থেকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল। ওই হাসপাতালে তাকরিমের অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ে। প্রয়োজন হয় পিআইসিইউ বা শিশুর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের। সেই হাসপাতালে পিআইসিইউ না পেয়ে তাকে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই সবকিছু শেষ।

একটি নয়, দুটি নয়। আমাদের দেশে প্রায় ভুলে যাওয়া রোগ হামের কবলে এভাবে ঝরে গেছে সাড়ে সাত শ প্রাণ। মাত্র ১১৭ দিনে (১৫ মার্চ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত) এ নতুন প্রাণগুলো নেই হয়ে গেছে। আমরা যেন একে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি। মৃত্যুর এ তালিকা হয়তো আরও দীর্ঘ হবে। কারণ হামের সংক্রমণ কমছে না, মৃত্যুও না। গণটিকা দেওয়ার দুই মাসের বেশি সময় পর এমন মৃত্যু অস্বাভাবিক, বলছেন বিশেষজ্ঞরাই। কারণ সেই গণটিকাদানেও গলদ ছিল। অন্তত ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে গেছে বলে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে।

  • একটি হাসপাতালের ছয়টি মৃত্যুর জন্য যদি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে শত শত প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যুর জন্য রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতা কি তদন্তের দাবি রাখে না?

  • আমাদের জানা দরকার—কেন টিকাদান কাভারেজ কমল? কেন টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হলো? কেন সতর্কবার্তাগুলো যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নিল না? কেন এত শিশু টিকার বাইরে থেকে গেল? 

২.

কোনো রোগে মৃত্যু হতেই পারে। কিন্তু সে রোগটি যদি প্রতিরোধযোগ্য হয়, আর যদি সেই প্রতিরোধের ন্যূনতম চেষ্টা না করা হয়, তবে তাকে নিছক ‘রোগে মৃত্যু’ বলা যায় না; এটি সামাজিক হত্যা। 

১৮৪৫ সালে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাঁর বিখ্যাত বই দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড–এ ‘সামাজিক হত্যা’র ধারণা দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, যখন রাষ্ট্র ও সমাজ জানে কী করলে মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব; কিন্তু অবহেলা, অদূরদর্শিতা কিংবা নীতিগত ব্যর্থতার কারণে সেই ব্যবস্থা নেয় না এবং মানুষ প্রতিরোধযোগ্য ঘটনায় মারা যায়, তখন সেই মৃত্যুকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যায় না। এটি একধরনের ‘সামাজিক হত্যা’। বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে সাড়ে ৭০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু কি সেই ধারণার আলোকে বিবেচিত হতে পারে? প্রশ্নটি কঠিন। কিন্তু আরও কঠিন হলো এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া।

হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯ মাসের শিশুসন্তান। শোকে স্তব্ধ বাবা। মায়ের কান্না
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

হাম কোনো নতুন রোগ নয়। এ রোগ প্রতিরোধে নিরাপদ, কার্যকর টিকার ব্যবহার হচ্ছে বহু দশক ধরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলেছে, পর্যাপ্ত টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে হামে মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব। অর্থাৎ দেশে এই মৃত্যুগুলোর বড় অংশই অনিবার্য ছিল না।

বাংলাদেশ একসময় টিকাদানে সফল দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ছিল আমাদের জনস্বাস্থ্যের একটি বড় সফলতার গল্প। বহু দেশ বাংলাদেশকে অনুসরণ করেছে। অথচ সেই দেশেই আজ শত শত শিশু হামে মারা যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই পতন কীভাবে ঘটল? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, তথ্যের দিকে তাকাতে হবে।

আরও পড়ুন

টিকার সাফল্যে বাংলাদেশ হামমুক্ত হওয়ার পথে ছিল। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।

২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কাভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিল। সেবার কাভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

এর পরের বছরগুলোতে টিকাদানের কভারেজ ধারাবাহিকভাবে ১০০ শতাংশ কিংবা তার বেশি ছিল। সরকারি হিসেবেই ২০২৫ সালে হঠাৎ এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতা দেখা দেয়। কিন্তু ভ্রুক্ষেপ ছিল না সে সময়কার সরকারের।

ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ভ্যাকসিন সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে ভ্যাকসিন সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। তিনি আরও জানান, ইউনিসেফ একাধিক বৈঠক করেছে, প্রতিটি বৈঠকের পর সরকারকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে এবং সম্ভাব্য ভ্যাকসিন সংকট, রোগের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে।

অর্থাৎ, এটি এমন কোনো বিপর্যয় নয়, যা হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে এসেছে। সতর্কবার্তা ছিল। ঝুঁকির পূর্বাভাস ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে—সেই সতর্কবার্তার প্রতি যথাসময়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল কি?

আরও পড়ুন

৩.

বাংলাদেশে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। গত আড়াই দশকে কখনো দেশে হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। এর আগে হামের সর্বাধিক রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে, ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এর পর থেকে রোগী কমে আসে। ২০২৫ সালে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আগের পাঁচ বছরের (২০২০ থেকে ২০২৪) রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭। এ সময়ে মৃত্যুর ঘটনা ছিলই না। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে দেশে হামের প্রকোপ শুরু হয়। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানের স্বল্পতা এবার হামের এই মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত ২০ মে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছিলেন, ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লেখা অন্তত পাঁচটি চিঠিতে সম্ভাব্য টিকা–সংকটের কথা বলে সতর্ক করেছিল। তারা ১০টি সভায় সরকারের কর্মকর্তাদের কাছে একই কথা জানিয়েছিল। ইউনিসেফ মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনায় দেশে সময়মতো টিকা আসেনি।

১০ মাসের সন্তান মাহাজবিকে বাঁচানো গেল না। তিন দিন আইসিইউতে চিকিৎসার পর হামে মৃত্যু হয় ছেলের। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের নিচতলায়
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

হামের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে বছরের শুরুতেই। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেলেও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, নজরদারি ও গণটিকাদান কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। পরবর্তীকালে বর্তমান সরকার জাতীয় এমআর টিকাদান কর্মসূচি চালু করলেও দেখা গেল, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে অংশ নেওয়া শিশুদের তুলনায় অন্তত ৪০ লাখ শিশু হামের টিকার বাইরে রয়ে গেছে। এমআর টিকাদান কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। অথচ একই বয়সী শিশুদের জন্য ২৮ জুন পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে অংশ নেয় ২ কোটি ২৩ লাখের বেশি শিশু। এর অর্থ হলোদেশে এখনো বড়সংখ্যক শিশু হামের সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, গণটিকাদানের দুই মাসেরও বেশি সময় পরও প্রতিদিন হাজারের মতো নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুও পুরোপুরি থামেনি। তাহলে কি আমরা কেবল সংকটের পেছনে ছুটেছি, সংকটকে আগেভাগে ঠেকাতে পারিনি? এই একটি প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন

কোনো হাসপাতালে ছয়টি শিশুর মৃত্যু হলে সেটি জাতীয় সংবাদ হয়। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। জবাবদিহির দাবি ওঠে। হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায়। সেটি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ, একটি শিশুর জীবনও অমূল্য। কিন্তু যখন ৭৫০ শিশু মারা যায়, তখন কি একই রকম জাতীয় আত্মসমালোচনা হয়? একটি হাসপাতালের ছয়টি মৃত্যুর জন্য যদি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে শত শত প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যুর জন্য রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতা কি তদন্তের দাবি রাখে না? সংসদ, বিচারব্যবস্থা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কিংবা নাগরিক সমাজ—কারও কি এই প্রশ্ন তোলার দায় নেই?

বোধ হয় নেই। কারণ, জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদের জন্য ওয়াশিং মেশিন বা ওভেন চেয়ে আলোচনা হয়েছে। এত ‘গুরুত্বপূর্ণ’ আলোচনার মধ্যে হামে মৃত্যু চাপা পড়ে গেছে।

এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নানাভাবে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এমন কথাও বলেছেন, আগের আট বছরে নাকি হামের টিকা দেওয়া হয়নি। যখন সমালোচনার মুখে পড়ল, তখন অর্ন্তবর্তী সরকারের ওপর কিছুটা চড়াও হতে দেখা গেল স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ অন্যদের। কিন্তু এ ঘটনার তদন্ত করতে এখনো কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। তদন্ত দূরের কথা, গত সরকারের সময় টিকাদানের নিম্নহার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকারি ওয়েবসাইট থেকে ওই তথ্য–উপাত্তই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এ লজ্জার ভার বিএনপি সরকার নিতে লজ্জাবোধ করেছে হয়তো।

আরও পড়ুন

৪.

পাঁচ মাস বয়সী যমজ রাইসা, রুমাইসা। হাম–পরবর্তী জটিলতায় সকালে রাইসা মারা গেছে। মা–বাবা এক মেয়ের মরদেহ এবং হামে আক্রান্ত আরেক মেয়েকে নিয়ে ফরিদপুরে ফিরে যাচ্ছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

সরকারকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিতে দেখি। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। একটি ছোট চারা একদিন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হবে। সেই বৃক্ষ ছায়া দেবে, অক্সিজেন দেবে, ফুল-ফলে সমৃদ্ধ করবে ধরিত্রী। কিন্তু যে শিশুদের সেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার কথা ছিল, তাদের শত শত জীবন অঙ্কুরেই ঝরে গেল। গাছের প্রতি মমতা যদি রাষ্ট্রের নৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হয়, তবে শিশুদের জীবন রক্ষার প্রশ্নে একই রকম দৃশ্যমান বেদনা, জরুরি পদক্ষেপ কোথায়?

একটি গাছ হারালে আমরা কষ্ট পাই। কিন্তু একটি শিশুকে হারানো মানে একটি সম্ভাবনা হারানো, একটি পরিবারকে চিরদিনের জন্য ভেঙে দেওয়া, একটি জাতির ভবিষ্যতের একটি অংশ হারিয়ে ফেলা।

এই সংকটকে রাজনৈতিক দোষারোপের খেলায় নামিয়ে আনা আরও বিপজ্জনক। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দোষ দেবে—এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু ভাইরাস কোনো দল চেনে না। হাম কোনো পতাকা দেখে সংক্রমণ ঘটায় না। একটি শিশুর মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; সেটি বাংলাদেশের ব্যর্থতা।

এই ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ জরুরি। কারণ, জবাবদিহি ছাড়া জনস্বাস্থ্য কখনো শক্তিশালী হয় না। জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলছিলেন, ‘এতগুলো শিশুমৃত্যুর দায় নিশ্চয়ই আছে। অবশ্যই এটা বিরাট ক্ষতি। এর তদন্ত দরকার। দোষীদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থাও জরুরি।’

আমাদের জানা দরকার—কেন টিকাদান কাভারেজ কমল? কেন টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হলো? কেন সতর্কবার্তাগুলো যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নিল না? কেন এত শিশু টিকার বাইরে থেকে গেল? কেন জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে আরও আগেই দেশব্যাপী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নয়; ভবিষ্যতের শিশুদের বাঁচানোর জন্য।

৫.

এঙ্গেলসের ‘সামাজিক হত্যা’ ধারণা হয়তো আদালতের ভাষা নয়, কিন্তু এটি বিবেকের ভাষা নিঃসন্দেহে। যখন আমরা জানতাম, কী করলে এই মৃত্যুর বড় অংশ ঠেকানো সম্ভব, যখন আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার সতর্ক করেছিল, যখন সময় হাতে ছিল—তারপরও আমরা যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা পারি না। তাই এই মৃত্যুগুলোকে কেবল ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

৭৫০ শিশুর মৃত্যু আমাদের জাতীয় বিবেকের সামনে একটি আয়না রেখেছে। সেই আয়নায় আমরা কি কেবল একটি ভাইরাসকে দেখব? নাকি আমাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত ভুল, সিদ্ধান্তহীনতা, অবহেলা এবং নীরবতাকেও দেখার সাহস করব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—আমরা সত্যিই শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে চাই, নাকি পরবর্তী মহামারি এবং আরও কিছু কবরের জন্য অপেক্ষা করছি।

এই সংকট এখন আর শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এটিকে জনস্বাস্থ্যগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে। ৯ জুলাই বিবিসি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাব, টিকাদান ব্যবস্থার ভাঙন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব বিশদভাবে তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য জানতে বিবিসি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল; তবে কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শত শত শিশুর মৃত্যু নিয়ে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের প্রকাশ্য জবাবদিহি প্রত্যাশা করা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, নীরবতা কখনােই শোকের ভাষা হতে পারে না। অনেক সময় তা উত্তরহীন প্রশ্নকে আরও ভারী করে তোলে।

পার্থ শঙ্কর সাহা প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক

*মতামত লেখকের নিজস্ব