বৃক্ষরোপণ ও সুরক্ষায় ৮ দফা প্রস্তাব

বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, সরকার গঠন করলে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ করবে। সরকার গঠনের পরপরই বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার সেই বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। বৃক্ষরোপণ ও সুরক্ষায় ৮ দফা প্রস্তাব নিয়ে লিখেছেন তুহিন ওয়াদুদ

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে দেশীর প্রজাতির গাছ অগ্রাধিকার পাবে

গাছের চারা রোপণ করে সেই চারা বড় গাছে পরিণত করা কঠিন কাজ। কত কঠিন কাজ, এটি কেবল যাঁরা গাছ রোপণ করার কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাঁরাই জানেন। অনেকের পক্ষে ধারণা করাও কঠিন। বৃক্ষসখা মোকারম হোসেন দীর্ঘদিন ধরে গাছ সংগ্রহ করেন। প্রতিবছর তিনি অনেক স্থানে বৃক্ষরোপণের কাজ করে থাকেন। তিনি একটি কথা সব সময় বলেন, ‘গাছ লাগাই গাছ বাঁচাই।’

আমি নিজেও শৈশব থেকে বৃক্ষরোপণের কাজের সঙ্গে যুক্ত। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় বড় ভাইয়ের বিয়েতে গেট ধরে যে টাকা পেয়েছিলাম, সেই টাকায়ও গাছ রোপণ করেছিলাম। অনেকের বিয়েতে উপহার হিসেবে গাছ দিয়েছি। বন্ধুদের উৎসাহিত করেছি প্রেমিক-প্রেমিকাদের গাছ উপহার দিতে। প্রেম ভেঙে যেতে পারে, গাছ টিকে থাকবে!

আমাদের গ্রামে প্রতি বাড়িতে পেয়ারার চারা এবং ভালো আমের একটি করে চারা দিয়েছি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৭ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। এই চারা সংগ্রহ, রোপণ ও পরিচর্যার কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। সেখানে প্রায় চার শ প্রজাতির গাছ আছে। এর অধিকাংশই দুর্লভ প্রজাতির। আরও অনেক স্থানে বৃক্ষরোপণ করেছি।

বৃক্ষরোপণের বড় বিচিত্র অভিজ্ঞতা। বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনাহীন হলে তা কত অর্থহীন হয়, তার একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। ২০১৭ সালে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম উদ্যোগ নিয়েছিলেন এক ঘণ্টায় সাত লাখ চারা রোপণের। কয়েক মাস ধরে তিনি এই বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং অর্থ ও চারা সংগ্রহ করেছিলেন। উপজেলাজুড়ে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল।

আরও পড়ুন

এই সাত লাখ চারা রোপণ করা হয়েছিল মাত্র এক ঘণ্টায়। গোটা উপজেলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ আপামর জনতা এ কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। বিভাগীয় কমিশনারও উপস্থিত ছিলেন এই বৃক্ষরোপণে। ইউএনও রফিকুল ইসলাম রাজারহাট থেকে বদলি হয়ে যান। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় আট বছর। রাজারহাট উপজেলায় রোপণ করা সাতটি গাছও নেই। অর্থ-সময়-শ্রম-উদ্যোগ—সবকিছুই মরে গেল। যাঁরা প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে চারা রোপণ করেছেন, তাঁরা কি আর নতুন করে এ রকম উদ্যোগে প্রাণ পাবেন? ওই ইউএনও এখন দিনাজপুরের ডিসি।

বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, সরকার গঠন করলে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ করবে। সরকার গঠনের পরপরই বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার সেই বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। সরকারের পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগ কার্যকর হোক। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করি।

বৃক্ষরোপণ কেবল ঘোষণা কিংবা রোপণের বিষয় নয়। যথাসময়ে যথাস্থানে যথা বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে সেগুলো বড় করে তুলতে হবে। বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে ঠিক করতে হবে কোথায় রোপণ করা হবে, কোন বৃক্ষের চারা রোপণ করা হবে, চারাগুলোর পরিচর্যা কীভাবে হবে, রোপণ করা চারা গরু–ছাগল ও মানুষের উপদ্রব থেকে নিরাপদ কি না? স্থান বুঝে গাছ রোপণ করতে হবে। বিলের ধারে যদি গাছ রোপণ করা হয়, তাহলে বিচিত্র গাছ রোপণ করা সম্ভব। পাখির খাওয়ার কথা বিবেচনা করে বট, পাকুড়জাতীয় গাছ রোপণ করা যাবে। এই গাছে ছায়াও হয়।

সড়কের পাশে গাছ রোপণের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। সড়কের প্রশস্ততাভেদে গাছের ধরন ভিন্ন হবে। সড়ক উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিম বরাবর হলেও গাছের ধরনে ভিন্নতা হতে পারে। সড়কের মোড়ে যেখানে মানুষ বিশ্রাম নেবে—এমন স্থানে ছায়া দেবে, সেই গাছ রোপণ করা চাই।

যাঁদের জমির পাশে গাছ রোপণ করা হবে, তাঁদের অনেকেই গাছ বড় হতে দেবেন না। সড়কের পাশে যদি গাছ রোপণ করা হয় এবং সেই গাছ যদি এক সারির কিংবা মাত্র দুই সারি হয়, তাহলে অনেক ঘন করে গাছ রোপণ করলেও অসুবিধা নেই। গাছ যদি কোনো মাঠে রোপণ করা হয়, তাহলে দূরত্ব গাছের ধরন অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।

গাছ রোপণও একধরনের বিজ্ঞান। বিষয়টি সাধারণ একজন ভাবলেন আর ইচ্ছেমতো রোপণ করে সংখ্যা প্রচার করলেন, তা নয়। অতীতে এমনটাই দেখেছি। অনেকের ফেসবুকে প্রচুর গাছ রোপণের ছবি পাওয়া যায়। ওই ছবি ধরে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, ওই বৃক্ষরোপণ কেবল ওই ছবির জন্যই।

অনেক গাছ আছে মৌসুমের শুরুতে রোপণ করলে ওই মৌসুমেই এত বড় হয়ে উঠবে যে পরের মৌসুমে গরু-ছাগল আর খেতে পারবে না। সব গাছ যে এক মৌসুমেই বড় হয়ে উঠবে, এমনটি ভাবার কারণ নেই। গাছের গোড়ায় সার দেওয়া চাই। এ ক্ষেত্রে গরুর গোবর শুকিয়ে সেই সার দেওয়া উত্তম।

সব জায়গায় মাটি এক রকম নয়। একেক স্থানে একেক গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে। যেমন হাওর অঞ্চলে হিজলগাছ যত সহজলভ্য এবং তা সহজে বেড়ে ওঠে, দেশের সব অঞ্চলে হিজলগাছ এত বেড়ে উঠবে না। পাহাড়ি অঞ্চলে যে গাছ হয়, তার সবটাই সমতলে সমানভাবে না–ও বেড়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন

ফলদ বৃক্ষ রোপণের পাশাপাশি কাঠ হবে, এমন বৃক্ষও রোপণ করতে হবে। আবার দীর্ঘমেয়াদি হবে এমন ঔষধি বৃক্ষও রোপণ করতে হবে। হরীতকী, আমলকী, বহেরা, অর্জুন আমাদের দেশে খুব ভালো হয়। সর্বত্রই এই গাছ রোপণ করতে হবে। অর্জুনের বাকল অনেক অসুখে উপকারী। উদাল নামে একটি বৃক্ষ আছে। দ্রুত বর্ধনশীল। এ গাছের বাকল, পাতা, ফুল, ফল—সবই ঔষধি। এই গাছ দুর্লভ। এমন গাছও রোপণ করতে হবে।

গাছ মানে সৌন্দর্যেরও প্রশ্ন। যে স্থানে বৃক্ষ সৌন্দর্যবর্ধক হিসেবে কাজ করবে, সেসব স্থানে সৌন্দর্যবর্ধক গাছ রোপণ করতে হবে। আমাদের দেশে প্রচুর সৌন্দর্যবর্ধক গাছ আছে। ফুলের বড় বড় গাছের পাশাপাশি ফুলপ্রধান নয়, এমন সৌন্দর্যবর্ধক গাছও আছে। দেশি গাবগাছ এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

যাঁরা গাছ রোপণ করবেন, তাঁরা সবার আগে এই নিশ্চয়তা দেবেন যে ওই গাছ তাঁরা পরিচর্যার মাধ্যমে সব ধরনের উপদ্রব থেকে রক্ষা করে বড় করে তুলবেন। যাঁরা এই নিশ্চয়তা দেবেন না, তাঁদের গাছ রোপণ করতে দেওয়া যাবে না। যে গাছগুলোর নাম উল্লেখ করেছি, তা কেবল উদাহরণ হিসেবে। বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করা গেলে আরও ভালো পরামর্শ পাওয়া সম্ভব। বৃক্ষরোপণ নিয়ে কয়েকটি প্রস্তাব—

আরও পড়ুন

১. বৃক্ষরোপণে সবার আগে একটি জাতীয় কমিটি করতে হবে। এই কমিটিতে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞদের রাখতে হবে। এই কমিটি মূলত ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মাস্টারপ্ল্যান করবে।

২. বৃক্ষরোপণের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করতে হবে। দেশে নিশ্চয় ২৫ কোটির চেয়ে বেশি বৃক্ষরোপণের স্থান আছে। সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং কোন বছরে কোথায় বৃক্ষরোপণ করা হবে, সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থান প্রস্তুত করতে হবে। বন বিভাগের আওতায় থাকা লাখ লাখ একর জমি বেদখল হয়েছে। এই জমিগুলো দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. দেশে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে বনভূমির পরিকল্পনা করতে হবে। এই বনভূমিগুলো হবে দেশের দুর্লভ বৃক্ষের বনভূমি। ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়াও বনভূমি তৈরি করা সম্ভব। সে জন্য বর্ষায় পানি ব্যবস্থাপনা ঠিক রেখে বিল-জলাশয় খনন করে তার চারদিকে বৃক্ষরোপণ করতে হবে।

৪. যে বিলগুলো ভরাট হয়েছে, সেই বিলের মাটি যদি শর্ত সাপেক্ষে বিক্রি করা যায়, তাহলে ওই মাটির টাকায় পাড় ভরাট করে ওই টাকায় বৃক্ষরোপণ করা সম্ভব। ওই বিলের মাটি বিক্রি করতে হবে। যে টাকা অগ্রিম পাওয়া যাবে, সেই টাকায় আগে পাড় বাঁধতে হবে। তারপর ক্রেতারা মাটি তুলে নিয়ে যাবেন। ধারণা করি, মাটি তুলে পাড় ভরাট করার পর যে টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে, ওই টাকায় বৃক্ষরোপণ এবং দুই বছরের পরিচর্যা ও পাহারা দেওয়ার ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে। বিলগুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়বে বহুগুণ। পানি ধরে রাখা যাবে। অনেক পাখির খাদ্যসংকট দূর হবে।

৫. যে গাছ রোপণ করা হবে, তার চারা আগেই প্রস্তুত করতে হবে। সরকারি নার্সারি যদি প্রয়োজনীয় সংখ্যক চারা উৎপাদন করতে না পারে, তাহলে ব্যক্তিমালিকানাধীন নার্সারিকে আগেই জানাতে হবে কোন চারা নেওয়া হবে। সে মোতাবেক চুক্তি করতে হবে। তাহলে সামান্য টাকায় প্রচুর চারা পাওয়া সম্ভব। দুর্লভ যে গাছগুলো রোপণ করা হবে, সেগুলোর চারা উৎপাদনেও বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। পরিবেশের জন্য ক্ষতির বৃক্ষরোপণ করার বিষয়টি এখনই জানিয়ে দিতে হবে।

৬. সামাজিক বনায়ন পদ্ধতি আমাদের দেশে চালু আছে। এ পদ্ধতির বড় বড় অসুবিধা আছে। এ পদ্ধতিতে গাছ বড় হলে নির্দিষ্ট বছরের পর গাছগুলো কেটে সমিতির সদস্য এবং স্থানীয় কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান এর অংশ পেয়ে থাকে। সামাজিক বনায়ন পদ্ধতি যদি এড়ানো যায়, তাহলে খুব ভালো। যদি সামাজিক বনায়ন পদ্ধতি একেবারেই এড়ানো না যায়, তাহলে নীতিমালা সংশোধন করতে হবে। নীতিমালায় এমন ধারা উল্লেখ থাকতে হবে যে সামাজিক বনায়নের সব গাছ কাটা যাবে না। অর্থাৎ সব গাছে সমিতির সদস্যরা অংশ পাবেন না। এই গাছের ২০-৩০ শতাংশ সেখানে রাখা হবে। তাহলে নির্দিষ্ট দূরত্বে সেসব গাছ রেখে দেওয়া সম্ভব হলে সেখানে আর নতুন করে গাছ রোপণ না করলেও চলবে।

৭. স্বেচ্ছাশ্রমে বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিতে হবে। স্বেচ্ছাশ্রমে যাঁরা কাজ করতে চান, তাঁদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। কোনো একটি জেলাকে বেছে নিয়ে সরকারের বিনা ব্যয়ে ১০ লাখ বৃক্ষরোপণ করা যায় কি না, সেটি পরীক্ষামূলক দেখা যেতে পারে। বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে কিংবা চারা উৎপাদন ব্যয় গ্রহণ করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি-সাংগঠনিক পর্যায়ের ব্যক্তিদের সহায়তায় ১০ লাখ চারা রোপণ করার দৃষ্টান্ত তৈরি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সমন্বয় করার কাজ গুরুত্বপূর্ণ।

৮. রোপণ করা গাছের কত শতাংশ টিকে থাকল, সে তথ্য সঠিকভাবে গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই কেবল দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জবাবদিহির আওতায় আসবেন। বৃক্ষরোপণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চারা রক্ষা করা। কোথাও পাহারা দিতে হবে, কোথাও ঘিরে দিতে হবে। বিশেষজ্ঞ-অভিজ্ঞদের পরামর্শে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

শেষ কথা

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবেশের ওপর জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নদী-খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণের যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে দেশের আপামর জনতা নিশ্চয়ই এগিয়ে আসবে। আমরা চাই, পরিকল্পিতভাবে দেশে বৃক্ষরোপণ হোক। উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো আমলে নেওয়া গেলে বৃক্ষরোপণ পরিকল্পিত হবে বলে মনে করি।

  • তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক; নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

    মতামত লেখকের নিজস্ব