ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ খতমের ঘোষণার এখনই সময়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

পুরোনো একটি গল্প। দুই বন্ধু বেড়িবাঁধ দিয়ে হাঁটছিল। দূর থেকে তারা দেখল, পাশের জলাশয়ে একটি কম্বল ভাসছে। এক বন্ধু জলাশয়ে নেমে গেল কম্বলটি আনতে। অনেকক্ষণ কম্বল নিয়ে টানাটানি করছে দেখে ওপরে দাঁড়ানো বন্ধু হাঁক দিয়ে বলল, ‘কম্বল ছেড়ে দে, তাড়াতাড়ি চলে আয়। দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

নিচের থেকে বন্ধু উত্তর দিল, ‘হাম কম্বল কো ছোড় দিয়া, মগর কম্বল মুঝে নহি ছোড়তা।’

আসলে জলাশয়ে একটা ভালুক গোসল করছিল। কম্বল ভেবে নেমে বন্ধুটির এখন কী যে বিপদ!

ইরান যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের একই রকম অবস্থা। যুদ্ধে নেমেছিল বন্ধু ইসরায়েলের কথায় কাজটি খুব সহজ হবে মনে করে এখন ছেড়ে আসার কোনো পথ সে খুঁজে পাচ্ছে না।

যাঁরা মনে করছেন, ট্রাম্প ইরানে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাইছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবে ট্রাম্পকে ভুল বুঝছেন। ট্রাম্প আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসতে। তবে তাঁর প্রয়োজন ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা, যেখানে এমন কিছু থাকবে, যাতে তিনি নিজেকে জয়ী ঘোষণা করতে পারবেন। কিন্তু কিছুতেই ইরানকে বশে আনতে পারছেন না।

নিঃসঙ্গ সৈনিক

যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ যে কয়টি জনমত জরিপ বের হয়েছে, তাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনসমর্থন দেখা যাচ্ছে ৩৩ থেকে ৩৬ শতাংশ; সিএনএনের জরিপে তা ৩৫ শতাংশ। নির্দ্বিধায় বলা যায়, মার্কিন জনগণ ট্রাম্পের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাঁর নিজের দলের অন্তত ১৫ শতাংশ সমর্থক এখন তাঁর ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

যে মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) কোয়ালিশনের বদৌলতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের বড় অংশই এখন ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পকে বিরোধিতা করছে। সাবেক ফক্স চ্যানেল হোস্ট এবং ট্রাম্পের এককালীন বন্ধু টক শো হোস্ট টাকার কার্লসন কয় দিন আগে তাঁর শ্রোতাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়ার জন্য আবেদন করা বড় ভুল ছিল।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চারপাশে দেখলে মনে হবে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে যাঁরা এত দিন সোচ্চার সমর্থন জানিয়ে তাঁর চারপাশে শোরগোল করতেন, তাঁরা এখন নিশ্চুপ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষা সেক্রেটারি পিট হেগসেথ, এমনকি উগ্রবাদী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম—সবাই যেন কেমন চুপসে গেছেন।

শান্তিচুক্তিতে মূল সমস্যাটি হলো ইরানের আত্মমর্যাদা। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ‘তারা ইরানের আত্মসমর্পণ চায়, ইরানিরা শক্তির কাছে নতিস্বীকার করবে না।’

ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স চুপচাপ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি কখনো ইরান যুদ্ধের বড় সমর্থক ছিলেন না; এখনো যতটুকু সম্ভব নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন।

মার্কিন জনগণ যুদ্ধের বিরোধিতা করে বলে দিয়েছে, এই যুদ্ধ তাদের জন্য নয়। ইউরোপের বন্ধুরাও যুদ্ধের প্রথমেই বলে দিয়েছে, এটি তাদের যুদ্ধ নয়। ট্রাম্পের চারপাশের লোকেরাও একে একে চুপ হয়ে সরে যাচ্ছে। বলা যায়, ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প এখন এক নিঃসঙ্গ সৈনিক।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুই বন্ধু মিলে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। ট্রাম্প ওতপ্রোতভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে আছেন। এখন চেষ্টা করছেন মানসম্মান নিয়ে বেরিয়ে আসতে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রাপ্তি সম্পন্ন হয়েছে।

এখন নেতানিয়াহু লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিম তীর ও গাজায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে জায়গা দখলে ব্যস্ত। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এমনিতে ইসরায়েলের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেতানিয়াহুরও খুব ভালো নয়। তিনি ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা যতটুকু নিশ্ছিদ্র ভেবেছিলেন, প্রমাণিত হয়েছে, তা ছিল ভুল। ইরানি মিসাইল কোথাও কোথাও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা দারুণভাবে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেছে।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যাপক হারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম
ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধ বনাম শান্তি নিয়ে ট্রাম্প পোপ লিওর সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন। এ যেন পোপকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ ক্যাথলিক, যাঁরা পোপকে ধর্মগুরু মানেন। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য পোপের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় যাওয়া অনেকটা ‘নো গো জোন’ অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ এলাকা।

কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চাইবেন অকারণে দেশের ২২ শতাংশ লোকের বিরাগভাজন হতে?

উল্লেখ্য, বর্তমান পোপ একজন মার্কিন নাগরিক, তারপর ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও একজন ক্যাথলিক। পুরো ব্যাপার রিপাবলিকান পার্টির জন্য নেতিবাচক এবং ভ্যান্সের জন্য দারুণ বিব্রতকর। কিন্তু ট্রাম্পকে বোঝাবে কে?

ইরান যুদ্ধে টলমল অবস্থা দেখে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এখন আর ট্রাম্পের ওপর ভরসা করতে পারছেন না। খবরে প্রকাশ, স্থবির হয়ে পড়া শান্তি আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে ইউক্রেন তুরস্ককে অনুরোধ জানিয়েছে। এটা ‘শান্তির দূত’ ট্রাম্পের ওপর একটা বড় অনাস্থা।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘আমরা ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারছি না।’

ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পকে নিঃসঙ্গ করে ফেলেছে। তিনি যেন নিজের মনের এক বিভ্রমে ঘুরপাক খাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

প্রয়োজন মান বাঁচানোর একটি চুক্তি

আগেই বলেছি, ট্রাম্প চাইছেন এই যুদ্ধ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হয়ে আসতে। দ্বিতীয় শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার আগেই ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের পথে রওনা হয়ে গেছেন।

২৪ এপ্রিল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের সঙ্গে আলাপ করতে ইসলামাবাদে গেছেন; বলেছেন, মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর আলোচনার কোনো পরিকল্পনা নেই। তবু ট্রাম্প বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারকে আগেভাগে ইসলামাবাদে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বারবার তিনি বলছিলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পথে। এসব যুদ্ধ বন্ধের জন্য তাঁর অস্থিরতাকেই বারবার সামনে তুলে এনেছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক এক খবর সত্য হলে মনে করা যেতে পারে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবার সম্ভবত কিছুটা গঠনমূলকভাবে ভাবছেন। পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, ‘ইরানের সঙ্গে ওবামার করা পূর্ববর্তী একটি চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে এক দশক অতিবাহিত করার পর ট্রাম্প তাঁর নিজের শুরু করা একটি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে গিয়ে মার্কিন আলোচকদের এমন একটি সমঝোতার বিষয় বিবেচনা করার অনুমোদন দিয়েছেন, যার শর্তাবলি হবে অনেকটা ওবামার করা চুক্তির মতোই।’

আরও পড়ুন

ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে আরও বলা হয়েছে, ‘ইরানের জব্দকৃত শত শত কোটি ডলারের সম্পদ হয়তো তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার লক্ষ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর মেয়াদ হয়তো সীমিত হতে পারে এবং একসময় শেষমেশ ফুরিয়ে যেতে পারে।’

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ইরানকে যদি একটু দুর্বল দেখাত বা তারা যদি ট্রাম্পের সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা না দিত, তাহলে ট্রাম্প চুক্তির শর্ত নিয়ে আরও নমনীয় হতেন। ট্রাম্পের প্রয়োজন মান বাঁচানোর একটি চুক্তি।

শান্তিচুক্তিতে মূল সমস্যাটি হলো ইরানের আত্মমর্যাদা। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ‘তারা ইরানের আত্মসমর্পণ চায়, ইরানিরা শক্তির কাছে নতিস্বীকার করবে না।’

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প হয়তো একটি চুক্তি করবেন অথবা এমনও হতে পারে, যুদ্ধে ক্ষান্ত হওয়ার আগে ট্রাম্প ইরানের ওপর তুমুলভাবে আঘাত করবেন—ইরান সভ্যতাকে ধ্বংস করতে না পারলেও অন্তত ইরানের দম্ভকে চুরমার করতে চেষ্টা করবেন। তিনি যুদ্ধ এলাকায় এর মধ্যেই অনেকগুলো রণতরি জড় করেছেন, মার্কিন সৈন্য ও যুদ্ধ সরঞ্জাম বাড়িয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে ধ্বংসযজ্ঞ করবেন নাকি গঠনমূলক কিছু মেনে নেবেন, তা নিয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব ব্যাপার। তবে ধ্বংসযজ্ঞ করার আগে তাঁকে ভাবতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাকি ৩৫ শতাংশ জনগণ কি তখন তাঁর সঙ্গে থাকবে?

মিশন সফল

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান—প্রতিটি জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করতে গিয়ে একের পর এক বিপাকে পড়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, নিজেদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে নিরুপায় হয়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে হয়েছিল এবং নিজেদের লোকজনের টানাহেঁচড়া করে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে নিদারুণ অসহায় পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল, অনেকটা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা।

ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের টানাহেঁচড়া করে ছেড়ে আসার শেষ কয় দিনের ছবিগুলো এখনো মার্কিন নাগরিকদের দারুণভাবে পীড়া দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ইতিহাসে ৩৫ থেকে ৩৬ হলো সেই ম্যাজিক নম্বর, এই জনসমর্থন নিয়ে কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষেই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রেসিডেন্ট জনসন ১৯৬৮ সালে ৩৬ শতাংশ জনসমর্থন নিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের জনসমর্থন যখন ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছিল, তিনি ‘ইউএসএস আব্রাহাম’ লিঙ্কন রণতরিতে ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ বা অভিযান সফল ব্যানার টানিয়ে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন।

মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পালা, তিনিও সেই ম্যাজিক নম্বর স্পর্শ করেছেন। তাঁর উচিত আর টালবাহানা না করে ‘অভিযান সফল’ ব্যানার টানিয়ে এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা।

আরেকটি ব্যাপার সম্ভবত ট্রাম্পকে খেয়াল রাখতে হবে—তাঁর মেয়াদের বাকি সময় যেন তিনি নেতানিয়াহুর থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। তিনি নিশ্চয় চাইবেন না নেতানিয়াহুর খপ্পরে পড়ে আবার আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে।

  • সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ই-মেইল: [email protected]