কয়েক মাস ধরে একের পর এক শিশুকে ছিনিয়ে নিয়েছে প্রাণঘাতী হাম। গত বছর জুলাই মাসে মাইলস্টোন স্কুলে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২৮ জন কিশোর-কিশোরী। শোকের মেঘ জমেছে আমাদের শহরে।
এরপর সংবাদপত্র আর টিভি চ্যানেলগুলো শোকের গল্প বলেছে বেশ কয়েক সপ্তাহ। ছেপেছে হৃদয়বিদারক স্থিরচিত্র। চলমান চিত্রের পেছনে করুণ সুর বেজেছে।
তারপর একসময় তাদের মাইক্রোফোন সরে গেছে, ক্যামেরা মুখ ঘুরিয়েছে অন্যদিকে, মনোযোগের বাতি নিভে গেছে।
তবে যাঁদের সন্তান চলে গেছে, জীবন আমূল পাল্টে গেছে ওই মুহূর্ত থেকে, তাঁদের কাছ থেকে কি শোক সরে গেছে? সরে কি যায়?
বরং এই অভাগা মানুষগুলোর জন্য শহরটা শূন্য হয়ে দাঁড়ায়। তাঁদের কাছে এটি তখন কেবলই শোকের শহর।
এ শহরের পথগুলো অন্ধকার। এখানে কেউ থাকে না। চেনা অলিগলিতে স্মৃতিরা নির্জনে ঘুরে বেড়ায়। শোকের পথে হাঁটতে গেলে কখন যে কোন স্মৃতির সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া হবে, বোঝা শক্ত।
কখনো স্মৃতিগুলো অন্ধকারের মতো পেছন থেকে জাপটে ধরে, কখনো চেনা বন্ধুর মতো এসে হাত মেলায়।
সন্তানকে নিয়ে বেড়ানোর স্মৃতি, আইসক্রিম খাওয়ার স্মৃতি, বেলুন হাতে ঘরে ফেরার স্মৃতি...শহরের রাস্তার চিরচেনা বাঁকে বাঁকে বেয়াড়া স্মৃতিগুলো একঝাঁক কাকের মতো তাড়িয়ে বেড়ায়। অবর্ণনীয় এই যন্ত্রণা একাকী সইতে হয়।
শোকের শহরে মানসিক সহায়তা দেওয়ার কেউ থাকে না। এর চর্চাই তো নেই আমাদের।
শোকের যাত্রা নিয়ে আমরা তেমন ভাবি না। জানিও কম। এই দুরূহ সময়টার পরিক্রমার স্টেশনগুলো চেনা থাকলে হয়তো তা পেরোতে খানিক সুবিধা হয়।
১৯৬৯ সালে এলিজাবেথ কুবলার-রস তাঁর অন ডেথ অ্যান্ড ডায়িং গ্রন্থে শোকের পাঁচটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন—১. অস্বীকৃতি বা ডিনায়াল: অর্থাৎ ঘটনাটি ঘটেনি;
২. ক্রোধ বা অ্যাঙ্গার: নিজের প্রতি, চিকিৎসকের প্রতি, সমাজের প্রতি, কখনোবা সৃষ্টিকর্তার প্রতি ক্রোধ অনুভব;
৩. কী হলে কী হতো বা বার্গেনিং: যদি খানিক আগে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যেত, যদি সন্তান আজ স্কুলে না যেত, এমনই সব প্রকল্প তৈরি;
৪. বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন: জীবনের প্রতি, কাজের প্রতি অনাগ্রহ, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, আনন্দের অভাব ইত্যাদি; ৫. স্বীকৃতি: শেষমেশ, বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া।
এসব স্তর যে একের পর এক আগত হবে কিংবা একই সময়ব্যাপী থেকে যাবে, তা নয়। যেকোনো স্তর বারবার ফিরে আসতে পারে এবং এর স্থায়িত্বকালও বদলাতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, শোকাহত মানুষের জন্য আমাদের করণীয় কী? পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী বা সামাজিকভাবে কী করতে পারি আমরা?
প্রথমত, এটি মেনে নিতে হবে যে শোকযাত্রা সম্পন্ন করতেই হবে। জীবনের দাবিতে, সময়ের প্রয়োজনে প্রায়ই শোককে পাথরচাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করি আমরা।
তবে শোক আমাদের পিছু ছাড়বে না কিছুতেই। শোকের সময়কাল একেকজনের জন্য একেক দৈর্ঘ্যের।
কারও কয়েক মাস, কারও ক্ষেত্রে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।
এ কথা অনেকেই বলে থাকেন যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব হালকা হয়ে আসে। আমি বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখি। সময় যত গড়ায়, জীবনে ভিড় তত বাড়ে।
আর সেই ভিড়ে শোকের দেখা সব সময় মেলে না। শোক যে কমে আসে, তা নয়। শোকযাত্রা সম্পন্ন করতে পারলে আমরা শোকের পাশাপাশি হাঁটতে শিখি।
পরিবার-পরিজন হিসেবে আমাদের তাই দায়িত্ব, শোকাহতকে শোক পালন করার সুযোগ করে দেওয়া।
আমাদের শহরে আর যা–ই হোক দুর্ঘটনার অভাব নেই, অভাব নেই মৃত্যুর। যাঁরা বেঁচে থাকেন, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কতটুকু ভাবে এই শহর? মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া তো সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যই নয়; বলা হবে যে শোকে ব্যক্তিটি উন্মাদ হয়ে গেছে। তাই কাউন্সেলিংয়ে ট্রেনিং দিয়ে, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো নামে এর প্রচলন জরুরি।
এটি উপলব্ধি করা যে তাঁর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশের পেছনে অন্য কিছুর প্রভাব আছে। তাঁর রাগ, বিষণ্নতা, কিংবা অনাগ্রহ চরিত্রগত নয়। সময় দিলে তা মানিয়ে নিতে পারবেন তিনি।
যিনি শোক করছেন, তাঁর জন্যও করণীয় আছে। তাঁর যা ভালো লাগে তাতে মন দেওয়া, আর যাতে মন বসে না তা থেকে নিজেকে দূরে রাখা জরুরি।
নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করা, প্রার্থনা করা, কবর বা সমাধিতে গিয়ে দাঁড়ানো, প্রথম ধাপ। এর বাইরেও, জার্নাল লেখা যেতে পারে। লেখার মাধ্যমে শোককে আকার দেওয়া যায়, একটা শৃঙ্খলে বাঁধা যায় একে। শোকের সর্বগ্রাসী অবয়বকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা যায়।
এর বাইরেও প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া, একাকী সময় যাপন, প্রিয় কোনো বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটানো যেতে পারে।
সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর ‘মৌর্নিং অ্যান্ড মেলানকোলিয়া’ প্রবন্ধে বলছেন: ‘শোককে যাপিত জীবনে নামিয়ে নিয়ে আসা দরকার। এর আধিদৈবিক অস্তিত্ব আমাদের তাড়িত করে অনেক বেশি।’
তবে সমাজের এ ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। শোক পরামর্শ বা গ্রিফ কাউন্সেলিং একটি অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ, যেখানে শোকসন্তপ্ত ব্যক্তি অকপটে নিজের অনুভূতির কথা বলতে পারেন।
মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব অনুযায়ী, যে শোক ভাষা খুঁজে পায় না, তা অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধবোধ, ক্রোধ, ভয়, শারীরিক অস্বস্তি বা গভীর বিষণ্নতার রূপ নিয়ে ফিরে আসে; অনেকটা, শোকের পাঁচ স্তর বারবার পেরোনোর মতো।
গ্রিফ কাউন্সেলিং একজন মানুষকে এমন একটি নিরাপদ পরিসর দেয়, যেখানে তিনি বিচার, উপদেশ বা সামাজিক চাপ ছাড়াই নিজের কষ্টের কথা বলতে পারেন।
এই কথোপকথনের মধ্য দিয়ে অস্পষ্ট আবেগ ভাষা পায়, ‘যদি এমন করতাম’ ধরনের অপরাধবোধ যাচাই করা যায় এবং হারানোর অভিজ্ঞতাকে ধীরে ধীরে জীবনের গল্পের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়।
কাউন্সেলিং প্রিয়জনকে ভুলে যেতে শেখায় না; বরং তাঁর স্মৃতি ও সম্পর্ককে সঙ্গে রেখেই পরিবর্তিত জীবনে ফিরে আসার পথ খুঁজতে সাহায্য করে।
আমাদের শহরে আর যা–ই হোক দুর্ঘটনার অভাব নেই, অভাব নেই মৃত্যুর। যাঁরা বেঁচে থাকেন, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কতটুকু ভাবে এই শহর?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া তো সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যই নয়; বলা হবে যে শোকে ব্যক্তিটি উন্মাদ হয়ে গেছে। তাই কাউন্সেলিংয়ে ট্রেনিং দিয়ে, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো নামে এর প্রচলন জরুরি।
আমাদের জীবিত নাগরিকদের মানসিক পরিচর্যার অভাব সমাজকে এগোতে দেবে বলে বোধ হয় না। এই শোকের শহরে শোকযাত্রার পথটি যেন তৈরি থাকে, অন্তত এটুকু তো আমরা নিশ্চিত করতে পারি।
নাভিদ সালেহ যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে পুর, স্থাপত্য ও পরিবেশ কৌশল অনুষদের অধ্যাপক।
* মতামত লেখকের নিজস্ব।