ভোটের মাঠে আওয়ামী নেতাদের ডিমান্ড, রুমিনের হাঁস ও জিএম কাদেরের দুশ্চিন্তা

ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী জনসভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে বলেছেন: যারা অন্যায় করেনি, তাদের কোনো শাস্তি হতে দেব না। অন্যদিকে চৌদ্দগ্রামে জামায়াতের প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তৃতা করেন স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা।ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

নির্বাচনের প্রচারণা ভালোই এগোচ্ছে। এখন পর্যন্ত মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে প্রচারণা চলছে। আমি বলব, এই সময়ে পরিবেশ এর চেয়েও শান্তিপূর্ণ থাকলে আমি বিস্মিত ও শঙ্কিত হতাম। বিস্মিত হতাম; কারণ, সেটা হতো অস্বাভাবিক। আর শঙ্কিত হতাম এ কারণে যে ঝড়ের আগের ‘প্রশান্তি’ আমরা আগেও দেখেছি।

২০২৪ সালের জানুয়ারির ডামি-আমি নির্বাচনটাও ছিল খুবই শান্তিপূর্ণ। তারপরই শুরু হলো আন্দোলন ও অশান্তি।

দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল শুরু করেছে ‘অপারেশন ভোট হান্ট’। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, উত্তাপ বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। কিছু ছোটখাটো অঘটনও ঘটবে, কিছু ডিমের অপচয় হবে এবং নেতারা প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে গরম-গরম কথা বলবেন—ভোটযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বীকে কাবু করে নকআউট করাই হবে সবার লক্ষ্য।

নির্বাচনের এই সময়ের উত্তাপ, বিরক্তি বা টেনশনটাকে আমরা পজিটিভলি নিতে পারি। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের পর নেতাদের আর তেমন দেখা যাবে না। টেনশন কমে যাবে, জনগণও হাঁপ ছেড়ে বাঁচবেন।

যাঁরা নির্বাচিত হতে পারেননি, তাঁরা বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নেবেন, আবার পরের নির্বাচনে তাঁদের মাঠে দেখা যাবে। যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা সবাই ঢাকা চলে যাবেন, নতুন মিশনে যোগ দিতে। একদল সরকার গঠন করবেন—মন্ত্রী, স্পিকার কিংবা ডেপুটি হবেন; অন্যরা বিরোধী দলের নেতা, উপনেতা বা হুইপ হবেন, তাঁদের প্রতাপও কম নয়।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পাস হলে নির্বাচিত ব্যক্তিদের কাজ আরও বেড়ে যাবে—সনদের কাগজপত্র খুঁজে শাসনতন্ত্রে জোড়া লাগাতে হবে; ডিসেন্টগুলোও ভালো করে পরখ করে দেখতে হবে। তাই বলছিলাম, আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এবার অনেক কাজ করতে হবে।

তবে প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় কথা, আগে নির্বাচিত হতে হবে। নির্বাচিত হতে নেতারা নানা কৌশল অবলম্বন করবেন; সেগুলোকে কেউ সিরিয়াসলি নেবেন, কেউবা আবার বাঁকা চোখে দেখবেন।

তাহলে চলুন আমরা নির্বাচনী মাঠটা একটু ঘুরে দেখি—আমাদের নেতারা ‘ভোট হান্ট’ করতে কে কী কৌশল নিচ্ছেন, কে কী করছেন এবং কে কী বলছেন।

এনসিপি নেতাদের কবর জিয়ারত

এনসিপির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করে ২০২৪ সালের গণ–আন্দোলনের নেতা শরিফ ওসমান হাদি এবং ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান আন্দোলনের তিন নেতা শেরেবাংলা ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমউদ্দিনের কবর জিয়ারত করে।

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এনসিপির কবর জিয়ারতের মধ্যে ১৯৭১ সাল কি বাদ গেল? এই তরুণ নেতারা যদি মিরপুর স্মৃতিসৌধের পাশে অবস্থিত ১৯৭১–এর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কবরগুলো জিয়ারত করে আসতেন, তাহলে তাঁরা কিছু বিব্রতকর প্রশ্ন থেকে রক্ষা পেতেন।

আরও পড়ুন

ফখরুলের ‘ডেভিল হান্ট’

নির্বাচনের সময় সবাই ভোট হান্টিংয়ে ব্যস্ত। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলও তা–ই করছেন। দেশে এখন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট-২’ চালু আছে—আওয়ামী লীগ হলেই বন্দিশালা আর জয় বাংলার শব্দ শুনলেই জলকামান। নির্বাচনের সময় আশা করা যাচ্ছিল, ডেভিল হান্টের ৩ নম্বর সংকেত জারি করা হবে। কিন্তু এরই মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম অভিনব কায়দায় আওয়ামী লীগারদের ভোট হান্টিংয়ে লেগে গেলেন।

সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শোল্টিহরি বাজারে নির্বাচনী গণসংযোগের সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা চলে গেছেন ভারতে। তিনি ভারতে গেছেন ভালো করেছেন। এলাকার সমর্থক-কর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন কেন? আমরা কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আপনারা বিপদে পড়বেন না। আমরা আছি আপনাদের পাশে। যারা অন্যায় করেছে, তাদের শাস্তি হবে। যারা অন্যায় করেনি, তাদের কোনো শাস্তি হতে দেব না।’

মির্জা ফখরুলের ‘মানবিক’ বাণীতে আওয়ামী লীগাররা হয়তো খুশি হবেন, কিন্তু তাঁরা দল বেঁধে বিএনপিকে ভোট দিতে যাবেন কি না, তা দেখার কৌতূহল অনেকেরই থাকবে।

প্রচারে আওয়ামী লীগ নেতাদের ডিমান্ড বাড়ছে

নির্বাচনের প্রচারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বেশ ডিমান্ড আছে। যদিও আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে পারছে না, তবে স্থানীয় অনেক নেতা অন্য দলগুলোর পক্ষে বিভিন্ন সভা–সমিতিতে বক্তব্য রাখছেন।

সম্প্রতি শরীয়তপুর-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুর পক্ষে নির্বাচনী সভার আয়োজন করে স্থানীয় বিএনপি। সভায় বিএনপি প্রার্থী অপুকে সমর্থন জানিয়ে মহিষার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম চৌকিদার বক্তব্য দেন। তিনি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তৃতা শেষ করেন।

জামায়াতে ইসলামীও পিছিয়ে নেই। কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের জনসভায় বক্তৃতা করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ। নায়েবে আমির বলেন, ‘সালাউদ্দিনের বাবা এই এলাকায় আমার অভিভাবক ছিলেন। সে কী বলতে চেয়েছে, আপনারা বুঝেছেন তো? কোথায় ভোট দেওয়ার কথা বলেছে, আপনারা বুঝে নিয়েন।’

আরও পড়ুন

রুমিনের হাঁস ধানের শীষ খেয়ে বড় হচ্ছে

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা কিছুদিন আগেও ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। বিএনপির জোট-কৌশলে তিনি মনোনয়ন থেকে ছিটকে পড়েন, এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছেন। তিনি যে নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে হাঁস পেলেন, সেটা নিয়ে অনেকেই অনেক কৌতুক করেছেন।

এখন বিষয়টা পরিষ্কার হলো। তাঁর সঙ্গে বিএনপির অনেক স্থানীয় নেতা-কর্মী হাঁসের পেছনে দাঁড়িয়েছেন। বলা যায়, ধানের শীষের ধান খেয়েই হাঁস বড় হচ্ছে।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বাবা অলি আহাদ ছিলেন বায়ান্নর ভাষাসৈনিক ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ।

অনেকে বলছেন, রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক নক্ষত্র সামনে আরও উজ্জ্বল হতে পারে। যদি বিএনপি ক্ষমতায় যায় এবং রুমিন নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেন, তাঁর হাঁস হয়তো তখন সোনার ডিম দিতে শুরু করবে। হাজার হোক, ধানের শীষের ধান খেয়ে বড় হওয়া হাঁস!

সাবেক স্বামী–স্ত্রীর লড়াই এবং ফ্যামিলি ফিউড

স্বামী–স্ত্রীর লড়াই হচ্ছে। আপনি বলবেন, এ আর নতুন কী, সেটা তো সব ঘরেই হচ্ছে! তা ঠিক, কিন্তু সেই লড়াই যখন ঘরের বাইরে চলে আসে, তখন খবর হয়ে যায়।

কুড়িগ্রাম-৪ (চিলমারী-রৌমারী-রাজীবপুর) আসনের নির্বাচনী মাঠে এবার দেখা গেছে এক ব্যতিক্রমী চিত্র। একই আসনে সাবেক স্বামী ও স্ত্রী ভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা দুইজন সাবেক স্বামী ও স্ত্রী হলেও বর্তমান স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নজির অতীতে অনেকবার দেখা গিয়েছে।

জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) থেকে প্রার্থী হয়েছেন কে এম ফজলুল মণ্ডল। তিনি রৌমারী উপজেলার চরশৌলমারী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বলে জানা গেছে। অন্যদিকে তাঁর সাবেক স্ত্রী মোছা. শেফালী বেগম বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) থেকে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

আরও পড়ুন

নির্বাচন নিয়ে একই পরিবারে একাধিক ধারা বা ফ্যামিলি ফিউড নতুন কিছু নয়। তবে এই পরিবার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের হওয়ায় আলোচনা আরও বেশি। মাহফুজ আলমের বড় ভাই মাহবুব আলম লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) শাপলা কলি প্রতীকে জামায়াত ঐক্যজোটের হয়ে নির্বাচন করছেন। তাঁর বাবা আজিজুর রহমান ওই আসনের বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিমের পক্ষে পথসভা করে তাঁর পক্ষে ভোট চাইছেন। বাবা বলেছেন, পরিবার ও রাজনীতি ভিন্ন।

মাহফুজ আলম কোন দলের এবং কাকে সমর্থন করবেন, তা এখনো জানা যায়নি। তিনি আগেই বলে দিয়েছেন, এনসিপি যেহেতু জামায়াতের সঙ্গে জোট করছে, তাই তিনি এনসিপির সঙ্গে নেই।

জি এম কাদেরের হিজড়া–বিপত্তি

জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করার সুযোগ পেল। তারা ভয়ভীতি নিয়ে ১৯৬ আসনে নির্বাচন করছে। নুরুল হক নুরুর গণ অধিকার পরিষদ ও এনসিপির কর্মীদের বিরোধিতার কারণে প্রতিটি আসনেই জাতীয় পার্টির কিছুটা ভয়ভীতি আছে।

তবে রংপুর-৩ আসনে জি এম কাদেরের চ্যালেঞ্জ আরও বড়। সেখানে তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি মোছা. আনোয়ারা ইসলাম রানী দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও রংপুর-৩ আসনে ঈগল প্রতীকে নির্বাচন করে তিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন এবং ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়েছিলেন।

এবার আনোয়ারা ইসলাম রানী নির্বাচন করছেন হরিণ প্রতীকে। তবে গতবারের মতোই রানীর বিরুদ্ধে নির্বাচনটা কাদেরের জন্য একটু ট্রিকি বা নাজুক হতে পারে; কারণ, তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য।

অবশ্য হিজড়া সম্প্রদায়ের এই একমাত্র প্রার্থী জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর আক্রমণের কোনো শিকার হননি। তবে অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হতে হচ্ছে। অপপ্রচার করছে, খারাপ খারাপ শব্দ ব্যবহার করছে।

  • সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    ই-মেইল: [email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব