দুই বছর পর এসে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? চব্বিশের আগের বাংলাদেশ আর চব্বিশের পরের বাংলাদেশের মধ্যে কতটা পার্থক্য দেখতে পান?
আসিফ মোহাম্মদ শাহান: ঐতিহাসিকভাবে একটা গণ-অভ্যুত্থান বা আরও বড় অর্থে বিপ্লব—এটা যে সব সময় অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের আগের সব আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে, সেটা হয় না। একটি দেশে যখন গণ-অভ্যুত্থান ঘটে, তার পরবর্তী যে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেখানে এমন অনেক শক্তি ও গোত্রের উত্থান ঘটে, যারা মূলত সেই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা থেকে বাইরে চিন্তাভাবনা করে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমার ধারণা, আমরাও সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখন প্রশ্নটি হলো, গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা কী অর্জন করলাম? সবার কাছে গ্রহণযোগ্য অর্জন হলো একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অবসান। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন হচ্ছিল না, সেখান থেকে দেশকে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটানো গেছে।
এই অর্জনের বিপরীতে ব্যর্থতার পাল্লাটাও বেশ ভারী। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দিকে যদি ফিরে তাকাই, তাহলে আমরা দেখব, গণতন্ত্রের জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করার দরকার, সংসদের যে ভূমিকা পালন করা দরকার এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে শক্তিশালী ও কার্যকর করা দরকার—তার কিছুই হয়নি। সেদিক বিবেচনায় আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে ২০৩০ বা ৩১ সালে আমরা আরেকটি নির্বাচন পাব কি না, সেই প্রত্যাশার ওপর; অর্থাৎ আমরা নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের মধ্যেই থেকে যাচ্ছি।
এখানে বিপদটা হচ্ছে, আমরা নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রটা ১৯৯১ সালেও দেখেছি। নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র, যেটা প্রতিষ্ঠান দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত হয় না, সেটা একটা সময় পর গিয়ে অর্থহীন হয়ে পড়ে। কেননা তখন কোনো ব্যক্তি বা দল অগণতান্ত্রিক হবে না, এমন বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেই ব্যক্তি বা দল যখন অগণতান্ত্রিক হতে যাবে, সেটা যদি প্রতিষ্ঠানগুলো বাধা দিতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্র কখনোই টিকে থাকতে পারে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়টিতে বেশ কিছু সংকট ছিল। কিছু গোষ্ঠী মনে করেছিল, ‘আমরাই গণ-অভ্যুত্থান করেছি, আমাদের কারণেই সবকিছু হয়েছে।’ এই ভাবনা থেকে তারা অনেক কিছুই জোরজবরদস্তি করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সমালোচনার জায়গা হলো, তারা এখানে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পরও সেই গোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা কিংবা মব সহিংসতাকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো নমুনা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান বক্তব্য ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু অন্তর্ভুক্তির সেই জায়গা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। সমাজের অনেকগুলো অংশকে আমরা বাদ দিয়ে দিয়েছি। আমরা নারীদের বাদ দিয়ে দিয়েছি, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষিত করা যায়নি, লিবারেল স্বরগুলোও নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছে।
অভ্যুত্থান পরিবর্তনের বড় এক জনপ্রত্যাশা তৈরি করেছিল। সংস্কার কমিশন হলো, ঐকমত্য কমিশন হলো। রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করল। নির্বাচনের পর পুরো প্রক্রিয়াটা শাসক দলের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় হতে দেখলাম। জনপ্রত্যাশা, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারপ্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারভাবনার মধ্যে এমন ফারাকটা কেন তৈরি হলো?
আসিফ মোহাম্মদ শাহান: প্রথম আলোয় গত বছরে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমি বলেছিলাম, আমাদের সংস্কারের পুরোটা একটা এলিট পরিচালিত প্রক্রিয়া হয়ে গেছে। এখন এলিট পরিচালিত সংস্কারপ্রক্রিয়া হওয়ার বিপদটা কী? সংস্কারের শুরুর দিকে জনগণের কাছ থেকে মতামত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কমিশনগুলোর প্রতিবেদনগুলো নিয়ে যখন ঐকমত্য কমিশন বসল, তখন না নাগরিক সমাজ, না সরকার, না রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে জনগণের কাছে গিয়ে, তারা কী নিয়ে দর–কষাকষি করছে, সেটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়নি। এই ব্যর্থতার দায়কে আমি রাজনৈতিক দলগুলোকে কমই দেব। এটা আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ, যারা একটি আধিপত্যবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল, তাদেরও দেব।
উদাহরণ হিসেবে উচ্চকক্ষের প্রসঙ্গটি আনা যায়। এই উচ্চকক্ষ বা তা গঠনের ক্ষেত্রে পিআর পদ্ধতির সঙ্গে জনগণের জীবনের যে সমস্যা, সেটার সম্পর্ক কী, তা তাদেরকে বোঝানো হয়নি। দুদক বা মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন হলে কিংবা পুলিশের সংস্কার হলে তাদের জীবনে কী পরিবর্তন হবে, সেটাও বলা হয়নি। ফলে সংস্কারপ্রক্রিয়ায় সঙ্গে জনগণ তাদের মালিকানা খুঁজে পায়নি। এই প্রক্রিয়ায় যদি জনগণের একটা সক্রিয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা যেত, তাহলে এখন তারা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর একটা চাপ তৈরি করতে পারত। সংস্কারপ্রক্রিয়া থেকে জনগণ বাদ পড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেটি রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার বিষয় হয়ে ওঠে।
এই পর্যায়ে গিয়ে অনেকেই মনে করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কল্যাণের কথা বিবেচনায় নিয়ে একটা জায়গায় এসে পৌঁছাবে। সেটা কখনোই হয় না। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তার যেটা সুবিধা, সেটাকেই ধরে রাখে। বিএনপি জানত যে নির্বাচনে গেলে তারাই ক্ষমতায় আসবে এবং ক্ষমতায় এলে তারপর তারা তাদের মতো করে সংস্কারকে সাজাতে পারবে।
বিএনপি এটাও জানত যে তারা চাইলে পুরো প্রক্রিয়াটাকে ভেস্তে দিতে পারে। এটা হচ্ছে দর–কষাকষির ক্ষেত্রে বিএনপির শক্তির জায়গা। ফলে এখানে একটি অসম দর–কষাকষি হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে বাকিদের পারার কোনো কারণ ছিল না। এই অসম দর–কষাকষিতে সমতা আনার উপায় ছিল জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সংস্কারপ্রক্রিয়ায় যখন জনগণকে মালিকানা দেওয়া হয়নি, সেটা বিএনপির জন্য আরও বেশি সুবিধার হয়ে গেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন শেষের দিকে এসে কিছু জিনিস, যেমন গণভোটের প্রশ্নটাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে, বিএনপি তার অবস্থান থেকে সেটাকে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করেছে। বিএনপি খুব পরিষ্কারভাবে বলেছে, নির্বাচন হতে যাতে কোনো ঝামেলা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তখন তারা সম্মতি দিয়েছিল। এখন এ ঘটনা যে ঘটতে পারে, সেটাকে ঠেকানোর জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আদৌ কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, তার নমুনা আমরা দেখিনি।
মোদ্দাকথা, একটা এলিট পরিচালিত সংস্কারপ্রক্রিয়া থেকে যখন জনগণ বাদ পড়ে গেছে, তখন বিষয়টা স্রেফ রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তি পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। এই শক্তি পরীক্ষায় বিজয়ী বিএনপি নিজের মতো করেই সংস্কারকে ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ করেছে। বিএনপির এই ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করবে, এমন ক্ষমতা রাজনৈতিক দলগুলোর নেই।
আবার বিএনপি এমন একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে যে শেষ পর্যন্ত তারাই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দিতে পারবে। এই স্থিতিশীলতার স্বার্থেই নাগরিক সমাজ বিএনপি যা–ই করছে, সেটাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে না। অধ্যাদেশগুলো যখন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে বা জুলাই সনদের বেশ কিছু বিষয়কে যখন উপেক্ষা করা হচ্ছে, তখন নাগরিক সমাজের দিক থেকে এক অর্থে মিষ্টি বা কুসুম কুসুম সমালোচনা দেখা যাচ্ছে।
বিএনপি সরকার পাঁচ মাস পার করছে। সরকার পরিচালনায় গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কতটা ধারণ করতে পেরেছে বলে মনে করছেন?
আসিফ মোহাম্মদ শাহান: বিএনপির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক রূপরেখা খুব পরিষ্কার। কিন্তু সংস্কারপ্রক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখন থেকেই বিএনপি একটি বিষয় বিশ্বাস করে এসেছে, তাদের একটি শক্তিশালী সরকার ও শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্র দরকার, যার মাধ্যমে তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
এখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র যে একটা বিপজ্জনক ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে, সেটা আমরা আওয়ামী লীগের সময়ে দেখেছি। অর্থনৈতিক রূপরেখা সমর্থন করে এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিএনপিকে তৈরি করতে দেখছি না। এটা ভবিষ্যতের জন্য বড় সংকট হিসেবে দেখা দিতে পারে।
কেননা বিএনপি যখন তার অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করতে যাবে, তখন যদি সুশাসন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে এসব কর্মসূচির ফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না। জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করার দরকার ছিল, সেটা যখন হচ্ছে না, তখন অবধারিতভাবেই একটা সংকট ডেকে আনা হচ্ছে। আমার কাছে এটাকেই বিএনপির পাঁচ মাসের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বলে মনে হয়।
নতুন সরকারের প্রথম অধিবেশনেই বিচার বিভাগ, দুদক, মানবাধিকার কমিশনের মতো মৌলিক সংস্কারগুলোও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। সামগ্রিকভাবে সংস্কারের ভবিষ্যৎ কী?
আসিফ মোহাম্মদ শাহান: সংস্কারের ভবিষ্যৎ খুব একটা আশাব্যঞ্জক বলে মনে হচ্ছে না। এখানে একটা সংখ্যার খেলা আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি অপরিবর্তিত অবস্থায় পাস হয়েছে। প্রথমে মনে হতে পারে, সংখ্যাটি তো অনেক। কিন্তু এগুলোকে যদি ভাগ করেন, তাহলে দেখবেন কিছু অধ্যাদেশ শুধু নাম পরিবর্তন–সংক্রান্ত, কিছু প্রশাসনিক, কিছু আছে রেগুলেটরি, আবার কিছু আছে জবাবদিহি নিশ্চিতে।
এখন যদি হিসাব করা হয়, কোন ধরনের অধ্যাদেশ কত শতাংশ পাস হয়েছে, তাহলে একটি মজার প্রবণতা দেখা যাবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করার অধ্যাদেশ—যেমন বিচার বিভাগ, দুদক, মানবাধিকার কমিশন কিংবা গুম কমিশন–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ—এ জায়গায় দেখা যাচ্ছে, বড় একটি অংশ বিএনপি হয় বাতিল করেছে, নয়তো পরে আবার উত্থাপন করা হবে বলে তুলে রেখেছে অথবা সংশোধন করে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, যার উপযোগিতাই থাকছে না।
অন্তর্বর্তী সরকার আমলাতন্ত্রের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। আমলাতন্ত্রের যেকোনো সংস্কার উদ্যোগেই বাধা এসেছে। আমলাতন্ত্রের সংস্কার ছাড়া রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার কতটা সম্ভব?
আসিফ মোহাম্মদ শাহান: এই সরকারের সময়ে আমরা দেখছি যে আমলাতন্ত্র আরও শক্তিশালী হচ্ছে। ইতিমধ্যেই সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্য আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের পারফরম্যান্সের বড় একটি সমস্যা তো রয়েছেই; কিন্তু এটা প্রধান সমস্যা নয়। মূল সমস্যাটা হলো আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিকীকরণ। আমাদের গণতন্ত্রে আমলাতন্ত্রের ভূমিকাটা কী রকম হওয়া উচিত, এটিকে কীভাবে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে, এ বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলছি না।
বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ হয়নি। এ ধরনের নিয়োগ প্রশাসনের ভেতরে একধরনের অসন্তোষ তৈরি করে। এখন পর্যন্ত জনপ্রশাসনে মেধাভিত্তিক কোনো ব্যবস্থা দাঁড় করানো যায়নি।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে সরকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে চেয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে যখন ইউএনও ও অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়াই আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আমলাদের পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে এই আমলাতন্ত্র নিয়ে সরকারের পক্ষে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব নয়।
আপনি একটু আগে নাগরিক সমাজের দ্বিধাগ্রস্ত ভূমিকার কথা বললেন। আপনার বিবেচনায় নাগরিক সমাজ এখন কী করতে পারে?
আসিফ মোহাম্মদ শাহান: নাগরিক সমাজকে অবশ্যই একটা শক্ত অবস্থান নিতে হবে, নাগরিক সমাজকে নিজের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। কেন আমি এ কথা বলছি? এর উত্তরের জন্য আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকার যখন নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশই চুপ থেকেছে। তারা এটা ভেবে চুপ ছিল যে অন্তত একটা ‘লিবারেল সরকার’ তো পেয়েছি, এই সরকার চলে গেলে বিকল্প তো কিছু নেই। এটা ছিল একটা ফলস-স্ট্যান্ড বার্গেনিং। এর ফল নাগরিক সমাজের জন্যও ভালো হয়নি। কারণ, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নাগরিক সমাজের বৈধতা নিয়ে বিশাল প্রশ্ন আসছে এবং তারা অনেক ক্ষেত্রেই তার দায়িত্বটা পালন করতে পারেনি।
এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে নাগরিক সমাজকে অবশ্যই শিক্ষা নিতে হবে। এখন নাগরিক সমাজকে মাথায় রাখতে হবে যে বিএনপির যে কর্মকাণ্ড, সেটা যদি গণতান্ত্রিক নীতিকে লঙ্ঘন করে এবং সেটা যদি গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হয়, তাহলে অবশ্যই তাদের শক্ত আওয়াজ তুলতে হবে। এই আওয়াজের ফলে আবারও যদি কে উপকৃত হচ্ছে, কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এই চিন্তা করে নাগরিক সমাজ তার দায়িত্ব থেকে সরে আসে, তাহলে এবার কিন্তু তার ফল আরও ভয়াবহ হবে।
কেননা গতবার মাঝখানে বিএনপি ছিল বলে এখন তারা ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতি তৈরি হলে মাঝখানে জায়গা নেওয়ার মতো কোনো রাজনৈতিক দল নেই। যে ডানপন্থাকে ভয় করা হচ্ছে, তারাই কিন্তু সবকিছুর দখল নিয়ে বসবে। সুতরাং ডানপন্থাকে ঠেকানোর জন্যই বিএনপিকে একটা সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করে যেতে হবে।
অন্তর্বর্তী আমলেই ডানপন্থার একটা পরিষ্কার উত্থান দেখা গিয়েছিল। আমাদের সমাজের মেরুকরণ ও বিভাজন যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র। এটিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
আসিফ মোহাম্মদ শাহান: ডানপন্থার এই উত্থানের একটি ইতিহাস আছে, সমাজের ভেতরে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা হঠাৎ করে হয়নি। আমরা এখন এর ফলাফলটা দেখতে পাচ্ছি। অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারকে ‘লিবারেল সরকার’ বলতেন, কিন্তু সেই সরকারেরও কর্মকাণ্ড দেখুন, ২০১৪-১৫-এর ডানপন্থীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দেখুন, তারাও ডানপন্থীদের সঙ্গে আপস করেই ক্ষমতায় থেকেছে। ফলে সমাজের যে পরিবর্তন, তার সূচনা তখন থেকেই শুরু হয়েছে।
এখন বিপদটা হচ্ছে, আমরা এখন এমন এক সময়ে এসে পৌঁছেছি, যেটাকে রাজনৈতিক ট্রাইবালিজম বা গোত্রতন্ত্র বলা যায়। আমাদের মধ্যে আদর্শগত মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কেউ কোনো মতের সঙ্গে একমত হবেন, কেউ হবেন না—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ডানপন্থার উত্থানের ফলে এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ভিন্নমতকে শুধু অগ্রাহ্যই করা হচ্ছে না, বরং ভিন্নমতের নাগরিকদের অধম ও শত্রু হিসেবে দেখা হচ্ছে। মতের সঙ্গে না মিললেই তার প্রতি বৈরী আচরণ করা যাবে, এমন মানসিকতা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস এবং বর্তমান সরকারের ৫ মাসে আমরা এই রাজনৈতিক ট্রাইবালিজমের বিস্তার দেখছি।
একদিকে ডানপন্থী রাজনৈতিক ট্রাইবালিজমটা বাড়ছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্তরা এই ট্রাইবালিজমের রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরেই ‘আমরা বনাম তারা’—এই বিভাজনের রাজনীতি করেছে এবং তারা একটি জনগোষ্ঠীকে অধম হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। যে জনগোষ্ঠীটি তখন নির্যাতিত ছিল, তারা এখন বিপরীত দিকে আরেকটি জনগোষ্ঠীকে অধম হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। ফলে রাজনৈতিক ট্রাইবালিজম যখন বাড়ছে, তখন সমাজের মধ্যে একটা বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার কারণেই ডানপন্থার এই উত্থানকে কার্যকরভাবে ঠেকানো যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ করছে। জামায়াতের জন্য ডানপন্থার বিস্তার রাজনৈতিকভাবে লাভজনক, তাই এটিকে ঠেকানোর তেমন কোনো প্রণোদনা তাদের নেই। এনসিপি যেহেতু জামায়াতের সঙ্গে রয়েছে, তাই জামায়াতের কোনো অবস্থান বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও দলটি শক্ত কোনো অবস্থান নিচ্ছে না।
বিএনপির বড় একটা ভোট আসে ডানপন্থী মনোভাবের ভোটারদের কাছ থেকে। ফলে এটিকে বিএনপিও চ্যালেঞ্জ করতে পারছে না। ফলে পুরো রাজনৈতিক ডিসকোর্স ডান দিকে সরে এসে কে কতটা ডানপন্থীদের আকৃষ্ট করতে পারবে, রাজনীতিটা সেই জায়গায় আটকে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক এই ট্রাইবালিজম থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ কি দেখেন?
আসিফ মোহাম্মদ শাহান: প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক আলোচনা ও ডিসকোর্স, যেটা মধ্যপন্থী অবস্থান থেকে অনেক বেশি ডান দিকে সরে গেছে, সেটিকে আবার মধ্যপন্থী অবস্থানে নিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে একটু বাম পরিসরের দিকে সরিয়ে আনতে হবে।
এই পরিবর্তনের জন্য প্রথম যে জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, ব্যক্তিগত অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া। আপনার মতামত আমার পছন্দ না-ও হতে পারে এবং আমার মতামত আপনার পছন্দ না-ও হতে পারে, তার জন্য আমাকে বা আপনাকে অধম বা ঊনমানুষ বানানো যাবে না। নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। এটা রাষ্ট্রের বামপন্থী আদর্শ নয়; এটি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমরা দেখেছি, গত শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে এনজিওসহ বিভিন্ন নাগরিক সংস্থা গ্রামীণ জনগণের জন্য কাজ করেছে। মানুষের মধ্যে সহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরিতে এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে নাগরিক সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্পেকট্রামের লিবারেল জায়গায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটা পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোকে এখানে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে তারা এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তাদের প্রথম কাজ হতে পারে, একটি ন্যূনতম অভিন্ন সমঝোতার ভিত্তিতে এক হওয়া। এরপর মানুষের অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে ধারাবাহিক রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করা।
আপনাকে ধন্যবাদ।
আসিফ মোহাম্মদ শাহান: আপনাকেও ধন্যবাদ।