‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগে সায় নেই, অপেক্ষাতেই দল

দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রধান প্রধান দলগুলোর অবস্থান নিয়ে গত ২০ মে থেকে ‘রাজনীতির হালচাল’ সিরিজ প্রকাশ শুরু হয় প্রথম আলোয়। পাঁচটি পর্ব পেরিয়ে আজ এর শেষ পর্ব প্রকাশ হলো।

জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এমন বেহাল হয়ে পড়ে আছেফাইল ছবি: প্রথম আলো

পুরোনো অবস্থানেই অনড় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা কিংবা পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থান বদলের লক্ষণ নেই। ‘রিফাইন্ড’ বা ‘পরিশুদ্ধ’ আওয়ামী লীগের ধারণা ঘিরে দলটির ভেতরে আলোচনা আছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে টিকে থাকা ও আবার সক্রিয় হওয়ার সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প পথ হিসেবে এই ধারণাকে সামনে আনছেন কেউ কেউ। তবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে শেখ হাসিনা, এ ধারণার প্রতি একেবারেই অনাগ্রহী।

এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকের কাছেই দলটির রাজনীতিতে ফেরার পথ কী, তা স্পষ্ট নয়। অনেকের মধ্যে হতাশাও কাজ করছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বর্তমান সরকার যদি বড় ধরনের ভুল করে বা অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ বা সুযোগ তৈরি হবে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘রিফাইন্ড’ বা সংস্কারের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিতদের নেতৃত্বে আনার বিষয়টি বন্ধুপ্রতিম দেশ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছানো হয়েছিল। নির্বাচনের পরও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে নিজের সভাপতি পদ ছাড়তে নারাজ শেখ হাসিনা। বড়জোর সাধারণ সম্পাদকের বিকল্প হিসেবে মুখপাত্র হিসেবে এক বা একাধিক নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সেটাও তাঁর পছন্দের এবং বিদেশে থাকা নেতাদের মধ্য থেকেই করার পক্ষে তিনি, যা শুভাকাঙ্ক্ষীদের কোনোভাবেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে সংস্কারের সব ধারণা আপাতত ‘মৃত’ বলেই মত সবার।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকের কাছেই দলটির রাজনীতিতে ফেরার পথ কী, তা স্পষ্ট নয়। অনেকের মধ্যে হতাশাও কাজ করছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বর্তমান সরকার যদি বড় ধরনের ভুল করে বা অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ বা সুযোগ তৈরি হবে।

আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা ও অনলাইন আলোচনা থেকে দলটির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। ওয়াকিবহাল সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর এখন দলে সবচেয়ে বিতর্কিত ও কট্টরপন্থীরা বেশি সক্রিয়। যাঁরা নিজেদের ভুল স্বীকার কিংবা অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা দেখাতে মোটেও প্রস্তুত নন। বরং দেশের ভেতর ঝটিকা মিছিল ও বিচ্ছিন্ন স্লোগান দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি এবং সংগঠিত হওয়ার পক্ষে। এ ছাড়া প্রশাসনের ভেতর সরকারবিরোধী মত প্রবল করাও তাঁদের লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে রিফাইন্ড বা নতুন করে শুরু করার বিষয়ে যাঁরা আশা দেখছিলেন, তাঁরা অনেকটাই চুপসে গেছেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা নিজেই দলের নীতি নির্ধারণ করছেন। পরিবারের সদস্যরা এতে যুক্ত থাকেন। আর দেশের ভেতর ও আত্মগোপনে থাকা নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বেশি সক্রিয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। আর সরকারের ভেতরের বিভিন্ন সংস্থায় থাকা দলঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তিনি কলকাতায় অবস্থান করছেন। এর বাইরে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, চিঠিপত্র আদান-প্রদানসহ কিছুটা ‘সফট’ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়াসহ কিছু নেতা। বাকিরা অনলাইনে দলীয় প্রধান কিংবা অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ যদি গায়ের জোরে ফিরে আসার চিন্তা করে, সে ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি যৌথভাবে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করবে। এ ধরনের চিন্তা আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতিকর, দেশের জন্য ভয়াবহ হবে, সংঘাতপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসবে।
আলতাফ পারভেজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি অংশ মনে করেন, দলে সংস্কার আনার বিষয়ে অনাগ্রহ বন্ধুপ্রতিম দেশ ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা কিছুটা অখুশি। বর্তমানে যে বিশ্বব্যবস্থা তাতে কোনো বিদেশি শক্তি আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে—এমনটা মনে করছেন না তাঁরা। অন্তর্বর্তী সরকারের মতো ক্ষমতাসীন বিএনপি হয়তো আওয়ামী লীগের ওপর এতটা কঠোর হবে না। কিন্তু তারা কখনোই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন পুরোনো আওয়ামী লীগকে ফিরতে দেবে না। সুতরাং আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানের জন্য অপেক্ষা করতে হবে; যা একেবারেই অবাস্তব। আরেকটি পথ হচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপির মধ্যে চরম বিভেদের জন্য অপেক্ষা করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ধারণারও খুব একটা ভিত্তি নেই। ফলে আওয়ামী লীগের এখনকার রাজনীতি অনেকটাই লক্ষ্যহীন।

ভারতে থাকা শেখ হাসিনা দলের কর্তৃত্ব ছাড়তে নারাজ বলে জানাচ্ছে দলটির সূত্র
ফাইল ছবি

এ অবস্থায় স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচনের সময় এলাকায় টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগের অনেকেই অন্য দলে চলে যেতে পারেন বলে আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করেন।

নানা মাধ্যমে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা দলের নেতা-কর্মীদের প্রায়ই বলতেন, যাঁরা রাজনীতি করতে চান, তাঁরা দেশে ফিরে যান। অর্থাৎ দেশে গিয়ে কারাবরণ, মামলা মোকাবিলা করুন। এখন পর্যন্ত কেউ এই নির্দেশনায় সাড়া দেননি। আবার, দেশে এসে কারাগারে গেলে জামিন মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকার আওয়ামী লীগকে ছাড় দেবে এমন কোনো সমঝোতা কিংবা উদ্যোগও নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশে ব্যবসা আছে এমন সাবেক সংসদ সদস্য, বিদেশে পরিবার থাকে এমন নেতা কিংবা বয়সে জ্যেষ্ঠ অনেকে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হওয়ার কথাও বলছেন ঘনিষ্ঠদের। দেশে ফিরলে জামিন মিলবে-এমন আশ্বাস পেলে ফেরার কথা ভাবছেন ব্যবসায় যুক্ত সাবেক সংসদ সদস্য বা নেতারা।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে জায়গা দিতে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক কোনো মহল থেকে কোনো চাপ আছে বলেও মনে করেন না দলটির নেতারা। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে থাকা নেতারা দেশে ফেরার চিন্তা করছেন না। বরং কেউ কেউ দেশে ফেরার তাগিদ এড়াতে দীর্ঘদিন ভারতে থাকার পর অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এর মধ্যে দুজন প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্যের একজন মালয়েশিয়ায়, অন্যজন সাইপ্রাসে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের ধারণা, ভারতের সঙ্গে বিএনপি সরকারের সম্পর্ক ভালো হলে সে দেশটি তাঁদের জন্য নিরাপদ না–ও হতে পারে।

টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ছাত্র–গণঅভ্যুত্থানে তাদের পতন হয়েছে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাসহ অধিকাংশ নেতা-কর্মী বিদেশে আত্মগোপনে। দেশে থাকা নেতা–কর্মীদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ কারাগারে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়নি। ফলে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি, হারিয়েছে সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক অবস্থান ও মাঠের নিয়ন্ত্রণ।

বিকল্প পথ ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’

এমন সংকটময় বাস্তবতায় ‘রিফাইন্ড’ বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগের ধারণা সামনে আসে। এটি হচ্ছে মূলত দলটি পুনর্গঠনের একটি প্রস্তাব, যেখানে বিতর্কিত বা অভিযুক্ত নেতৃত্বের বাইরে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য, কম বিতর্কিত ও ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তির’ নেতাদের দিয়ে দলকে নতুনভাবে দাঁড় করানো।

‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগের আলোচনা হলেও দলের কট্টরপন্থী নেতারা মনে করেন, শেখ হাসিনার বিকল্প আওয়ামী লীগে নেই। আর যদি বিকল্প আনতে হয়, তবে তাঁর পরিবার থেকেই হতে হবে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রস্তুত কেউ নেই; তা ছাড়া বর্তমান সময়টাও এই ধরনের উদ্যোগের জন্য অনুকূল নয়।

এই ধারণার পেছনে যুক্তি হচ্ছে—বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক দায় তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে সরাসরি রাজনীতিতে ফিরে আসা কঠিন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মহল এবং দেশের একটি বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান বার্তা প্রয়োজন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনার বয়স ৮০ পেরিয়েছে। তিনি চার দশকের বেশি ধরে দলের নেতৃত্বে। তাঁর রাজনীতিতে ফিরে আসা কঠিন মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ফলে ভবিষ্যতের জন্য দলটিকে সংগঠিত করার একটা বিকল্প হচ্ছে নেতৃত্বে পরিবর্তন।

রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফেরার বিরোধিতায় সরব জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকা তরুণেরা
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ধারণাটি প্রথম সামনে আসে গত বছর মার্চে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) এবং বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ নিজের ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেন। তাতে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে। এই পরিকল্পনা পুরোপুরি ভারতের; সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ফজলে নূর তাপসকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।

এরপর কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। আবার বিষয়টি সামনে আসে বিএনপি সরকার গঠনের পর। তবে এবার বেশি আলোচনা হয় ভারতভিত্তিক কিছু অনলাইন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর মূল বার্তা হচ্ছে—রিফাইন্ড আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার সায় নেই বা এ ধরনের কোনো চেষ্টা সফল হচ্ছে না।

সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনীতি একধরনের ‘অপেক্ষার রাজনীতিতে’ রূপ নিয়েছে। কিন্তু সেই অপেক্ষার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। দলটির নেতাদের মধ্যে রাজনীতিতে ফেরার আলোচনা আছে। তবে তা কীভাবে সম্ভব, এর কোনো স্পষ্ট পথ জানা নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশে ও বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, দলের কট্টরপন্থী নেতারা মনে করেন, শেখ হাসিনার বিকল্প আওয়ামী লীগে নেই। আর যদি বিকল্প আনতে হয়, তবে তাঁর পরিবার থেকেই হতে হবে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রস্তুত কেউ নেই; তা ছাড়া বর্তমান সময়টাও এই ধরনের উদ্যোগের জন্য অনুকূল নয়। কট্টরপন্থীদের মত হচ্ছে—আগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম শুরুর অনুমতি পাক। এরপর দলে সংস্কার আনা হবে। তবে সংস্কার হতে হবে শেখ হাসিনাকে রেখে এবং অন্য বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে নতুনদের আনতে হবে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই হতাশ

দেশে থাকা নেতা, কর্মী কিংবা সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায়ই বিদেশে থাকা নেতাদের ফোনে কথা হয়। কেমন আছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বেশির ভাগ নেতার মুখ থেকে আসে দীর্ঘশ্বাস, ভালো থাকার সুযোগ কোথায়? দিল্লি, কলকাতা, লন্ডন, নিউইয়র্ক, ব্রাসেলস, দুবাই, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর—যেখানেই থাকুক না কেন কমবেশি সবার জবাব কাছাকাছি।

ভারত ও ইউরোপে থাকা দুজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা বলছিলেন, রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে অঢেল টাকা বা আয়েশি জীবন—কোনোটাই সুখের হয় না। পরিস্থিতি এমন যে ঘরের বাইরে যেতেও নানা সংশয়, মন টানে না। আবার বিদেশে থাকা সবাই আর্থিকভাবে খুব ভালো আছেন, তা–ও নয়। বিশেষ করে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে থাকা অনেকে আর্থিকভাবে কষ্টে আছেন বলেও কোনো কোনো নেতা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশে ব্যবসা আছে এমন সাবেক সংসদ সদস্য, বিদেশে পরিবার থাকে এমন নেতা কিংবা বয়সে জ্যেষ্ঠ অনেকে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হওয়ার কথাও বলছেন ঘনিষ্ঠদের। দেশে ফিরলে জামিন মিলবে—এমন আশ্বাস পেলে ফেরার কথা ভাবছেন ব্যবসায় যুক্ত সাবেক সংসদ সদস্য বা নেতারা।

দেশে-বিদেশে প্রথমে আলোচনা ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে দিয়ে ‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চালু হতে পারে। বিএনপি সরকারের গঠনের পর গত ৭ এপ্রিল সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তিনি পাঁচ দিনের মাথায় ১২ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পান। তাঁকে নিয়েও আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের গুঞ্জন ছড়ায়।

সব মিলিয়ে নেতাদের কেউ কেউ এতে কিছুটা আশাও দেখছিলেন; এর মাধ্যমে যদি রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ হয়। তবে দলের ভেতরে একটা শক্তিশালী মত হচ্ছে—শেখ হাসিনার অনুমোদন ছাড়া নতুন কোনো সাংগঠনিক কাঠামো টেকসই হবে না। কারণ, মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বড় অংশ এখনো তাঁর নেতৃত্বকেই চূড়ান্ত হিসেবে মানে। শেখ হাসিনার দিক থেকে এ ধরনের উদ্যোগে সায় নেই জানার পর অনেকেই এখন আর আশা দেখছেন না।

বিএনপির সরকার গঠন: আশা ও হতাশা

বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে—এমনটা আশা করছিলেন অনেকেই। এমনকি গ্রেপ্তারকৃত নেতারা জামিন পাবেন, এরপর আত্মগোপনে থাকা নেতারা দেশে ফিরবেন—এমনও প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বিএনপির তিন মাসের মেয়াদে এমন আশা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ নেতাদের।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা অংশ নেবেন এবং ভালো ফলাফলের মাধ্যমে কর্মীদের মনোবল বাড়াতে চেষ্টা চালাবেন বলেও দলের একটি অংশ আশা করছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সুযোগ পাবেন বলে মনে করছেন না দলটির অনেক নেতা। ফলে বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরতে পারবে বলে দলটির একটা অংশের ভেতর যে আশা ছিল, তা কিছুটা হতাশায় রূপ নিয়েছে।

এই মিছিল চট্টগ্রামে গত এপ্রিলে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা নানা স্থানে মাঝে–মধ্যে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করে, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়
ফাইল ছবি

আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ছাড় দেওয়ার মতো রাজনৈতিক ঝুঁকি বিএনপির পক্ষে এখন নেওয়া কঠিন। ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী শক্তি জামায়াত-এনসিপির মধ্যে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে তাদের অবস্থান প্রায় একই। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকার বড় ধরনের চাপে পড়ে কি না, সে জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আওয়ামী লীগের জন্য খুব একটা বিকল্প নেই। এর মধ্যে দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করতে হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ চেষ্টা চালালেও সফল হয়নি। ফলে নির্বাচনটি বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন আওয়ামী লীগের ভেতরে একটি কৌশলগত ভাবনা কাজ করেছিল—জামায়াতকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না।

দলীয় সূত্র অনুযায়ী, এই লক্ষ্য থেকে বিএনপি জোটের প্রতি একধরনের নীরব সমর্থনের কৌশল নেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। জামায়াত ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি আরও কঠোর হতে পারত।

সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনীতি একধরনের ‘অপেক্ষার রাজনীতিতে’ রূপ নিয়েছে। কিন্তু সেই অপেক্ষার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। দলটির নেতাদের মধ্যে রাজনীতিতে ফেরার আলোচনা আছে। তবে তা কীভাবে সম্ভব, এর কোনো স্পষ্ট পথ জানা নেই।

গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, রাজনীতিতে ফিরতে হলে আওয়ামী লীগকে তাদের সাড়ে ১৫ বছরের শাসন ও রাজনীতি নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি ও ভুল স্বীকার করতে হবে। ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থানে ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টি তাদের মেনে নিয়ে এর মুখোমুখি হতে হবে। কোনো সরকারই ফৌজদারি অপরাধের ক্ষমা করতে পারবে না। কিন্তু মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ এর কোনোটার জন্যই প্রস্তুত নয়।

আলতাফ পারভেজ প্রথম আলোকে বলেন, মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ যদি গায়ের জোরে ফিরে আসার চিন্তা করে, সে ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি যৌথভাবে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করবে। এ ধরনের চিন্তা আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতিকর, দেশের জন্য ভয়াবহ হবে, সংঘাতপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসবে।

নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করাটা অন্তর্বর্তী সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন না আলতাফ পারভেজ। তাঁর মতে, বিএনপিও একই ভুল করল। বরং আওয়ামী লীগকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারত। যেমন নেপালে গণ–অভ্যুত্থানের পর কোনো দল নিষিদ্ধ করা হয়নি। পূর্বতন ক্ষমতাসীন দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ফলে আওয়ামী লীগ এই প্রচার করতে পারছে যে তারা ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্ত।