৭০ পেরোনো তিন নারী ভোটের লড়াইয়ে
তিনজন নারীর প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁদের কারও স্বামী ছিলেন মন্ত্রী, কারও স্বামী ছিলেন সংসদ সদস্য। খুব কাছ থেকে রাজনীতির বন্ধুর পথ দেখেছেন। তাঁদের বেশ কিছু মিলও রয়েছে—আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তিনজনই। তিনজনই উচ্চশিক্ষিত, সম্পদশালী। সবার বয়স ৭০ বছর পেরিয়েছে, এবার নারী প্রার্থীদের মধ্যে তাঁরা বয়োজ্যেষ্ঠ। তাঁদের দুজন দলীয় প্রার্থী, একজন স্বতন্ত্র।
এই তিন নারী প্রার্থী হলেন নরসিংদী-৫ আসনের মেহেরুন নেছা খাঁন হেনা, নোয়াখালী-১ আসনের রেহানা বেগম এবং ময়মনসিংহ-৬ আসনের আখতার সুলতানা।
তাঁদের মধ্যে একজন পেশায় শিক্ষক। একজন শিক্ষক ও ব্যবসায়ী। অন্যজন রাজনৈতিক কর্মী। নির্বাচনের আগমুহূর্তে এখন তাঁরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, ভোট চাইছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, এবারের নির্বাচনে ভোটাররা প্রতীক নয়, যোগ্য প্রার্থী দেখে ভোট দেবেন।
এখন পর্যন্ত ১৯টি ইউনিয়নের ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়েছি। ভোট চাইছি। ভোটাররা স্বাগত জানিয়েছেন। আমি অভিভূত
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ১৭ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী ৮৫ জন। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া নারী প্রার্থীদের হলফনামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, তাঁদের ৬৪ জনই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। পেশাগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী কর্মজীবী।
নারী প্রার্থীদের মধ্যে ২৫ বছর বয়সী ৩ জন, ২৬ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ২৯ জন, ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৩১ জন, ৫১ থেকে ৬৯ বছর বয়সী ১৮ জন এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সী প্রার্থী রয়েছেন ৩ জন। একজন প্রার্থীর বয়সের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছি: মেহেরুন নেছা
মেহেরুন নেছা খাঁন হেনা জাতীয় পার্টির প্রার্থী। প্রতীক লাঙ্গল। রায়পুরা উপজেলা নিয়ে গঠিত নরসিংদী–৫ আসনে ভোটে দাঁড়িয়েছেন। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৮ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ৭২ বছর ১১ মাস।
বিএ পাস এই নারী হলফনামায় পেশা উল্লেখ করেছেন গৃহিণী ও রাজনৈতিক কর্মী। তাঁর বছরে আয় সাড়ে ২৩ লাখ টাকার বেশি। নগদ অর্থ রয়েছে ২৭ লাখ ২৮ হাজার টাকার বেশি। ব্যাংকে রয়েছে সাড়ে ৫ লাখ টাকার বেশি। তাঁর ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং আড়াই কোটি টাকার বেশি সেভিংস ডিপোজিট রয়েছে।
এ ছাড়া মেহেরুন নেছার ৩৫ ভরি স্বর্ণালংকার রয়েছে এবং রাজধানীর গুলশান এলাকায় নিজের নামে ২ হাজার ৩৭৭ বর্গফুটের ফ্ল্যাটও রয়েছে।
মেহেরুন নেছার বাবার নাম আবদুল খালেক খাঁন। মায়ের নাম মকবুলা খাঁন। চার বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে মেহেরুন নেছা সবার বড়। তাঁর স্বামী ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ছিলেন রাষ্ট্রদূত। পরে তিনি আশির দশকে এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হন। এখন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন। রাজনীতিতে আর সম্পৃক্ত নন।
মেহেরুন নেছা ২০০৭ সালে জাতীয় পার্টিতে যুক্ত হন। তিনি এখন দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পদে রয়েছেন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নরসিংদীর একই আসন থেকে মনোনয়ন পেলেও পরে তিনি দলীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।
এক মেয়ে ও দুই ছেলের মা মেহেরুন নেছা প্রথম আলোকে জানান, শিক্ষা আর রাজনীতি—দুই ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠিত হতে তাঁকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। কম বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী তখন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে কর্মরত ছিলেন। সেখানে গিয়ে মেহেরুন নেছা ও লেভেল এবং এ লেভেল শেষ করেন।
দেশে ফিরে আসার পর ১৯৮৭ সালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। এরপর ইডেন কলেজে ইংরেজি বিভাগে এমএ ভর্তি হয়ে দুই বছর পড়াশোনা করেন, কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে পারেননি। তাঁকে চলে যেতে হয় স্বামীর তৎকালীন কর্মস্থল মালয়েশিয়ায়।
নির্বাচন কমিশনে (ইসি) মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া নারী প্রার্থীদের হলফনামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, তাঁদের ৬৪ জনই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। পেশাগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী কর্মজীবী।
মেহেরুন নেছা বলেন, নারীদের জীবনে কী পরিমাণ ছাড় দিতে হয়, তা তিনি নিজেকে দিয়েই বুঝতে পারেন। তাঁর এলাকার নারীরা যেন শিক্ষায়–কর্মে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেই লক্ষ্য পূরণ করতে চান তিনি। তরুণেরা যেন শিক্ষার পর এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, সে জন্য এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।
প্রচারের অভিজ্ঞতা জানিয়ে মেহেরুন নেছা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১৯টি ইউনিয়নের ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়েছি। ভোট চাইছি। ভোটাররা স্বাগত জানিয়েছেন। আমি অভিভূত।’
এবারের নির্বাচনে নরসিংদী–৫ আসনে মোট ১০ জন প্রার্থী লড়ছেন। তাঁদের মধ্যে আরেকজন নারী রয়েছেন। তিনি ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের তাহমিনা আক্তার (২৫)।
নারী ভোটাররা নারী জনপ্রতিনিধি পছন্দ করেন: রেহানা বেগম
চাটখিল ও সোনাইমুড়ী উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-১ আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) প্রার্থী রেহানা বেগম। দলীয় প্রতীক তারা। হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৫৫ সালের ২০ মে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় বয়স ছিল ৭০ বছর ৭ মাস ৯ দিন।
রেহানার শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসসি, এমএস। পেশা লিখেছেন ব্যবসা। তবে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর এখনো শিক্ষকতা করছেন।
রেহানার বাবার নাম শরিয়ত উল্লাহ। মায়ের নাম সুফিয়া খাতুন। সাত বোন আর তিন ভাইয়ের মধ্যে রেহানা তৃতীয়। স্বামী গোলাম জিলানী চৌধুরী ৪৫ বছর জেএসডির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। সত্তর দশকে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ছিলেন। ১৯৮৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেএসডির প্রার্থীও হয়েছিলেন। তিনি বেঁচে নেই। স্বামীর পথ ধরে জেএসডিতে যুক্ত হন রেহানা। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
নির্বাচনী হলফনামায় রেহানা বার্ষিক আয়ের ক্ষেত্রে (বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট/ বাণিজ্যিক স্থান, অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া) ৬ লাখ টাকা উল্লেখ করেছেন। ব্যবসা থেকে বছরে আয় লিখেছেন ১৫ লাখ ২১ হাজার টাকার বেশি। শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংকে আমানত রয়েছে ৯০ লাখ টাকা। নগদ অর্থ রয়েছে ১০ লাখ টাকা। সোনার গয়না রয়েছে ২০ ভরি। অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে তাঁর যৌথ মালিকানায় একটি ৪ তলা বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে তাঁর নামে ভবনের (আবাসিক/বাণিজ্যিক) অবস্থানের মালিকানা রয়েছে, যার মূল্য ২২ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
রেহানা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামী রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা করতেন। আমদানি-রপ্তানির সময় পণ্য খালাস ও গন্তব্যে পরিবহনের ব্যবসা ছিল তাঁর। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ও তাঁর দুই ছেলে ব্যবসার হাল ধরেন। ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে অবসর নেওয়ার পর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় তাঁর একটি শাড়ির দোকান রয়েছে।
স্বামী বা পরিবারের পুরুষ সদস্যের কথায় অনেকে ভোট দেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তাঁরা নারী জনপ্রতিনিধি পছন্দ করছেন
রেহানা বেগম এবারই প্রথম নির্বাচন করছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের জন্য কিছু করার উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি। ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। এখানকার নারীরা অবহেলিত। স্বামী বা পরিবারের পুরুষ সদস্যের কথায় অনেকে ভোট দেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তাঁরা নারী জনপ্রতিনিধি পছন্দ করছেন। তাঁরা নিজেরা সরাসরি জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে চান।’
এই প্রার্থী আরও বলেন, ভোটারদের প্রতি আহ্বান থাকবে, দল বা প্রতীক দেখে নয়, যোগ্য প্রার্থী দেখে যেন তাঁরা ভোট দেন।
নোয়াখালী–১ আসনে এবারের নির্বাচনে মোট সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নারী প্রার্থীদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ আখতার সুলতানা
ময়মনসিংহ–৬ (ফুলবাড়িয়া উপজেলা) আসনে ফুটবল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আখতার সুলতানা। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৪৯ সালের ৭ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় তাঁর বয়স ছিল ৭৬ বছর ৮ মাস ২২ দিন। হলফনামায় তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতা লিখেছেন স্নাতকোত্তর। পেশা শিক্ষকতা। বাবার নাম মজিবর রহমান, মায়ের নাম লুৎফুন্নেছা বেগম।
আখতার সুলতানার স্বামী প্রয়াত প্রকৌশলী শামছ উদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহ–৬ আসন থেকে দুবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তিনি উপজেলা (ফুলবাড়িয়া) বিএনপির সভাপতিও ছিলেন। ২০২০ সালে শামছ উদ্দিন আহমেদ মারা যান।
উপজেলার আখতার সুলতানা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন এই নারী প্রার্থী। তাঁর দুই ছেলে। এবারের নির্বাচনে আখতার সুলতানা এবং তাঁর বড় ছেলে তানভীর আহম্মেদ বিএনপি থেকে মনোনয়নপত্র নিয়েছিলেন। কেউই মনোনয়ন পাননি। এরপর মা ও ছেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
তানভীর আহম্মেদ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার। দ্বৈত নাগরিক (যুক্তরাষ্ট্রের) হওয়ায় যাচাই–বাছাইয়ে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। আখতার সুলতানা উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি ছিলেন। এখন দলের কোনো পদে তিনি নেই। তিনি এবারই প্রথম নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
আখতার সুলতানার স্বামী প্রয়াত শামছ উদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহ-৬ আসন থেকে দুবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। আখতার সুলতানাও বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন, না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
হলফনামা অনুযায়ী, আখতার সুলতানার আয়ের উৎস কৃষি খাত, শেয়ার বন্ড, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত এবং পেনশন। বছরে সাড়ে ৫ লাখ টাকার বেশি আয় রয়েছে তাঁর। নগদ অর্থ রয়েছে ৫৪ লাখ টাকার বেশি। বন্ড, ঋণপত্র, শেয়ার রয়েছে ২০ লাখ টাকার। এ ছাড়া স্থাবর সম্পদ হিসেবে এক একর কৃষিজমির মূল্য দেখিয়েছেন ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। গয়না রয়েছে ৫ ভরি।
এবারের নির্বাচনে ময়মনসিংহ–৬ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী রয়েছেন।