আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা আছে যে বিএনপি ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গণসমাবেশে বড় জমায়েত করতে সফল হলে পরবর্তী সময়ে আরও বড় কর্মসূচি দেবে। এমনকি পরবর্তী সময়ে সারা দেশ থেকে লোকজন এনে ঢাকা অবরোধ কিংবা অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ঢাকার ভেতর থেকেও বড় সাড়া পাবে বিএনপি, যা সরকার পতনের বড় আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে সরকার পতনের কথা বললেও ঢাকায় তারা নিজেদের শক্তি দেখাতে পারেনি।

বিএনপি ঢাকায় কোনো ঝামেলা করলে হেফাজতে ইসলামকে মতিঝিল থেকে যেভাবে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এর চেয়ে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে
আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য

আওয়ামী লীগের ভাবনা হলো, ১০ ডিসেম্বর বিএনপির গণসমাবেশ ব্যর্থ করে দিতে পারলে পরবর্তী সময়ে আর দাঁড়াতে পারবে না দলটি। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘ঢাকা অভিযাত্রা’ কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি। সেবার দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গুলশানের নিজ বাসভবন থেকেই বের হতে দেওয়া হয়নি। ওই কর্মসূচির বেশ কদিন আগে থেকেই খালেদা জিয়ার বাসভবন ঘিরে বালুর ট্রাক রেখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল। এরপর বিএনপি আর ঢাকায় বড় জমায়েত করতে পারেনি।

এসব বিবেচনায় বিএনপির জন্য রাজধানী ঢাকার গণসমাবেশ অনেকটা ‘অ্যাসিড টেস্টে’ রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হলো, ঢাকা নিয়ন্ত্রণে না নিতে পারলে দেশের রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বাইরের বিভাগীয় গণসমাবেশগুলোতে বাধার মুখেও বেশ বড় জমায়েত দেখাতে পেরেছে বিএনপি। কিন্তু ঢাকায় ব্যর্থ হলে কর্মীদের মধ্যে ইতিমধ্যে যে চাঙাভাব দেখা যাচ্ছে, তাতে ভাটা পড়বে। আর আওয়ামী লীগ এটাই করতে চাইছে। এ জন্য ক্ষমতাসীন দলটি কয়েক স্তরের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

আওয়ামী লীগের ভাবনা হলো, বিএনপি মরিয়া হয়ে আওয়ামী লীগের বাধা ঠেলে ঢাকায় বড় জমায়েত করতে চাইলে সংঘাত অনিবার্য হবে। তবে বাধার মুখে বিএনপি পেরে উঠবে না বলেই মনে করছেন ক্ষমতাসীনেরা। এ ছাড়া সংঘাত-মারামারি হলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা ও গ্রেপ্তারের সুযোগ নেবে সরকার। বিএনপি দেশে ‘অশান্তি’ সৃষ্টি করতে চায়, এই প্রচারেও জোর দেবে আওয়ামী লীগ।

বিএনপিকে যে সহজে ছাড় দেওয়া হবে না, সে ইঙ্গিত পাওয়া যায় আওয়ামী লীগের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তৃতায়। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কদিন ধরেই বলছেন, ১০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা রাজপথে থাকবেন। বিএনপিকে শান্তি নষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাকও অন্তত তিন দিন বলেছেন, বিএনপি ঢাকায় কোনো ঝামেলা করলে হেফাজতে ইসলামকে মতিঝিল থেকে যেভাবে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এর চেয়ে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগ যে পরিকল্পনা নিয়েছে

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ১০ ডিসেম্বর কী পরিকল্পনা নিয়েছে। এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, ১০ ডিসেম্বর ক্ষমতাসীন দলটি ঢাকাকে প্রায় ‘অবরুদ্ধ’ করে রাখবে। বিএনপির অন্য বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে বড় বাধা ছিল পরিবহন বন্ধ রাখা। ঢাকায় পরিবহন বন্ধের বিষয়টি প্রাথমিক বাধা। মূল বাধা তৈরিতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের দক্ষিণ শাখা তাদের অধীনে থাকা ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে সতর্ক পাহারা বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা, কর্মী ও সমর্থকেরা অবস্থান নেবেন।

এই বিষয়ে আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের দপ্তর সম্পাদক মো. রিয়াজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ১০ ডিসেম্বর কাউকে ঢাকার ভেতরে শান্তি নষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হবে না। মহানগর আওয়ামী লীগ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের অধীনে ৬৪টি ওয়ার্ড ও ১টি ইউনিয়ন আছে। প্রতিটিতে সতর্ক পাহারা বসানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত। এর বাইরে উত্তরের ২৬টি থানা কমিটিও তাদের নিজ নিজ থানার নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নেবে। ওয়ার্ড ও থানা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এতে নেতৃত্ব দেবেন। সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোও অংশ নেবে। ওয়ার্ড ও থানার অবস্থান দেখভাল করার জন্য মহানগর উত্তরের ৭৫ জন নেতাকে এলাকা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ১০ ডিসেম্বর তাঁরা ঢাকায় বড় একটি সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছেন। দল থেকে এখনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। সমাবেশ না হলে প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানায় সতর্ক পাহারা বসানো হবে।

মহানগর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সতর্ক পাহারার জন্য যেসব স্থান নির্বাচন করা হয়েছে, তার সব কটিই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়। এসব মোড় কিংবা সড়ক এড়িয়ে কারও পক্ষেই নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশে যাওয়া কঠিন।

সতর্ক পাহারা কর্মসূচিতে কী থাকবে, এই বিষয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, তাঁরা ঘুরে ঘুরে নিজ নিজ এলাকায় মিছিল করবেন। থাকবে মোটরসাইকেল মহড়াও। প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানা কমিটিতে নেতার সংখ্যা ৩৭। প্রত্যেককে আরও ৫০ জন করে লোক নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে।

এর বাইরে ১০ ডিসেম্বর ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সাভার, ধামরাই ও আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগ সমাবেশ করবে। এর ফলে উত্তরবঙ্গ ও ঢাকা-পাটুরিয়া মহাসড়ক ধরে কেউ বিএনপির গণসমাবেশে আসতে চাইলে বাধার মুখে পড়বেন। একইভাবে কেরানীগঞ্জ আওয়ামী লীগ এবং গাজীপুর জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নিজ নিজ এলাকার মহাসড়কে সমাবেশ ও সতর্ক পাহারা বসাবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে বিএনপির গণসমাবেশে আসা মানুষের বাধা হয়ে দাঁড়াতে যাত্রাবাড়ীতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এবং কাঁচপুরে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের পাহারা থাকবে।

সতর্ক পাহারার জন্য প্রস্তুতি চলছে

১০ ডিসেম্বর ঘিরে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এক মাস ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ ‘বিএনপির মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে’ শান্তি সমাবেশ ও মিছিল কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুতি সারছে।

৫ নভেম্বর বাড্ডায় ও ২০ নভেম্বর উত্তরায় শান্তি সমাবেশ করেছে তারা। দুটিতেই দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিপুল জমায়েতও করা হয় এগুলোতে। প্রতিটি শান্তি সমাবেশের আগে ওই সব এলাকার ওয়ার্ড ও থানা কমিটি নিয়ে প্রস্তুতি সভা হয়েছে। মোহাম্মদপুরে সর্বশেষ শান্তি সমাবেশ করবে মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ। এখনো তারিখ ঠিক হয়নি। তবে ২৬ নভেম্বর হতে পারে।

এদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা করছে। ২৬ নভেম্বর তাদের সঙ্গে দক্ষিণ যুবলীগের যৌথ সভা হবে। এরপর ৯ ডিসেম্বর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। সংগঠনের নেতারা বলছেন, এই সমাবেশে বিপুল জমায়েত নিশ্চিত করার বিষয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্দেশনা রয়েছে।

বর্তমান সরকারের টানা ১৪ বছরের শাসনকাল চলছে। এর মধ্যে সমালোচনা-বিতর্ক নিয়ে দুটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সংঘাত-সহিংসতার মধ্য দিয়ে। আরেকটি জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। এই নির্বাচনকে রাজনৈতিক মহল, নাগরিক সমাজ ও বিদেশিরাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে। কিন্তু বিএনপি ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, তারা সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না। বিপরীতে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী, তাঁরা একচুলও নড়বেন না।

তাহলে কী, রাজনৈতিক এই বিরোধের ফয়সালা কি রাজপথেই হবে?