শুরুটা আরও সুন্দর হতে পারত

বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে শপথবাক্য পাঠ করেনছবি: বাসস থেকে নেওয়া

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি স্বৈরশাসনের পতন ঘটায়নি; জন্ম দিয়েছিল এক নতুন প্রত্যাশার। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশ পেল একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। গতকাল মঙ্গলবার ছিল নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথ। সব মিলিয়ে দিনটি হওয়ার কথা ছিল নতুন রাজনৈতিক সূচনার প্রতীক, গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের এক বড় আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপন।

কিন্তু শুরুতেই দেখা দিল অনাকাঙ্ক্ষিত টানাপোড়েন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে তৈরি হলো প্রথম জটিলতা। বিএনপি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে এ ধরনের শপথের উল্লেখ নেই। শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতেই তারা জানিয়ে দেয়, তারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না। তাদের যুক্তি—সংবিধানে যেহেতু এর ভিত্তি নেই।

আরও পড়ুন

বিএনপির এই অবস্থান রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সকালে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জানায়, বিএনপি যদি সংস্কার পরিষদের শপথ না নেয়, তবে তারা সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের শপথ না–ও নিতে পারে। এতে দিনের প্রথম ভাগে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুটি শপথই নেন। তবে দল দুটির কেউ বিকেলে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেননি, যা অনেকের কাছে রাজনৈতিক দূরত্বের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে জনরায় এসেছে। সেই রায় কার্যকর করার জন্যই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা। আদেশ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই অনুষ্ঠানে পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান ছিল এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারিত। সূচনালগ্নেই এই প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়ার কারণে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বেড়ে গেছে।

আরও পড়ুন

১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, এটা কেবল সরকার পরিবর্তন বা নতুন সরকার গঠন নয়; এটা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশার নির্বাচন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তঝরা পটভূমিতে দেশের তরুণেরা নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখার আশা জুগিয়েছিল—সংলাপ, সমঝোতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ী ভাষণে বলা হয়েছিল, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা।

নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে চায়। বিএনপি জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির কথা বলছে জোরেশোরে।

কিন্তু শপথের দিনেই যে দৃশ্য দেখা গেল, তা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে অনেকটাই বেমানান।

আরও পড়ুন

গণতন্ত্রে মতভেদ অস্বাভাবিক নয়; বরং সেটিই তার প্রাণশক্তি। তবে সূচনালগ্নে প্রতীকী ঐক্যের গুরুত্বও কম নয়। নতুন সরকারের প্রথম দিনটি যদি আরও দৃশ্যমান ঐক্যের বার্তা দিতে পারত, তবে সেটা হতো গণ-অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগের প্রতি গভীরতর শ্রদ্ধা।

এখন দেখার বিষয়, এই প্রাথমিক টানাপোড়েন বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়, নাকি সংলাপের মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে নেয় নতুন বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে বলা যায়, এত ত্যাগের পর যে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা গড়ে উঠেছে, তার আনুষ্ঠানিক শুরুটা আরও সুন্দর হতে পারত।

টিপু সুলতান: সাংবাদিক

আরও পড়ুন