দক্ষিণে এবার ভিন্ন হিসাব

প্রতীকী ছবি

‘এবার টাহাইয়া (দখল করে সিল মেরে) ভোট নেতে পারবে না। মাইনষের মন জয় কইর‍্যা ভোটে জেততে অইবে। যত বড় নেতাই অউক (হোক), আর যেই অউক কেউ সহজে পার পাইবে না। মার্কা লইয়া খাড়াইলেই অইবে না, হিসাব এইবার কঠিন আছে।’

গত বৃহস্পতিবার বরিশাল শহরের সদর রোডে এ কথাগুলো বলছিলেন রিকশাওয়ালা আবদুল মান্নান। তিনি আরও বললেন, ‘ভোট দিমু এবার মনীষারে (মনীষা চক্রবর্ত্তী)। হ্যার লইগ্যা (তাঁর জন্য) এই শহরে অটোরিকশা চালাইয়া দুইডা ডাইল–ভাত খাইতে পারি। আমরা সবাই হ্যারে ভোট দিমু।’

মনীষা চক্রবর্ত্তী বরিশাল–৫ (সদর) আসনে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত মই প্রতীকের প্রার্থী। ২০১৮ সালে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও তিন চাকার যান চলাচলের বৈধতার দাবিতে রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বরিশালে পরিচিত হয়ে ওঠেন বাসদ নেত্রী মনীষা।

বোঝা গেল, আবদুল মান্নান বিপদে নিজের পাশে যাঁকে পেয়েছেন, তাঁকেই ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবদুল মান্নানের বক্তব্যের একটি বার্তা হলো, কখনো কখনো প্রতীকের চেয়ে প্রার্থী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

মনীষা চক্রবর্ত্তী। বরিশাল–৫ (সদর) আসনে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত মই প্রতীকের প্রার্থী
ফাইল ছবি
আরও পড়ুন
বিএনপির প্রার্থী মো. মজিবর রহমান সরোয়ার
ছবি: সংগৃহীত

এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির মো. মজিবর রহমান সরোয়ার, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীমসহ তিন প্রার্থী আছেন। ফয়জুল করীমের সম্মানে এখান থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছে জামায়াতে ইসলামী। মজিবর ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আর ফয়জুল তাঁর দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা। সব মিলিয়ে নির্বাচনের সমীকরণে এ দুজনকে নিয়েই আলোচনা বেশি।

বরিশাল সার্কিট হাউসের সামনে জাহিদুল ইসলাম নামের এক যুবকের কথাতেও এমন আভাস পাওয়া গেল। তিনি বললেন, ‘নির্বাচন হবে সমানে সমান। কাউকেই এবার ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।’

গত পাঁচ দিন বরিশাল জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ভোট নিয়ে এমন নানা আলাপ শোনা গেল। ভোটারদের কাছে কে এসেছেন, এলাকার জন্য কে কী কাজ করেছেন, কোন প্রার্থী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কার সঙ্গে থাকা লোকজন ভালো, কে কাকে হুমকি দিল—সব জায়গাতেই আলোচনা।

আরও পড়ুন
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম
ফাইল ছবি

কেবল বরিশাল জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনেই নয়, ৩০ জানুয়ারি থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠির ভোটের মাঠেও প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। অতীতের ভোটের হিসাব আর সমীকরণ অনেক জায়গাতেই এবার বদলে গেছে।

শুক্রবার সকালে বরিশাল শহর থেকে কাউনিয়া হয়ে বাটনা, আমিরগঞ্জ বাজার পার হয়ে সদর উপজেলার উত্তরের শেষ সীমানায় পৌঁছালাম। ব্রিজের ওপারে বাবুগঞ্জের ধুমচর আর এপারে আমিরগঞ্জ। বরিশাল–৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদী) আসনে যাওয়ার আগে এ পারে কথা হলো অটোরিকশাচলক জসীম উদ্দিনের (৪০) সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘১৭ বছর ভোট দিতে পারি নাই। এবার ভোট দিমু।’

আরও পড়ুন

ভোটের ত্রিমুখী সমীকরণ

বিএনপির প্রার্থী জয়নুল আবেদীন
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

বরিশাল সদর আসন থেকে বের হয়ে বাবুগঞ্জের ধুমচরে ঢুকতেই চোখে পড়ল বিএনপির জয়নুল আবেদীনের ধানের শীষ, ১১–দল সমর্থিত এবি পার্টির মো. আসাদুজ্জামান ভুইয়ার (ব্যারিস্টার ফুয়াদ) ঈগল প্রতীক এবং জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপুর লাঙ্গল প্রতীকের ব্যাপক প্রচারণা। আরও তিন প্রার্থীর কিছু প্রচারণাও দেখা গেল।

খাল আর বিলের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া সড়ক ধরে কিছুটা এগিয়ে দেখা হলো চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালী গ্রামের কৃষক কামাল হোসেন হাওলাদারেরর (৫৮) সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এহেনে বিএনপি–জামাত (জামায়াতের নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী) হোমানে হোমান (সমানে সমান)।’

কামালের কথার সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই আসনটিতে এবার ত্রিমুখী লড়াই হবে। অতীতে আসনটিতে বিএনপির প্রাধান্য থাকায় দলটির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন হিসেবে এগিয়ে থাকবেন। আবার তিনবারের সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়ারও নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। যদিও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গ্রেপ্তার হয়ে তিনি এখনো জেলে আছেন। তবে তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রচারণায় আছেন। আর এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান এলাকার বেশ কিছু উন্নয়ন কাজের দাবিতে সরব থেকে আলোচনায় রয়েছেন।

এবি পার্টির প্রার্থী মো. আসাদুজ্জামান ভুইয়া (ব্যারিস্টার ফুয়াদ)
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন

বাবুগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বরিশাল বিমানবন্দরের পাশের সড়ক ধরে রহমতপুর, রাকুদিয়া, নতুন হাট, শিকারপুর, জয়শ্রী বাজার, শানুহার, বামরাইল বাজার হয়ে এবার পৌঁছালাম গৌরনদীতে। এলাকাটি বরিশাল–১ (গৌরনদী–আগৈলঝাড়া) আসনের অন্তর্ভুক্ত। এখানে বিএনপির প্রার্থী দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। রাস্তার দুই পাশেই তাঁর প্রচারণার ব্যানার ব্যাপকভাবে দেখা গেল।

এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মো. কামরুল ইসলাম খানের দাঁড়িপাল্লার ব্যানারও চোখে পড়ে। আসনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ফুটবল প্রতীকে।

বাটাজোরের দেওপাড়া এলাকায় একজন প্রাইমারি শিক্ষক বলেন, ‘এখানে লড়াই হবে ত্রিমুখী।’

জহির উদ্দিন স্বপন
ফাইল ছবি

এ অঞ্চলের অন্যতম বড় বাজার শরিকলে এবার গন্তব্য। এই বাজারের ওপারেই আবার বাবুগঞ্জের আগৈলঝাড়া, যা বরিশাল–৩ আসনে পড়েছে। বাটাজোরের চন্দ্রহার পার হয়ে শরিকল বন্দর যেতে পথেই পড়ে চন্দ্রহার বাজার। এই বাজার থেকে আরও প্রায় ছয় কিলোমিটার সামনে শরিকল। পথে শরিকল ইউনিয়নের সাকোকাঠি গ্রামের কানাই লাল দাস (৫৫) বললেন, তাঁদের নিকটবর্তী কেন্দ্রে ২ হাজার ৭০০ ভোটার। এলাকাটিতে শতাধিক হিন্দু ঘর আছে।

আরও পড়ুন

যেখানে অনেক হিসাব

গৌরনদী থেকে বেরিয়ে উজিরপুর এবং বানারীপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল–২ আসনের বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের সঙ্গে কথা হলো। বোঝা গেল, এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু ও জামায়াতের আবদুল মন্নানের সঙ্গে। তবে জাতীয় পার্টির এম এ জলিলের কিছু ভোট আছে, এমন কথাও জানালেন কেউ কেউ।

ভোটের কিছু হিসাব বোঝা গেল উজিরপুরের শোলক ইউনিয়নের মো. সেলিম হাওলাদারের সঙ্গে কথা বলে। তিনি বলছিলেন, ‘বড় ভোট ২০০৮–এ দিছি, তারপর আর দিতে পারি নাই। এবার নিজে ভোট দিতে পারমু বোজলে (বুঝলে) কেন্দ্রে যামু। আর যদি বুঝি মাইনষে দিয়া দেবে, হ‍্যালে (তাহলে) যামু না।’

এর বাইরে আরেকটি হিসাব পাওয়া গেল উপজেলার যুগিহাটীর মো. আলমগীর হোসেন হাওলাদারের কথায়। তিনি বলেন, এই এলাকায় ৪ হাজার ৭০০ ভোটের মধ্যে বেশির ভাগই দুই দলের। এখন কী হবে, তা বলা যায় না।

বানারীপাড়ার গুঠিয়ায় মসজিদের কাছে কথা হলো একজনের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বললেন, ‘মামলা–বাণিজ্যসহ কিছু কর্মকাণ্ড মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এর ফল নির্বাচনেও পড়তে পারে।’

আরও পড়ুন

আশা-নিরাশার একই গল্প

দক্ষিণের নির্বাচনী মাঠ ঘুরে দেখার যাত্রা শুরু হয়েছিল এ অঞ্চলের স্থলভাগের শেষ প্রান্তের পটুয়াখালীর গঙ্গামতীর চর, কাউয়ার চর ও লেবুর চর থেকে। বরিশাল জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে শহরে এসে যা থামে। কাগজে–কলমে যে রাজনীতির চিত্র দেখা যায়, মাঠের মানুষের মনে তার প্রতিফলন কেমন, সেটা জানতেই এবার বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ঘুরে দেখা। নদী, খাল আর দীর্ঘ সড়কপথ পেরিয়ে একের পর এক জনপদে গিয়ে কথা হয়েছে প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে। তাঁদের চোখে নির্বাচন, তাঁদের জীবনের হিসাব আর রাজনৈতিক সমীকরণের ভেতরেই ধরা পড়েছে দক্ষিণের ভোটের বাস্তবতা।

পাঁচটি জেলায় ভ্রমণে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে, তা হলো বেকারত্ব, মাদক, চাঁদাবাজি, নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, ঘন ঘন দুর্যোগ এবং শিল্পকারখানার অভাবে কর্মসংস্থানের সংকট। এসব সমস্যা মানুষের নিত্যদিনের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অনেকেই মনে করেন, নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিতে এসব ইস্যু থাকলেও বাস্তবে সমাধান খুব কম দেখা যায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রগুলো জানায়, বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, র‍্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্যসহ ৩৫–৪০ হাজারের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে।

আরও পড়ুন

রোববার দুপুরে পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. মঞ্জুর মোর্শেদ আলমের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকা সংশয় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘এবার একটা ভোট কেউ এদিক–সেদিক করতে পারবে না, সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। কেউ কোনো বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।’

তবে রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরেও মানুষের মনে রয়েছে অনিশ্চয়তা। নির্বাচনের পর তাঁদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আসবে, সেই প্রশ্নই বারবার ফিরে এসেছে। ঢাকা থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রাপথে নদী, সড়ক আর জনপদ বদলেছে বারবার; কিন্তু মানুষের আশা–নিরাশার গল্প প্রায় একই।

আরও পড়ুন