অস্বস্তিতে ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীরা

কয়েকটি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার কথা শোনা যাচ্ছে।

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী (বাঁ দিক থেকে), আহমেদ আযম খান, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, এস এম ওবায়দুল হক নাসির ও লুৎফর রহমান মতিন

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার বাসিন্দা মুজাফফর হোসেন (৭০) পেশায় একজন কৃষক হলেও রাজনীতির বিষয়ে যে ভালো খোঁজ রাখেন, সেটা তাঁর কথায় বোঝা গেল। গত রোববার দুপুরে উপজেলার খায়েরপাড়া এলাকায় নির্বাচনের পরিবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকার প্রার্থী মনোনয়নে যেভাবে ভুল করেছিল, একই পথে হেঁটেছে বিএনপিও। বিপদে-আপদে এলাকায় যাঁদের সব সময় পাওয়া যায়, তাঁদের সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না দিয়ে দেওয়া হয়েছে যাঁদের টাকাপয়সা ও ওপরে যোগাযোগ আছে তাঁদের। ওপরের ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হয় স্থানীয় জনগণকে।

মুজাফফর হোসেনের কথার যৌক্তিকতা পাওয়া যায় টাঙ্গাইলের আটটি সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের দিকে তাকালে। জেলার আটটি সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচনে বেশ কয়েকজন ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী রয়েছেন, যাঁদের কেউই স্বস্তিতে নেই। এসব জাতীয় নেতা নিজ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন নিজ দলের প্রার্থীদের কাছেই।

কয়েকটি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার কথা শোনা যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে এলাকাভিত্তিক ভোট, সংখ্যালঘুদের ভোট পেতে নানা ধরনের কৌশল নিচ্ছেন তাঁরা। যদিও ভোটাররা বলছেন, দল থেকে প্রার্থী মনোনয়নের সময় আরও দেখেশুনে দেওয়া উচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় নেতা হলেও কারও কারও এলাকায় যোগাযোগ নেই।

আরও পড়ুন

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য লুৎফর রহমান, সাবেক ছাত্রদল নেতা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এস এম ওবায়দুল হক (নাসির) তাঁদের নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটযুদ্ধ করতে হচ্ছে। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার করলেও লাভ হয়নি, তাঁরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না থাকায় স্থানীয়দের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কেন্দ্র থেকে প্রার্থীকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। দেখা গেল, ওই প্রার্থীর এলাকার সঙ্গে তেমন যোগাযোগ থাকে না। অন্যদিকে দলগুলোয় শৃঙ্খলাও নেই।
বাদল মাহমুদ, সহসভাপতি, সুজন 

বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সুযোগ নিচ্ছেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জামায়াত প্রার্থীরা।

অন্যদিকে টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত নেতা লতিফ সিদ্দিকী। যদিও তাঁর নির্বাচনী প্রচারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের কাউকে পাশে পাচ্ছেন না। তাঁর ভাই কাদের সিদ্দিকী সার্বক্ষণিক তাঁর সঙ্গে নির্বাচনে প্রচারে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন

টুকুকে ভোগাচ্ছেন ফরহাদ

টাঙ্গাইলের আটটি সংসদীয় আসনে প্রার্থী মোট ৪৭ জন। রাজনৈতিকভাবে টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হরিণ প্রতীকে নির্বাচন করছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী আহছান হাবীব মাসুদ। টাঙ্গাইল সদর আসনে এবার প্রার্থী মোট ১০ জন। 

স্থানীয় লোকজন বলছেন, এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে টুকু ও ফরহাদের মধ্যে। এতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী।

আরও পড়ুন

তিনবারের এমপি বনাম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য 

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এস এম ওবায়দুল হক (নাসির) ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এ আসনে দলীয় প্রতীক না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোটরসাইকেল প্রতীকে নির্বাচন করছেন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী লুৎফুর রহমান খান ওরফে আজাদ। তিনি ৯১, ৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মন্ত্রীও ছিলেন তিনি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দীর্ঘদিন দলে নিষ্ক্রিয় থাকা ও সংস্কারপন্থী হওয়ায় এবার আজাদকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তা ছাড়া তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর। আজাদ তিনবারের সংসদ সদস্য, মন্ত্রীও ছিলেন। ফলে তাঁর একটি প্রভাব রয়েছে এলাকায়। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা আজাদের ভাতিজা হন। তাঁরও একটি প্রভাব রয়েছে নির্বাচনে। বিএনপি প্রার্থী নাসির ঢাকায় রাজনীতি করেন। অবশ্য এ দুজনের লড়াইয়ে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাইফুল্লাহ হায়দার।

আরও পড়ুন

চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য লুৎফর রহমান ওরফে মতিন। যদিও এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোটরসাইকেল থেকে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আব্দুল হালিম মিঞা ভোট করছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় তাঁকে গত ২৬ জানুয়ারি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। অন্যদিকে হাঁস প্রতীকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। 

আরও পড়ুন

ভাইস চেয়ারম্যান বনাম ব্যবসায়ী

টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল, সখীপুর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান। হরিণ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন সালাউদ্দিন আলমগীর। তিনি লাবিব গ্রুপের চেয়ারম্যান ও মধুমতি ব্যাংকের নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান। বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হন।

এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান দাঁড়িপাল্লার প্রতীকে নির্বাচন করছেন।

আরও পড়ুন

বাকি চার আসন 

টাঙ্গাইল–১ (মধুপুর, ধনবাড়ী) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন বিএনপি প্রার্থী ফকির মাহবুব আনাম। ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী আব্দুল্লাহেল কাফী, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকে মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন, একসময়ের বিএনপি নেতা (বহিষ্কৃত) তালা প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আসাদুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকে হারুন অর রশিদ নির্বাচন করছেন। এ আসনে বিএনপি থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়ান মোহাম্মদ আলী। যদিও পরে তিনি সরে যান। 

টাঙ্গাইল–২ (গোপালপুর, ভূঞাপুর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন বিএনপির সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু। ১১ নির্বাচনী ঐক্য জামায়াতে ইসলামের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে হুমায়ুন কবীর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করছেন মনোয়ার হোসেন সাগর এবং জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করছেন হুমায়ুন কবির তালুকদার। 

আরও পড়ুন

টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর, দেলদুয়ার) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন রবিউল আওয়াল। ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জামায়াতের প্রার্থী এ কে এম আব্দুল হামিদ, লাঙ্গল প্রতীকে মামুনুর রহিম, দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জুয়েল সরকার, মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম নির্বাচন করছেন। এ আসনেও ধানের শীষের সঙ্গে লড়াই হবে জামায়াত প্রার্থীর। 

টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে মোট তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জেলা জামায়াতের শিক্ষা সম্পাদক মাওলানা আব্দুল্লাহ এবনে আবুল হোসেন এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী তোফাজ্জল হোসেন। এ আসনে ধানের শীষের সঙ্গে দাঁড়িপাল্লার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, বলছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।

টাঙ্গাইলের সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সহসভাপতি বাদল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না থাকার কারণে স্থানীয়দের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কেন্দ্র থেকে প্রার্থীকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। দেখা গেল, ওই প্রার্থীর এলাকার সঙ্গে তেমন যোগাযোগ থাকে না। অন্যদিকে দলগুলোয় শৃঙ্খলাও নেই।