সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন

প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন হলো সংবিধান। ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। গত ৫০ বছরে এই সংবিধান ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন শুধু ‘তাত্ত্বিক’ বিষয় নয়, সব সময় এর একটি পটভূমি ও উদ্দেশ্য থাকে। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, এর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের সংকট, যেকোনোভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা, সামরিক শাসন, সরকারগুলোর কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা—এ সবকিছুই সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। সংবিধান সংশোধন নিয়ে আট পর্বের এই লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রতি রোববার প্রকাশিত হচ্ছে। আজ সপ্তম পর্ব

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অধীন ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবার কাছেই নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ হয় প্রধান বিরোধী দল। গণ-অভ্যুত্থানে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কারাগারে থাকলেও তিনি ও তাঁর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

আরও পড়ুন

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সামরিক-বেসামরিক স্বৈরশাসনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি তৈরির একটি সুযোগ এসেছিল। ক্ষমতাসীন ও প্রধান বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারপদ্ধতির বদলে সংসদীয় পদ্ধতি ফিরিয়ে আনায় অনেকে বেশ আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই বিরোধী দলগুলো সরকারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। ১৯৯৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সংসদে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানায়।

১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বিরোধী দলগুলো একযোগে সংসদ বর্জন করে। এরই মধ্যে ২০ মার্চ মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচন হয়। এতে ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠে। বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, বিএনপির অধীন কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। মাগুরা উপনির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন জোরদার হয়।

আরও পড়ুন

১৯৯৪ সালের ২৪ জুন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত সংসদ ভবনে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে। তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে ২৭ ডিসেম্বরের পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি বিষয়টি আমলে নেয়নি। ২৮ ডিসেম্বর বিরোধীদলীয় ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একযোগে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে তাঁদের পদত্যাগ গ্রহণযোগ্য নয় বলে স্পিকার রুলিং দেন।

১৯৯৫ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের সংসদে টানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিতি পূর্ণ হয়। এতে তাঁদের আসন শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সুপ্রিম কোর্ট আসন শূন্য হওয়ার পক্ষে মতামত দেন। ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে, শূন্য আসনগুলোয় ১৫ ডিসেম্বর উপনির্বাচন হবে। তবে বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। এ অবস্থায় সরকার উপনির্বাচনের পরিকল্পনা বাদ দেয়। ২৪ নভেম্বর সংসদ ভেঙে দিয়ে সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। তৃতীয় দফা পরিবর্তনের পর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। আওয়ামী লীগসহ বেশির ভাগ বিরোধী দল বিএনপি সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন বর্জন করে।

১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি আসন পায়। এর মধ্যে ৪০ জনের বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ‘ভোটারবিহীন’ বিতর্কিত এ নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে বিরোধী দলগুলো হরতাল ও অসহযোগের মতো আন্দোলন চালাতে থাকে। এতে সরকারি কর্মচারীদের একাংশ যুক্ত হয়। ফলে প্রশাসনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যায় এবং বিরোধীদের আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। ১৯ মার্চ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয় এবং ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। ২১ মার্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল উত্থাপন করা হয়। ২৬ মার্চ গভীর রাতে সেই বিল পাস হয়।

আরও পড়ুন

এই বিল নিয়ে প্রয়াত রাজনীতিক মওদুদ আহমদ তাঁর বাংলাদেশে গণতন্ত্র: ১৯৯১ থেকে ২০০৬ বইয়ে লিখেছেন, ‘সরকার তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল নামে ২৭ মার্চ একটি বিল পাস করেন। এভাবে বিশ মাস আগে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে দাবি উত্থাপিত হয়েছিল, জনগণ ও জাতীয় সংসদের ব্যাপক সম্মতি ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত সে দাবির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হন।…’

বিরোধীদের তীব্র আন্দোলন ও প্রশাসনের অসহযোগিতার মুখে ৩০ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সংসদ ভেঙে দেন এবং তিনি নিজেও পদত্যাগ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস সদ্য সংশোধিত সংবিধান অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দেন।

আরও পড়ুন

ত্রয়োদশ সংশোধনী

এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। এতে বলা হয়, কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে কিংবা সংসদের মেয়াদের অবসান হলে এর ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। তবে সরকারের মেয়াদ কত দিন হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ গঠনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত এ সরকার ক্ষমতায় থাকবে। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা আছে। সেই হিসাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিন বলা হতো।

ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসারে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১১ সদস্যের বেশি হবে না। এর মধ্যে একজন ‘প্রধান উপদেষ্টা’ এবং অনধিক ১০ জন ‘উপদেষ্টা’ থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টা হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান এবং তিনি প্রজাতন্ত্রের সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং অন্য উপদেষ্টারা মন্ত্রীর পদমর্যাদা ও পারিশ্রমিক পাবেন। ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ যৌথভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।

এতে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেবেন। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না গেলে বা তিনি প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানালে ঠিক তাঁর অব্যবহিত পূর্বের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হবে।

আরও পড়ুন

অবসরপ্রাপ্ত কোনো প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না গেলে আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং তাঁকে পাওয়া না গেলে বা তিনি সম্মত না হলে রাষ্ট্রপতি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শক্রমে অন্য কোনো ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেবেন। এগুলোর কোনো একটিও কার্যকর করা না গেলে রাষ্ট্রপতি তাঁর স্বীয় দায়িত্বের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করবেন।

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে উদ্দেশ্যে বিএনপি আমলে (১৯৯১-১৯৯৬) আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো আন্দোলন করেছিল, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালে তেমন একটি নির্বাচনই হয়েছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই নির্বাচনে জিতে ২১ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের যৌক্তিকতাই প্রমাণিত হয়েছিল।

চতুর্দশ সংশোধনী

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করে এবং ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান প্রধান উপদেষ্টা হন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ ‘নীলনকশা’র নির্বাচন বলে অভিযোগ তুললেও অন্যান্য দল, গণমাধ্যম ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বলেছিল। নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি, অর্থাৎ ২১৬টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ৬২টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী দল হয়।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-০৬) এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল, যার রাজনৈতিক অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রাসারী। এর মধ্যে ২০০৪ সালের এপ্রিলে চটগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার, একই বছরের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালে জঙ্গি সংগঠন জেএমবির উত্থান ছিল বহুল আলোচিত বিষয়। এসব ঘটনার মধ্যেই ২০০৪ সালের ১৬ মে সংসদে চতুর্দশ সংশোধনী পাস হয়।

চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে একটি হলো সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসংখ্যা বৃদ্ধি। সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি প্রদর্শনের বিধানও করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

চতুর্দশ সংশোধনীর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসর নেওয়ার বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা। এ পরিবর্তনের ফলে সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কে এম হাসান বিএনপির ‘সমর্থক’ এবং তাঁকে প্রধান উপদেষ্টা করার পূর্বপরিকল্পনা থেকেই সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের বয়স বাড়ানো হয়েছে—এমন অভিযোগ ছিল আওয়ামী লীগের। এ অভিযোগের ভিত্তি ছিল, কে এম হাসান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

যেহেতু সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংসদ সদস্য ছিল বিএনপিদলীয়, তাই সরকারের পক্ষে খুব সহজেই সংবিধানে এ পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু রাজনীতির মাঠে এটা নিয়ে তারা প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধে দেশজুড়ে এক সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং সংঘর্ষে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। এ অবস্থায় বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব না নেওয়ার কথা জানান। পরদিন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন।

অভিযোগ রয়েছে, সংবিধান অনুযায়ী সব বিকল্প অনুসন্ধান না করেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন সে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা বানানোর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া—এ ঘটনাক্রম থেকে স্পষ্ট যে চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিএনপি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছিল।

এক-এগারোর পরিবর্তন

রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের কর্মকাণ্ডে বিএনপির প্রতি তাঁর দলীয় আনুগত্য ছিল স্পষ্ট। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা করার বিরোধী জোটের দাবি আমলে না নিয়েই ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রাথমিকভাবে সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু তাদের বেশ কয়েকজন নেতার মনোনয়নপত্র প্রশ্নবিদ্ধভাবে বাতিল করা হয়।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই তারা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। দেশ একটি একতরফা নির্বাচনের দিকে এগোতে থাকে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো লাগাতার হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয়। এ রকম এক সংঘাতময় পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং ইয়াজউদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১২ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদ নতুন প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন এবং ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।

তথ্যসূত্র

১. মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশে গণতন্ত্র: ১৯৯১ থেকে ২০০৬, ইউপিএল

২. মহিউদ্দিন আহমদ, বিএনপি: সময়-অসময়, প্রথমা