কামানের গর্জন আর রাজপথের মানবিকতায় ঘেরা রমজান

জর্দানে ইফতারের পূর্বে কামানের গোলা ছোঁড়া দেখতে হাজারো পর্যটক পাহাড়ে ভিড় করেনছবি: আনাদোলু

আরব বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জর্ডান হাশেমীয় ঐতিহ্যের ধারক। জর্ডানের রমজান আমাদের শেখায় কীভাবে আধুনিকতার ভিড়েও নিজের শেকড় এবং মানবিকতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

জর্ডানের রমজানের অলিগলি খুঁড়লে যে দৃশ্যগুলো বেরিয়ে আসে, তা সত্যিই অভাবনীয়।

‘মাস্তাজেল’: জীবনের সন্ধানে

জর্ডানের রাস্তায় আসরের পর থেকেই এক বিশেষ চাঞ্চল্য শুরু হয়। রাজধানী আম্মানের ব্যস্ত মোড়গুলোতে দেখা যায় একদল তরুণ-তরুণীকে। তাদের গায়ে বিশেষ জ্যাকেট, হাতে ছোট ছোট প্যাকেট।

‘মাস্তাজেল’ (তাড়াহুড়ো করবেন না) ক্যাম্পেইনের মূল স্লোগান হলো—‘একটি খেজুরের জন্য একটি জীবন হারাবেন না’।

ইফতারের ১৫-২০ মিনিট আগে জর্ডানিরা প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেন।  এই দ্রুতগতি রুখতেই স্বেচ্ছাসেবকরা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে খেজুর ও পানির প্যাকেট বাড়িয়ে দেন, যাতে চালক রাস্তায় চলন্ত অবস্থাতেই ইফতার করতে পারেন এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে।

এতে কেবল সাধারণ ছাত্ররাই নয়, পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সেলিব্রিটিরাও অংশ নেন। এটি এখন জর্ডানের একটি ‘জাতীয় শিষ্টাচার’ হিসেবে গণ্য হয়।

জর্ডানের সব বয়সীরা একসঙ্গে বসে ইফতার করতে পছন্দ করেন
ছবি: আল–জাজিরা ডটনেট
আরও পড়ুন

আম্মানের দুর্গ ও কামানের প্রতিধ্বনি

জর্ডানিদের কাছে ইফতারের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ হলো ‘মিদফা আল-ইফতার’ বা রমজান কামান।

১৯৩৮ সালের নথিপত্রে এই কামানের উল্লেখ পাওয়া যায়। কয়েক দশক বন্ধ থাকার পর ২০১৯ সাল থেকে আম্মানের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় ‘জাবাল আল ক্বালা’-তে এটি বসানো হয়।

সূর্যাস্তের ঠিক আগে পুরো শহর যখন শান্ত হয়ে যায়, তখন কামানের গর্জন আর তার পরপরই প্রাচীন আল-হুসাইনি মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে। হাজারো পর্যটক এই দৃশ্য দেখতে পাহাড়ে ভিড় করেন।

ইফতারের দস্তরখান

জর্ডানিদের ইফতার টেবিল বা ‘সফরা’ মানেই ঐতিহ্যের প্রদর্শনী।

মানসাফ: যদিও মানসাফ জর্ডানের জাতীয় খাবার, তবে রমজানের বড় পারিবারিক ইফতারে এটি থাকা চাই-ই চাই। বড় থালায় ভাত বিছিয়ে তার ওপর ‘জ্যামিদ’ (বিশেষ শুকনো দই) দিয়ে রান্না করা খাসির মাংস সাজিয়ে দেওয়া হয়। চামচ নয়, হাত দিয়ে এটি খাওয়ার বিশেষ নিয়ম জর্ডানের মেহমানদারির অংশ।

কাতায়েফ: রমজান মানেই জর্ডানের রাস্তার মোড়ে মোড়ে কাতায়েফ বা এক ধরণের পিঠার দোকান। এটি মূলত প্যানকেকের মতো যার ভেতরে বাদাম বা পনির পুরে কড়া করে ভাজা হয়। ইফতার পরবর্তী আড্ডায় কাতায়েফ আর গরম কফি জর্ডানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইফতারের পূর্বে শিশুদের আনন্দ
ছবি: রয়টার্স
আরও পড়ুন

আত্মসম্মান বজায় রেখে দান

জর্ডান গত কয়েক বছর ধরে ত্রাণ বিতরণের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে।

এখন আর লাইনে দাঁড়িয়ে খাবারের প্যাকেট নিতে হয় না। জর্ডানের বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা যেমন ‘নামা’ (Namaa) এমন এক বাজার তৈরি করে যেখানে সবকিছু সাজানো থাকে।

একে বলে ‘সুক খয়েরি’ বা কল্যাণের বাজার।

দরিদ্র পরিবারগুলোকে কুপন দেওয়া হয়, তারা সাধারণ ক্রেতাদের মতো ট্রলি নিয়ে ঘুরে ঘুরে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস বেছে নেন।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি দরিদ্র মানুষের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করে না, বরং তাদের অধিকারের অনুভূতি দেয়।

‘মুসাহারাতি’ ও রাতের আমেজ

ইফতারের পর জর্ডান যেন জেগে ওঠে। তারাবির নামাজের পর রাতভর চলে আড্ডা।

জর্ডানের গ্রাম এবং পুরনো শহরগুলোতে এখনও ‘মুসাহারাতি’ বা সাহ্‌রির ডাক দেওয়া ব্যক্তিদের দেখা যায়। তারা কেবল ঢাকই বাজান না, বরং পাড়ার প্রতিটি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বাসিন্দাদের নাম ধরে ডেকে সাহ্‌রির জন্য জাগিয়ে দেন।

মুসাহারাতিরা কেবল একজন কর্মী নন, তারা প্রতিটি পাড়ার গল্পের এক একটি জীবন্ত চরিত্র।

‘সুক খয়েরি’ বা কল্যাণের বাজারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন সংস্থার সদস্যরা, জর্দান
ছবি: রয়টার্স
আরও পড়ুন