আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের মাঝেও আমাদের জন্য রয়েছে এক অনন্য ‘আসমানী উপহার’। এই বিশেষ উপহারটি হলো সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬)। এই দুই আয়াত কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, বরং এটি সরাসরি আরশ থেকে আসা এক বিশেষ নুর।
আসমান থেকে আসা বিশেষ বার্তা
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এই উপহারের মাহাত্ম্য ফুটে ওঠে। একদিন জিবরাইল (আ.) নবীজির (সা.) কাছে বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ আসমান থেকে এক আওয়াজ শুনতে পেলেন।
তিনি ওপরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটি আসমানের এমন একটি দরজা, যা আজই প্রথমবারের মতো খোলা হলো; আগে কখনো খোলা হয়নি।”
সেখান থেকে একজন ফেরেশতা অবতরণ করে নবীজিকে (সা.) সালাম দিয়ে এক অভূতপূর্ব সুসংবাদ দিলেন, “আপনাকে এমন দুটি নুরের সুসংবাদ দেওয়া হচ্ছে, যা আপনার আগে আর কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি। একটি হলো সুরা ফাতিহা, আর অন্যটি সুরা বাকারার শেষাংশ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৬)
আপনাকে এমন দুটি নুরের সুসংবাদ দেওয়া হচ্ছে, যা আপনার আগে আর কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি। একটি হলো সুরা ফাতিহা, আর অন্যটি সুরা বাকারার শেষাংশ।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৬
কী আছে এই বিশেষ দুই আয়াতে
এই আয়াতগুলোতে রয়েছে মুমিনের জীবনের পূর্ণাঙ্গ দর্শন এবং রবের কাছে আত্মসমর্পণের এক অকল্পনীয় আকুতি।
আয়াত ২৮৫: এখানে মুমিনের ইমানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফেরেশতা, কিতাব এবং রাসুলগণের ওপর অটল বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। মুমিনরা বলছে, “আমরা শুনলাম এবং মানলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনারই ক্ষমা প্রার্থনা করি।”
আয়াত ২৮৬: এটি মানুষের সীমাবদ্ধতার এক চমৎকার ঘোষণা।
ভারমুক্তি: “আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।”
আকুতি: “হে আমাদের রব, আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না।”
সাহায্য প্রার্থনা: “আপনি আমাদের অভিভাবক। কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন।”
কেন এই আয়াতগুলোকে ‘নুর’ বলা হয়
এই আয়াতগুলোকে ‘নুর’ বা আলো বলার পেছনে বেশ কিছু বিশেষ কারণ রয়েছে:
ইমানের পূর্ণ কাঠামো: এটি মুমিনের বিশ্বাসকে সংজ্ঞায়িত করে।
অক্ষমতার স্বীকৃতি: বান্দা যখন নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে, তখন প্রতিপালকের রহমত অবধারিত হয়।
সরাসরি দোয়া কবুল: সহিহ মুসলিমে এসেছে, যখন কোনো মুমিন এই দোয়াগুলো পাঠ করে, তখন আল্লাহ বলেন, “আমি কবুল করলাম।”
মানসিক প্রশান্তি: “সাধ্যের বাইরে চাপ নেই”—এই একটি বাক্য মুমিনের বুক থেকে দুশ্চিন্তার বড় বোঝা নামিয়ে দেয়।
যে ব্যক্তি রাতে সুরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তার জন্য এই আয়াত দুটিই যথেষ্ট হয়ে যাবে।
রাতের জন্য শ্রেষ্ঠ সুরক্ষা
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতে সুরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তার জন্য এই আয়াত দুটিই যথেষ্ট হয়ে যাবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০০৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৮)
আলেমদের মতে, ‘যথেষ্ট হওয়া’ মানে হলো:
১. এটি তাকে সারারাত শয়তানের অনিষ্ট ও জ্বিন-ইনসানের ক্ষতি থেকে বাঁচাবে।
২. সেই রাতে যদি সে তাহাজ্জুদ পড়তে না-ও পারে, তবে এই পাঠ তার জন্য বিশেষ ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।
শেষ কথা
সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত কেবল তেলাওয়াতের বিষয় নয়; এগুলো হলো বিশ্বাসের শক্তি এবং রবের সান্নিধ্যের এক মজবুত সিঁড়ি। দিনের ক্লান্তি শেষে কিংবা রাতের নিস্তব্ধতায় যখন একজন মুমিন এই আয়াতগুলো পড়ে, তখন সে তার সব ভয় ও ভার মহান আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে দেয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই নূরের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক