সাহাবি হিন্দের হিজরত: মাতৃভূমি ত্যাগের বেদনাকাব্য

ছবি: ফ্রিপিক

হিজরতের আদেশ চলে এসেছে। মক্কার মুসলমানরা ভেতরে-ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছেন স্বদেশ ত্যাগ করার জন্য। কিন্তু দেশ ছেড়ে যাওয়া তো সহজ কাজ নয়। যে দেশের আবহাওয়া ও আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা, শৈশব-কৈশোর পার হয়েছে যে দেশের জমিনে হেঁটে ও দৌড়ে, তা ছেড়ে অচেনা কোনো বিদেশ-বিভুঁইয়ে যাত্রার যে কী যন্ত্রণা, তা শুধু ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন।

এক.

স্বদেশ ত্যাগের কথা ভেবে মন ভেঙে যায় হিন্দের। তার পুরো নাম হিন্দ বিনতে আবি উমাইয়া আল-মাখজুমিয়া। তিনি ছিলেন মক্কার অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের আবু উমাইয়া সুহাইলের দুলালি। জীবনভর কাটিয়েছেন চরম রাজকীয় আয়েশের মধ্যে। দুঃখ বা অভাব কী জিনিস, তা তিনি জানতেন না। দাস-দাসীর পরিবেষ্টনে বড় হওয়া এই নারী না চাইতেই হাতের কাছে হাজির পেয়েছেন সুখের তাবৎ আয়োজন।

বাবার বাড়ি ছেড়ে যখন স্বামী আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আসাদের ঘরে এলেন, সেখানেও দেখা পেলেন রাশি রাশি সুখ ও ঐশ্বর্যের। পরনে থাকত সারাক্ষণ দামি রেশমের পোশাক, হাতে-কানে-গলায় বাহারি অলংকার। নিত্যনতুন প্রসাধনীতে রাঙিয়ে রাখতেন চিবুক ও ওষ্ঠাধর।

রাজকুমারীর মতো জীবন কাটাতেন হিন্দ। স্বামী আবদুল্লাহর গভীর আদর, সোহাগ ও ভালোবাসায় যেন এক স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করতেন তিনি।

কিন্তু শুধু সত্য কবুলের ‘অপরাধে’ তাঁকে বিতাড়িত হতে হলো সেই সুখরাজ্য থেকে। তবু এতকাল প্রেমময় স্বামীর সঙ্গে নিজের মাতৃভূমিতেই তো ছিলেন। কিন্তু ইসলামের স্বার্থে সেই সামান্য সুখটুকুও আজ বিসর্জন দিতে চলেছেন। স্বদেশ ছেড়ে ছুটে চলেছেন এক অজানা-অচেনা কৃষ্ণবর্ণের দেশ হাবাশার (আবিসিনিয়া) উদ্দেশে।

আরও পড়ুন

স্বামী আবদুল্লাহর হাত ধরে তিনি হাঁটছেন; হৃদয় ব্যথাতুর, চোখ অশ্রুসজল। কিছু সময় পরপর বুকটা ভারী হয়ে আসছে তাঁর। চলার পথে পেছন ফিরে বারবার মক্কার পানে চাইছেন তিনি। হু হু কান্নায় যেন ভেঙে পড়তে চাইছেন, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিচ্ছেন। ধর্মের জন্য এতটুকু কষ্ট তো সহ্য করে নিতেই হবে।

অন্যরা আরও কত দুঃসহ যন্ত্রণা সয়ে নিয়েছেন মুখ বুজে। সুমাইয়া (রা.)-এর জীবন পর্যন্ত চলে গেল। নিজেকে শক্ত করেন হিন্দ (রা.)। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/২৫৫-২৫৬, মুস্তফা আল-বাবি আল-হালাবি, কায়রো, ১৯৫৫)

দুই.

এ ঘটনা ছিল নবীজির নবুয়তপ্রাপ্তির পঞ্চম বছরের রজব মাসের। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে তখন চলছে ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দ। গোপনে মুসলমানরা দেশ ছাড়ছেন এবং নবীজির নির্দেশমতো যাত্রা করছেন হাবাশার উদ্দেশে।

মক্কার কোরাইশরা যেন টের না পায়, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন তাঁরা। ১০ জন পুরুষ ও ৪ জন নারীর ছোট্ট সেই কাফেলার কেউ ছিলেন আরোহী, আর অধিকাংশই পথ চলছিলেন পায়ে হেঁটে।

তবুও কোনোভাবে মক্কায় চাউর হয়ে যায় মুসলমানদের হিজরতের এই গোপন সংবাদ। ক্ষোভে ফেটে পড়েন কোরাইশ নেতারা। শিকার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে দ্রুত একদল সশস্ত্র অশ্বারোহীকে পাঠিয়ে দেয় তারা পলায়নপর ‘ধর্মত্যাগী’দের ধরে আনার জন্য।

মক্কা থেকে বেরিয়ে মুহাজির কাফেলা প্রথমে পৌঁছায় লোহিত সাগরের শুআইব বন্দরে। আল্লাহর কী মহিমা, তাঁরা বন্দরে পৌঁছামাত্র দেখতে পান যে ব্যবসায়ীদের দুটি বাণিজ্যিক নৌকা নোঙর করে আছে, যা হাবাশার উদ্দেশেই ছেড়ে যাবে।

মুহাজির কাফেলা দ্রুত নৌকায় চড়ে বসে। জনপ্রতি মাত্র আধ দিনার ভাড়ার বিনিময়ে তারা মুহাজিরদের হাবাশার মাসওয়া বন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে রাজি হন। পিছু ধাওয়া করতে করতে কোরাইশ বাহিনী যখন শুআইব বন্দরে পৌঁছায়, মুহাজিরদের বহনকারী নৌকা ততক্ষণে তীর ছেড়ে বহু দূর চলে গেছে। ফলে ব্যর্থ ও ক্ষুব্ধ হয়েই তাদের ফিরে যেতে হয় মক্কায়। (মুহাম্মদ ইবনে সাদ, কিতাবুত তাবাকাতিল কুবরা, ১/২০৪, দার ছাদের, বৈরুত, ১৯৬৮)

আরও পড়ুন

তিন.

নিরাপদে মাসওয়া বন্দরে পৌঁছে মুসলিম কাফেলা। সম্পূর্ণ অচেনা দেশ, চেনা নেই পথঘাট কিংবা মানুষ। আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করে মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা এগিয়ে যেতে থাকেন রাজ্যের অভ্যন্তরে। তাঁদের হৃদয়ে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল ছিল যে আল্লাহই তাঁদের রক্ষা করবেন তাবৎ বিপদ ও দুর্বিপাক থেকে।

বন্দর ছাড়িয়ে পৌঁছান তাঁরা হাবাশার তৎকালীন রাজধানী আকসুম নামক এলাকায় । অবস্থানের জন্য এই জায়গাটিই অধিক নিরাপদ ও উপযোগী মনে করে মুহাজির কাফেলা আকসুমেই শুরু করেন তাঁদের উদ্বাস্তু প্রবাসজীবন। (ইবনে সাদ, কিতাবুত তাবাকাতিল কুবরা, ১/২০৪)

চার.

নতুন দেশে এসে হিন্দ (রা.) যেন মুক্ত বাতাসে বুকভরে শ্বাস নেওয়ার অবকাশ পেলেন। সুযোগ পেলেন আবারও প্রাণপ্রিয় স্বামী আবদুল্লাহকে নিবিড়ভাবে ভালোবাসার। আবার নতুন করে, নব উদ্যমে দাম্পত্য ও সাংসারিক আনন্দে ডুবে যান হিন্দ।

স্বামী ছাড়াও এখানে সঙ্গী হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন মক্কার আরও তিনজন পুণ্যময়ী নারীকে—নবীকন্যা রুকাইয়া, সাহলা বিনতে সোহাইল ও লায়লা বিনতে আবু খাইসামা (রা.)। এই চার নারীর মধ্যে এক চমৎকার সখ্য গড়ে ওঠে। দিনভর তাঁরা সুখ-দুঃখের গল্প করতেন, মক্কার জীবনের স্মৃতিচারণা করতেন এবং আলোচনা করতেন ধর্ম ও রাসুলকে নিয়ে।

হাবাশার প্রবাসজীবনে হিন্দ আরেকটি পরম আনন্দের মুখোমুখি হন, যা তাঁর মাতৃভূমি ছাড়ার সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। বেশ কিছুদিন ধরেই নিজের মধ্যে তিনি নতুন এক সত্তার প্রাণস্পন্দন অনুভব করছিলেন। একদিন সেই আনন্দ এক ফুটফুটে শিশুপুত্রের রূপ ধরে পৃথিবীতে আসে।

মায়ের মতোই উজ্জ্বল অবয়ব নিয়ে জন্ম নেওয়া সেই নবাগতের নাম রাখা হয় ‘সালামা’। আর সেই দিন থেকেই আবদুল্লাহ ও হিন্দ দম্পতি আরবের প্রথা অনুযায়ী নতুন কুনিয়াত বা সম্বোধনে পরিচিত হয়ে ওঠেন—‘আবু সালামা’ ও ‘উম্মে সালামা’।

আবু সালামার মা ছিলেন মহানবীর ফুপু ও আবদুল মুত্তালিবের কন্যা বাররাহ। ওহুদ যুদ্ধে আহত হয়ে আবু সালামা শহীদ হন। মহানবী (সা.) তখন উম্মে সালামাকে বিবাহ করেন। ফলে ইসলামের ইতিহাসে এই হিন্দই মুমিনদের জননী বা উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা (রা.) নামে অমর হন।

  • আহমাদ সাব্বির : আলেম ও লেখক

আরও পড়ুন