শিক্ষায় মুসলিম সমাজের গন্তব্য কোথায়

ছবি: পেক্সেলস

জ্ঞানের কেন্দ্রীয় অবস্থান কী—ইদানীং এই প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠেছে। ইসলামে জ্ঞানার্জন ও শিক্ষাদান কেবল জাগতিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি পরকালীন সাফল্যের সোপানও বটে।

মহান আল্লাহর পরিচয় লাভ, মানবিকতার বিকাশ এবং একটি সমৃদ্ধ সভ্যতা বিনির্মাণের একমাত্র পথ হলো শিক্ষা। জাতীয় ও সামষ্টিক নীতিমালায় শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া তাই সময়ের দাবি।

আসমনি নির্দেশনায় ‘শিক্ষা’র ব্যাপকতা

কোরআন মাজিদে ‘তালিম’ (শিক্ষাদান) শব্দটি বিভিন্ন আঙ্গিকে ও ধরনে বহুবার এসেছে। আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘শিক্ষাদান’ স্বয়ং মহান আল্লাহর একটি বিশেষ গুণ বা কাজ। (আবদুন নুর বাজা, মান আল-মাকাসিদ আত-তারবিয়্যাহ ফিল কুরআন আল-কারিম, লন্ডন: আল-ফুরকান ফাউন্ডেশন, ২০১৮, পৃষ্ঠা: ৩৮৯-৪২০)

আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “আর তিনি আদমকে সব নাম শিক্ষা দিলেন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩১)

অন্য আয়াতে এসেছে, “দয়াময় আল্লাহ, তিনি কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাব প্রকাশ (বয়ান) শিখিয়েছেন।” (সুরা রহমান, আয়াত: ১-৪)

আরও পড়ুন

এ ছাড়া খিজির (আ.) প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “আমি তাকে আমার পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলাম।” (সুরা কাহফ, আয়াত: ৬৫)

নবী দাউদকে বর্ম তৈরির কৌশল এবং নবীজিকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ এই ‘শিক্ষাদান’ প্রক্রিয়ার ব্যাপকতা তুলে ধরেছেন।

রাসুলের আগমনের মূল উদ্দেশ্য

শিক্ষা প্রদান করা কেবল আল্লাহর কাজই নয়, বরং এটি নবীদের প্রেরণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। নবী ইব্রাহিমের দোয়া ছিল, “হে আমাদের প্রতিপালক, তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে একজন রাসুল পাঠান, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াত তেলাওয়াত করবেন, তাদের কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৯)

আল্লাহ সেই দোয়া কবুল করে মহানবীকে শিক্ষক হিসেবেই পাঠিয়েছেন।

তাঁর ওপর হেরা গুহায় প্রথম যে ওহি নাজিল হয়েছিল, তার শুরুই ছিল ‘পড়ো’ (ইকরা) শব্দ দিয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, “পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন... যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।” (সুরা আলাক, আয়াত: ১-৫)

মহানবী (সা.) নিজেই ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৯)

অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, “আল্লাহ আমাকে কঠোরতা অবলম্বনকারী হিসেবে পাঠাননি, বরং তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন শিক্ষক ও সহজকারী হিসেবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৭৮)

মুয়াবিয়া ইবনুল হাকাম (রা.) নবীজির শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন, “আমি আল্লাহর রাসুলের চেয়ে অধিক দয়ালু ও শ্রেষ্ঠ কোনো শিক্ষক আর দেখিনি।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৯৩০)।

শিক্ষা সংস্কার ও সভ্যতার পুনর্গঠন

কোরআনে বর্ণিত শিক্ষার এই কেন্দ্রীয় গুরুত্বের উদ্দেশ্য কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানার্জন নয়। নবীজি (সা.) যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, তা সাহাবিদের গড়ে তুলেছিল বিশ্বজয়ী নেতা ও সভ্যতার কারিগর হিসেবে। আজকের মুসলিম সমাজকে যদি অনগ্রসরতা থেকে মুক্তি পেতে হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার আবশ্যক।

আরও পড়ুন

শিক্ষা সংস্কারই হলো সমাজ সংস্কারের প্রবেশদ্বার।

মালেক  ইবনে নবির মতে, কেবল তথ্যের স্তূপ জমানো শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়, বরং শিক্ষার ‘পদ্ধতি’ বা কারিকুলাম এমন হতে হবে যা মানুষের চিন্তা ও চরিত্রে পরিবর্তন আনে। (মালেক বিন নবী, শুরুত আন-নাহদাহ, পৃষ্ঠা: ৪০-৪৬)

শিক্ষা হতে হবে জীবনের লক্ষ্য ও পরকালীন গন্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

আলজেরীয় মনীষী ইবনে বাদিসের দর্শন

শিক্ষা ও ওলামার ভূমিকা সম্পর্কে আলজেরিয়ার সংস্কারক আবদ আল-হামিদ ইবনে বাদিস বলেছিলেন, “ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর অবস্থার পরিবর্তন হবে না, যতক্ষণ না তাদের ওলামা শ্রেণির সংস্কার হবে। ওলামা হলেন জাতির হৃদপিণ্ডের মতো। আর ওলামা শ্রেণির সংস্কার তখনই সম্ভব যখন তাদের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার হবে।” (আসারু ইবনে বাদিস, ৪/৭৮, আলজেরিয়া: দার ও মাকতাবা আশ-শারিকা, ১৯৬৮)

তিনি মনে করতেন, প্রকৃত শিক্ষা তা-ই যা একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে জাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে গড়ে তোলে। আর সেই শিক্ষার আদর্শ রূপ হতে হবে নববি শিক্ষার আদলে। সুতরাং কোরআন নির্দেশিত শিক্ষার পথে ফিরে আসাই হলো একটি জাতির পুনর্জাগরণের প্রধান শর্ত।

কোরআনের দৃষ্টিতে শিক্ষা কেবল সাক্ষরতা নয়, বরং এটি আত্মিক ও জাগতিক উৎকর্ষের চাবিকাঠি। নববি আদর্শে অনুপ্রাণীত হয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে পারলেই একটি ন্যায়নিষ্ঠ ও উন্নত সভ্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। 

আরও পড়ুন