ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনির আল-গিয়াসি গ্রন্থটি রাষ্ট্র ও রাজনীতির চরম সংকটের এক আগাম সমাধান। কীভাবে খেলাফতের চিরাচরিত রূপটি পরিবর্তিত হয়েছিল এবং ইমাম আল-জুওয়াইনি কেন একটি নতুন ‘তাত্ত্বিক সমাধানের’ প্রয়োজন বোধ করেছিলেন, তা–ই এই গ্রন্থের মূলকথা।
এই পরিবর্তনের বীজ বপন হয়েছিল আরও আগে।
চতুর্থ হিজরি শতক থেকেই আব্বাসীয় খলিফারা মূলত তুর্কি সেনাপতি এবং শিয়া বুওয়াইহি শাসকদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন। খলিফাকে মাটিতে ফেলে অপমান করা বা তাঁর চোখ উপড়ে ফেলার মতো ঘটনাও তখন ঘটেছিল।
ঐতিহাসিক ইবনে কাসির এই সময়কালকে বর্ণনা করেছেন এভাবে—“খলিফার কোনো আদেশ-নিষেধ বা উজির (মন্ত্রী) বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।”
আগাম রাজনৈতিক ফিকহ
এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনি (মৃ ১০৮৫ খ্রি.) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ আল-গিয়াসি রচনা করেন, যা পরে ‘আগাম রাজনৈতিক ফিকহ’ নামে প্রসিদ্ধি পায়।
সাধারণত ফকিহরা বর্তমান বা চলমান সমস্যার সমাধান দেন। কিন্তু জুওয়াইনি এমন এক রাজনৈতিক দর্শনের অবতারণা করলেন, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপর্যয় বা ‘রাষ্ট্রহীন অবস্থা’ কল্পনা করে তার আইনি কাঠামো তৈরি করে রাখে।
জুওয়াইনি মনে করতেন, “রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার আগেই তার বিকল্প ব্যবস্থাগুলো কল্পনা করে রাখা আলেমদের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব।”
ইমাম মাওয়ার্দি ও জুওয়াইনি
কাছাকাছি ধারার একটি গ্রন্থ হলো আল-মাওয়ার্দির আল-আহকাম আস-সুলতানিয়্যাহ। তবে মাওয়ার্দি ও এবং জুওয়াইনির গ্রন্থের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
মাওয়ার্দি চেয়েছিলেন যেকোনো মূল্যে খলিফার মর্যাদা রক্ষা করতে। তাই তিনি পঙ্গু বা ক্ষমতাচ্যুত খলিফার অধীনেও শাসনকে ‘জায়েজ’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, যেন খেলাফতের ধারাটি টিকে থাকে।
জুওয়াইনি ছিলেন আরও বেশি বাস্তববাদী। তিনি দেখলেন সেলজুক তুর্কিদের উত্থান। তিনি বুঝলেন, কেবল ‘কোরাইশ বংশীয়’ হওয়ার চেয়ে শাসন করার ‘সক্ষমতা’ ও ‘স্বাধীনতা’ খেলাফতের জন্য বেশি জরুরি।
জুওয়াইনি যুক্তি দেন, যদি খলিফা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন বা তাঁর কোনো প্রভাব না থাকে, তবে তাঁর জায়গায় এমন কাউকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত যার প্রভাব ও ক্ষমতা আছে। এটিই আধুনিক যুগের ‘সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের’ প্রাথমিক মুসলিম রূপরেখা।
নামকরণের তাৎপর্য
বইটির পুরো নাম গিয়াসুল উমাম ফি ইলতিয়াছিজ জুলাম (অন্ধকারে জাতিসমূহের আর্তনাদ)। এর ‘গিয়াস’ শব্দটি এসেছে ‘গাউস’ বা উদ্ধারকর্তা থেকে।
অর্থাৎ, যখন রাজনৈতিক অন্ধকারে জাতি পথ হারাবে, তখন এই ফিকহ বা দর্শনই হবে তাদের উদ্ধারের পথ। জুওয়াইনি চেয়েছিলেন মুসলিম উম্মাহর জন্য এমন একটি ‘ইমার্জেন্সি ম্যানুয়াল’ তৈরি করতে, যা খেলাফতহীন সময়েও সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখবে।
মোট কথা, আল–গিয়াসি গ্রন্থে ইমাম জুওয়াইনি খেলাফতের দুর্বলতাকে পুঁজি করে জুওয়াইনি তাঁর নতুন তত্ত্ব সাজিয়েছেন
তিনি প্রথাগত ফিকহের বাইরে গিয়ে ভবিষ্যতের সংকটের সমাধান দিয়েছেন এবং খলিফার চেয়ে ‘সক্ষম সুলতানের’ গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
উৎসর্গ
ইমাম আল-জুওয়াইনি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী সেলজুক উজির নিজামুল মুলককে। এই ঘটনা সে–সময় ‘তরবারি ও কলমের জোট’ বলে প্রসিদ্ধি পেয়েছিল।
জুওয়াইনি চেয়েছিলেন নিজামুল মুলক কেবল একজন উজির হিসেবে নয়, বরং একজন ‘সংস্কারক’ হিসেবে খেলাফতের এই পঙ্গুত্ব দূর করুন।
তিনি তাঁকে পরোক্ষভাবে উৎসাহ দিয়েছিলেন যেন তিনি এবং সালজুক শাসকরা খেলাফতের নাম বজায় রেখে প্রকৃত শাসন ক্ষমতা নিজেরা গ্রহণ করেন এবং আলেমদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
ইমাম জুওয়াইনির চিন্তার প্রভাব
আল-জুওয়াইনির মৃত্যুর প্রায় দুই শতাব্দী পর ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর আল-সিয়াসা আল-শারইয়্যাহ গ্রন্থটি রচনা করেন। ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারায় জুওয়াইনির আল-গিয়াসির গভীর ছাপ ছিল। যেমন—
জুওয়াইনির মতো ইবনে তাইমিয়াও ক্ষমতার ‘কোরাইশ বংশীয়’ হওয়ার চিরাচরিত শর্তের চেয়ে শাসকের ‘শক্তি’ এবং ‘আমানতদারি’কে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবনে তাইমিয়ার মতে, উলুল আমর বা ক্ষমতার অধিকারী হলো দুই শ্রেণি—উমারা (শাসক) এবং ওলামা (আলেম)।
এই ধারণাটি সরাসরি জুওয়াইনির ‘তরবারি ও কলমের জোট’ তত্ত্বের প্রতিফলন। তিনি চেয়েছিলেন মামলুক সুলতানরা যেন আলেমদের পরামর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, যা জুওয়াইনির ‘সাংবিধানিক তদারকি’র আধুনিক সংস্করণ।
ইবনে খালদুন যখন তাঁর মুকাদ্দিমায় ক্ষমতার উত্থান-পতন নিয়ে আলোচনা করেন, সেখানেও জুওয়াইনির প্রভাব স্পষ্ট। জুওয়াইনি যেমন আরবদের (আব্বাসীয়) হাত থেকে ক্ষমতা তুর্কিদের (সেলজুক) হাতে যাওয়ার ঐতিহাসিক অনিবার্যতা দেখেছিলেন, ইবনে খালদুনও তেমনি ক্ষমতার ‘আসাবিয়াহ’ বা গোষ্ঠীগত সংহতির বিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন।
জুওয়াইনি খেলাফতের ‘আদর্শ’ রূপের চেয়ে এর ‘বাস্তব’ রূপ নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। ইবনে খালদুন এই বাস্তববাদকেই ইতিহাসের দর্শনে রূপান্তর করেন, যেখানে তিনি দেখান যে শাসন ক্ষমতা কেবল বংশ দিয়ে নয়, বরং সংহতি ও সক্ষমতা দিয়ে অর্জিত হয়।