আল-কিন্দি: ইসলামি দর্শনের জনক

ছবি: এইআই/ প্রথম আলো

মধ্যযুগের ইসলামের স্বর্ণযুগ ছিল জ্ঞানবিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব বিকাশের কাল। সেই সময়ে যে কৃতী সন্তানদের হাত ধরে মুসলিম বিশ্ব জ্ঞানচর্চার শিখরে পৌঁছেছিল, তাঁদের মধ্যে আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি ছিলেন এক অনন্য নাম।

ইতিহাসে আল–কিন্দি ‘আরবদের দার্শনিক’ ও ‘ইসলামি দর্শনের জনক’ হিসেবে সমধিক পরিচিত। তিনি কেবল একজন দার্শনিকই ছিলেন না, বরং একাধারে গণিতবিদ, চিকিৎসক, সংগীতবিশারদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ হিসেবেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।

আল-কিন্দি ছিলেন এমন এক বিরল মনীষী, যিনি গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞানের সঙ্গে ইসলামি চিন্তাধারার মেলবন্ধন ঘটিয়ে পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর জন্য এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।

বাইতুল হিকমাহর দিনগুলো

আল-কিন্দি নবম শতকে ইরাকের এক অভিজাত আরব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন কুফার গভর্নর। ফলে শৈশব থেকেই তিনি আভিজাত্য ও জ্ঞানচর্চার এক সুন্দর পরিবেশ পেয়েছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা কুফায় সম্পন্ন করলেও উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি তখনকার জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র বাগদাদে পাড়ি জমান।

আল-কিন্দি ছিলেন প্রথম মুসলিম দার্শনিক, যিনি অ্যারিস্টটলীয় ও প্লেটোনিক চিন্তাধারাকে ইসলামি বিশ্বাসের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন।
ফিলিপ কে হিট্টি, হিস্ট্রি অব দ্য আরব

বাগদাদে আল–কিন্দির মেধা ও বিদ্যার প্রতি গভীর অনুরাগ তৎকালীন আব্বাসীয় খলিফাদের নজর কাড়ে। খলিফা আল-মামুন তাঁকে বাগদাদের বিখ্যাত ‘বাইতুল হিকমাহ’ বা ‘জ্ঞানগৃহ’-এ গ্রিক দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক পাণ্ডুলিপিগুলো অনুবাদের তদারকির দায়িত্বে নিযুক্ত করেন।

বাইতুল হিকমাহতে অবস্থানকালে আল–কিন্দি কেবল অনুবাদই করেননি, বরং গ্রিক জ্ঞানকে মুসলিম বিশ্বের উপযোগী করে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর এই অবদান সম্পর্কে ঐতিহাসিক ফিলিপ কে হিট্টি লিখেছেন, ‘আল-কিন্দি ছিলেন প্রথম মুসলিম দার্শনিক, যিনি অ্যারিস্টটলীয় ও প্লেটোনিক চিন্তাধারাকে ইসলামি বিশ্বাসের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন।’ (ফিলিপ কে হিট্টি, হিস্ট্রি অব দ্য আরব, পৃষ্ঠা: ৪৪১, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০১২)

খলিফা আল-মুতাসিম ও আল-ওয়াসিকের শাসনকালেও আল–কিন্দি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। তবে খলিফাদের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাগদাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতির বদল ঘটলে শেষ জীবনে তিনি কিছুটা একাকী হয়ে পড়েন এবং ৭২ বছর বয়সে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

আরও পড়ুন

দর্শনের সেতুবন্ধন

তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তিনি গ্রিক দর্শনকে মুসলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলেন। তৎকালীন অনেক মুসলিম পণ্ডিত গ্রিক দর্শনকে সন্দেহের চোখে দেখতেন, কিন্তু আল-কিন্দি বিশ্বাস করতেন যে সত্য যেখানেই পাওয়া যাক, তা গ্রহণ করা উচিত।

তিনি মনে করতেন, সত্যের কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতি নেই; বরং সত্য হলো সর্বজনীন। তিনি তাঁর বিখ্যাত ফি আল-ফালসাফাহ আল-উলা গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমাদের উচিত সত্যের মূল্য দেওয়া এবং তা যেখান থেকেই আসুক না কেন—তা পূর্ববর্তী প্রজন্ম বা ভিন্ন কোনো জাতির কাছ থেকে হলেও—তা গ্রহণ করতে দ্বিধা না করা।’ (পৃষ্ঠা: ৪২, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৫০)

আল-কিন্দি অ্যারিস্টটলের ‘ফার্স্ট কজ’ বা ‘আদি কারণ’ তত্ত্বকে কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর অস্তিত্বের সঙ্গে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে মিলিয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, মহাবিশ্বের সৃষ্টির পেছনে যে একটি পরম কারণ রয়েছে, তা যুক্তি ও ওহি (ঐশী বাণী) উভয় মাধ্যমেই প্রমাণিত।

আল-কিন্দি মানুষকে প্রকৃতির নিদর্শনগুলো পর্যবেক্ষণ করে আল্লাহকে চেনার আহ্বান জানাতেন। পবিত্র কোরআনেও এই চিন্তাশীলতার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, ‘আমি অচিরেই তাদের আমার নির্দেশনাবলি দেখাব দিগন্তসমূহে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে, যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে এটিই সত্য।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৫৩)

আল-কিন্দি চাঁদের বিভিন্ন পর্যায়ের ওপর ভিত্তি করে রোগীর রোগের সংকটময় দিনগুলো নির্ধারণের একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক উদ্ভাবন

আল-কিন্দির প্রতিভা কেবল তত্ত্বকথাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ব্যবহারিক বিজ্ঞানেও তিনি বিস্ময়কর অবদান রেখেছিলেন, বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফার্মেসি শাস্ত্রে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।

আল-কিন্দি প্রথম চিকিৎসক, যিনি ওষুধের গুণাগুণের মাত্রা নির্ধারণের জন্য একটি গাণিতিক নিয়ম প্রবর্তন করেন। এর আগে চিকিৎসকেরা সাধারণত আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে ওষুধ প্রয়োগ করতেন, কিন্তু আল-কিন্দি জ্যামিতিক প্রগতি ও গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে ওষুধের প্রতিটি উপাদানের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণের পথ দেখান। (এম এম শরিফ, আ হিস্ট্রি অব মুসলিম ফিলোসফি, ১/৪২১, রেনেসাঁ পাবলিশার্স, লাহোর, ১৯৬৩)

এ ছাড়া আল-কিন্দি চাঁদের বিভিন্ন পর্যায়ের ওপর ভিত্তি করে রোগীর রোগের সংকটময় দিনগুলো নির্ধারণের একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। তাঁর এই চিকিৎসা-দর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ আধুনিক বাগদাদের সর্ববৃহৎ হাসপাতালের নামকরণ করা হয়েছে ‘আল-কিন্দি জেনারেল হাসপাতাল’।

আরও পড়ুন
আল–কিন্দির স্মরণে ১৯৬২ সালে প্রকাশিত ইরাকের একটি ডাক টিকেট
ছবি: উইকিপিডিয়া

গণিত, রসায়ন ও আলোকবিজ্ঞান

গণিতশাস্ত্রে আল-কিন্দি আধুনিক পাটিগণিত ও গোলাকার জ্যামিতির ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি প্রখ্যাত গণিতবিদ আল-খাওয়ারিজমিকে তাঁর জ্যোতির্বিদ্যা–সংক্রান্ত গবেষণায় সহায়তা করেছিলেন।

রসায়নশাস্ত্রে আল-কিন্দির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক। তাঁর সময়ে অনেক ‘অ্যালকেমিস্ট’ বিশ্বাস করতেন যে সাধারণ ধাতুকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সোনা বা রুপায় রূপান্তর করা সম্ভব।

আল-কিন্দি এ ধারণাকে ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করেন এবং রসায়নের ভিত্তি হিসেবে সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর জোর দেন। এমনকি তাঁকে অ্যালকোহল পাতন প্রক্রিয়ার অন্যতম আদি প্রবর্তক হিসেবে গণ্য করা হয়। (ফাইলাসুফুল আরব, পৃষ্ঠা: ৮৫, দারুল কলম, বৈরুত, ১৯৭৫)

আমাদের উচিত সত্যের মূল্য দেওয়া এবং তা যেখান থেকেই আসুক না কেন—তা পূর্ববর্তী প্রজন্ম বা ভিন্ন জাতির থেকে হলেও গ্রহণ করতে দ্বিধা না করা।
আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি

আলোকবিজ্ঞান বা অপটিকসেও তাঁর গবেষণা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় আধুনিক বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে। তিনি জ্যামিতিক আলোকবিজ্ঞান নিয়ে একটি আকরগ্রন্থ রচনা করেন, যা রজার বেকনের মতো আধুনিক বিজ্ঞানের প্রবক্তাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

আল-কিন্দিকে ইতালীয় রেনেসাঁ পণ্ডিত জিরোলামো কার্দানো মধ্যযুগের ১২ জন শ্রেষ্ঠ মেধাবীর একজন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিলেন।

সংগীতের বিজ্ঞান ও শব্দতরঙ্গ

আল-কিন্দির বহুমুখী প্রতিভার অন্যতম চমকপ্রদ দিক হলো সংগীত নিয়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণা। তিনি প্রথম প্রমাণ করেন যে সুরের প্রতিটি লয় বা নোটের একটি নির্দিষ্ট পিচ বা কম্পাঙ্ক রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সুরের সমন্বয়ে কীভাবে হারমনি বা ঐক্যতান তৈরি হয়, তা গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, তিনি কয়েক শ বছর আগেই অনুমান করেছিলেন যে শব্দ বাতাসের মাধ্যমে তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাদের কানের পর্দায় আঘাত করলে আমরা শুনতে পাই। সংগীতের বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর মৌলিক কাজগুলো পরবর্তীকালে ইউরোপে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।

আল-কিন্দির উত্তরাধিকার

তিনি অন্তত ২৬০টি বই লিখেছিলেন, যদিও কালের বিবর্তনে তাঁর অনেক কাজ হারিয়ে গেছে। পরবর্তীকালে ইবনে সিনা বা আল-ফারাবির মতো দার্শনিকদের খ্যাতি আল-কিন্দির অর্জনকে কিছুটা ম্লান করলেও বর্তমান সময়ের গবেষকেরা স্বীকার করেন যে আল-কিন্দিই ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি প্রথম ইসলামি দর্শনের মজবুত কাঠামো তৈরি করেছিলেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞান ও ইমান একে অপরের পরিপন্থী নয়, বরং তারা একে অপরের পরিপূরক।

তাঁর জীবন থেকে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জ্ঞানের প্রতি তাঁর উদারতা। তিনি দেখিয়েছেন যে মুসলিমদের উচিত পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে সত্য ও প্রজ্ঞা গ্রহণ করা। তিনি কেবল মধ্যযুগের একজন দার্শনিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে এক বুদ্ধিবৃত্তিক সেতুবন্ধন।

ইসলামের স্বর্ণযুগের এই মহান জ্ঞানতাপস আমাদের মনে করিয়ে দেন, জ্ঞানচর্চা কেবল কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না; বরং প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে মানবতার কল্যাণে তা নিয়োজিত করা। আল-কিন্দির জীবন ও কর্ম আজ এক হাজার বছর পরও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

আরও পড়ুন