রমজানের যে ইবাদতের কথা আমরা মনে রাখি না

ছবি: পেক্সেলস

রমজান বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তারাবির দীর্ঘ কাতার, সাহরি ও ইফতারের আয়োজন, পবিত্র কোরআন তোলাওয়াত কিংবা দুস্থদের মাঝে দান-সদকার দৃশ্য।

এই দৃশ্যমান আমলগুলো নিঃসন্দেহে রমজানের প্রাণ এবং এতে রয়েছে অশেষ সওয়াব। কিন্তু এই বাহ্যিক কর্মতৎপরতার আড়ালে রমজানের ইবাদতের আরও একটি গভীর ও নীরব দিক আছে। সেটি হলো— যা আমরা করি, তা দিয়ে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা আমরা ‘করি না’ বা বর্জন করি, তা দিয়ে সংজ্ঞায়িত।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)–এর মতে, “ইবাদত হলো এমন একটি ব্যাপক শব্দ যা আল্লাহ পছন্দ করেন এবং যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন—তা সে কাজ প্রকাশ্য হোক বা গোপন, তা হতে পারে অন্তর, জিহ্বা কিংবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ।” (মাজমু আল-ফাতাওয়া, ১০/১৪৯, দারুল ফাতওয়া, বৈরুত)

সুতরাং, ইবাদত কেবল কর্মের নাম নয়, বরং আল্লাহর জন্য কোনো কিছু সচেতনভাবে বর্জন করাও একটি বড় ইবাদত।

রোজা কেবল অভুক্ত থাকা নয়

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা রোজা ফরজ করার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেছেন, “হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩)

ভাষাগতভাবে ‘সাওম’ বা রোজার অর্থ হলো—বিরত থাকা বা সংযম অবলম্বন করা। ইসলামের পরিভাষায়, রোজা হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহকারে পানাহার ও দাম্পত্য মিলন থেকে বিরত থাকা।

কিন্তু ক্ষুধার্ত থাকাই রোজার মূল লক্ষ্য নয়; বরং এটি হলো তাকওয়া অর্জনের একটি মাধ্যম। ইমাম গাজালি (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, “রোজা কেবল পানাহার ত্যাগ করা নয়, বরং যাবতীয় পাপ থেকে বিরত থাকা: জিহ্বার নীরবতা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সংযম এবং হৃদয়ের স্থিরতা।” (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ১/২৩১)

আরও পড়ুন

রোজার তিনটি স্তর

ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি রোজার তিনটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন:

১. সাধারণ মানুষের রোজা: কেবল পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থাকা।

২. ধর্মভীরুদের রোজা: চোখ, কান, জিহ্বা, হাত ও পা-কে যাবতীয় পাপ থেকে রক্ষা করা।

৩. বিশিষ্টজনদের রোজা: অন্তরকে নীচ চিন্তা ও আল্লাহ থেকে বিমুখকারী সব কিছু থেকে মুক্ত রাখা। (মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদিন, পৃষ্ঠা: ৪৪, দারুল মানার, কায়রো)

রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, চারিত্রিক শুদ্ধি ছাড়া কেবল না খেয়ে থাকায় কোনো সার্থকতা নেই, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ করা বর্জন করল না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৩)

নীরবতার শক্তি ও ডিজিটাল সংযম

রমজান আমাদের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। অতিরিক্ত কথা অন্তরকে শক্ত করে ফেলে। আল্লাহ তাআলা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা সংরক্ষণ করার জন্য একজন সদা প্রস্তুত প্রহরী তার পাশেই থাকে।” (সুরা কাফ, আয়াত: ১৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)

গিবত, পরনিন্দা বা অহেতুক তর্ক থেকে বিরত থাকা এই মাসে একটি শক্তিশালী ইবাদত।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই সংযম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অহেতুক স্ক্রলিং, অনর্থক কৌতূহল এবং আল্লাহ থেকে বিমুখকারী ডিজিটাল আসক্তি বর্জন করা আধুনিক সময়ের 'অন্তরীয় রোজা'।

আল্লাহ বলেন, “যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)

আরও পড়ুন

ব্যস্ত জীবনে রমজানের আমল

কর্মজীবী: কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা, অধৈর্য না হওয়া এবং পরনিন্দা এড়িয়ে চলাই তাদের জন্য ইবাদত।

মা ও গৃহিণী: ইফতার ও সাহরি প্রস্তুতির যে নিরলস খিদমত (সেবা), তা যদি ধৈর্য ও নিয়তের সাথে হয়, তবে সেটিও বড় ইবাদত।

শিক্ষার্থী: পড়াশোনার চাপে রোজা রেখেও ধৈর্য ধারণ করা এবং অসততা বর্জন করা তাদের জন্য আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছেন, ছোট আমলকেও তুচ্ছ মনে করা যাবে না। এমনকি ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও একটি নেক কাজ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৬)

আল্লাহর কাছে সেই আমলই সবচেয়ে প্রিয় যা নিয়মিত করা হয়, তা পরিমাণে অল্প হলেও। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)।

রমজান আমাদের শেখায়, ‘অনুপস্থিতি’ বা কোনো কিছু না করা সবসময় ক্ষতি নয়; কখনো কখনো এটিই বড় রহমত। যখন আমরা ভোগের নেশা, ক্রোধের প্রতিক্রিয়া এবং অনর্থক কথা বলা থেকে নিজেকে সচেতনভাবে দূরে রাখি, তখন আমাদের আত্মা পুষ্ট হয়।

রমজান শেষে যখন আমাদের রুটিন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন যদি এই ‘সংযমের পজ’ বা বিরতি নেওয়ার অভ্যাসটি আমাদের ভেতরে থেকে যায়, তবেই বুঝতে হবে আমরা রমজানকে সার্থক করতে পেরেছি।

আরও পড়ুন